রাজনীতিতে ডিএনএ

শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকশামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক
Published : 6 June 2021, 07:09 PM
Updated : 6 June 2021, 07:09 PM

অনেকে ভাববেন রাজনীতিতে ডিএনএ আবার কেমন কথা? এটিতো চিকিৎসা বিজ্ঞান তথা শরীরবিদ্যার তত্ত্ব। যা দিয়ে আজকাল পিতা-মাতার পরিচয় নির্ধারিত হচ্ছে, যা খুন-ধর্ষণের মতো মারাত্মক অপরাধে অপরাধী শনাক্তের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। তাহলে রাজনীতিতে এর স্থান কোথায় হতে পারে? হ্যা, কথাটি অমূলক নয়, এমনটিই দাবি সুভাষ সিংহ রায়ের। সুভাষ বিজ্ঞানেরই ছাত্র। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তিনি একজন চৌকস, বলিষ্ঠ কণ্ঠ। টক শোতে প্রাঞ্জল ভাষায় গুছিয়ে যেসব কথা বলেন তা গভীর যুক্তিতর্ক এবং তথ্য দিয়ে প্রমাণিত। সোজা কথায় তার দাবির মূল তত্ত্ব হচ্ছে এই যে, আজ যেখানে রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির মধ্যে বিভক্ত- সেখানে কোন ব্যক্তি কোন পক্ষের তা নির্ধারণের জন্য ডিএনএ বা পারিবারিক পরিচয় অপরিহার্য। 

এমন কথা আওয়ামী লীগের পররাষ্ট্র সাব কমিটির সম্পাদক ড. সাম্মি আহমেদেরও। এটা অত্যন্ত অনুতাপের কথা যে দেশ স্বাধীন হওয়ার অর্ধ শতাব্দী পরেও এই বিভাজন রয়ে গেছে। এমন অনেকে রয়েছেন যাদের পূর্বপুরুষ রাজাকার হলে তারা পূর্বপুরুষদের মতবাদ অনুসরণ না করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষেই কঠোর অবস্থান নিয়েছেন, যার এক বড় উদাহরণ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক নাইমুল ইসলাম খান, যিনি প্রকাশ্যেই তার রাজাকার পিতার নিন্দা করে থাকেন। কিন্তু যেসব মানুষ পিতৃপুরুষের পাকিস্তানপন্থি মতবাদ শুধু ধরেই রাখছে না বরং আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দেশকে আবার পাকিস্তানে পরিণত করা যায় কিনা, সেসব রাজাকার বংশধরদের সংখ্যাই বেশি। একটি প্রজন্ম পার হওয়ার পরই তাদের মনে বাজছে 'পাকিস্তান জিন্দাবাদ' ধ্বনি। যেমন সাকার ছেলে সাকাই রয়ে গেছে, মীর কাসেম আলী, কাদের মোল্লা, সাইদী, চখা মিঞা, যাদু মিয়া, সবুর খান প্রমুখের সন্তান বা উত্তরসূরিরা পিতৃপুরুষের মতবাদই ধরে রেখেছে, তবে অনেক সময় বর্ণচোরের মতো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক সাজার চেষ্টা করছে।

বেশ কয়েক মাস আগে এক টেলিভিশন টকশোতে অংশ নিয়েছিলাম। সেখানে আরও ছিলেন এক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক বিষয়ের এক প্রভাষক। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান নিয়ে কথা উঠলে সে প্রভাষক বললেন, "মুক্তিযুদ্ধের কথা তো আর এখন প্রযোজ্য নয়।" সোজা কথায় তিনি মুক্তিযুদ্ধকেই অস্বীকার করলেন। এরপর তিনি চীন কর্তৃক সম্প্রতি ভারত আক্রমণকে সমর্থন করে বললেন, "চীন ঠিকই করেছে, কেননা সে তো ১৯৪৯ সালেই মেকমেহোন লাইনকে অস্বীকার করেছে।" 

আমার স্ত্রী বিলেতে রেডিং বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পড়াশোনা করেছে বিধায় আমার জানার সুযোগ হয়েছিল যে তাদের পাঠ্য তালিকায় আন্তর্জাতিক আইনের কিছু মৌলিক বিষয়ও থাকে। তাই আন্তর্জাতিক বিষয়ের এক প্রভাষক কিভাবে এ ধরনের একটি আন্তর্জাতিক আইন অসমর্থিত কথা বললেন, তা শুনে আমি অবাক হয়েছিলাম। তার তো এটা অজানা থাকার কথা নয় যে, ১৯১৪ সালের সিমলা চুক্তি দ্বারাই মেকমেহোন লাইন টানা হয়েছিল, যে চুক্তির পক্ষ ছিল একদিকে ভারতের ব্রিটিশ সরকার এবং অন্যদিকে তিব্বত। কেননা লাইনটি তিব্বত ঘেঁষে, আর তিব্বত ছিল তখন একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র। তবে চীনও কিন্তু ওই চুক্তিতে সাক্ষী হিসেবে দস্তক্ষত করেছিল। আন্তর্জাতিক আইন বলছে কোনো দেশ যদি দ্বি-পাক্ষিক বা বহু পাক্ষিক চুক্তি করে তাহলে পরবর্তীকালে যদি চুক্তিকারী দেশটি অন্য দেশের অংশে পরিণত হয়, তাহলে অংশে পরিণত করা দেশটিও অংশে পরিণত হওয়া দেশের দ্বারা অতীতে করা চুক্তি দ্বারা বাধিত থাকে এবং সেই চুক্তি একতরফাভাবে বর্জন করতে পারে না। অর্থাৎ যেহেতু ১৯১৪ সালের স্বতন্ত্র তিব্বত ভারতের বৃটিশ রাজ্যের সাথে চুক্তি করেছিল, চীন পরবর্তীকালে অর্থাৎ ১৯৫০ সালে তিব্বত দখলের পর তিব্বত স্বতন্ত্র থাকা অবস্থায় ১৯১৪ সালের সিমলা চুক্তিসহ যত চুক্তি করেছিল, চীন তার সব চুক্তি দিয়েই আন্তর্জাতিক আইনে বাধ্য। একইভাবে ভারতের তৎকালীন ব্রিটিশ রাজ, সিমলা চুক্তিসহ যেসব চুক্তি করেছিল, সেগুলো মানতে ভারতও বাধ্য। সেই টকশো চলাকালে সেই প্রভাষক সাহেবের মজ্জাগত ভারত বিরোধিতা দেখে আমার মনে হয়েছিল তার পূর্বপুরুষ সম্ভবত স্বাধীনতা বিরোধী ছিলেন। এটা জানার জন্য প্রথমেই তার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাবেক উপাচার্যকে জিজ্ঞেস করায় তিনি তেমন কিছু তথ্য দিতে পারেন নি। তাই আরও গভীরে তদন্ত করে জানতে পারলাম তার পিতা ১৯৭১ সালের অগাস্ট মাসে, অর্থাৎ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৪৭ নং লং কোর্সে। যে মানুষ ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে পারে, তাকে রাজাকার বৈ অন্য কিছু বলা যেতে পারে বলে আমার জানা নেই। ওই সময়ে যারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেয় তারা নিশ্চিতভাবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ছিল এবং পাকিস্তানের অখ-তায় বিশ্বাসী ছিল এবং সেই মতবাদই ডি এন এ-এর মাধ্যমে চলে এসেছে তার সন্তানদের মধ্যে, নয়তো সে বলতে পারে না ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এখন অপ্রাসঙ্গিক এবং আন্তর্জাতিক আইন অসমর্থিত কথা বলে চীনের ভারত আক্রমণ সমর্থন করতে পারে না। এখানে উল্লেখ্য যে, যারা পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা চায়নি তারা প্রায় সকলেই ভারত বিরোধী। কেননা ভারত আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অপরিহার্য সহায়ক শক্তি ছিল।

সেই প্রভাষকের পিতা পরবর্তীকালে একজন মেজর হিসেবে অবসরে যাওয়ার পরও পাকিস্তানপ্রেমী সরকারের বদৌলতে পরিচালক হিসেবে চুক্তিভিত্তিতে নিয়োগ পান জাতীয় ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ বোর্ডে। তবে পরবর্তীতে সেই পাকিপ্রেমী মেজরকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল।

সম্প্রতি সেই প্রভাষকের ইংরেজিতে লেখা একটি প্রবন্ধ আমার নজরে এসেছে। প্রবন্ধটি পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত অহেতুক ভারত বিরোধিতায় ভরপুর, রয়েছে প্রচুর মিথ্যাচারও। তিনি লিখেছেন, ১৯৭১-এ ভারতের রাজনৈতিক সমর্থন প্রয়োজন ছিল, কিন্তু সেটিই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় ছিল না।' তিনি আর এক জায়গায় লিখেছেন ভারত ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর, অর্থাৎ আমাদের মুক্তির মাত্র ১৩ দিন পূর্বে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে শরিক হয়েছিল। ভারত যে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে শুধু রাজনৈতিক সমর্থন দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই আমাদের এক কোটির উপরে উদ্বাস্তুকে আশ্রয়, খাদ্য, চিকিৎসা দিয়েছিল, আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়, প্রশিক্ষণ অস্ত্র প্রদান করে মুক্তিযুদ্ধে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেছিল, মুক্তিযুদ্ধে বিশ্ব সমর্থন আদায় এবং পাকিস্তানি কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করার জন্য ইন্দিরা গান্ধী পৃথিবীর সব প্রান্তে ভ্রমণ করেছেন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে ভারতের ১৬ হাজার সৈন্য শহীদ হয়েছিলেন, এই যুদ্ধে ভারতের প্রচুর অর্থ এবং সমরাস্ত্র নষ্ট হয়েছে, সে কথাগুলো প্রভাষক সাহেব বেমালুম ভুলে গেছেন। এটাকি তার অজ্ঞতার কারণে নাকি উত্তরাধিকার সূত্রে তার মুক্তিযুদ্ধবিরোধী পিতার থেকে পাওয়া মুক্তিযুদ্ধে অপরিহার্য সহায়ক শক্তি ভারত বিরোধিতার মন্ত্রে দীক্ষিত হওয়ার কারণে, সেটা পরিষ্কার নয়। তবে ডিএনএ সূত্রে প্রাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিতার কারণটিই মুখ্য বলে মনে হচ্ছে। প্রভাষক সাহেব উল্লেখ করেছেন মিয়ানমারের সাথে নাকি ভারতের প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে, যার জন্য রোহিঙ্গা সমস্যায় ভারত মিয়নমারপন্থী ভূমিকা পালন করছে। এ কথা বলে প্রকারান্তরে প্রভাষক সাহেব মিথ্যাচারই করেছেন এই অর্থে যে রোহিঙ্গা সমস্যা যে মূলত চীনই জিইয়ে রেখেছে একথাও তিনি বেমালুম ভুলে গেছেন। এটা কি তার অজানা যে ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত রোহিঙ্গা বিষয় যতবার নিরাপত্তা পরিষদে উঠেছে, ততবারই চীন এবং রাশিয়া ভেটো দিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান গলা টিপে হত্যা করেছে। চীন রাশিয়া ভেটো না দিলে ২০১৭ সালে নিরাপত্তা পরিষদেই রোহিঙ্গা সমস্যা মিটে যেতো, কেননা নিরাপত্তা পরিষদের রয়েছে প্রয়োগ ক্ষমতা। এখনো মিয়ানমার আন্তর্জাতিক আদালতের প্রাথমিক আদেশগুলো লংঘন করে যাচ্ছে এ জন্য যে উক্ত আদালতের রায় লংঘনের বিরুদ্ধে প্রতিকার একমাত্র নিরাপত্তা পরিষদই দিতে পারে, আর মিয়ানমার জানে যে, নিরাপত্তা পরিষদে গেলে তাদের শ্রেষ্ঠতম রক্ষাকারী দেশ চীন, তাদের পক্ষে ঢাল হিসেবে কাজ করবে। মিয়ানমারে চীনের ব্যাপক স্বার্থ রয়েছে বলেই চীন অন্ধের মতো মিয়ানমারকে সমর্থন করে যাচ্ছে, এ জিনিসটা এই প্রভাষক সাহেবের নিশ্চয়ই জেনেও না জানার ভান করছেন, কেননা তার পিতার থেকে তিনিও উত্তরাধিকার সূত্রে পেযেছেন মজ্জাগত ভারত বিরোধিতা, কেননা ভারত আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অপরিহার্য ভূমিকা রেখেছিল। এটা ঠিক যে ভারতের সাথে ও মিয়ানমারের সুসম্পর্ক রয়েছে; কিন্তু চীনের সাথে মিয়ানমারের যে অত্যন্ত গভীরে প্রথিত মধুর সম্পর্ক রয়েছে ভারত-মিয়ানমার সম্পর্ক সে তুলনায় অনেক নিম্ন পর্যায়ের। এমনকি অতি সাম্প্রতিককালেও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এক প্রস্তাবে যেখানে চীন মিয়ানমারের পক্ষে ইতিবাচক ভোট দিয়েছিল, সেখানে ভারত ভোট দানে বিরত ছিল।

বঙ্গবন্ধু ভারত এবং পাকিস্তানের সাথে একই মাপের সম্পর্ক রেখেছিলেন বলে প্রভাষক সাহেব নগ্নভাবে সত্যকে জলাঞ্জলি দিয়েছেন। ভারতের সাথে বঙ্গবন্ধুর সময়ে যে সম্পর্ক ছিল, এবং যেটি এখনো রয়েছে, সেটির সাথে পৃথিবীর কোনো দেশের সম্পর্কেরই তুলনা হয় না। প্রভাষক সাহেব ১৯৭২-এর ইতিহাস ঘাঁটলে জানতে পারবেন যে বঙ্গবন্ধু সে বছরে কলকাতার ইতিহাসের বৃহত্তম জনসভায় দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছিলেন ভারতের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা ভোলার নয় এবং ভারতের সাথে আমাদের বন্ধুত্ব চিরস্থায়ী এবং সে সময়ে ভারতের সাথে আমাদের ২৫ বছরের বন্ধুত্ব চুক্তিও ছিল, যার ফলশ্রুতিতে আমরা ছিটমহলসহ বহু সমস্যার সমাধান করতে পেরেছি। অন্যদিকে পাকিস্তানের সাথে আমাদের সম্পর্ক ছিল দুই দেশের মধ্যে নেহায়েত কূটনীতিক পর্যায়ের। শুধু তাই নয়, সে সময়ে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কাছে প্রতিনিয়ত দাবি জানাচ্ছিলেন আমাদের পাওনা অর্থ এবং সম্পদ ফেরত দিতে, আমাদের দেশে পাকিস্তান যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ দিতে, বিহারিদের ফেরত নিতে। এমনকি ১৯৭৪ সালে ভুট্টো ঢাকায় এলে তার মুখের উপর বঙ্গবন্ধু এসব দাবি তুলেছিলেন, তুলেছিলেন কমনওয়েলথ সম্মেলনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমাবেশে ১৯৭৫-এ শহিদ হওয়ার আগ পর্যন্ত। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাও এই দাবির পুনরাবৃত্তি করেছেন। এখনও আমাদের শীর্ষ মন্ত্রিবর্গ স্পষ্ট ভাষায় বলছেন ভারতের সাথে আমাদের রক্তের সম্পর্ক, যার কোনো তুলনা নেই, আর চীনের সাথে আমাদের সম্পর্ক নেহায়েত বাণিজ্যিক। প্রভাষক সাহেব জিয়াউর রহমানকে 'প্রেসিডেন্ট জিয়া' বলে উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্টের অবমাননা করেছেন, যা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ, কেননা পঞ্চম এবং সপ্তম সংশোধনী মামলাসহ আরো কটি মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগ পরিষ্কার বলে দিয়েছেন যে আইনের দৃষ্টিতে জিয়া কখনো আমাদের প্রেসিডেন্ট ছিল না, আর এই প্রভাসক সাহেবসহ সকলেই সুপ্রিম কোর্টের এ নির্দেশনা মানতে, অথবা শাস্তি পেতে বাধ্য। তার লেখার এই অংশ থেকে প্রভাসক সাহেবের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত পাকিস্তান প্রেমই ফুটে উঠেছে। বাংলাদেশ যে গত বছরে তিনজন পাকিস্তানি কূটনীতিককে, একজন উপরাষ্ট্রদূতসহ, বহিষ্কার করেছিল, পাকিস্তান যে বঙ্গবন্ধু হত্যায় এবং ২১ আগস্ট গ্রেনেড আক্রমণে জড়িত ছিল, যার প্রমাণ গ্রেনেডেই ছিল এবং দুই পাকিস্তানির সম্পৃক্ততায় ছিল, যাদের ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে, সে কথাগুলো প্রভাষক সাহেব চেপে গেছেন। তদুপরি বাংলাদেশে জঙ্গিদের অর্থায়নকালে দুইজন পাকিস্তানি কূটনীতিক হাতেনাতে ধরা পড়েছিল, উত্তরায় জঙ্গি ধরার অভিযান চালানোকালে পিআইএর এক ছদ্মবেশি কর্মকর্তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, এ কথাগুলো প্রভাষক সাহেব বলতে নিশ্চয়ই লজ্জা পেয়েছিলেন।

এ প্রভাষক সাহেব আমাদের ২০১৩ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রতি ভারতের অনুমোদন ছিল বলে তার বিএনপি-জামায়াত প্রীতির কথা নিশ্চিত করেছেন। যারা ৭১-এ স্বাধীনতা চায়নি বা তাদের বংশধরদের জন্য বিএনপি-জামায়াত তত্ত্বের ধারক হওয়াই স্বাভাবিক। আমাদের শঙ্কা এ নিয়ে যে, এই উগ্র পাকিস্তানপন্থি এবং ভারতবিরোধী প্রভাষক, যার রক্তে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিতা, তিনি কত ছাত্রের মস্তিষ্ক ধোলাই করে ইতিহাস বিকৃত করবেন। এ ব্যাপারে আমাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।

মজার ব্যাপার হচ্ছে সেই প্রভাষকই এখন দিল্লীরই এক বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর শিক্ষার জন্য পড়াশোনা করছেন।

সম্প্রতি তিনি হেফাজতসহ অন্যন্য ধর্ম ব্যবসায়ীদের পক্ষে সাফাই গাওয়া শুরু করে তার পাকিস্তানপ্রীতি, মজ্জাগত ভারত বিরোধিতা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী চিন্তা ধারাকে আরও স্পষ্ট করে দিয়েছেন। গত ২৪ এপ্রিল একটি জাতীয় ইংরেজি দৈনিকে তিনি যে কথাগুলো বলেছেন তা সত্যিই লোমহর্ষক। সেগুলো বাংলায় তর্জমা করলে যা দাঁড়ায় তা মোটামুটি নিম্নরূপ: 'এই গ্রেপ্তারগুলো (ধর্ম ব্যবসায়ীদের) হয়তো এক প্রতিবেশীকে (নিশ্চয়ই ভারতের প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে) প্রফুল্ল করবে, কিন্ত এই গ্রেপ্তারের দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক প্রতিফলন তিক্ত হতে বাধ্য বিশেষ করে যখন সরকারের সাথে তার জনগণের সম্পর্ক নাই বললেই চলে এবং এমন একটি সময়ে যখন জনগণ কোভিড অতিমারী থেকে বাঁচবার সংগ্রামে লিপ্ত। ভবিষ্যতে এটি আনন্দদায়ক হবে না।'

এ কথা ভেবে ভয় হচ্ছে যে, এসব রাজাকারের বংশধর শিক্ষকরা কত শিক্ষার্থীকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে মগজ ধোলাই করছে এবং উস্কানি দিচ্ছে যাতে দেশটিকে আবার পাকিস্তানে পরিণত করা যায়। এ বিষয়টি সরকারকে অবশ্যই গভীরভাবে ভাবতে হবে এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক