রাস্তায় নামেন, না হয় রাস্তা মাপেন

Published : 9 May 2019, 06:26 AM
Updated : 9 May 2019, 06:26 AM

ওরা বলে, বাজারে আপনার অধিকার নেই। কারণ, আপনার 'কনটেন্ট' ভালো নয়। কনটেন্ট ভালো নয় বলেই 'টিআরপি' নেই। টিআরপি নেই তো বিজ্ঞাপন নেই। বিজ্ঞাপন নেই তো টাকা নেই। টাকা নেই তো বেতন নেই। বেতন নেই তো আপনি প্রথমে ছদ্মবেকার, তারপর ছাঁটাই! অ্যাটকো সভাপতি বলছেন, ব্যবসা করতে না পারলে মালিক আপনাকে রাখবে কি করে! তাই তো, কথা সত্য। মালিকের কাজ ব্যবসা, আপনাকে পালা তার দায় নয়। ২০ বছর ধরে যে পেশায় ছিলেন সেটাই এখন আপনার দায়, আপনার কাল! আপনি পড়েছেন এমনই একটা দুষ্টচক্রে। এবার আপনি ভাবুন, ভাবনার রাস্তায় নামুন। ল্যাম্পপোস্ট খুঁজুন, তার সামনে বসে পড়ুন। দেখুন, সারাজীবন কী উৎপাদন করেছেন!

আপনি, আপনারা যারা খবর সংগ্রহ করেন, খবর পৌঁছে দেন মানুষের কাছে, শেষ পর্যন্ত কেমন খবর হলেন নিজেরাই! এই আপনারাই তো, নিজে ভালো নেই কিংবা প্রিয়জন হাসপাতালে, তবু দিনরাত ছোটেন মানুষকে ভাল রাখতে, খবর পৌঁছে দিতে। অথচ, মাসশেষে অনেক টেলিভিশনে নিয়মিত বেতন নেই, নেই ইনক্রিমেন্ট, গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড, ইন্স্যুরেন্স কল্যাণ তহবিল। এমনকি যে সমাজকে ক্রমাগত নিরাপদ করতে আপনার কাজ, সেখানে আপনিই পড়ে থাকেন সবচেয়ে ঝুঁকিতে। নেই ঝুঁকিভাতা, আর সরকারি নীতিমালায়ও সম্প্রচারকর্মীরা আসেনি ওয়েজ বোর্ডের আওতায়।

কেন এই 'নেই রাজ্য'? সম্প্রচার মাধ্যম তো এক বিশাল বাণিজ্যালয়। তবু কেন বাজারে আপনার অধিকার নেই? সত্যি কি আপনার কনটেন্ট ভালো নয়, নাকি ভালো কনটেন্ট বানানোর নীতিটি টিভি লাইসেন্স প্রক্রিয়ার মধ্যেই নেই?

বছর আগে, সেই ২০১০ সালে সামাজিক মাধ্যমে আমি লিখেছিলাম, 'টেলিভিশন মিডিয়া পাঁচ বছর মেয়াদী কোনো দলীয় রাজনৈতিক ব্যবসা নয়। এটি শিল্প। বিকাশমান শিল্পকে মালিক সরকারগুলো যেরকম নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে তা থেকে বাঁচাতে পেশাজীবীদের সচেতন ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।'

দশ বছরেও গোড়ার এই আলাপটি কাউকে তেমন করতে দেখিনি। সম্প্রতি ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টারের তৎপরতায় শিল্পের সংকটের আলোচনাটি সামনে এলো। গত বিশ বছরে সরকারগুলো প্রায় চল্লিশটি বেসরকারি টিভির লাইসেন্স দিয়েছে, প্রক্রিয়াটি ছিল দলীয় বিবেচনা। মানুষ শুধু রাজনৈতিক প্রাণী নয়, বেনজামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের মতে মানুষ 'হাতিয়ার প্রস্তুতকারী প্রাণী' বটে। তাই যারা লাইসেন্স পেয়েছেন, দু'একজন ব্যতিক্রম ছাড়া, তারা এটিকে 'মেয়াদী' ব্যবসার 'হাতিয়ার' বানিয়েছেন। 'অ্যাটিচিউড'টি ছিল এমন, দল পাঁচ বছর ক্ষমতায় আছে, তাই পাঁচ বছর ব্যবসার জন্য মিডিয়া হলে ভালো। পাঁচ বছর পর সরকার বদলে গেলে মালিকানা নাও থাকতে পারে। তাই প্রথম থেকেই এটাকে ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে নেয়ার 'ভিশন' ছিল না। ছিল না বিজনেস প্ল্যান, ছিল না কনটেন্ট প্ল্যান। ছিল কেবল 'ধরমারকাট', 'কপিপেস্ট' 'জোড়াতালি' পদ্ধতি। তাই ইটিভির কপিতে এনটিভি, তারপর কপি করে অন্য টিভিগুলো। লোগো বদলে দিলে আলাদা করা কঠিন। দুই একটি ছাড়া সেই 'কপিপেস্ট' সংবাদে, বুলেটিন কাঠামোয়। এখন নামতে নামতে ভারতীয় টিভির সিরিয়াল বা বিনোদন অনুষ্ঠানগুলোর কপিতে নেমেছে।

তারপর একদিন দর্শক ঠিক করলেন, তারা আর 'ঘোল' খাবেন কেন? তারা মূলটাই দেখবেন। আপনি দর্শক হারালেন, আপনার কাজ হারালেন। দেখেন, মালিক কিন্তু তার ব্যবসা হারাননি। কারণ তিনি মিডিয়াকে 'পাঁচসালা ব্যবসা' হিসেবে নিয়েছেন, দলের ক্ষমতাকালে 'গ্র্যান্ড বিজনেস প্ল্যান'টি করেছেন। ধরুন, যদি ২০ হাজার কোটি টাকার ব্যবসার পরিকল্পনা করে থাকেন, তাহলে সেটি করতে তিনি মাত্র ২০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ হিসেবে টেলিভিশনকে নিয়েছেন। বড় বিজনেস প্ল্যানের 'টুল' ছিল মিডিয়ায় বিনিয়োগ, তখন পেশাজীবী হিসেবে আপনি তা দেখেননি। প্রথম দিনের সূর্যের প্রশ্ন আপনি শোনেননি। তার আলোয় আপনি ঝলমলে স্টার হয়েছেন; পেশাদার হননি। হলে ভাবতেন। ভাবনার রাস্তায় নামতেন।

তারা বলে, আমরা তো লাইসেন্স দিয়েছি, টেলিভিশনগুলো আয় করুক। নিজের পায়ে দাঁড়াক। 'তারা' মানে টিভি লাইসেন্স দাতা এবং উদ্যোক্তা। এবার ভাবুন, আসলে কী ওরা চায়, আপনি নিজের পায়ে দাঁড়ান?

আপনি গণমাধ্যম। আপনার আয় বাড়ছে, আপনি নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছেন, বিজ্ঞাপন নির্ভরতা কমছে, গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। তার মানে আপনি সম্পাদকীয় স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করতে পারছেন। কিন্তু কর্পোরেট সরকারগুলো কি শেষ পর্যন্ত স্বাধীন গণমাধ্যম দেখতে চায়? কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে! ফলে তারা আপনাকে নির্ভরশীল করে রাখে, স্বনির্ভর হতে দেয় না। না দিয়েই সে বলে, 'তুমি তো পারছ না। তুমি ব্যর্থ, তুমি যাও' মনে পড়লো শঙ্খ ঘোষ, 'পেটের কাছে উঁচিয়ে আছো ছুরি/ কাজেই এখন স্বাধীনমতো ঘুরি/এখন সবই শান্ত সবই ভালো/ তরল আগুন ভরে পাকস্থলী/ যে কথাটাই বলাতে চাও বলি/ সত্য এবার হয়েছে জমকালো।' আপনি তো প্রথম দিন থেকে সম্প্রচার শিল্পের আর্থরাজনৈতিক জ্ঞান পেশাদারিত্বের কৃৎকৌশল নিয়ে দাঁড়াননি। মেনেমানিয়ে চলেছেন। মানিয়ে চলার নাম সাংবাদিকতা নয়। তাই তো আপনার সংবাদ দর্শক আর দেখছেন না। যখন দেখেন না তখন টিআরপি থাকে না। তখন টাকা আসে না, আপনি হন ব্যর্থ। রাষ্ট্র আর মালিক আপনাকে দু'ভাবে কাটে। প্রথমে আপনাকে ব্যর্থ করে, তারপর ব্যর্থ বলে। এবার আপনার ব্যর্থতা নিয়ে আপনি রাস্তা মাপেন!

তো গেলো সংবাদ। এবার আসি বিনোদনে। এখানেও দেশের টিভি দর্শক দেখছে না। কারণ ওই যে, ভালো কনটেন্ট নেই। একটা ছোট প্রশ্ন। টিআরপি বলছে, দর্শক বাংলা সিনেমা দেখছে। বাংলা সিনেমা কি তবে ভালো কনটেন্ট? দেখছে যে! মধ্যবিত্তউচ্চমধ্যবিত্ত দর্শকদের দেখতে পাচ্ছি, আমার এই প্রশ্নেই নাক সিঁটকাচ্ছেন। তাহলে ভালো কনটেন্ট কি? তা নিয়ে কোনো গবেষণা হয়েছে? কোন সেগমেন্টের মানুষ কী দেখতে চায়, নিয়ে কোনো গবেষণা উদ্যোক্তারা করেননি, পেশাজীবীরা করেননি। না করে আপনি 'কপিপেস্ট' পলিসি নিয়েছেন। আপনার দর্শক কি দেখতে চায়? আপনার সমাজের 'ভোগ' কী? আপনার বাজার 'কানার হাটবাজার' নয়, বাজার মগজের। বাজার সংস্কৃতির। আপনার পণ্য মানুষের প্রতিদিনের বুদ্ধিবৃত্তি বিনোদনের সাথে সম্পর্কিত। এটা 'কালচারাল প্রোডাক্ট', আলুপটলের ব্যবসা নয়। আলু ব্যবসায়ীও বাজার ভাবে, পরিকল্পনা করে। আপনি কেন ভাবলেন না?

এবার ঘটনা আরও গভীরে। সমস্যা আপনার দেশবোধে। জাতীয় স্বাধীনতা মানে যে জাতীয় বাজার, সেই বাজারে মানুষ আপনার পণ্যের ভোক্তা হবে, গড়ে উঠবে 'সম্প্রচার অর্থনীতি' এই দৃষ্টিভঙ্গি এবং দূরদৃষ্টি আপনার নেই। থাকলে আপনি গবেষণায় বিনিয়োগ করতেন, বিজনেস কেস করতেন। নতুন আইডিয়াযার যোগ সমাজের সাথে, মানুষের সাথে, তেমন কনটেন্টই দেখা যেত আপনার পর্দায়। আপনার নাটক দেখলে কেন মনে হয় এদেশের ইয়ংদের 'ভাঁড়ামো' বা 'প্যানপ্যানানো প্রেম' ছাড়া আর কোনো জীবন নেই? যেমন সংবাদ দেখলে মনে হয় 'রাজনীতি' ছাড়া এদেশের মানুষের আর কোনো সমস্যা নেই। আপনি শুধু বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে গিয়ে 'ভালো কাজ করুন, নতুন কাজ করুন' সৃষ্টিশীলতার বয়ান দেবেন কিন্তু নিজে করবেন না। নিজে ঠিকই পাঁচ টাকা দিয়ে বাংলা সিনেমা কিনে টিভিতে চালিয়ে ৫০ টাকা ব্যবসা করে টিভি এবং সিনেমা দুই ইন্ডাস্ট্রির ক্ষতি করবেন। কই, আপনারা তো বেগম রোকেয়ার 'সুলতানা' ড্রিম'কে টিভি নাটক করতে বিনিয়োগ করলেন না।

গল্প তো আমাদের, গল্পের পটেনশিয়াল ভিউয়ারও তো আমাদের নারী দর্শক পরিবার। উলটো আমদানি করলেন 'সুলতান সোলেমান' কই, আমাদের ক্র্যাক প্লাটুনের নায়কদের নিয়ে তো নাটক তৈরি করলেন না। এখন স্টার জলসার 'নেতাজী' সিরিয়াল নিয়ে বাহবা বলছেন। কিংবা যদি বলি এসময়ের ঘটনা, যেখানে মানুষের গল্প রয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনা বা এফআর টাওয়ারে আগুন, এসবও তো কোনোদিন আপনার নাটকের বিষয় হলো না। এই যে এফ আর টাওয়ারের আগুনে পুড়ে যাওয়া এক দম্পতি, মাত্র এক মাস আগে যাদের বিয়ে হয়েছিল পরিবার সমাজের বিরুদ্ধে, দুই অফিসে কাজ করতেন। কখনো মেয়েটি ছেলেটির অফিসে আসেনি, যেদিন প্রথম এলো বিয়ের পর, সেদিনই লাগলো আগুন। কই সম্পর্কের এমন এক মানবিক গল্প নিয়ে তো আপনাদের টিভিগুলো কাজ করে না। ভালো কাজ যে হয়নি, হচ্ছে না, তা বলছি না। কিন্তু প্রতিদিন আপনার টিভি দর্শক দেখার জন্য যে গল্প চাই, সে গল্প নির্মাণে তো আপনি বিনিয়োগ করেননি, করছেন না। আপনারা বরং আকাশ খুলে দিয়েছেন। হুড়মুড় করে বিদেশি চ্যানেল ঢুকে পড়ছে আমাদের ড্রয়িং রুমে। সন্ধ্যা ৭টা থেকেই চোখ ঢেকে যায় ভারতীয় চ্যানেলে, মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি এলে আমাদের টিভি কিংবা বিলবোর্ড দেখে চোখ কচলাবেন, ভাববেন, বাংলাদেশ ভেবে ভুল করে নিজের কোনো রাজ্যে চলে আসেননি তো! কারণ চারদিকে সব ভারতীয় স্টার। আমরা গল্পে যেমন বিনিয়োগ করি না, তেমনি স্টার তৈরিতেও বিনিয়োগ করি না।

জাতীয় স্বাধীনতা মানে স্বশাসিত আকাশ। অথচ আপনারা প্রায় বিনা পয়সায় খুলে দিয়েছেন বাংলাদেশের আকাশ। সেই আকাশে দখলদার এখন বিদেশি চ্যানেল। দখল করছে দেশের বাজার, দখল করছে মানুষের মগজ। 'একে আমার ভাঙ্গা নাও, তার উপরে তুফান বাও!' এবার আপনারা মালিক হিসেবে পড়লেন অসম প্রতিযোগিতায়। এখানে বলি, রবীন্দ্র রচনাবলীও তো এক বিশাল বাণিজ্যালয়। সেই পটভূমি নির্মাণেও ছিল বড় বিনিয়োগ। প্রিন্স দ্বারকানাথের বিনিয়োগ। তিনি ব্যবসায়ী ছিলেন। কিন্তু সংস্কৃতির পেছনে আজ  সেই বিনিয়োগ কই? সংস্কৃতির বাজার তৈরিতেও বিনিয়োগ লাগে। কি ধরনের কনটেন্ট সেই বিনিয়োগের টাকা তুলে আনবে, কিভাবে তুলে আনবে, সেই অংকও যেমন গত বিশ বছরে পেশাদারিত্বের সাথে করা হয়নি, তেমনি গড়ে তোলা হয়নি পেশাদারী ব্যবস্থাপনা বিপণন। টেলিভিশনগুলোকে নির্ভর করতে হয় শুধু বিজ্ঞাপনের ওপর, যে বাজার বড়জোর বারোশ' কোটি টাকার। এখন এই টাকারও একটা অংশ চলে যাচ্ছে ডিজিটাল মার্কেটে। ক্যাবল অপারেটরেরা যা দেখিয়ে ব্যবসা করছেন তা সম্প্রচারকর্মীদের রক্তঘামে তৈরি কনটেন্ট। এক হিসেবে দেখা যাচ্ছে, বাণিজ্য ছয় থেকে আট হাজার কোটি টাকার। কিন্তু টাকার কোনো অংশই টিভি স্টেশনগুলো অর্থাৎ কনটেন্ট উৎপাদক পায় না। বরং অনেক সময় তাদের জিম্মি করে উল্টো টাকা আদায় করা হয়। অথচ ক্যাবল অপারেটরেরা গ্রাহকদের কাছ থেকে যে টাকা নেয়, সেখান থেকে প্রতিটি চ্যানেল দশ টাকা করে পেলেও বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরতা কমে, কনটেন্টের মান বাড়ে, বাড়ে কর্মীদের বেতনভাতা, জীবনমান পেশাদারিত্ব। নিজেদের এমন একটি বাজার, যার পটেনশিয়াল রয়েছে অন্তত ৫০ হাজার কোটি টাকার 'সম্প্রচার অর্থনীতি' হওয়ার, তা আমরা ছেড়ে দিয়েছি বিদেশি চ্যানেলের হাতে।

অবস্থা এমন যে, আইন অমান্য করে বিজ্ঞাপনসহ এখানে বিদেশি চ্যানেল প্রচারিত হচ্ছে। কই, পাশের দেশ ভারত তার আকাশ তো খুলে দেয়নি। আপনি সেখানে বাংলাদেশি চ্যানেল দেখাতে হলে কোটি টাকা ল্যান্ডিং ফি দিতে হয়। আর ভারত আমাদের দেশে তার চ্যানেল দেখানোর জন্য ল্যান্ডিং ফি দেয় মাত্র লাখ টাকা। সেই চ্যানেলও আবার এখানে চলে বিজ্ঞাপনসহ। সরকার বাহাদুর, আপনি বিদেশি চ্যানেল বিজ্ঞাপনসহ প্রচার বন্ধের আইনানুগ উদ্যোগ নিলে এখানকার ডিস্ট্রিবিউটর ব্যবসায়ীরা ভারতীয় চ্যানেলের অন এয়ারই বন্ধ করে আপনাকে বেকায়দায় ফেলতে চাইল। প্রচার হলো যে সরকার বোধহয় বিদেশি চ্যানেল বন্ধ করে দিয়েছে। আপনি সেই বেকায়দায় পড়লেন এবং ভাবলেন যে এতদিন ধরে চ্যানেলগুলো চলছে, আইন অনুযায়ী এখনই ব্যবস্থা নিলে দর্শক ভুল বুঝবে, মানে আপনি এখানে ভোটার নিয়ে চিন্তিত হলেন এবং একের পর এক তারিখ দিয়ে আইনের লঙ্ঘন চলতে দিলেন। একদিকে এখনো যেখানে গণমাধ্যম শিল্প সুরক্ষা নীতিআইন নেই সেখানে যেটুকু আইন আছে তাও লঙ্ঘন করা যায়! কারণ ভয় করা হচ্ছে দর্শকের অভ্যাসকে। ভাবা হয়নি যে, এটা একটা তৈরি অভ্যাস যা বদলানো যায়। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে দেশের সমাজসংস্কৃতি বাজার স্বার্থ। এটা এজন্যই বললাম, আমাদের সামান্য টিভি দর্শকের চেয়েও বড় ভোক্তা অভ্যাস গড়ে উঠেছে ফেসবুক নিয়ে। পশ্চিমে তো বটেই, বিশ্বজোড়া অভ্যাস। সেই ফেসবুক আইন ভোক্তার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করেছে বলে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তাকে আইনের আওতায় আনা নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে জরিমানা করাসহ নতুনভাবে রেগুলেট করতে মার্কিন ফেডারেল ট্রেড কমিশনএফটিসি ফেসবুকে সরকারি কর্মকর্তা বসানোর কথা ভাবছে। কই, সেখানে তো মানুষের অভ্যাসকে ভয় করা হয়নি। বরং ভাবা হয়েছে ব্যক্তিমর্যাদা সমাজ সম্পর্কের গুরুত্ব।

আর আমাদের এখানে দেখুন, প্রথমে দৃষ্টিভঙ্গি আর নীতিতে ঝামেলা। বিনিয়োগের ক্ষেত্রটিকে শিল্প বিবেচনা না করা। কনটেন্টে বিনিয়োগ না করা। এই যখন নীতিনির্ধারকদের অবস্থা, তখন মালিকগণ আজকে না হয় সংবাদ বিভাগ বন্ধ করলেন খরচ কমানোর জন্য, কিন্তু বিদেশি চ্যানেলের সঙ্গে অসম লড়াইয়ের বিনোদন বাজারে আগামীকাল আপনাকে বিনোদন বিভাগও বন্ধ করতে হবে। তার মানে বন্ধ হবে আপনার প্রতিষ্ঠান। তাতে অবশ্য আপনার ক্ষতি নেই, কারণ এরই মধ্যে আপনি ২০ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করে ফেলেছেন। আপনি তো আর দেশপ্রেমিক উদ্যোক্তা নন, জাতীয় বাজারে আপনার বিশ্বাস নেই। ক্ষতিটা হলো দেশের, সমাজের মনের। ক্ষতিটা হলো অর্থনীতির, সংস্কৃতির, আর আমাদের মতো সাধারণ সম্প্রচার গণমাধ্যমকর্মীর।

এবার আসি দর্শক প্রশ্নে। যাদের রঞ্জনেভঞ্জনে এই সংবাদ কিংবা বিনোদন কারখানা। আপনি এবং উদ্যোক্তারা উভয়ই মনে করেন, তো মুক্ত বাজার। আমি স্বাধীন, আমি ভোক্তা। যা দেখতে চাই তাই দেখবো। কিন্তু আপনি জানেন না, আপনার দেখার চাহিদাটিও নির্মাণ করা হয়। আপনি হয়তো ভাবছেন স্টেডিয়ামটি গোল করে বানানো, চারদিকে দর্শক আরাম করে খেলা দেখবে বলে। ফুকো বলেন, আসলে এটি এভাবে বানানো আপনার আরামের জন্য নয়, নজরদারির সুবিধার জন্যে। ঠিক তেমনি আপনি স্টার জলসাস্টার প্লাস কিংবা যেকোনো বিদেশি চ্যানেল আরাম করে দেখছেন ড্রয়িং রুমে, ভাবছেন নিটোল বিনোদন। বিনোদন নয়, আসলে পণ্যের কারবার। আপনি যেমন স্টেডিয়ামে নজরদারি দেখতে পান না, তেমনি এখানে পণ্যের কারবারও বুঝতে চান না। পণ্যকারবার প্রথমে দখল করে আপনার দৈনন্দিন বাজার শ্যাম্পুসাবান, পেঁয়াজতেল। আলপিন থেকে অ্যারোপ্লেন। তারপর দখলে নেয় নাটকগান, শিল্পসংস্কৃতির ক্ষেত্র। এরপরে আপনার অগোচরে দখল করে আপনার চিন্তা। আপনি নিজেও টের পান না যে, কখন আপনি বাজারের মতো করে ভাবতে শুরু করেছেন। নিজে টের না পেলেও কথা বলুন আপনার সন্তানের সাথে, দেখবেন কী করে সে আপনার ঘরে থেকে হয়ে উঠছে অন্য ঘরের মানুষ, কী করে কোমলতা হারিয়ে এই বয়সেই হয়ে উঠছে অন্য বয়সের মানুষ। এই যে প্রথমে বাজার দখল, তারপরে চিন্তার দখল, এভাবে দখল করতে করতে দখলদারেরা একদিন বলবেন এদেশে আপনার অধিকার নেই। আপনি তখন নিজ দেশে পরবাসী। আপনার শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা আছে, আর কিছুই নেই। সংস্কৃতি নেই, শিল্প নেই, নিজেদের তৈরি পণ্য নেই, আপনি শুধুই দোকানদার আর ভোক্তা। আপনার দোকানে অন্যের পণ্য, আর আপনি নিজেই সেসব পণ্যের ভোক্তা। যদিও আপনার অবস্থা এখনই অনেকটা সেরকম, একে তাত্ত্বিকরা বলেন নয়া উপনিবেশ। এই উপনিবেশ আপনার মনে। এবার দর্শক, আপনি এই স্বাধীনতাবোধ নিয়ে ধুয়ে পানি খান।

অতঃপর… 

যে আপনাকে রিমোটের নামে স্বাধীনতার রঙ্গিন জানালায় দাঁড় করিয়েছে, সে কখন যে আপনারই দরজা দিয়ে ঢুকে আপনাকে করছে পরাধীন, সেটি ভাবা জরুরি। পরিস্থিতি এখন রাস্তায় নামার কিংবা রাস্তা মাপার। বাহাস আরও দীর্ঘ করা যায়, হওয়া যায় মালিককর্মীদর্শক একে অপরের পক্ষবিপক্ষ। তাই সিদ্ধান্ত আমাদের- আমরা কি সম্প্রচার শিল্পে 'নেই রাজ্য' চলতে দেবো, না এই শিল্প আর পেশাজীবীদের সুরক্ষায় নীতি ও পুঁজি বিনিয়োগ করবো? প্রণয়ন করবো গণতান্ত্রিক আইন। সিদ্ধান্ত নিতে হবে- আমরা সবাই কি রাস্তা মাপবো, না রাস্তা তৈরি করবো?

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক