কোভিড গেলেও স্বভাব যাবে না

অজয় দাশগুপ্তঅজয় দাশগুপ্ত
Published : 28 June 2021, 06:29 PM
Updated : 28 June 2021, 06:29 PM

কঠোর লকডাউনে যাবে দেশ। কিন্তু মানুষ কি যাবে লকডাউনে? আমি যেখানে থাকি সেই সিডনিতে শুরু হয়েছে লকডাউন। এটা নিশ্চিত এখানে সবাই মানবে, মানতে বাধ্য হবে। কিন্তু দেশে? কেউ মানবে? বন্ধ হবে অনৈতিকতা? আমি একটা নিরীহ প্রশ্ন দিয়ে শুরু করতে চাই। একদিন হয়তো করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শেষ হবে। হয়তো না, তাকে যেতেই হবে, সে যাবে। মানুষ কখনো হারেনি। সভ্যতার ইতিহাস মানুষের ইতিহাস। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে করোনাভাইরাস গেলেও কি আমাদের স্বভাব যাবে? 

বিস্ময়কর হলেও সত্যি দেশে করোনাভাইরাসকে টপকে বড় খবর কিন্তু ডাকাতি। এসব ডাকাতরা রাতে ডাকাতি করে না। দিনদুপুরে করে। আগে শুনতাম চোরের মায়ের বড় গলা। খামোখা মাকে টানাটানি কেন বুঝি না, তবে এখনকার ডাকাতদের নিজেদের গলাই বেশ বড়। তাদের গলা এতোটাই বড় যে দেশের টিভি বাক্সেও তারা সরব। তাদের অনেকে বুদ্ধিজীবী, টকশো-নায়ক। আওয়ামী লীগের নামে, ছাত্রলীগের নামে, নানা লীগের ব্যানারে পুষ্ট। করোনাকালেও এরাই বড় নিউজ। এরা প্রমাণ করে দিয়েছে কোভিড গেলেও আমাদের ডাকাতি-চুরি যাবে না। অদ্ভুত হলেও সত্য মানুষের জীবন নিয়ে এমন মশকরা, মহামারী নিয়ে এমন দু নম্বরী দুনিয়ার কোন দেশে কোন সমাজে এই কোভিডের সময়ে ঘটেছে বলে শুনিনি। সাথে জুটেছে সরকারের সমন্বয়হীনতা। 

পৃথিবীর কোনও দেশেই করোনাভাইরাস নির্মূল হয়ে যায়নি। কোথাও কোথাও দমেছে। আমাদের সিডনিতেও দমেছিল। আমরা কাজ শুরুর পর, এখন আবার লকডাউনে। আর ইউরোপ-আমেরিকায় মানুষ কাজে যাচ্ছেন কি ইচ্ছা করে? একটুও না। আপনার সামনে যখন কেবল দুইটি পছন্দ তার একটিতো নিতেই হবে। একটি হলো, করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হলে মারা যাতে পারেন এবং আরেকটি ক্ষুধা, কষ্ট, অনাহারে নিশ্চিত মৃত্যু। তখন কোনটা নেবেন? প্রথম ক্ষেত্রে আপনি সংক্রমিত হলেও হতে পারেন, আবার তাতে মারা গেলেও যেতে পারেন। কাজেই ফল নিশ্চিত নয়। আর দ্বিতীয়টার ফল একেবারে নিশ্চিত। তাই বন্দি মানুষ জান হাতের মুঠোয় নিয়ে দৌড়াচ্ছে। কিন্তু কোথাও করোনাভাইরাস একেবারে চলে যায়নি। নিউজিল্যান্ডের সুনাম আমরা শুনেছি। সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করে তাদের দেশে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার দমিয়ে রেখেছিল বটে, কিন্তু খুলে দেওয়ার পর দেখা গেল শত্রু  ঘাপটি মেরে আছে। সুযোগ মিললেই ঝাঁপিয়ে পড়ছে। 

পুরো দুনিয়ার চিত্র আজ একদিকে বেদনা বিধুর, আরেকদিকে সংগ্রাম ও জীবনের জন্য মরীয়া। আমাদের জন্মভূমি বাংলাদেশ। আমরা অস্ট্রেলিয়া-আমেরিকা-ইতালি-কানাডা যেখানেই থাকি না কেন, আমাদের মূল পরিচয় কী আসলে? মিডিয়ায় খবর আসছে যুক্তরাষ্ট্রে অতোজন বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে, লিখছে এতজোন বাংলাদেশি আক্রান্ত হয়েছেন। এদের অনেকেই হয়তো কবে বাংলাদেশে শেষবার এসেছেন সেটি নিজেরাই ভুলে গেছেন। কারো কারো নাড়ির টান ছাড়া যোগসূত্রও নেই দেশের সাথে। তবু আমরা বলছি বাংলাদেশী। এটাই আমাদের পরিচয়। তাই আমরা দেশ নিয়ে নিশ্চুপ থাকতে পারি না। 

বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকার আছে বলে এখনো পরিস্হিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারেনি। যে সমাজে রাজনীতি নাই, যে সমাজে মান্যতা বলে কিছু নাই, যেখানে দু একজন মানুষ বলেন আর বাকিরা শোনেন- সেখানে এপর্যন্ত যে হাজার হাজার মানুষ মারা যাননি- এটাই শোকর। আমার এক বন্ধু ঠাট্টা করে বলেন, দেশে নাকি বক্তা বা বলার মানুষ দুই জন। প্রশ্ন করেছিলাম, তারা কারা? এক মিনিটও না ভেবে উত্তর দিল- কেন? আওয়ামী লীগের ওবায়দুল কাদের আর বিএনপির রুহুল কবির রিজভী। কথাটা মজার মনে হলেও সত্য। দেখবেন কথা-পাল্টা কথার জন্য এরা সবসময় হাজির। জনগণ পাত্তা দিচ্ছে, নাকি দিচ্ছে  না সেটা বড় কথা নয়। বড় বিষয় তাদের বলতে হবে। এই লেখা যখন লিখছি বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা আগের রেকর্ড ভেঙেছে। অথচ কাদের সাহেবের বক্তব্য ছিল- 'বিএনপির রাজনীতি এখন টেলিভিশনকেন্দ্রিক'। এই মহামারীও তাদের ঝগড়া থামাতে পারেনি। 

এদিকে আমরা কী দেখছি? প্রচণ্ড সমন্বয়হীনতা। একবার বলা হচ্ছে কাল থেকে শপিং খোলা। তারপর আবার বলা হচ্ছে- না, সব বন্ধ। স্কুল কলেজ সব সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বন্ধ থাকতে পারে এমন আভাস দিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু এদিকে শিক্ষকদের স্কুলে যাওয়ার জন্য বলা হচ্ছে। আসলে কে কী করছে বা কে কী বলছে তার কোন সমন্বয় নাই। সবচেয়ে বড় কথা হলো ঈদ আসছে বলে কি ব্যবসায়ীদের অন্যায় আবদার মানতে হবে? এবারের ঈদ, পূজা বা যেকোনও উৎসব আগের মতো হবে না। গোটা দুনিয়া তা মেনে নিয়েছে। আমাদের সিডনিতে সরকার থেকে বলা হয়েছে এখন কোন বিলাসদ্রব্য বা কাপড়-পোশাক কেনার সময় না। প্রয়োজনের বাইরে টাকা খরচ না করার পরামর্শ দিয়েছে সরকার। তাছাড়া বাংলাদেশে যে এক শ্রেণির মানুষ কি পরিমান কষ্টে আছে তা বলাই বাহুল্য। সবমিলিয়ে শপিং খোলার যৌক্তিক কোন কারণ নাই। এমন হতে পারতো ঈদের আগ দিয়ে হয়তো অবস্থা বিবেচনায় কয়েকদিন সীমিত সময়ের জন্য খোলা যেতে পারতো দোকানপাট। সেটা কিন্তু পরিষ্কার করে বলেনি কেউ। 

অবস্থাদৃষ্টে এটা পরিষ্কার যারাই চাপ দিচ্ছেন, তারাই ছাড় পাচ্ছেন। সেটা ধর্মীয় ব্যাপার থেকে শপিং- সর্বত্র সত্য। এই চাপাচাপির পরিণাম আমরা কিন্তু হাতে হাতে পেতে দেখছি। আজ যে সরকারের প্রতি চাপের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে তার জন্য দায়ী কারা? আমরা কি পোশাক শ্রমিকদের জোর করে ঢাকায় আনা এবং ফেরত যাবার কথা ভুলে গেছি? কই সে ঘটনার জন্য তো কারো বিচার হলো না। কাউকে ধরাও হলো না। ধরা হলোনা জানাজার নামে লাখো মানুষ জড় করার নেপথ্যে থাকা কাউকেও। আজ দেশে এসব শিথিলতার জেরেই বেড়ে চলেছে করোনাভাইরাস রোগীর সংখ্যা। এখনই আমরা যদি তার প্রভাব এবং ফল পাই- শপিং ও বাজার পুরোদস্তুর খোলার পর কী হবে সেটি ভাবা যায়? গত দু-এক দিনে ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে করোনা রোগীর সংখ্যা আগের দিনের সঙ্গে রীতিমত পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। আমরা দেশের বাইরে থাকি বলে অনেকে ঝুঁকি নিয়ে হলেও আমাদের সত্য কথা জানান। 

যেমন- আমার জানা মতে, দেশের চিকিৎসকরা ভালো নেই। তাদেরকে এই করোনাভাইরাসের সময় কোনও রকম অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ। কিন্তু সেই কথা নিজ মুখে চিকিৎসকদের বলতে পারছেন না। সরকারের দৃষ্টিতে সেটি অপরাধ। তাই ফ্রন্টলাইনে থাকা ডাক্তার-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীরা আছেন ঝুঁকির মুখে। কিন্তু সত্য গোপনে কার লাভ? কিসের লাভ? কম্বল উজাড়ের মতো ডাক্তার নার্সরা উজাড় হতে শুরু করলে বাংলাদেশ সামনের দিনগুলোতয় এ ধরনের সমস্যা মোকাবেলা করতে পারবে না। 

আর এক বিপদে আছে আমাদের পুলিশবাহিনী। এবার তারা প্রমাণ করেছেন, তারা জনগণের বন্ধু। তাদের কাজ, তাদের ত্যাগ, তাদের ভূমিকা সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে ইতিহাসে। কিন্তু আজ তারা অনিরাপদ। এখানেও সরকার কেন মনে করছে এটা বলা মানে অপরাধ? এই সংক্রমণের মূল জায়গাগুলো বন্ধ করলেই তো তারা আক্রান্ত হবেন না। তারা এটা পাচ্ছেন কোথা থেকে? মানুষকে সাবধান করার দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই তো আজ তাদের এই হাল। কাল যদি তারা মৃত্যু ভয়ে হাত পা গুটিয়ে ঘরে বসে থাকে কী হবে সমাজের? ইতোমধ্যে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করার মতো কাজও করেছেন পুলিশের এক সদস্য। যারা মনে করছেন, এটা ঠিক কাজ নয় বা এভাবে কারও মরা উচিৎ নয়- তাদের বলি তার জায়গায় নিজেকে বসিয়ে দেখুন হয়তো মনে হবে রোজ তিলে তিলে পরিবারের সবাইকে মারার আগে নিজেই চলে যাই। 

ভয়ংকর কষ্টে আছে নিম্মবিত্ত এবং নিম্মমধ্যবিত্ত । তারা না পারছেন লজ্জায় লাইনে যেতে মানুষের কাছে হাত পাততে, না তারা পারছেন বেঁচে থাকতে। সব মিলিয়ে  আগামী দিনগুলিতে বাংলাদেশের সামনে মহার্দুযোগ। এখন সত্য গোপন মানে আমাদের ডাক্তার নার্স স্বাস্থ্যকর্মীসহ পুলিশ বাহিনীর মৃত্যূ। আমাদের আত্মীয় স্বজন বন্ধুবান্ধবদের সর্বনাশ। এটা কোন পরিসংখ্যানে যোগ বিয়োগের খেলা না।  সরকারের একদল এসব বুঝেও বুঝতে পারছে না।

এর মধ্যে যোগ হয়েছে আন্তর্জাতিক ভারসাম্যের খেলা। চীন নাকি ভারত- এ নিয়ে সরকারে যে টানাপড়েন তাও কিন্তু ক্রমেই জটিল হচ্ছে। পান থেকে চুন খসলে কোন দেশ ছেড়ে কথা বলবে না। সব মিলিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়ন ও সামনে যাওয়াকে কেন জানি প্রশ্নের মুখোমুখি করতে চাইছে 'তারা'। এই 'তারা'ই আসলে সবকিছুর পেছনে। মাস্ক কেলেংকারী থেকে হাসপাতাল কেলেংকারী কিছুই এর বাইরে না। গড ফাদারদের কারণে যদি করোনাভাইরাসের চাইতেও ভয়াবহ কোন ব্যধি আমাদের খেয়ে ফেলে তার প্রতিকার করবে কে? 

এখনই সময়। আস্তে আস্তে ভাবমূর্তি ডুবে যাচ্ছে । গায়ের জোরে তা উদ্ধার করা অসম্ভব। এর জন্য এখন থেকে প্রস্তুত না হলে বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি কোনদিকে মোড় নেবে তা বলা কঠিন। আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে উত্তরণ চাই। দেশ যেন এগিয়ে যায়, মানুষ যেন শান্তিতে থাকে, সমৃদ্ধি যেন অব্যহত থাকে- এটাই সবার চাওয়া। করোনাভাইরাস ও করোনাপরবর্তী দুনিয়ার সাথে চলতে এর বিকল্প কোথায়?

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক