দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে কিছু আলোচনা ও প্রস্তাব

অপর্ণা হাওলাদার
Published : 17 July 2022, 05:33 PM
Updated : 17 July 2022, 05:33 PM

উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতির সাথে তুলনা করে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে কিছু আলোচনা তুলতে চাই আজকের এ লেখায়। উন্নত বিশ্বের সব কিছু অন্ধের মতো আমাদের পক্ষে অনুসরণ করা সম্ভব নয়, উচিতও নয়। কিন্তু, উন্নত বিশ্বের সাপেক্ষে তুলনা করে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার পরিস্থিতি বিবেচনা করা দরকার। আমি প্রথমে বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হওয়ার নিয়োগনীতি, এবং এই নিয়োগ প্রণালীর কারণে তৈরি হওয়া অবস্থার বর্ণনা করবো। এরপর অন্য কিছু দেশের বর্তমান শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করবো। তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরার পর বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে আমার প্রস্তাবগুলো তুলে ধরবো। আমি অর্থনীতির শিক্ষার্থী ছিলাম, সুতরাং অনেক অভিজ্ঞতাই অর্থনীতি বা সামাজিক বিজ্ঞানের প্রেক্ষিতে থাকবে। মূল কথা অবশ্য যে কোনও বিভাগের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। 

বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতি 'ইন্টেলেকচুয়াল' জায়গা থেকেই ভুল। আজকের বিশ্বে কেবল অনার্স বা মাস্টার্স এর রেজাল্ট দেখে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ ভাবাই যায় না। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি বিশ্ববিবেচনায় নতুন। যে হারে ১৯৪৭ এর পরে মাইগ্রেশন হয়েছে, বা যেভাবে ১৯৭১ এ শিক্ষক নিধন হয়েছে, তাতে প্রভাষক পদে স্নাতক পাস করার পর শিক্ষক নিয়োগের প্রয়োজন হয়তো ছিল। কিন্তু, বর্তমান বাংলাদেশে আমাদের অনেক ছেলেমেয়ে বাইরে থেকে পড়াশোনা করেছেন। সঠিকভাবে নীতি প্রণয়ন করলে, গবেষণার সুবিধা দিলে, রাজনীতির প্রকোপ কমালে, তারা অনেকেই হয়তো ফেরত আসবেন। এর প্রেক্ষিতে ২৩/২৪ বছরের প্রায় আনাড়ি স্নাতক পাস করা শিক্ষার্থীকে কেবল ফলাফলের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ কারো জন্যই মঙ্গলজনক নয় বলে মনে করি। 

এই অনার্সের রেজাল্ট এর ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ সিস্টেমের কারণে অনেকগুলো সমস্যা তৈরি হয়। যেমন-

১. অভিজ্ঞতাহীন ব্যক্তিদের শিক্ষক নিয়োগের কারণে শিক্ষকেরা নিজেরাই হিমশিম খান। তারা একই বিভাগ থেকে মাত্রই ছাত্রাবস্থা শেষ করেছেন, পড়ানোর কোনও অভিজ্ঞতা নেই। 

২. প্রফেশনাল ট্রেইনিং ছাড়া এই শিক্ষকেরা যখন শিক্ষার্থীদের সামনে যান, অনেক কাজই করে বসেন যেটা বয়সজনিত বিবেচনায় মানা গেলেও, শিক্ষকদের কাছে থেকে আশা করা যায় না। 

৩.রিসার্চের মেন্টরিং এর  সুবিধা না থাকায় এই শিক্ষকেরা নিজেদের উন্নয়নে মনোযোগ দিতে পারেন না।

৪. অ্যাকাডেমিক জীবনে পিছিয়ে পড়ার ভয় কাজ করে তাদের মধ্যে। আরেকটু পেছনের রেজাল্ট করা অনেকেই দেশের বাইরে গিয়ে পিএইচডি শুরু করে দেন। কিন্তু প্রভাষকের চাকরি স্থায়ী করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকেই বিভিন্ন রাজনীতির শিকার হন। অনেকে নিজেই রাজনীতিতে নেমে পড়েন। আমরা এই প্রক্রিয়ায় বহু সম্ভাবনাময় তরুণ শিক্ষার্থীকে হারাই। ষষ্ঠত, সদ্য স্নাতক পাস করা তরুণদের কারণে অপেশাদারী মনোভাব দেখা যায়। 

এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার ফলে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া আমরা দুই ধরনের শিক্ষক তৈরি করছি। প্রথমত, যারা আর পরিশ্রম করতে চান না। অনেকেই পিএইচডি ছাড়া অ্যাসিস্ট্যান্ট, অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর হয়ে যাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রোমোশনের ফাঁক অনেক, কোনও একটি ফাঁক খুঁজে নিয়ে এরা প্রোমোশন পেয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি ছাড়া প্রফেসরও আমি চিনি। আবার দেশের ভেতর বা বাইরে খুব নিম্নমানের কোনও জায়গা থেকে নামেমাত্র পিএইচডি এনে প্রোমোশন নিচ্ছেন কেউ কেউ। এই গ্রুপটিকে বলা যায় এই সিস্টেমের কারণে পুরোই নষ্ট হয়ে যাওয়া দল।

এদের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি আরও প্রখর হচ্ছে, নিজে পরিশ্রম না করার কারণে অন্যদের পরিশ্রমও এদের চক্ষুশূল। সিস্টেমের বিভিন্ন গলদে এদের মধ্যে যে সম্ভাবনা ছিল, তা পুরোটাই শেষ হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়া শিক্ষকদের অনেকেরই ১০/২০ বছরে কোনও গবেষণা নেই।  দ্বিতীয়ত, অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়ে সেই পরিচয় দেখিয়ে বৃত্তি নিয়ে দেশের বাইরে গিয়ে আর ফেরত আসছেন না। সেটা নিয়ে আলাদা আলোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু ঝামেলা হচ্ছে, এরা বছরের পর বছর শিক্ষাছুটি নিয়ে বেতন নিচ্ছে। এদের অনেককে পরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই চাকরি থেকে ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছে।  

সত্যি বলতে, খুব কম শিক্ষকই এর মধ্যেও নিজেদের অ্যাকাডেমিক ক্যারিয়ার প্রাধান্য রেখে পিএইচডি করে গবেষণা এবং শিক্ষকতা চালিয়ে যাচ্ছেন। এরকম দুই একজন শিক্ষকের উপর চাপ পড়ছে অনেক আন্ডারগ্র্যাড শিক্ষার্থীকে মেন্টরিং করার। পুরো সিস্টেমে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী প্রত্যেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই গ্রুপটি সংখ্যায় খুবই নগণ্য, এবং তাদের গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সুবিধাও খুব কম। রাজনীতিতে ব্যস্ত প্রশাসন এবং অন্যান্য শিক্ষকেরা এদের ভালো চোখে দেখেন না। এই গ্রুপের অনেকেই আবার কিছু বছর দেশে থেকে হতাশ হয়ে আবার বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কেউ দেশের বাইরে থাকাটা তার ব্যক্তিগত বিবেচনা। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এদের ধরে রাখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কোনও পদক্ষেপ নিচ্ছে না। প্রশাসন বহুভাবেই রাজনীতি করে, তোষামোদী করে এগিয়ে যাওয়া শিক্ষকদেরই সহায়তা করছে। 

এখন অন্যান্য অন্যান্য উন্নত দেশের প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত আমার কিছু অভিজ্ঞতা তুলে ধরছি।  

প্রথমত, আজকের যুগে সারা দুনিয়ায় কেবল সেশনাল ইন্সট্রাকটর হিসেবে অল্পকিছু নিয়োগ দেওয়া হয় কেবল মাস্টার্স পাসদের। এটা কেবল এক সেমিস্টারের টিচিং জব, মূলত পিএইচডি শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয়। কিন্তু, সামগ্রিকভাবে, অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর পজিশনে পিএইচডি ছাড়া এখন আর নেওয়া হয় না। এমনকি ভারতেও অর্থনীতিতে ফ্যাকাল্টি হতে চাইলে অবশ্যই পিএইচডি এবং গবেষণা থাকতে হবে। বিষয়ভেদে এক বা একাধিক পোস্টডকও করতে হয় শিক্ষক হতে চাওয়া প্রার্থীদের। আন্ডারগ্র্যাডের পর মাস্টার্স, পিএইচডি, পোস্টডক শেষ করে কেউ যখন অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে যোগ দেন, তাদের দক্ষতার মাত্রা আলাদা হয়। তারা শিক্ষার্থীদের সাথে হিংসাত্মক খেলায় নামেন না, তারা অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হতে চান অ্যাকাডেমিক কাজের তাগিদেই। এই ম্যাচিউরিটি আমাদের শিক্ষকদেরও প্রয়োজন। পিএইচডি একটা ডিগ্রি কেবল নয়, এটা একটা সংকেত যে কে আসলেই গবেষণামূলক কাজের প্রতি আগ্রহী। 

দ্বিতীয়ত, ডিগ্রি ছাড়াও এই নিয়োগ প্রক্রিয়া অনেক কিছুর উপর নির্ভর করে। রিসার্চ প্রোফাইলে দেখাতে হয় পাবলিকেশন, ভবিষ্যত প্রজেক্ট প্ল্যান, ইন্ডিভিজুয়ালিটি এবং কোলাবরেশন, গ্র্যান্ট রাইটিং এর অভিজ্ঞতা। প্রতিটি ইন্টারভিউতে জিজ্ঞাসা করা হয় রিসার্চের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী। কেবল অতীত প্রোফাইল দেখিয়ে টিকে থাকা কঠিন। টিচিং প্রোফাইলে দেখাতে হয়ে আগের পড়ানোর অভিজ্ঞতা, শিক্ষার্থীদের দ্বারা মূল্যায়ন, কোর্স ডিজাইন। এছাড়াও আরও দেখাতে হয় কিভাবে গবেষণা পাবলিক এঙ্গেজমেন্ট বা এক্সটেনশনে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। কেবল গবেষণা নয়, এই রিসার্চ পাবলিক প্ল্যাটফর্মে তুলে ধরাকেও দেওয়া হয় গুরুত্ব। আরও দেখাতে হয় বৈচিত্র্যতা নিয়ে শিক্ষকপ্রার্থী কী ভাবছেন – বৈষম্য কমাতে পাঠপদ্ধতিতে কী ধরনের পরিবর্তন চিন্তা করছে। এইসব আলাদাভাবে স্টেটমেন্টে লিখে এবং মুখে ব্যাখ্যা করে পরেই চাকরি পাওয়া যায় শিক্ষকতার। ইন্টারভিউ হয় বেশ কয়েকটি ধাপে। ক্যাম্পাস ভিজিট করে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, প্রশাসন সবার সাথে কথা বলতে হয়। রিসার্চ এবং টিচিং এর আলাদা প্রেজেন্টেশন দিতে হয়। প্রায় কয়েক মাসের খাটাখাটনির ব্যাপার এই পুরো ইন্টারভিউ প্রসেস। 

বাইরের দেশের সব আমাদের হয়তো নেওয়া সম্ভব না। আমাদের রিসোর্স সীমাবদ্ধতা আছে, রাজনীতিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একদিনে হটিয়ে দেওয়া সম্ভব না। আমার প্রস্তাবনায় কিছু কিছু জিনিস কোনও বিশাল পরিবর্তন ছাড়াই ঘটানো সম্ভব। যেমন – 

প্রথমত, লেকচারারশিপ- অনার্স বা মাস্টার্স পাসদের জন্য খুব বেশি হলে আমরা সেশনাল ইন্সট্রাকটর ধারার কিছু অস্থায়ী পদ রাখতে পারি। এরা সেই অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে পিএইচডি অ্যাপ্লাই করতে পারবে। এই পজিশনের জন্য খুব কঠোরভাবে প্রফেশনাল ট্রেইনিং দেওয়া প্রয়োজন যেন শিক্ষার্থীদের সাথে সম্পর্কের প্রফেশনালিজম তারা জানে। 

দ্বিতীয়ত, অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর- এই চাকরিটি পিএইচডি এবং পোস্টডকের অভিজ্ঞতা না থাকলে একেবারেই দেওয়া উচিত না। এই চাকরিও পার্মানেন্ট না করে বাইরের স্টাইলে টেনিউর-ট্র্যাক করা উচিত। এতে তরুণ শিক্ষকদের মধ্যে গবেষণা এবং পাঠদানে আগ্রহ বাড়বে। গবেষণার প্রোফাইল অনুযায়ী এদের গবেষণার সুযোগ দিতে হবে। 

তৃতীয়ত, ভিজিটিং প্রফেসর পজিশন- আমাদের দেশের অনেকেই দেশের বাইরের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক হিসেবে আছেন। গ্রীষ্মের ছুটিতে এদের ভিজিটিং পজিশনে আমন্ত্রণ জানালে সবার মধ্যেই রিসার্চের, জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ বাড়বে। শিক্ষার্থীরাও মেন্টরশিপ পাবে।  

চতুর্থত, প্রফেশনাল ট্রেইনিং- আমাদের দেশে শিক্ষকদের অনেকের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে 'মাস্তানি' করার অভিযোগ রয়েছে। তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে কথা বলা, মানুষের স্বপ্নকে ভেঙ্গে দেওয়া, ক্ষেত্রবিশেষে গালিগালাজ করাও তারা ছাড়েন না। আমি বিদেশে যে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী/গবেষক হিসেবে কাজ করেছি, সব জায়গায় আমাকে অনেক প্রফেশনাল ট্রেইনিং এর মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। একজন শিক্ষার্থীকে ধরে বাজে কথা বলে এখানে পার পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। আমাদের দেশেও প্রফেশনাল ট্রেইনিং এবং টিচিং এভালুয়েশনের ব্যবস্থা করা উচিত।   

শেষে একটি পয়েন্ট হচ্ছে, আমাদের টিচিং এবং রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপের ব্যবস্থা করা উচিত। শিক্ষকদের যেমন সময় বাঁচবে, অনেক শিক্ষার্থীর আয়ের ব্যবস্থাও হবে। আমাদের শিক্ষার্থীরা এমনিতেই ইনফরম্যালি জুনিয়রদের পড়ায়। এটাকেই ফরম্যাল ব্যবস্থার মধ্যে আনলে প্রশাসন, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী- সবারই সুযোগ বৃদ্ধি পাবে। আমি নিজেও স্নাতকে পড়াবস্থায় জুনিয়রদের পড়িয়েছি। এই পড়ানো কিন্তু আমি সিভিতে লিখতে পারিনি। এর বদলে যদি টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপের সুযোগ থাকতো, সেটা সিভিতে লেখা যেতো। 

এই পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয় বাঁচাতে পারে অনেক টাকা গচ্চা যায়। প্রশাসনের সচেতন হওয়াটা এখন প্রয়োজন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক