আমরা সবুজে ফিরেছিলাম!

ফেরদৌস আহমেদ উজ্জল
Published : 13 Sept 2020, 11:44 AM
Updated : 13 Sept 2020, 11:44 AM

এপ্রিলের মাঝামাঝি একটি কাজে বাধ্য হয়ে সদরঘাট গিয়েছিলাম। আদাবর থেকে সদরঘাটে আসতে যেতে আমার সময় লেগেছিল মাত্র ২৭ মিনিট। সদরঘাট থেকে সিএনজি স্টার্ট করার পর পুরো রাস্তাটির একটি ভিডিও করেছিলাম। ভিডিওটা এখনো মাঝেমধ্যে বের করে দেখি। এই কয়েক কিলোমিটার রাস্তার এই ভিডিওটায় হাতেগুণে কয়েকজন মানুষ দেখেছিলাম। সেদিন আমার বারবার ভাবনায় আসছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের কথা, মনে হচ্ছিল এমনই হয়তো ছিল সে সময়কার পথ-ঘাট, আতঙ্ক, নিরবতা আর নিস্তব্ধতার রূপ। কেমন গা ছম ছম করা একটা ভুতুড়ে পরিবেশ। গুলিস্থান মোড়ে দেখলাম ট্রাফিক সার্জেন্টটি মনোযোগ সহকারে মোবাইল চালাচ্ছেন। যাহোক শহর, তার ব্যস্ততা, ভীড়, চাপ আর সেই গতি কোথায় হারাল সেটা ভাবতেই কেমন লাগছে! এমন শহর আমাদের দেখতে হলো এটা নিশ্চয়ই আমাদের প্রজন্মের বেঁচে যাওয়াদের ভাণ্ডারের খুবই গুরুত্বপূর্ণ গল্প হবে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য।

আমাদের আদাবরের ভাড়া বাসাটি অনেক সুন্দর আর তার বড় কারণটা হলো পাশের ছাদের অদ্ভুত সুন্দর বাগানটি। এই বাগানটিতে আম গাছ, লেবু গাছ, নানান ধরনের শাক থেকে ফুল সবকিছুই হতো। আমরাও বরাবরই এই ছাদ বাগানের ফল, ফুল, সবজি পাই। হয়তো আমরা বাসায় নেই কিন্তু জানলা দিয়ে এক হালি লেবু দিয়ে যেতেন বাড়িওয়ালা। আমরাও খুব আনন্দ পাই এই আচরণে। এপ্রিলের শেষে এই ছাদ বাগানে প্রথম ঘুঘু দেখি আর কয়েকদিন পরে এই ঘুঘু আমাদের বেডরুমের ভেতরেও আসা-যাওয়া শুরু করে। এই করোনাকালে আমরা দেখেছি কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে খেলা করছে ডলফিন। সমুদ্রের তীরে উঠে এসেছে শত শত কচ্ছপ। সমুদ্রের তীরে জন্ম নিচ্ছে সেই পুরনো নাম না জানা বাহারী ফুলেরা। দুনিয়ার তাবৎ জায়গাতেও এর ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়নি। আফ্রিকার সিংহরা রাস্তায় রোদ পোহাচ্ছে, হিমালয়ের শ্বেত ভল্লুকেরা গ্যাংটকের রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, ভেনিসে ডলফিন আর হাঁসের খেলা, ওজন স্তুরের ক্ষত সেরে উঠছে আপন নিয়মেই। এমন কত কত ঘটনা আমাদের একদম তাক লাগিয়ে দিচ্ছে। আহা! আমরা কি এমনটা ভেবেছিলাম? প্রকৃতি কতটাই আত্ম সৃষ্টিবাদী হয়ে নিজেকে সারিয়ে নিতে পারে তা কি আমরা আগে কখনো কল্পনায় নিতে পেরেছিলাম? না তা কখনোই হয়তো ভাবিনি।

এদিকে বুড়িগঙ্গার পানিতে নতুন প্রাণ ফিরে এসেছিল এই লকডাউন পরিস্থিতিতে। পানির মান পরিবর্তন হয়েছিল, কমেছিল দূষণ। সেই নোংরা দুর্গন্ধও কমে গিয়েছিল। বুড়িগঙ্গায় নতুন করে নানান ধরনের মাছও পাওয়া যাচ্ছিল।

নগরের কোথাও ধুলার ওড়াওড়ি লক্ষ্য করা যায়নি। অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও রাস্তার খোড়াখুড়ির কারণে ঢাকার বাতাসের মান সবসময় দূষিত থাকে। ইটের ভাটা এবং আনফিট গাড়ির ধোঁয়ার কারণেও বাতাসে দূষণ বাড়ে। করোনাভাইরাস সংক্রমণের ভয়ে ওই সময়ে সবকিছুই বন্ধ ছিল আর এ কারণেই স্বাস্থ্যকর হয়ে উঠেছিল বাতাস। লকডাউনের কালে বন্ধ ছিল অধিকাংশ উন্নয়ন কাজ। এ সময়ে মানুষজনের কোনো যাতাযাতও ছিল না। যে কারণে ধুলা দূষণের মাত্রা ছিল খুবই কম। এ সময়ে গবেষণায় দেখা গেছে এয়ার কোয়ালিটিও রাতারাতি বেড়ে গিয়েছিল।

গবেষকদের মতে, যেসকল কারণে বায়ুদূষণ হতো সেগুলো বন্ধ হওয়ায় দূষণের মাত্রা কমে এসেছে। আমরা যদি এরপর পরিকল্পনামাফিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাই হবে বাতাসের দূষণ আর বাড়বে না কিন্তু সেক্ষেত্রে সরকারকে সঠিক পদক্ষেপটা নিতে হবে।

শহরের দেয়ালে শ্যাওলা জমেছিল, রোড ডিভাইডারে বেড়ে উঠেছিল আগাছা। এই লকডাউনে শহরের কনক্রিটের দেওয়াল কেমন সবুজে ভরে গিয়েছিল। ছাদে কিংবা বারান্দায়, ঘরে কিংবা ব্যালকনিতে একটু সবুজ আর প্রাণের প্রতি যেনো খুবই যত্নবান হয়ে পড়েছিল সকল মানুষ। ব্যালকনির যে গাছটা মলিন হয়ে পড়েছিল আজ দেখা যাচ্ছে সেটা সবুজে একাকার। কারণ অফুরন্ত সময়ে কেউ না কেউ তার যত্ন করেই চলেছে। আর করোনাভাইরাস মহামারীতে নিজেদের যত্ন নেয়ার উপকরণ হিসেবে নানান ভেষজ উদ্ভিদ, তুলসি, পুদিনা পাতা আরও কত কি যে মানুষ রোপন করেছে তার শেষ নেই।

ঢাকা শহরের রাস্তার ডিভাইডারগুলোতে তাকালেই চোখে পড়ছে ঘাস আর ফুল, গাছগুলোও অনেক সবুজ। দীর্ঘদিন ধরে শহরের ধুলা আর বায়ুদূষণের প্রভাবে গাছের পাতাগুলো ছিল বিবর্ণ আজ সেই পাতারা সবুজে সেজেছে। লকডাউল শিথিল হলেও পাতারা এখনো বিবর্ণ হয়নি। এ সময়ে অনেকটাই গৃহবন্দী মানুষেরা তাদের বারান্দা, ব্যালকনি আর ছাদে গড়ে তুলেছে বাহারি বাগান। খুব কম ভবনেই এখন ছাদ বাগানহীন দেখা যায়। এটা একটা অভূতপূর্ব বিষয়।

করোনাকালে পরিবেশ সুরক্ষা ও ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য প্রধান কাজই হলো প্রকৃতিকে তার স্বভাবজাত জায়গায় থাকতে দেয়া। প্রকৃতির যে বিজ্ঞান সেই বিজ্ঞানকে যখন আমরা ধ্বংস করি তখন প্রকৃতি আমাদেরকে ভয়াবহতা প্রদান করেন। আর আমরা যখন তাকে তার মতো থাকতে দেই, সে তখন তার আপন মহিমায় আমাদেরকে ভালো রাখে। করোনাকাল আমাদের এটাই শেখাচ্ছে যে প্রকৃতিকে প্রকৃত থাকতে দিতে হবে।

তবে এর ভিন্ন চিত্রও আমরা দেখি সর্বত্রই। বিশ্বব্যাপী এসময়েও যুদ্ধ থামেনি। থামেনি মানুষে মানুষে হানাহানি। প্রকৃতি ধ্বংসও থামেনি। থামেনি অমানবিকতার ক্রূর চর্চা। আমাদের এই ভূখণ্ডেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। মাদারিপুরের চরমুগুরিয়া মূলত বিখ্যাত ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য। কয়েকবার সেখানে গিয়েছিলাম পেশাগত জায়গা থেকে। দেখেছি শত শত বানর থাকে সেখানে। শুনেছি একসময় সেখানকার ধনাঢ্য মারওয়ারি ব্যবসায়ীরা বানর পুষতেন আর সেই থেকে চরমুগুরিয়ায় বানরের অভয়াশ্রম। কিন্তু এই লকডাউন পরিস্থিতিতে সেখানে বিষ খাইয়ে অসংখ্য বানরকে হত্যা করল কিছু মানুষনামী প্রাণী। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে গলা টিপে বানর হত্যা করে তা ভিডিও করে ভাইরাল করা হলো। নাটোরের একটি গ্রামে আম্ফান ঝড়ের রাতে কয়েকশত পাখি ভিজে মাটিতে পড়ে যায় আর গ্রামের মানুষেরা সেগুলো ধরে, মেরে, রান্না করে খেয়ে ফেলে। সেগুলো খুব বিরল প্রজাতির অতিথি পাখি ছিল। এ মাসের শুরুতেই দেখলাম পাবনার একটি গ্রামে বিষ দিয়ে শতাধিক ঘুঘুকে হত্যা করা হলো। কেউ কোনো প্রতিবাদ পর্যন্ত করলো না। এই ঘুঘু এখন বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলে দেখাই যায় না। কেন হত্যা করল, কার লাভ হলো, কার ক্ষতি হলো এই আলোচনাগুলোও আমরা দেখি না। মানুষের এই হত্যা প্রবণতা কি আদিম? এই হত্যার মৌলগত জায়গা কি সেই বুনো সংস্কৃতিই? নাকি মানুষের বিকৃত চিন্তার শিকারই হচ্ছে এই পাখি ও প্রাণীরা। আর কতটা সংকটে পড়লে মানুষের উপলব্ধিগুলো পাল্টাবে?

ঢাকা শহরের অলিতে গলিতে আবারও ময়লার স্তুপ জমতে শুরু করেছে। সেই চিরচেনা শব্দদূষণ আর ধুলা দূষণের শহরে পরিণত হয়েছে আমাদের ঢাকা। ঢাকায় কুকুর নিধনের মহোৎসব চলছে। কুকুর যেন ঢাকা শহরের প্রধান সমস্যা। রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম আর গায়ে গায়ে চলার অভ্যাসটা আবার ফিরে আসছে। ফিরে এসেছে চুরি, ডাকাতি, খুন ও হত্যার বেসাতি। সেই ভোগের চিন্তা আবার সবার মাথায় গিজগিজ করছে। রাস্তায় বের হলেই সেই চিরচেনা ঝগড়া, ঠকানো আর মারামারিও চোখে পড়ছে। অথচ বাংলাদেশেই শুধু নয় পৃথিবীর অসংখ্য ক্ষমতাধর মানুষ আত্মসমর্পণ করেছে এই মহামারীর হাতে। তাদের কিছুই করার ছিল না। তাদের এই অর্থ-বিত্তের ক্ষমতার শক্তি তাদের বাঁচাতে পারেনি। এই পুঁজিনির্ভর ক্ষমতা মানুষকে করোনাভাইরাস মহামারী থেকে রক্ষা করতে পারেনি। পৃথিবীর তাবৎ মিডিয়ায় খবর হয়েছে, লেখা হয়েছে যে মানুষের ভোগনির্ভর ক্ষমতা আর পুঁজিবাদের ক্ষমতার দিন শেষ। এখন সময় প্রাণ-প্রকৃতিনির্ভর মানবিক সমাজের। যে সমাজ ব্যবস্থায় মানুষ সবুজকে ধারণ করবে আর ভোগ নয় বরং সহভাগিতা ও সাম্যের পথেই হাঁটবে, সে ব্যবস্থাই মানুষকে টিকিয়ে রাখবে। আমরা সেই সবুজেই থাকতে চাই। তাই নয় কি!

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক