০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

নিমতলী ট্র্যাজেডি আর দেখতে চাই না

বেবী মওদুদ

Published : 07 Jun 2010, 05:41 PM

Updated : 01 Jul 2022, 05:54 PM

গত ৩ জুন রাতে নিমতলীতে আগুনে পুড়ে ও দমবন্ধ হয়ে ১১৭ জন মানুষ মারা গেছে। এদের মধ্যে শিশুকিশোর বৃদ্ধ নারী-পুরুষ রয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও দুই শতাধিক। যাদের অধিকাংশই আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসারত।

আগুনের এই ভয়াবহ লেলিহান ঘটনায় সারা জাতি স্তব্ধ, হতবাক ও বেদনাহত। এই নিষ্ঠুর মৃত্যু আমাদের একটা চরম শিক্ষা দিয়ে গেছে।

রাজধানীর মধ্যপ্রান্তে অবস্থিত নিমতলী পুরনো ঢাকার প্রবেশপথ, যার ঐতিহ্য আমাদের সব সময় আকর্ষণ করে থাকে। নতুন ঢাকার জৌলুস, ভবনের পর ভবন, প্রশস্ত রাস্তাঘাট, অজস্র গাড়ি, ফ্লাই ওভার, ফুট ব্রিজ, শপিং কমপ্লেক্স সবই নিত্যনতুন চাকচিক্য দেখিয়ে চলেছে আমাদের আর পুরনো বায়ান্ন বাজার তিপান্ন গলি যে পরিত্যক্ত, অবহেলিত, মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে দণ্ডায়মান তা যেন কারুর নজরেই ছিল না।

স্বাধীনতার পর ঢাকা রাজধানী হওয়ায় মানুষ বেড়েছে, অফিস-আদালত, ব্যাংক, ব্যবসা-বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধি পেয়েছে সত্য, কিন্তু রাজধানী ঢাকার আবাসিক এলাকাগুলোর শান্তি ও সৌন্দর্য মুছে গেছে। আবাসিক এলাকার পরিবেশ নষ্ট করে গড়ে উঠেছে দোকান-পাট, ক্ষুদ্র শিল্পকারখানা, গার্মেন্টস, ক্লিনিক, বিশ্ববিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন, হোটেল রেস্টুরেন্ট।

পুরনো ঢাকার আবাসিক ভবন ও বাড়ির নিচতলায় কাঁচামাল ও কেমিক্যাল গুদাম, ক্ষুদ্র শিল্পকারখানা, দোকানপাট গড়ে উঠেছে। আবাসিক এলাকা চরিত্র হারিয়ে রাজধানী ঢাকা চাকচিক্যময় বাণিজ্যিক এলাকায় পরিণত হয়েছে।

সেখান থাকা শিক্ষাসংস্কৃতি ও মূল্যবোধ সব দমবন্ধ হয়ে ছটফট করা ছাড়া আর কিছু জানে না। নানা রঙ ও ঢঙের অজস্র গাড়ির ধোঁয়া ও যানজট, পথঘাট খুঁড়ে আবর্জনার পুঁতিগন্ধ আমাদের হৃদয়ের সৌন্দর্য বিনষ্ট করে দিচ্ছে। এই রাজধানীতে কোকিল ডাকতে চায় না, কদম-কৃঞ্চাচূড়া শিউলি ফোটে না। যদিও ফুলের চাষ ও ফুলের বাণিজ্যিক অবস্থান অনেক মজবুত।

পুরনো ঢাকার অলি-গলি, কানা গলি, চোরাগলির কথা আমরা শুনেছি। এসব আঁকাবাঁকা পথে হেঁটেওছি। কোথাও বা একটা রিকশা চলতে পারে, কোথাও বা পাশাপাশি দুজন মানুষ হাঁটতে পারে না। আর বাড়িঘর এমন গায়ে গায়ে ঘেঁষা যে চলাচল করতে সমস্যা হয়। ঘরবাড়ি ভাগাভাগি হওয়ায় এমন কাণ্ড ঘটেছে। আর গুদাম ও ব্যবসার জন্য ভাড়া দেওয়ায় সেখানে ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এসব তদারকি করার দায়িত্ব কার

অবশ্যই সরকার, সিটি কর্পোরেশন ও ব্যক্তি পর্যায়ে যাদের বাড়িঘর রয়েছে তাদের এবং এলাকার বাসিন্দাদের। কিন্তু এই তদারকির কাজটি তারা করেন না। যাদের বাড়িঘর, তারা ইচ্ছেমতো ভাড়া দিয়ে অর্থ কামান, যারা অনুমতি দেবার তারাও ঘুষ নিয়ে লাইসেন্স দিচ্ছেন দোকানপাট, গুদাম ও কারখানার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের।

কিন্তু কোথায় দিচ্ছেন, পরিবেশ কেমন সেটার কোনো খোঁজ-খবর নেন না। আর এই অবস্থা তো একদিনে হয় নি। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। কেমিক্যাল ভর্তি গুদাম, প্লাস্টিক কারখানার পাশে বিয়েবাড়ির পান-চিনির রান্নাবান্নার কাঠের চুলো থেকে আগুনের এমন লেলিহান শিখা যে চিপাগলির ঘরবাড়ি পর্যন্ত মুহূর্তে ধাবমান হয়ে ১১৭ জন মানুষকে চির ঘুম পাড়িয়ে দেবে কেউ যেন তা ধারণার মধ্যে আনে নি। যারা বেঁচেছে তাদের ভাগ্য সহায় ছিল। যারা আহত হয়েছেন তারা এক আতঙ্কজনক স্মৃতি বহন করবেন। এ স্মৃতি বড় যন্ত্রণার।

এই শোকাবহ ঘটনার পর পুরনো ঢাকার বাসিন্দারা তাদের আবাসিক এলাকা থেকে কেমিক্যাল গুদাম ও প্লাস্টিকসহ ছোট ছোট কারখানা সরানোর দাবি জানিয়েছে। এ দাবি অবশ্যই ন্যায্য। রাজধানীর আবাসিক এলাকাগুলো শান্তিপূর্ণ বাসযোগ্য করে তুলতে হবে।

মৃত্যুঝুঁকি, জীবনের যাতনা-বেদনা সব দূর করতে হবে। সেই সঙ্গে আবাসিক এলাকাগুলোকেও পরিকল্পনা অনুযায়ী গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনীয় ও উপযুক্ত রাস্তাঘাট করতে হবে, মানুষের চলাচল সুবিধাজনক করতে হবে। প্রত্যেক ওয়ার্ড কমিশনারের নেতৃত্বে এলাকার অভিজ্ঞ প্রবীণ-নবীন পুরুষ-নারীকে নিয়ে কমিটি করে সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান করতে হবে।

এই ভয়াবহ ঘটনা আমাদের শিক্ষাও দিয়ে গেছে, চপেটাঘাতও করেছে। কদিন আগে বেগুনবাড়ির পাঁচতলা বাড়ি ধ্বসে মৃত্যুর কথাও আমাদের মনে রাখতে হবে। আতঙ্ক ও দুঃসহ স্মৃতিকে মুছে দিতে হলে প্রয়োজনে নতুন পরিকল্পায় পুরনো ঢাকার বাড়িঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হোক।

অনুমতিহীন বাড়িঘর, দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভেঙে ফেলতে হবে। পুরনো ঢাকার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে সমুন্নত রেখে এ কাজ এখনই শুরু করা যেতে পারে। অত্যন্ত কঠিন ও কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়ে যদি এ কাজে প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন ও এলাকাবাসী ঐক্যবদ্ধ হয় তাহলে নিহতদের আত্মা শান্তি পাবে। আমরা আর কোনো 'বেগুনবাড়ি' বা 'নিমতলী' ট্র্যাজেডি চাই না।