নির্জীব সাংস্কৃতিক অঙ্গন নিয়ে আমাদের সম্প্রীতি রক্ষার ভাবনা

অজয় দাশগুপ্তঅজয় দাশগুপ্ত
Published : 31 Oct 2021, 03:24 PM
Updated : 31 Oct 2021, 03:24 PM
আমি জন্মেছি তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে। পূর্ব পাকিস্তানে কেটেছে বারো বছর। এ বয়সের বালক অনেক কিছুই মনে রাখতে পারে। আমিও রেখেছি। তখন শীতের প্রকোপ ছিল বেশ জাঁকালো। দুর্গা পূজা বা শারদীয় উৎসব আসতো শরতে। কিন্তু শীত শুরু হয়ে যেতো ভোরবেলা থেকে। তখন মানুষের বাড়ির সামনে যার যার সুযোগ ও সাধ্যমতো ছোট ছোট উঠোন থাকতো। এখনকার মতো আকাশচুম্বি অট্টালিকা আর কবুতরের খোপের মতো ফ্ল্যাট বাড়ি ছিল না। মানুষ  বাস করতো টিনের চালার ঘরে। বড় জোর এক-দোতলা বাড়িতে। আমাদের মায়া বিছানো টিনের চালার বাসার সামনের উঠোনটা ভরে উঠতো ভোরের শিউলি ফুলে। শিশির ভেজা এ শিউলিবেলা খালি পায়ে আমরা ছুটতাম কাছের দুর্গা প্রতিমা দেখে দিন শুরু করবো বলে। তখন জানতাম পাকিস্তান আমাদের পছন্দ করে না  এবং রাষ্ট্র সাম্প্রদায়িক বলে হিন্দুদের কোন আমলে নেয় না। অথচ মানুষ ছিলেন অসাম্প্রদায়িক।  তেমন বাধা কিংবা ভাঙাভাঙি দেখিনি কোনওকালে।
আমাদের স্বাধীনতা কারো দয়া বা অনুগ্রহে আসেনি। অসম যুদ্ধে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লাখো মানুষের আত্মাহুতি আর মা-বোনদের ইজ্জত এনে দিয়েছে এই বিজয়। সে ইতিহাস কি সবাই ভুলে গেছে? একাত্তরের যুদ্ধ, আমাদের মুক্তি সংগ্রাম ছিল জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের অংশগ্রহণে এক বিশাল অর্জন। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-মুসলিমদের মিলিত সংগ্রাম রক্ত আর ত্যাগে পাওয়া দেশটিতে কেউ পর, কেউ আপন এমন হতে পারে না। অথচ যখন আওয়ামী লীগের সরকার দেশ শাসনে শেখ হাসিনার ঐকান্তিক চেষ্টায় দেশ এগিয়ে চলেছে প্রবলভাবে তখন হঠাৎ করে দেশে নেমে এলো ভয়ংকর বিভীষিকা। যতো দিন যাবে ততো হয়তো ফিকে হয়ে  আসবে  স্মৃতি। একসময় ইতিহাস হয়ে যাবে এ ঘটনা। দগদগে ঘা ছাড়া বাকি সব মিলিয়ে যাবে। মানুষ পারে না এমন কাজ নাই। মানুষই ভুলিয়ে দেবে মানুষকে। শান্তিও হয়তো বিঘ্নিত হবে না।
এ নিয়ে লিখতে চাই না। লিখছি সংস্কৃতি বিষয়ে। এবার আবার প্রমাণ মিললো আমাদের গর্ব আর আনন্দের পরম জায়গা শিল্প-সংস্কৃতি এখন নির্জীব। এটা এক দিনে এক বছরে হয়নি। গত এক দশকে আমাদের সংস্কৃতি পদ-পদকের লোভ  আর পাবার খায়েশে সবাই বেপরোয়া। কে না জানে শেখ হাসিনা কে? তিনি বঙ্গবন্ধু কন্যা। তার অবদানে দেশ চলছে এগিয়ে। কিন্তু সবসময় তার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকা আমাদের সংস্কৃতির মানুষজন দিশা হারিয়ে ফেলেছেন। তাদের অবয়ব ঢাকা পড়ে গেছে বলেই না আছে বলিষ্ঠ কোনও কর্মকাণ্ড, না বলিষ্ঠ কোন আশাবাদ।
সংস্কৃতি কী বা কেন এ নিয়ে কথা বলার দরকার পড়ে না।  বাংলার সংস্কৃতি ধারণ করে আছেন দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের বাঙালিরা, যার মধ্যে বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিম বাংলা, ত্রিপুরা এবং আসাম , যেখানে বাংলা ভাষা প্রধান এবং দাপ্তরিক।  এখনো বাংলা দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে এবং বাংলা সংস্কৃতির উৎসবগুলো পৃথিবীব্যাপি উদযাপিত হয়। পৃথিবীর অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মত হাজার হাজার বছর ধরে নানা নৃতাত্ত্বিক এবং ধর্মীয় গোষ্ঠী ও শাখা-গোষ্ঠী, নানা শ্রেণির মিলন, পারস্পরিক প্রভাব এবং সমন্বয়ের ফলে গড়ে উঠেছে বঙ্গীয় সংস্কৃতি। সুলতানি আমলের 'বাঙলা' রাজ্য অথবা বাংলা ভাষা গড়ে ওঠার মুহূর্ত থেকে বাঙালি সংস্কৃতির জন্ম হয়নি। বঙ্গীয় সংস্কৃতির ভিত্তি গড়ে উঠেছিল আরো অনেক আগে থেকে। ধারণা করা হয়, বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস প্রায় চার হাজার বছর পুরনো। এক সময় ভারত উপমহাদেশের মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে বাঙালিরা নেতৃত্ব দিয়েছে। বাঙলা ছিল উপমহাদেশীয় সংস্কৃতির রাজধানী। এজন্য ভারত উপমহাদেশে বাঙালি সংস্কৃতির অনেক প্রভাব ছিল; যা এখনো আছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসাম এলাকা নিয়ে বাঙালি সংস্কৃতির বিস্তৃতি ছিল। এছাড়া ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, মনিপুর, মেঘালয়, বিহার, ঝাড়খন্ড ও ঊড়িষ্যা রাজ্যের কিছু অংশে বাঙালি সংস্কৃতির প্রভাব আছে।
কথাগুলো বলা হলো এই কারণে যে, যারা সংস্কৃতিতে  মৌলিক প্রভাব আর তার উৎস ভুলে, ধর্মের নামে মাতম করে তাদের কে বোঝাবে এসব? আজকে সংস্কৃতি ধ্বংস হবার কারণ মূলত দুইটি। প্রথমত, ধর্মের নামে চাপানো সব বিধিনিষেধ। কথা বলা লেখা বা অন্য শিল্পসম্মত কাজে আরোপিত সীমাবদ্ধতা দ্বিতীয় কারণ এই যে, দেশে এতো সব কাণ্ড ঘটে গেল হিন্দুদের সর্বনাশ করার জন্য একেবারে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেদের মাঠে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল সেটা কি সম্ভব হতো সংস্কৃতি আগের জায়গায় থাকলে? আগে সংস্কৃতি সবার জন্য বুকে চিতিয়ে দাঁড়াতো। তার কাজ ছিল বিপদে সাহায্য করা, মানুষকে মানুষ করে তোলা।
এবার আমরা কি দেখলাম? যে বয়সে তরুণদের প্রেম করার কথা, যে বয়সে তারা দেশ-সংস্কৃতি-কবিতা-গান নিয়ে মেতে থাকবে- সে বয়সে তারা লাঠিসোঠা নিয়ে রাস্তায় । বুঝলাম এ একধরনের জোশ । না বুঝেও গেছে অনেকে। কিন্তু এই না জানার কারণ কি সংস্কৃতির শূন্যতা প্রমাণ করে না? আমরাও এদেশে বড় হয়েছিলাম। আমরা দেখেছি তারুণ্য ঝলমলে সংস্কৃতির আসল রূপ। তখন যুবশক্তি মানেই গান কবিতা নাটক। এরশাদ আমলে তা এমন জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিল যে এরশাদ সরকার রাজনৈতিক দলের চাইতেও কবিতা পরিষদকে বেশি ভয় পেত। সে কবিতা পরিষদের অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেছি। দেখেছি মানুষ কিভাবে আন্দোলিত হয়। কিভাবে কবিতা-গানে জেগে ওঠে এদেশের মানুষ। আজ কোথায় সে শক্তি?
সংস্কৃতি মাঠে থাকলে 'নেতিবাচক সংবাদ' ম্লান হয়ে যেতো। বড় খবর হতো- সংস্কৃতি, খেলাধুলা এসব। তার বদলে মুখ হা করে গিলতে হয় চোর-ডাকাত-বাটপারের খবর। টাকা লুট-ব্যাংক লুট-হত্যা-রাহাজানি-ধর্ষণের খবর শুনতে শুনতে তারুণ্যের মনে কী ভাব জাগবে? ডাকাতের গল্প শুনে বড় হয়ে কতজন সাধু হয়? পারবে কেউ আদর্শ বাঙালি হতে?
আজ সংস্কৃতির আবার জেগে ওঠার সময় এসেছে। কালচার বলে যা বুঝি তার ছিটেফোঁটাও নাই কোথাও। স্তাবকতা আর তোষামোদী প্রধান দুশমন। এরপর আছে সংস্কৃতিবিমুখ অপপ্রচার। সরকারি তরফ থেকে কোন উদ্যোগ নেওয়া হবে কিনা জানি না। তবে দেশ বাঁচাতে, তারুণ্য বাঁচাতে, সমাজ বাঁচাতে- সংস্কৃতির বিকল্প দেখি না। এবার এটা প্রমাণ হয়ে গেছে পাঠ্যসূচিতে কাজ হবে না। বদলে যাওয়া পাঠ্যসুচি মানুষকে মানুষ করতে পারলে এসব কাণ্ড ঘটতো না।  যা ঘটার তা ঘটে গেছে।
সামনে আমাদের রুখে দাঁড়ানোর জন্য সংস্কৃতির উদাহরণ জরুরী। তা না হলে বাংলাদেশের মৌলিক চরিত্র আর চেহারা বদলে যাবে একদিন। সেটারই মহড়া দেখেছি আমরা। এখন সময় ঘুরে দাঁড়ানোর। সংস্কৃতি কি মাথা তুলতে পারবে এবার? সে সুযোগ কি দেওয়া হবে?

সিডনি থেকে

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক