বিশ্ব বাঘ দিবস: সুন্দরবনের বাঘ বাড়ানোর টেকসই ব্যবস্থা পুনর্প্রবর্তন

মো. শাহাদাত হোসেন শুভ
Published : 28 July 2021, 08:12 PM
Updated : 28 July 2021, 08:12 PM

প্রতিবছর ২৯ জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবস পালন করা হয়। বিশ্ব বাঘ দিবসকে সামনে রেখেই সুন্দরবনে বাঘ বৃদ্ধির একটি টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদী পদ্ধতি নিয়েই এ লেখা। বাংলাদেশ এবং ভারতের ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার জুড়ে অবস্থিত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন যার ৬০ শতাংশ বাংলাদেশে অবস্থিত। বাংলাদেশের ২০১৮ সালের জরিপ অনুসারে বাঘ আছে ১১৪টি। এ সংখ্যা ২০১৫ সালের বাঘশুমারি থেকে ৮টি বেশি। ভারতের ২০১৯ সালের জরিপ অনুসারে বাঘ আছে ৯৬টি। দুই বছর আগে অর্থাৎ ২০১৭ সালে ছিল ৮৭ টি।

বাংলাদেশের তুলনায় ভারতীয় সুন্দরবন অংশে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সেখানকার বন বিভাগ অনেকদিন ধরেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলে ভারতের ভেতর পড়া সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যা বাংলাদেশের তুলনায় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভারতের সুন্দরবনের ভেতর যে সকল আদিবাসী সম্প্রদায় বসবাস করতো তাদের সরিয়ে অন্যত্র পুনর্বাসন করা হয়েছে। বাঘের বিচরণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও জনসাধারণের চলাচল পর্যবেক্ষণ ও সীমিত করণ নিশ্চিত করা হচ্ছে। এমনকি সুন্দরবনের ভারতীয় অংশের আয়তনও বেড়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে কিছুদিন পূর্বেও সুন্দরবনের গহীনে বনদস্যু ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গোলাগুলি ও অপহরণ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল। যদিও তা বর্তমানে অনেকাংশে কমে এসেছে। তারপরও বাংলাদেশের সুন্দরবনে মানুষের চলাচল ভারতীয় অংশ থেকে অনেক বেশি। মধু সংগ্রহ, গোলপাতা সংগ্রহ, মাছ ধরা, বনের কাঠ ও লাকড়ি সংগ্রহ করার জন্য মানুষ অবাধে বনে প্রবেশ করছে। যার ফলে বাঘ যেমন অনিরাপদ বোধ করছে, পাশাপাশি বাঘ ও মানুষের সাথে সংঘর্ষও বাড়ছে। 

সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং অভ্যন্তরীণ মানুষ সরিয়ে পুনর্বাসন করা উচিত। মাছ চাষ প্রকল্প, গবাদি পশু পালন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং কৃত্রিম উপায়ে মৌমাছি চাষ প্রকল্প স্থাপন করে বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা অনেক কমানো যায়। 

সুন্দরবন ও লোকালয়ের মাঝে সোলার-প্যানেল স্থাপন করলে লোকালয়ে বাঘের প্রবেশ কমানো সম্ভব। সুন্দরবনের বাঘ ছোট ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং হরিণের ওপর নির্ভরশীল। অবৈধভাবে গাছ কাটার ফলে ঝোপ-ঝাড় কমে যাচ্ছে। ঝোপ-ঝাড় কমে গেলে হরিণ শিকার করা বাঘের জন্য খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া ইদানিং নতুন করে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস এর কারণে জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পেয়ে অস্বাভাবিকভাবে সুন্দরবনে প্রবেশ করছে। ফলে মিঠা পানির অভাব এবং পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য প্রাকৃতিক জলাধারের সৃষ্টি করা প্রয়োজন।

 পুনর্প্রবর্তন (Reintroduction) পদ্ধতিতে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি

জলবায়ু পরিবর্তনে পৃথিবীর ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বছর বছর ঘুর্ণিঝড়ের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে দেখা দিচ্ছে নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলোচ্ছ্বাস। জলবায়ু পরিবর্তনে অতিবৃষ্টি ও অনাবৃষ্টি- মানুষসহ পশুপাখির দেশের দক্ষিণাঞ্চলে টিকে থাকা কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। জোয়ারের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষি উৎপাদনও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা ও পরিবেশ রক্ষায় সুন্দরবনের টেকসই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আর সুন্দরবন টেকসই করার জন্য বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির কোনও বিকল্প নেই। ১১৪টি বাঘের মধ্যে যদি ২০টি প্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রী বাঘও থাকে, তাদের থেকে প্রতিবছর কমপক্ষে ২০-৪০টি বাঘ বৃদ্ধি পাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সেইভাবে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে না। এর কারণ হতে পারে বাঘের জিনগত বৈচিত্র্যের অভাব। অল্প সংখ্যক বাঘ থাকায় তাদের মধ্যে ইনবিড্রিং তথা নিকট সম্পর্কের মধ্যে প্রজনন হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এতে মরণজিন প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং বাঘশাবক মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পায়। তাই বাঘ সংরক্ষণে মানুষ ও প্রাকৃতিক কারণগুলো ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি জিনগত বিষয়টির দিকে নজর দিতে হবে। এজন্য বাঘের জিনগত বৈচিত্র্যও আনা প্রয়োজন। হেটারোজেনোসিটি বৃদ্ধি করতে পারলে বাঘের বংশ যেমন বৃদ্ধি পাবে সেই সঙ্গে বাঘের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও যেকোনও পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর মাধ্যমে বাঘকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করবে। জিনগত বৈচিত্র্য বৃদ্ধিতে কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে পুর্নপ্রবর্তন (Reintroduction)। দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প নেওয়ার মাধ্যমে সুন্দরবনে অনেক সংখ্যক বাঘ ছাড়া সম্ভব। এজন্য নিচের ধাপ অনুযায়ী বাঘ পুনর্প্রবর্তন করে সুন্দরবনে নতুন করে বাঘ ছাড়া যায়।

 ক. বাঘ সংগ্রহ– বাংলাদেশের বিভিন্ন চিড়িয়াখানা ও সাফারিপার্ক হতে ১০টি বাঘ সংগ্রহ করা যেতে পারে। এদের থেকে ক্যাপ্টিভ ব্রিডিং করিয়ে জন্ম নেওয়া শাবকগুলো ছয়মাস বয়স হলে সুন্দরবনের কাছে বড় পরিসরে লালনপালন এর ব্যবস্থা করা। পরবর্তীতে এদেরকে ধাপে ধাপে ট্রেনিং করিয়ে ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী থেকে হরিণ পর্যন্ত শিকার করার অভ্যাস শেখানো সম্ভব। এসব বাঘশাবক প্রাপ্তবয়স্ক হলে এদের থেকে নতুন জন্ম নেওয়া বাঘশাবক একই প্রক্রিয়ায় প্রাপ্তবয়স্ক হলে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে ছাড়া হবে।

খ. ক্যামেরা ট্র্যাকিং- সুন্দরবনে ছাড়ার পূর্বে ক্যামেরা ট্র্যাকিং এর মাধ্যমে সুন্দরবনের যে সব অংশে বাঘ নেই সে সব অংশ চিহ্নিত করা। যাতে অন্য বাঘের সাথে সংঘর্ষ না হয়। সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে অবমুক্ত বাঘগুলোকে পর্যবেক্ষণে রাখা। 

গ. বাঘের খাদ্যের জোগান– উক্ত প্রকল্পের পাশে একইসাথে হরিণ এবং শুকরের খামার তৈরি করে এদের বংশবিস্তার করানো। সেখান থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী হরিণ এবং শুকরের একটি নির্দিষ্ট অংশ নতুন বাঘের এলাকায় খাদ্য হিসেবে প্রেরণ করা। এর মাধ্যমে বাঘের খাবারের সংকট দেখা দিবে না এবং বাঘ নিজ এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় প্রবেশ করবে না।

বাংলাদেশে দ্রুততার সাথে দক্ষিণাঞ্চলে যে হারে জলবায়ু পরিবর্তন শুরু হয়েছে, তাতে সুন্দরবনে বাঘ রক্ষায় মানুষ ও প্রাকৃতিক কারণগুলো ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি জিনগত বিষয়টির দিকেও নজর দিতে হবে। বাঘের সংখ্যা কম থাকায় প্রবল জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করে ভবিষ্যতে এ প্রাণীর অস্তিত্বই সুন্দরবন থেকে বিলীন হতে পারে। তাই অন্যান্য ব্যবস্থার পাশাপাশি পুনর্প্রবর্তন এর মাধ্যমে বাঘের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি করার বিষয়ে কাজ শুরু করা উচিত।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক