আশ্রয়ণ প্রকল্পে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অন্যদের জন্য শক্ত বার্তা

Published : 14 July 2021, 06:17 AM
Updated : 14 July 2021, 06:17 AM

বঙ্গবন্ধু যেমন দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর মাধ্যমে সোনার বাংলা গড়তে চেয়েছিলন, ঠিক তেমনি ভাবে তার সেই অসম্পূর্ণ স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি করোনা অতিমারির সময়েও তিনি দরিদ্র ভূমিহীন মানুষদের জন্য চিন্তা করে চলেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় মুজিব বর্ষে ভূমিহীন মানুষদের মাঝে বাড়ি উপহার দেবার জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্প নামে একটি বড় প্রকল্প হাতে নেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। এই প্রকল্পটিকে তার স্বপ্নের প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়। 

এই বছরের জানুয়ারি ও জুন মাসে ১ লাখ ১৮ হাজার ৩৮০টি গৃহহীন পরিবারের মাঝে আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধীনে নির্মিত দুই কক্ষের বাড়ি উপহার হিসেবে হস্তান্তর করা হয়েছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধীনে নির্মিত বাড়িগুলো পেয়ে ভূমিহীন মানুষরা অত্যন্ত খুশি কারণ এতদিন তাদের মাথার উপর কোন ছাদ ছিল না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের এই প্রকল্পের উদ্যোগটি সর্বস্তরে প্রশংসিত হয়েছে। গ্রামীণ অঞ্চলের দরিদ্র ভূমিহীন মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর প্রয়াসের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একদিকে যেমন জনবান্ধব নেতৃত্বের প্রতিফলন ঘটেছে, অন্যদিকে তার সরকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের পরিচয় পাওয়া গেছে।

গত কয়েক দিন যাবত সামাজিক, প্রিন্ট, এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন জেলায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের দুর্নীতির বিষয়টি জনগণের নজরে আসে।  বিষয়টি এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের দায়িত্ব প্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও নজরে এসেছে। বর্ষা মওসুমে চলমান কয়েক দিনের বৃষ্টিতে দেশের কয়েকটি স্থানে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাড়িগুলো ভেঙ্গে গেছে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও নিম্ন মানের উপকরণ দিয়ে বাড়ি নির্মাণ করার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও আবার গর্তের ভেতরে মাটি ফেলে বাড়ি নির্মাণ করায় সেগুলো ধসে গেছে বিধায় সে বাড়িগুলো এখন জলের নিচে- এই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। আবার কোথাও কোথাও পুরো কাজ সমাপ্ত না করেই বাড়ি হস্তান্তর করা অভিযোগ উঠেছে। 

আশ্রয়ণ প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে একটি অনুসন্ধান পরিচালিত হয়েছে। বিভিন্ন মিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী তদন্ত শেষে দেশের ২২ জেলার ৩৬ উপজেলায় এই প্রকল্পের বাড়ি নির্মাণের দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেছে। দুর্নীতির সাথে যুক্ত ১৪৪ জন সহকারী কর্মকর্তা এবং ৩৬ জন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এখন পর্যন্ত চিহ্নিত হয়েছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পে দুর্নীতির উপরে এখন পর্যন্ত ৩৬টি রিপোর্ট প্রচারিত বা প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে ৭টি রিপোর্ট এর পূর্ণাঙ্গ সত্যতা পাওয়া গেছে। অন্যদিকে ৯টি রিপোর্টের আংশিক সত্যতা পাওয়া গেছে। বাকি ২০টি রিপোর্টের কোন সত্যতা পাওয়া যায়নি। 

তবে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথে দুর্নীতির সাথে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে সরকার। ইতোমধ্যেই ৫ জন সরকারি কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়েছে এবং ২ জন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মিডিয়া রিপোর্টে ৩০০টি ত্রুটিপূর্ণ বাড়ি নির্মাণের বিষয় উপস্থাপিত হয়েছে যা মোট বিতরণকৃত বাড়ির সংখ্যার ০.২৫ শতাংশ। সংখ্যার হিসেবে নগণ্য হলেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের প্রকল্পে কোন ধরনের দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না- বিষয়ে সরকার বদ্ধপরিকর। 

ইতোমধ্যে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে জানা গেছে যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মহোদয় স্পষ্টভাবেই জানিয়েছেন যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের প্রকল্পতে এই ধরনের দুর্নীতির অর্থ হচ্ছে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রশাসনের ব্যর্থতা। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে উল্লেখ করেছেন, এই দুর্নীতির সাথে যারাই জড়িত হোক না কেন অথবা যাদেরই অবহেলা থাকুক না কেন তাদের প্রত্যেককে শাস্তির মুখোমুখি করা হবে। এমনকি এই প্রক্রিয়ার সাথে যদি কোন জেলা প্রশাসক যুক্ত থাকেন তাদেরকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা হবে। যারা এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সাথে যারা জড়িত রয়েছেন তাদের জন্য এটি সত্যিই একটা শক্ত বার্তা। 

আশ্রয়ণ প্রকল্পের দুর্নীতির বিষয়টিকে বিভিন্ন আঙ্গিক থেকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। প্রথমত, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের এই প্রকল্পে দুর্নীতি করার সাহস যারা দেখিয়েছে তারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তথা প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। দ্বিতীয়ত, এই ধরনের একটি হাই প্রোফাইল প্রকল্প বাস্তবায়নের তত্ত্বাবধান এবং পরিবীক্ষণের দায়িত্ব যাদের উপর অর্পণ করা হয়েছিল তারা সেই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তৃতীয়ত, বাড়ি পেয়ে দরিদ্র ভূমিহীন মানুষরা অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন। তাদের মুখের সেই হাসি বিষাদে পরিণত হয়েছে।  চতুর্থত, এই ধরনের একটি প্রকল্পে দুর্নীতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারি দলের বিরোধীদের হাতে সমালোচনা করার একটি সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।

গত ১২ বছরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশকে উন্নয়নের  অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। অর্থনৈতিক উন্নতির ক্ষেত্রে একটি ভিন্ন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। সামাজিক সূচকেও ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়েছে। এমনকি করোনা অতিমারি চলার সময়ে পৃথিবীর বড় বড় অর্থনীতি যখন বিপর্যস্ত, ঠিক সেই সময়ও বাংলাদেশের অর্থনীতি যথেষ্ট স্থিতিশীল রয়েছে। ফলে সরকার অর্থনীতি এবং স্বাস্থ্য খাতের বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। 

২০১৯ সালে আওয়ামী লীগ তৃতীয় বার ক্ষমতায় আসার পরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছিলেন। তার এই ঘোষণার ধারাবাহিকতায় দেশের বিভিন্ন সেক্টরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। ক্যাসিনো কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে করোনা অতিমারিকালীন সময়ে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে সরকার। কিন্তু কখনো কখনো কোন অদৃশ্য শক্তির প্রভাবের কারণে এই প্রক্রিয়া থেমে গেছে। হয়তো এই কারণেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্বপ্নের আশ্রয়ণ প্রকল্পে দুর্নীতি করার সাহস দেখিয়েছে কিছু কর্মকর্তা এবং জনপ্রতিনিধি। 

সময় এসেছে এই প্রকল্পে দুর্নীতির সাথে যুক্ত সকলকে শাস্তির আওতায় নিয়ে এসে দুর্নীতির মুলোৎপাটন করার। এটি করা গেলে দেশের অন্যান্য সেক্টরের প্রকল্প বাস্তবায়নের সাথে যারা যুক্ত রয়েছেন তাদের জন্য একটা শক্ত মেসেজ দেওয়া যাবে।  সরকার যদি অতি দ্রুততম সময়ে দুর্নীতির সাথে জড়িত সকলকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসে, তাহলে আওয়ামী লীগ সরকার এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপরে দেশের জনগণের শ্রদ্ধাবোধ অনেক বেড়ে যাবে যা প্রকারান্তরে আওয়ামী লীগকে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী করতে সাহায্য করবে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে আশ্রায়ন প্রকল্প বর্তমান সরকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন ব্যবস্থার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। মুজিববর্ষে এই দরিদ্র ভূমিহীন পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে মাথা গোঁজার ঠাঁই প্রদানের যে সিদ্ধান্ত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গ্রহণ করেছেন সেটি সত্যিই প্রশংসনীয় এবং মুজিব বর্ষের সবচেয়ে বড় উপহার।

দেশে যে কোন দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনগণ সোচ্চার হব-এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একটি বিশাল কর্মযজ্ঞের কোনো কোনো ক্ষেত্রে যদি নিয়মের ব্যত্যয় হয় সেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদাহরণগুলোকে সাধারণীকরণের মাধ্যমে সরকারকে দোষারোপ না করে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারকে সহায়তা করা সকলের দায়িত্ব। তবেই দেশে দুর্নীতি কমবে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। 

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক