‘আইনের শাসন’ বনাম ‘আইন দ্বারা শাসন’

এ বি এম খায়রুল হক
Published : 15 Feb 2012, 05:05 PM
Updated : 9 Oct 2021, 01:27 AM

সভ্যতার আদিযুগে এবং তারপরে রাজ্যাভিষেককালে রাষ্ট্রপ্রধানরা প্রজাদের কাছে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিতেন যে তারা আইন অনুসারে প্রজা পালন করবেন, তাদেরকে বাইরের শক্তির আক্রমণ থেকে রক্ষা করবেন।

৬৩৪ সালে হযরত ওমর ফারুক (রা.) খলিফা নির্বাচিত হয়ে ঘোষণা করেন:

"… I promise that I will not take anything of your taxes or of the booty (fay) that Allah grants to you, except in the proper manner. I promise you that whatever I do take, I will not spend it except in the proper manner. I promise you that I will increase your stipends, if Allah wills, and I will protect your borders …"

(ড. আলী মুহাম্মদ আস-সালাবী: উমর ইবনে আল-খাত্তাব, ভলিউম ১ এর ১৭৪ পৃষ্ঠা থেকে উদ্ধৃত)

আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে সপ্তম শতাব্দীর প্রথম ভাগে রাষ্ট্রের অধিবাসীদের নিকট রাষ্ট্র প্রধানের এই অঙ্গীকার সত্যি অনন্য।

১১০০ সালে রাজা প্রথম হেনরিও তার রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠানে সকলের প্রতি সুবিচার এবং অপরাধের মাত্রা অনুসারে শাস্তি দেওয়া বা দয়া দেখানোর অঙ্গীকার করেন। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে যুক্তরাজ্যের বর্তমান রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ১৯৫৩ সালে তার রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠানে প্রায় একই ধরনের অঙ্গীকার তার প্রজাদের প্রতি করেছিলেন। 

এখানে কিছু ঘটনা বর্ণনা করা প্রয়োজন যেগুলো একের পর এক ধীরে ধীরে এমন এক আইনগত অবস্থানে নিয়ে যায়, যে কারণে ১৮৬৭ সালে মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উইলিয়াম ই. হার্ন তার বিখ্যাত 'দ্য গভর্নমেন্ট অব ইংল্যান্ড: ইটস স্ট্রাকচার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট' গ্রন্থে ইংল্যান্ডের সাংবিধানিক অবস্থান, প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থাকে এক কথায় 'আইনের শাসন' নামে অভিহিত করেন। তৎপর, ১৮ বছর পরে অক্সফোর্ডের অধ্যাপক এ ভি ডাইসি ১৮৮৫ সালে প্রকাশিত তার 'ইন্ট্রোডাকশন টু দ্য স্টাডি অব দ্য ল অব দ্য কনস্টিটিউশন' গ্রন্থে 'আইনের শাসন'কে সংজ্ঞায়িত করেন।

প্রথম ঘটনা ১২১৫ সালের 'ম্যাগনা কার্টা' চুক্তি। রাজা জন  এর কুশাসনে বিরক্ত হয়ে ইংল্যান্ডের জমিদার শ্রেণি ও ধর্মযাজকরা তাকে এক চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন। ইংল্যান্ডের রানিমিড নামের এক দ্বীপে এই স্বাক্ষর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।

অন্যান্য শর্ত ছাড়াও ম্যাগনা কার্টায় নিম্নলিখিত দুইটি শর্ত ছিল-

      1. No free man shall be taken or imprisoned or dismissed or outlawed or exiled or in any way ruined, nor will we go or send against him, except by the lawful judgment of his peers or by the law of the land.
      1. To no one will we sell, to no one will we deny or delay right or justice.

(১২১৫ দ্য ইয়ার অব ম্যাগনা কার্টা, ড্যানি ড্যানজিগার এবং জন গিলিংহাম, ২০০৩ সালের সংস্করণ)

উল্লেখ্য যে ওই সময় ১২-১৩ শতকে সেনাবাহিনী ছিল রাজার সম্পূর্ণ আজ্ঞাধীন এবং রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান হওয়া ছাড়াও তার ছিল আইন প্রণয়নের সর্বোচ্চ ক্ষমতা এবং বিচার ব্যবস্থায়ও তার রায় বা নির্দেশ ছিল সর্বজন মান্য। এক কথায় ইংল্যান্ডের রাজা বিশ্বের অন্যান্য দেশের রাজা-বাদশাহের মত ছিলেন সর্বময় ক্ষমতাবান, রাজ্যের দণ্ডমুণ্ডের মালিক। কিন্তু এতদসত্ত্বেও আর্ল, ব্যারন, জমিদারশ্রেণি, নাইট এমনকি সাধারণ জনগণও মনে করতেন যে রাজ্যের দণ্ডমুণ্ডের মালিক হলেও তাকে কিছু কিছু রীতিনীতি ভিত্তিক বিধি-বিধান, আইন মেনে চলতে হবে। এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে 'ম্যাগনা কার্টা'য় বর্ণিত শর্তগুলো অবশ্য সেভাবে নূতন কিছু ছিল না। তখনকার ইংল্যান্ডের সাধারণ জনগণের অধিকার এবং তাদের প্রতি রাজার কর্তব্য হিসেবে পরোক্ষভাবে হলেও বিদ্যমান ছিল। কিন্তু যেহেতু রাজা অত্যাচার করতেন, নানাভাবে প্রজাদের সম্পদ লুণ্ঠন করতেন, যারা রাজার অবৈধ হুকুমের বিন্দুমাত্র বিরোধিতা করতো তাদেরকে সারা জীবন কারাগারে অন্তরীণ থাকতে হতো। এসব কারণেই এ মহান সনদ এর প্রয়োজন হয়েছিল। এ সনদই ভবিষ্যতের সকল Bill of Rights বা মৌলিক অধিকার ও আইনের শাসনের ভিত্তি ছিল।

ইংল্যান্ডের এইরূপ আইনগত ও সামাজিক অবস্থানের কারণেই রাজা তৃতীয় হেনরির রাজত্বকালে ১২৫০ সালে বিচারপতি হেনরি ডিব্যাকটন তার লিখিত 'ডি লেজিবাস' গ্রন্থে বলতে পেরেছিলেন:

In justitia recipienda minimo de regno suo (rex) comparatur অর্থাৎ The law bound all members of the State, whether rulers or subjects, and justice according to law was due to all)

 (স্যার উইলিয়াম হোল্ডসওয়ার্থ এর 'আ হিস্ট্রি অব ইংলিশ ল' গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত)

তিনি সেই 'অ্যাবসুলেট মনার্কি' বা রাজতন্ত্রের যুগে লিখেছিলেন:

Quad Rex non debet esse sub homine, sed sub Deo et lerge অর্থাৎ, That the King should not be under man, but under God and the law.

প্রতীয়মান হয় যে, ১৩ শতাব্দীতে রাজারা 'ডিভাইন রাইট' বা স্বর্গীয় অধিকার বলে নয়, দেশের আইন অনুসারেই রাজা হতেন। রাজা তৃতীয় এডওয়ার্ডের সময়েও নানা কারণে প্রজাদের ওপর অত্যাচার বেড়ে যাওয়ায় ১৩৫৪ সালে 'দ্য পিটিশন অব রাইট' প্রণীত হয়। এর চতুর্থ দফায় বলা হয়:

… that no man, of what state or condition that he be, should be put out of his lands or tenements, nor taken, nor imprisoned, nor disinherited, nor put to death, without being brought to answer by due process of law.

(সিলেক্ট ডকুমেন্টস অব ইংলিশ কনস্টিটিউশনাল হিস্ট্রি, ১৯১০ সালে সংস্করণের ৩৪০ পৃষ্টা থেকে উদ্ধৃত। সম্পাদনা: জর্জ বার্টন অ্যাডামস এবং এইচ. মোর্স স্টিফেনস)

এই বিধানসহ অন্যান্য বিধান ইংল্যান্ডকে আইনের শাসনের পথে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে যায়। ১৩৫৪ সালের উপরোক্ত দফায় ব্যবহৃত 'due process of law' শব্দগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে ১৭৯১ সালে ১০টি সংশোধনীর মাধ্যমে আনীত বিল অব রাইটস এর ৫ম সংশোধনীতে ব্যবহার করা হয়েছিল।

রানি এলিজাবেথের মৃত্যুর পর স্কটল্যান্ডের রাজা ১৬০৩ সালে প্রথম জেমস নাম গ্রহণ করে ইংল্যান্ডের সিংহাসনে বসেন। এর পরবর্তী প্রায় ৮৫ বছর ইংল্যান্ড-রাজেশ্বর এর শ্রেষ্ঠত্বের স্বর্গীয় অধিকার এবং পার্লামেন্ট ও কমন ল এর শ্রেষ্ঠত্বের অধিকার স্থাপনে পার্লামেন্ট ও আদালতের সংগ্রামের ইতিহাস। তিনি রাজার 'Prerogative' (বিশেষ ক্ষমতা) অধিকারকে রাজ্যের চূড়ান্ত আইন বলে মনে করতেন। রাজার কার্যক্রম আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে এই প্রকার বক্তব্য তিনি 'রাজদ্রোহ' বলে মনে করতেন। এ বিষয়ে তিনি 'কোর্ট অব কমন প্লিজ' এর প্রধান বিচারপতি স্যার এডওয়ার্ড কোক এর মতামত জিজ্ঞাসা করলে তিনি চারশ বছর আগে ১৬০৮ সালে 'প্রিভি কাউন্সিল' (রাজার উপদেষ্টা পরিষদ)  এর সামনে আইন সম্বন্ধে তার এই ক্ল্যাসিকাল বা অতুলনীয় বক্তব্য দেন:

The law was the golden met wand and measure to try the causes of his subjects: and which protect his majesty in safety and peace. … The king cannot take any cause out of any of his courts and give judgment upon himself. … The judgements are always given per curiam, and the judges are sworn to execute justice according to the law and customs of England.

(আ হিস্ট্রি অব ইংলিশ ল, স্যার উইলিয়াম হোলডসওয়ার্থ, ভলিউম. ভিজি এর ৪৩০ পৃষ্ঠা থেকে উদ্ধৃত)  

স্যার এডওয়ার্ডের এ মতামত শুনে রাজা মহাখাপ্পা হলেন। কিন্তু এর পরেও বিভিন্ন সময়ে স্যার এডওয়ার্ড রাজার আদেশ-নির্দেশের বিরোধিতা করেন। ফলে ১৬১৬ সালে স্যার এডওয়ার্ড শুধু বরখাস্তই হলেন না, তাকে ৭ মাস টাওয়ার (কারাগার) এ অন্তরীণ থাকতে হয়।

রাজা প্রথম জেম্স এর মৃত্যুর পর তার ছেলে প্রথম চার্লস ১৬২৫ সালে সিংহাসনে আরোহন করেন। তিনি কমন্স সভা মারফত বিভিন্ন প্রকারের কর আদায় ছাড়াও প্রজাদেরকে ঋণ দিতে বাধ্য করতেন। ঋণ দিতে ব্যর্থ হলে কারাদণ্ড দেওয়া হতো। কিংস বেঞ্চের এর প্রধান বিচারপতি ক্রিউ এই ঋণ প্রদানের বৈধতা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ১৬২৬ সালে তাকে বরখাস্ত করা হয়। রাজা অনেক সময় সাধারণ জনগণকে সামরিক আইনের আওতায় বিচারের সম্মুখীন করতেন।

রাজার এরূপ স্বেচ্ছাচারমূলক ক্ষমতায় সাধারণ জনগণ প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ  ও প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে। স্যার এডওয়ার্ডের নেতৃত্বে কমন্স সভার প্রচণ্ড চাপের মুখে তাদের দাবি সম্বলিত 'দ্য পিটিশন অব রাইট' এ রাজা প্রথম চার্লস অনিচ্ছা সহকারে ১৬২৮ সালে স্বাক্ষর দিতে বাধ্য হন। 'পিটিশন অব রাইট' আকারে লিখিত হলেও,এটি ছিল মূলত পার্লামেন্টের প্রণীত আইন। এটি ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় সাংবিধানিক দলিল। 'পিটিশন অব রাইট' এর ৮ম দফা নিম্নরূপ:

VIII. … and that no freeman, in any such manner as is before mentioned, be imprisoned or detained; and that your Majesty will be pleased to remove the sail soldires and mariners, and that your people may not be so burdened in time to come; and that the foresaid commissions, for proceeding by martial law, may be revoked and annulled; and that hereafter no commissions of like nature may issue forth to any person or persons whatsoever to be executed as aforesaid, lest by colour of them any of you MajestyÕs subjects be destroyed or put to death contrary to the laws and frachise of the land.

(ইংলিশ কনস্টিটিউশনাল হিস্ট্রি, থমাস পিট টাসওয়েল-ল্যাংমেড, দশম সংস্করণ, ১৯৪৬ থেকে উদ্ধৃত)

উল্লেখ্য যে ইংল্যান্ডে একজন প্রজার স্বাধীনতা এবং মুক্তির জন্য যত রকম বিধান রয়েছে তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছে 'Writ of Habeas Corpus Ges' (রিট অব হেবিয়াস কর্পাস জেস) এবং সব থেকে পুরানো।   রাজা ছিলেন ফাউন্টেইন অব জাস্টিস।  তার বিশেষ পাঁচ ধরনের রাজকীয় পরওয়ানা বা রিট জারি করার বিশেষ ক্ষমতা ছিল। 'Prerogative' বলা হত কারণ এটি রাজার নিজস্ব ক্ষমতা। ইংল্যান্ডের কমন ল রাজাকে এ ক্ষমতা দিয়েছিল। এই prerogative রিটগুলোর মধ্যে প্রাচীনতম হচ্ছে 'রিট অব হেবিয়াস কর্পাস জেস'। এই রিট বা পরওয়ানার মাধ্যমে রাজা তার শেরিফকে হুকুম করতেন 'have the body', অর্থাৎ রাজার কোনো প্রজাকে কোনো আর্ল বা ব্যারন অন্তরীণ রাখলে তাকে রাজার সম্মুখে হাজির করার হুকুম। অনেক সময় কোনো প্রজাকে অন্তরীণ রাখার জন্যও এ আদেশ বা রিট শেরিফ বরাবর জারি করা হতো। পরবর্তীতে রাজার এই রিট কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ব্যতিরেকে জারি করা হতো না। ১২১৫ সালের 'ম্যাগনা কার্টা' অনুসারে 'otherwise than by lawful process' ব্যতিরেকে এ রিট জারি করা যেত না। ১৪ শতকের দিকে রিট জারিসহ রাজার বিচারিক ও অন্যান্য ক্ষমতা তার পক্ষে 'কিংস বেঞ্চ' ও 'কোর্ট অব কমন প্লিজ' এর বিচারকগণ কর্তৃক প্রজাদের স্বার্থে ব্যবহার আরম্ভ হয়। তারা 'writ of habeas corpus cum causa' অর্থাৎ তারা 'have the body with the cause of the arrest'- এই আদেশ শেরিফ বরাবর জারি করতেন। ফলে যে ব্যক্তি বা কোনো রাজকর্মচারী যদি কোনো প্রজাকে অন্তরীণ রাখতেন, তাকে অন্তরীণ রাখার কারণ দর্শাতে বলা হতো। যদি কেউ আইনানুগ কারণ দর্শাতে ব্যর্থ হতেন তাহলে বন্দিকে মুক্তি দিতে তিনি বাধ্য থাকতেন। অবশ্য তখন এই রিট ইংল্যান্ড ও ওয়েলশেই কার্যকর ছিল, এর বাইরে নয়।

লর্ড বার্কেনহেড ১৬২৩ সালে রিটটি সম্বন্ধে বলেন: 

A writ antecedent to statute and throwing its roots deep into the genius of our common law. 

(ল অব রিটস, ভি.জি রামাচন্দ্রন, পৃষ্ঠা ৪, ৫ম সংস্করণ, ১৯৯৩ তেকে উদ্ধৃত)

যদি কোনাে একটি আইন মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকারে এসে থাকে তা এ 'রিট অব হেবিয়াস কর্পাস', যার মাধ্যমে লাখ মানুষ মুক্তির আনন্দ পেয়েছে। ১৬৬০ সালে রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়, দ্বিতীয় চার্লস রাজা হলেন। তার প্রভাবশালী মন্ত্রী ছিল আর্ল অব ক্লারেনডন। তিনি তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ইংল্যান্ড ও ওয়েলশ এর বাইরে বন্দিদের পাঠিয়ে দিতেন যেখানে এই রিট কার্যকর ছিল না। অথবা বন্দিদের এত বিভিন্ন কারাগারে পুনঃপুনঃ স্থানান্তর করা হতাে যে এক কারাগারের গভর্নরের কাছে যখন রিট পৌঁছাতাে, তখন অন্য কারাগারে বন্দিকে পাঠানো হত, ফলে আবার আদালতে গিয়ে নতুন করে রিট জারি করাতে হত। রিট পৌঁছাবার আগেই বন্দিদের সেখান থেকে অন্যত্র পাঠানাে হতাে। | ক্লারেনডন তার এখতিয়ারের মধ্যে এ সকল নির্দেশ দিতেন বিধায় আক্ষরিক অর্থে 'আইন ভঙ্গ করেছিলেন' বলা না গেলেও, তিনি কিন্তু আইনের শাসনের ব্যত্যয় ঘটিয়েছিলেন। আইন থাকা সত্ত্বেও আইনের শাসনের ব্যত্যয় ঘটাবার এ এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। 

পরবর্তীতে ক্লারেনডন অভিশংসিত হন, কিন্তু বন্দিদের অবস্থার পরিবর্তন হয় না। ১৬৭৬ সালে ফ্রান্সিস জেনকেসকে প্রিভি কাউন্সিলের আদেশে অন্তরীণ করা হয়। তার জামিনের আবেদন কোর্ট অব কোয়ার্টার সেশনস এ দায়ের করা হয়। যেহেতু উচ্চতর আদালতের আদেশে তাকে অন্তরীণ করা হয়েছিলা সেহেতু উক্ত আদালত জামিন দিতে অস্বীকার করে। লর্ড চ্যান্সেলরের কাছে 'রিট অব হেবিয়াস কর্পাস' আবেদন করা হলে ছুটির সময় থাকার তিনি রিট জারি করতে অস্বীকার করেন। তৎপর, কিংস বেঞ্চ এর প্রধান বিচারপতির নিকট 'রিট অব হেবিয়াস কর্পাস' আবেদন করলে তিনিও নানা অজুহাতে রিট জারি থেকে বিরত থাকেন। 'প্রিরোগেটিভ রিট অব হেভিয়াস কর্পাস' এর উদ্দেশ্যই বিফল হয়। ফলে ফ্রান্সিস জেনকেসকে বহুদিন অন্তরীণ থাকতে হয়। এ রকম বহু ঘটনা চলতেই থাকে। জেনকেস এর ক্ষেত্রে বিচারকরা 'রিট অব হেবিয়াস কর্পাস' জারি না করে, হয়তাে সত্যিকার অর্থে আইন ভঙ্গ হয়তাে করেননি, কিন্তু 'আইনের শাসন' অবশ্যই ভঙ্গ করেছিলেন। অবশেষে লর্ড স্যাফটেসবারির সহায়তায় ১৬৭৯ সালে 'Habeas Courpus Act (31 Car.II.c.2)' প্রণীত হয়। আইনের শুরুটা এরকম: 

An Act for the better securing the liberty of the subject, and for prevention of imprisonments beyond the seas. 

এই আইন প্রণীত হওয়ার পর, সুনির্দিষ্ট আইন ব্যতিরেকে কেউ অন্তরীণ হলে তার পক্ষে আনীত 'রিট অব হেবিয়াস কর্পাস' আবেদন লর্ড চ্যান্সেলর বা অন্য কোনাে বিচারক শুনানি করতে বাধ্য হন। 'হেভিয়াস কর্পাস রিট' এর কার্যপ্রণালী সহজতর হলাে। বিনা বিচারে অন্তরীণ বন্দিদের মুক্ত হওয়ার বাধাও অপসারিত হলাে। 

১৬৮৫ সালে রাজা দ্বিতীয় চার্লস এর মৃত্যুর পর তার পুত্র দ্বিতীয় জেমস ইংল্যান্ডের রাজা হন। তার রাজত্বের শেষভাগ বিচার বিভাগে চরম অবক্ষয় হয়। রাজ্যের প্রজারা রাজার অত্যাচার-অনাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। রাজা দ্বিতীয় জেম্স সামরিক শাসন দ্বারা দেশশাসন সম্বন্ধে বিচারকদের মতামত আহ্বান করলে কোনও বিচারকই তা সমর্থন করেননি। অবশেষে ১১ ডিসেম্বর ১৬৮৮ তারিখে রাজা দ্বিতীয় জেমস সিংহাসন ত্যাগ করে পালিয়ে যান। এরপর ১৬৮৯ সালের ২৫ অক্টোবরে তারিখে বিখ্যাত 'বিল অব রাইটস' প্রণীত হয়। এটিই ইংল্যান্ডের তৃতীয় সাংবিধানিক দলিল, মানুষের মুক্তি, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সনদ। লর্ড চ্যাথাম অত্যন্ত যথার্থভাবেই বলেন যে, 

the Magna Carta (1215), the Petition of Right (1628) and the Bill of Rights (1689), together constitute the Bible of the English Constitution. Plantagenet 

রাজবংশীয় দ্বিতীয় হেনরি ১১৫৪ সালে ইংল্যান্ডের সিংহাসনে আরােহন করে যে বিচার ব্যবস্থার সূচনা করেছিলেন, টুডর রাজাগণ বিচার ব্যবস্থার যে উৎকর্ষ সাধন করেছিলেন, ১৭ শতাব্দিতে স্টুয়ার্ট রাজাদের আমলে তার চরম অবক্ষয় হয়। যা-হােক, বিল অব রাইটস ইংল্যান্ডের রাজনীতিতে এক বিপ্লব আনে, অ্যাবসুলেট রাজতন্ত্রের অবসান হয়ে সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের সূচনা সৃষ্টি করে যা এখনও বহমান রয়েছে। এই পর্যন্ত সভ্যতার প্রারম্ভ থেকে আইন ও ইহার ক্রমবিকাশ নিয়ে এক নাতিদীর্ঘ আলােচনা করা হলাে। সঠিকভাবে আলােচনা করতে গেলে কয়েক খণ্ড বই লেখা যায়। যতদূর সম্ভব সংক্ষেপেই তুলে ধরা হলাে যে ৪ হাজার বছর আগেও মানুষ আইনের প্রয়ােজনীয়তা অনুভব করতাে। 

খ্রিস্টপূর্ব ১৭০০ বছর আগে রাজা হাম্মুরাবি বিদ্যমান আইন কোডিফাই বা বিধিবদ্ধ করেন। খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ বছর আগে এথেন্স নগর-রাষ্ট্রের অধিবাসীদের দাবির মুখে ওই নগরীতে বিদ্যমান আইন লিপিবদ্ধ আকারে প্রকাশ করলে সাধারণ মানুষ উপলব্ধি করে যে, তথাকথিত আইনের আবরণে ধনী অভিজাত শ্রেণি তাদের সঙ্গে প্রকৃত পক্ষে প্রতারণাই করেছে। সােলন সর্বপ্রথম আইনকে 'দুষ্টের দমন শিষ্টের পালনের হাতিয়ার' হিসেবে আইন প্রণয়ন করেন, রিসেপ্রোসিটি অব কনট্রাক্ট  বা চুক্তির পারস্পরিকতাকে আইন হিসেবে প্রয়ােগ করেন, আইনের পরিসীমা নির্ধারণ করেন, চুক্তি থাকলেও সব ধরনের চুক্তি বলবৎ করা যায় না তা সবার সামনে আনেন। যেমন, শাইলক চুক্তির কঠিন শর্ত অনুসারে খাতক অ্যান্টোনিওর বুকের এক পাউন্ড মাংস দাবি করলে সেই সুযােগ নিয়ে তার বন্ধু বাসনিওর এর প্রেমিকা পাের্শিয়া ওই পরিমাণ মাংস কেটে নেবার অনুমতি দিয়ে বললেন যে, 'but not a drop of blood'; কারণ রক্তক্ষরণের কথাতাে চুক্তিতে ছিলা না। | সােলনের পর সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টোটল আইনের শ্রেষ্ঠত্বকে যেভাবে তুলে ধরেছিলেন বর্তমান বিশ্বের অনেক অনেক রাষ্ট্রে সেভাবে এখনও তুলে ধরা হয় না। 

বর্তমানের সুসভ্য যুক্তরাজ্যের অধিবাসীদেরকে ১২/১৩ শত বছর আগে আগুনের ওপর হেঁটে তাদের বক্তব্য প্রমাণ করতে হতাে, এমনই ছিল তাদের বিচার ব্যবস্থা। তবে মধ্যযুগের প্রারম্ভে রাজাদের রাজ্যাভিষেকের সময়ে প্রদত্ত ন্যায়বিচার ও সুশাসনের প্রতিশ্রুতির আলােকে ১২১৫ সালের ম্যাগনা কার্টা, ১৩৫৪ সালের পিটিশন অব রাইট, ১৬২৮ সালের পিটিশন অব রাইট আইন প্রণিধানযােগ্য। স্টার চেম্বারআদালত যেকোনও ধরনের জঘন্য অত্যাচার করে অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি আদায় করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত ছিলা। ইংল্যান্ডের পার্লামেন্ট চারশ বছর আগে ১৬৪১ সালে ওই কুখ্যাত আদালত বিলােপ করে। সে সময় প্রধান বিচারপতি স্যার এডওয়ার্ড কোক, প্রধান বিচারপতি হোবার্ট, প্রধান বিচারপতি ক্রিউ যেমন ছিলেন, তেমনি ছিলেন কুখ্যাত বিচারপতি স্ক্রগ এবং 'ব্লাডি অ্যাসাইজেস' নামে বিচার পরিচালনাকারী প্রধান বিচারপতি জেফ্রেস। পরবর্তী প্রধান বিচারপতি রবার্ট রাইট এতই কুখ্যাত ছিলা যে তার সম্বন্ধে বলা হতাে যে, 'প্রধান বিচারপতি রাইট ছিলেন একজন দানব'। 

যা হােক, ১৬৮৮ সালের রক্তপাতহীন বিপ্লবের পর ১৬৮৯ সালে 'বিল অব রাইটস' প্রণীত হয়, অ্যাবসুলেট মনার্কি বা রাজতন্ত্র পরিত্যক্ত হয় এবং সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের সূচনা করে। 'কিং ইন পার্লামেন্ট' সর্বোচ্চ এবং সর্বময় ক্ষমতাসম্পন্ন আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইনানুগভাবে স্বীকৃতি প্রাপ্ত হয় যা আজ পর্যন্ত চালু রয়েছে। 

এবার বিচার ব্যবস্থা। 'বিল অব রাইটস' পার্লামেন্টকে অসীম ক্ষমতাবান করলেও বিচারকদের অবস্থান পরিবর্তন হয়নি। তারা রাজকর্মচারীই থেকে যান। ১৭০১ সালের 'অ্যাক্ট অব সেটলমেন্ট' এবং ১৭৬০ সালের আর একটি আইন মারফত বিচারকদের চাকরির মেয়াদ, বেতন এবং সুযােগ সুবিধা নিশ্চিত করা হয়। উল্লেখ্য যে, এই আইনগুলোর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪৭ অনুচ্ছেদ সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের চাকরির মেয়াদ ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। এর পূর্বে আইনের ক্রমবিকাশ এবং আইন কিভাবে পার্লামেন্ট ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে তা আলােচনা করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে অধ্যাপক এ.ভি. ডাইসি ১৮৮৫ সালে তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'ইন্ট্রোডাকশন টু দ্য স্টাডি অব ল অব কনস্টিটিউশন' আইনের শাসন সম্পর্কে বলেন: 

We mean, in the first place, that no man is punishable or can be lawfully made to suffer in body or goods except for a distinct branch of law established in the ordinary legal manner before the ordinary courts of the land…. We mean in the second place, when we speak of the 'rule of law' as a characteristic of our country, not only that with us no man is above the law, but (what is a different thing) that here every man, whatever be his rank or condition, is subject to the ordinary law of the realm and amenable to the jurisdiction of the ordinary tribunals. 

(ইন্ট্রোডাকশন টু দ্য স্টাডি অব ল অব কনস্টিটিউশন, এএলবিএস সংস্করণ, ১৯৬৮ এর পৃষ্ঠা ১৮৮, ১৯৩ হতে উদ্ধৃত)

আইনের শাসনের এই তত্ত্ব অধ্যাপক ডাইসির গ্রন্থে ১৮৮৫ সালে প্রকাশ হবার পর আইনের পণ্ডিতদের মধ্যে একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এমনকি স্যার ডাব্লিউ আইভর জেনিংসও এ তত্ত্বকে 'ভূয়া' বলেন। অন্যান্য পণ্ডিতরাও 'আইনের শাসন তত্ত্ব'কে নানাভাবে সমালােচনা করেন, এমনকি অনেকে একে কোনাও তত্ত্ব হিসেবে স্বীকার করতেই নারাজ।

স্ট্যানলি ডি স্মিথ এবং রডনি ব্রাজিয়ার তাদের 'কনস্টিটিউশনাল অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ল' বইয়ের পৃষ্ঠা ১৭-তে লিখেছেন-

.. One can at least say that the concept is usually intended to imply (i) that the powers exercised by politicians and officials must have a legitimate foundation; they must be based on authority conferred by law; and (ii) that the law should conform to certain minimum standards of justice, both substantive and procedural.

তবে বিচার বিভাগ এই তত্ত্ব গ্রহণ করেছে বলেই প্রতীয়মান হয়। কারণ আটলান্টিকের দুই পারের দেশগুলাের সুপ্রিম কোর্টের অসংখ্য রায়ে 'আইনের শাসন' এর কথা 'with approval' বা 'অনুমােদন সহকারে' ব্যক্ত করেছে। একইভাবে এই উপমহাদেশের বিভিন্ন সুপ্রিম কোর্ট অসংখ্যবার আইনের শাসন তত্ত্বের প্রসঙ্গ অনুমােদন করেছে।

বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়েও আইনের শাসনকে গ্রহণ করেছে, স্বীকৃতি দান করেছে। তাৎক্ষণিকভাবে বলা যায় যে, সুপ্রিম কোর্টের সংবিধানের অষ্টম সংশােধনী, পঞ্চম সংশােধনী, ত্রয়ােদশ সংশােধনী ও সপ্তম সংশােধনীর ওপর প্রদত্ত রায় এবং আরও অনেক রায়ে আইনের শাসন তত্ত্বকে পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করেছে।

আইনের শাসন সম্পর্কে নানা মুনির নানা মত। মােটা দাগে যা মনে হয় তা হলাে:

প্রথমত, সাধারণ আইনের শ্রেষ্ঠত্ব ও কর্তৃত্ব। কেউ অপরাধ করলে শুধু আইন অনুসারেই তার বিচার শেষে শাস্তি হতে পারে, অন্য কোনােভাবে নয়।

দ্বিতীয়ত, আইনের সমতা। সকল অধিবাসী আইনের দৃষ্টিতে সমান। যে কোনাে সাধারণ অধিবাসী বা সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ তিনি যত শক্তিশালীই হােন, একই আইন দ্বারা একইভাবে বাধ্য। তারা সকলেই একই আইনের মাধ্যমে একই আদালতের কাছে সমানভাবে জবাবদিহি করতে বাধ্য।

ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের Smt. Indira Nehru Gandhi Vs. Raj Narain AIR 1975 SC 2299 মােকদ্দমায়, আইনের শাসন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ম্যাথিও. জে বলেন:

The rule of law postulates the pervasiveness of the spirit of law throughout the whole range of Government in the sense of excluding arbitrary official action in any sphere. ..Rule of Law is based upon the liberty of the individual…

আনােয়ার হােসেন চৌধুরী (৮ম সংশােধনী) মােকদ্দমায় (১৯৮৯) বিচারপতি এম এইচ রহমান আইনের শাসন প্রসঙ্গে বলেন:

In this case we are concerned with only one basic feature, the rule of law, marked out as one of the fundamental aims of our society in the Preamble.

উল্লেখ্য যে গত আটশ বছর ধরে ধাপে ধাপে প্রথমে ম্যাগনা কার্টা, তারপর 'পিটিশন অব রাইট' , 'হেবিয়াস কর্পাস আইন', 'বিল অব রাইটস' ইত্যাদির মাধ্যমে ইংল্যান্ডের অধিবাসীদের মৌলিক অধিকার (যথা- বাক স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, স্বেচ্ছাচারপ্রসূত গ্রেপ্তার ও আটক থেকে রক্ষা পাওয়ার অধিকার, আইনানুগ কারণ ব্যতিরেকে জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং সম্পত্তি হরণের বিরুদ্ধে সুরক্ষা ইত্যাদি) রক্ষার চেষ্টা হয়েছে। 

এই সব মৌলিক অধিকার একটি বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থপূর্ণভাবে কার্যকর ও অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব হয়েছিল। পরবর্তীকালে এই প্রক্রিয়াকেই অধ্যাপক ডাইসি 'আইনের শাসন' নামকরণ করেন। কিন্তু এই 'আইনের শাসন' বা 'Rule of Law'-কে 'আইন দ্বারা শাসন' বা 'Rule by Law' এর সাথে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। মানুষকে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে আইনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে স্বৈরশাসকরা যে শাসন ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের ওপর স্বেচ্ছাচারমূলকভাবে আরােপ করেন, সেটাই 'আইন দ্বারা শাসন', সেখানে আইন আছে ঠিকই কিন্তু আইনের মূল শর্ত দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন, আইনের সমতার অনুপস্থিত এবং কোনাে শর্ত বহির্ভুতভাবে সাধারণ আইনের আওতায় দেশের সাধারণ আদালতে প্রতিকার পাওয়ার অধিকার থেকে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত থাকে। এই ধরনের শাসন ব্যবস্থাকেই 'আইন দ্বারা শাসন' বলে। এ ধরনের শাসন ব্যবস্থার আওতায় ভিন্ন মতাবলম্বী ব্যক্তিকে মধ্যরাতে উঠিয়ে নেয়া, স্টার চেম্বার আদালতের মতো প্রচণ্ডভাবে শারিরীক ও মানসিক যন্ত্রণা দিয়ে স্বীকারােক্তি আদায়, তথাকথিত আদালত বা ক্যাঙ্গারু কোর্ট মারফত মৃত্যুদণ্ডসহ যেকোনও শাস্তি আরােপ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, সােভিয়েত ইউনিয়নে স্ট্যালিনের শাসনকাল, জার্মানিতে হিটলারের নাজি শাসন, স্পেনে জেনারেল ফ্রাংকোর শাসন, চিলিতে পিনােসে-র শাসনকালকে চিহ্নিত করা যেতে পারে। এমনকি বাংলাদেশেও ১৯৭৭ সালে কর্নেল তাহেরের প্রাণদণ্ড, ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত সময়কালেও এ ধরনের শাসন ব্যবস্থার আওতায় ছিল। তখন আইন ছিল, সংবিধানও ছিল। কিন্তু মানুষ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। ওই সময় সংবিধান নয়, আইন নয়, স্বৈরশাসকদের ইচ্ছা অনুসারে রাষ্ট্রের কর্মচারীরা রাষ্ট্রের শাসনযন্ত্র পরিচালনা করতেন, যা ছিল সম্পূর্ণভাবে 'আইনের শাসন' এর পরিপন্থি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক