ঈদযাত্রা: আমরা কি সক্ষমতা উপলব্ধি করবো না?

অজয় দাশগুপ্তঅজয় দাশগুপ্ত
Published : 10 May 2022, 02:57 PM
Updated : 10 May 2022, 02:57 PM

ঈদযাত্রা (২০২২) বিষয়ে যাত্রীকল্যাণ সমিতি নামের একটি সংগঠন বলেছিল- 'Hellish Traffic Situation' আমাদের দেখতে হতে পারে। মধ্য এপ্রিলে সংবাদ সম্মেলন করে এ সংগঠনে যুক্ত একজন (যিনি নিজেকে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও খ্যাতিমান গবেষক হিসেবে পরিচয় দেন) প্রকৌশলী বলেন, Our research says that this time 30 lakh people will leave Dhaka every day for four days before Eid, but the country has the capacity to transport 13-14 lakh passengers only, there is no transportation system for the rest 16 lakh. This time the transport system will go into a coma- transport system can break down.

পয়লা মে টেলিভিশন টক শোতে এক খ্যাতিমান সাংবাদিক তিন দশকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, 'ঈদযাত্রা কোনোকালে স্বস্তিদায়ক ছিল না, এবারেও হবে না।'

মানিকগঞ্জে প্রবীণ সাংবাদিক কল্যাণ সাহাও তার অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, দুই দশক আগে আরিচা-পাটুরিয়া ঘাটে পরিস্থিতি এতটাই খারাপ ছিল যে অনেক যাত্রী ঘাটেই ঈদের নামাজ আদায় করেন।

২০২০ ও ২০২১ সালের চারটি ঈদ ছিল করোনার বিধিনিষেধ বলবৎ থাকার সময়। এবারে ঈদ পড়েছিল এমন এক সময়, যখন দিনের পর দিন ভয়ঙ্কর এ ব্যাধিতে কোনো মৃত্যুর দুঃসংবাদ নেই। ঈদের আগের কয়েকটি দিন প্রতিদিন ৩০ লাখ লোক ঢাকা ছাড়বে এবং আরও অনেক শহর ও জনপদ থেকে বিপুল সংখ্যক লোক রাজপথের গাড়িতে কিংবা লঞ্চ-ট্রেন-বিমানে উঠবে, এ ধারণা সঠিক ছিল। কিন্তু কোন জাদুমন্ত্র বলে ঈদযাত্রা অন্য যে কোনও সময়ের তুলনায় অনেকটাই নির্বিঘ্ন হতে পারলো?

২০১৯ সালের ১০ অগাস্ট একটি ইংরেজি দৈনিক খবর দিয়েছিল- যমুনায় বঙ্গবন্ধু সেতুর এলাকায় ৬৫ কিলোমিটার যানজট। এবারে ঈদযাত্রা শুরুর সময় (২৭ এপ্রিল) সেই একই দৈনিক লিখেছিল- গাজীপুর-বঙ্গবন্ধু সেতু এলাকায় আগের মতোই যানজট হবে। কেন এমন দুর্ভোগে পড়তে হয়নি লাখ লাখ মানুষকে? এ বিষয়টি অনেকের কাছে বিস্ময়ের বৈকি। কিন্তু বাংলাদেশের এই যে সক্ষমতা সেটা বিবেচনায় নিলে আগামীতে ঈদযাত্রা যেমন আরও নির্বিঘ্ন করা যাবে, তেমনি আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে অনেক বড় বড় উদ্যোগও  সফল করা যাবে।

পদ্মা সেতু নিয়ে যখন বিশ্বব্যাংক অহেতুক অভিযোগ তুলেছিল, দুর্নীতির সম্ভাবনা আছে বলে বাংলাদেশের বদনাম করছিল, তখন আমরা দেখেছি- একটি মহল বিশ্বব্যাংকের অভিমতকেই সঠিক বলে ধরে নিয়েছিল। একাধিক প্রভাবশালী দৈনিক পত্রিকা লিখেছিল- পদ্মা সেতুর ঋণ চুক্তি বাতিল করে বিশ্বব্যাংক সঠিক কাজ করেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিলেন, 'দুর্নীতি দমন কমিশন বিশ্বব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী সৈয়দ আবুল হোসেনকে মামলার আসামি না করে ভুল করেছে। এটা করা হলে দুর্নীতি দমন কমিশনের ভাবমূর্তি বাড়বে।'

বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ শেষ পর্যন্ত কানাডার আদালতে গড়ায় এবং ২০১৭ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি আমাদের সকল পত্রিকায় খবর প্রকিাশিত হয় এভাবে- 'পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির প্রমাণ পায়নি কানাডার আদালত'। আদালত সৈয়দ আবুল হোসেনসহ অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যে সব বক্তব্য উপস্থাপন করেছে তাকে জল্পনা, গুজব ও জনশ্রুতি হিসেবে উল্লেখ করেছে। আদালত স্পষ্ট ভাষায় বলেছে- গালগল্প আর গুজব দিয়ে দুর্নীতির মামলা হয় না। এমন ফালতু মামলা করার জন্য কানাডার পুলিশকেও তিরস্কার করা হয়।

বিশ্বব্যাংকের মুখ পুড়েছিল এ ঘটনায়। এ প্রতিষ্ঠানের ভাইস- প্রেসিডেন্ট ড. কৌশিক বসু ২০১৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেন, "১০ বছর আগে কেউ ভাবতেও পারেনি যে বাংলাদেশ নিজের টাকায় এত বড় একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারবে। বিশ্বব্যাংকের ওপর নির্ভরতা ছাড়াই বাংলাদেশ এটা করতে পারছে।" তিনি ঋণ চুক্তি বাতিল করায় বিশ্বব্যাংকের ভুল হয়েছে বলে স্বীকার করেন এবং বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে যে কোনো প্রকল্প-উদ্যোগ বাস্তবায়নে পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন।

বাংলাদেশের এবারের ঈদযাত্রার কয়েকদিন আগে এপ্রিলের শেষ দিকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যমুনায় বঙ্গবন্ধু সেতুর কাছাকাছি কয়েকটি ফ্লাইওভার 'অসময়ে' চালু করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন। এ সব ফ্লাইওভার এবং বিভিন্ন স্থানে দুই লেনের সড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজ চলার কারণে সড়কে যানজট অসহনীয় ছিল। ফ্লাইভারগুলোতে কিছু কাজ বাকি ছিল। তবে এ সিদ্ধান্তে ঈদের ভিড় সামলানো সহজ হয়েছে। তবে সকলে এতে খুশি হয়নি। প্রভাবশালী একটি বাংলা দৈনিকের শিরোনাম ছিল এভাবে- 'কাজ অসমাপ্ত রেখেই ফ্লাইওভার চালু'। হয়তো একটি মহল 'ঈদযাত্রায় মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ'- এমন শিরোনাম করতে পারলেই আনন্দ উপভোগ করতো।

এ সব হচ্ছে নেতিবাচক মনোভাবের বহির্প্রকাশ। ঈদযাত্রা নরকতুল্য হবে কিংবা সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে- এমন প্রচারের কারণে লাখ লাখ মানুষের মধ্যে অকারণ উদ্বেগ ছিল। ট্রেনের টিকিট যত লোক চেয়েছে, আসন সংখ্যা সে তুলনায় অনেক কম। রেলসেবার আরও উন্নতির তাগিদ এ থেকে আমরা অনুভব করতে পারি। কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষ যে ঈদের সময় অসাধ্যসাধন করেছে সেটা মন্ত্রীর স্ত্রীর ভুলে কারণে চাপা পড়ে যেতে পারে না।

কক্সবাজারের এক সংবাদকর্মী কিছুটা আক্ষেপের সঙ্গেই বলেছেন- কিছুদিন আগে একাধিক দৈনিকে খবর প্রকাশিত হয়- 'কেবল ডালভাতের জন্যই পর্যটকদের ৪০০ টাকা ব্যয় করতে হয়'। আরও বলা হয়, হোটেল-রিসোর্টে গলকাটা ভাড়া। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চিত্র উদ্বেগজনক। কিন্তু পর্যটকদের নিরাপত্তায় টুরিস্ট পুলিশ যে বিশেষভাবে উদ্যোগী ছিল, সেটা তেমন প্রচার পায়নি। ঈদের ছুটিতে কক্সবাজারে লাখ লাখ পর্যটক গিয়েছেন। অনেক ধরনের মোটরযান তারা ব্যবহার করেছেন। সমুদ্র ও নদী পথে নির্বিঘ্নে চলাচল করেছেন। ছোট এলাকায় বিশাল সমাবেশ- এ কারণে দুর্ভোগ কিছু না কিছু হবেই। কিন্তু যাদের কারণে পর্যটন নিরাপদ এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থনীতি ফের রমরমা- তাদের কি একটু প্রশংসা আমরা করতে পারি না?

উৎসবের অর্থনীতি উন্নত দেশগুলোতে আলোচনার বিষয়। টানা দুই বছর বাংলাদেশে ঈদের বাজার মন্দা গেছে। এ বারে মানুষ প্রচুর কেনাকাটা করেছে, দলে দলে গ্রামে গিয়েছে। এর প্রভাবে শিল্প-বাণিজ্য খাত লাভবান হয়েছে, গ্রামীণ অর্থনীতিও চাঙ্গা হয়েছে। যারা টিসিবির 'ন্যায্য মূল্যের পণ্য বিক্রির গাড়ির সামনে লম্বা লাইন দেখে' বাংলাদেশের মানুষের ক্রয় ক্ষমতা তলানিতে ঠেকে গেছে উদ্বেগ প্রকাশ করছিলেন, তারা নিশ্চয়ই এখন একটু ভিন্নভাবে ভাবতে বসবেন।

ঈদে ঢাকা থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ গ্রামে গেছেন ব্যক্তিগত গাড়িতে। ঈদযাত্রায় মোটর সাইকেল ব্যবহার- এটা ছিল বিশেষভাবে আলোচনায়। একটি দৈনিকে কয়েকদিন আগে ফ্রিজ বিক্রি নিয়ে লিখেছে- ফ্রিজের বাজার বড় হচ্ছে। বাজারে দেশি কোম্পানির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। শহর ও গ্রাম সর্বত্র, সর্বত্র বিদ্যুৎ সররাহ নির্বিঘ্ন থাকার কারণে গত বছর  কেবল একটি দেশিয় কোম্পানি ৩২ লাখ ফ্রিজ বিক্রি করেছে।

আমরা কেন এই নবলব্ধ সক্ষমতা উপলব্ধি করব না? করোনা শুরুর পর পোশাকশিল্পের এক শীর্ষস্থানীয় মালিক আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন- এ শিল্পে ধস নামবে। লাখ লাখ কর্মী বেকার হয়ে পড়বে। বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন। এ বছর রপ্তানি আয় ৫ হাজার কোটি ডলার ছাড়াবে, এমনই পূর্বাভাস। পোশাকের বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অবস্থান যে কোনো সময়ের চেয়ে ভাল। কোভিড আরোগ্য সূচকে ৮ ধাপ এগিয়ে ৫ম হয়েছে বাংলাদেশ। এটা গর্বের খবর। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে আমরা এগিয়ে করোনাজয়ে এবং ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন হওয়া কি এসব অর্জন থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু?

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক