কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে দায়িত্ব নেবে কে?
শুধু গ্রেপ্তারে কিশোরদের অপরাধে জড়ানোর পথ বন্ধ হয় না। প্রয়োজন নিরাপদে ফিরে আসার সুযোগ, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট দায়িত্ব এবং প্রতিরোধের ফলাফলের জবাবদিহি।
কিশোরদের দলবদ্ধ সহিংসতার কোনো ঘটনা সামনে এলেই অভিযান, গ্রেপ্তার ও কঠোর শাস্তির দাবি ওঠে। অপরাধের তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহি অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু গ্রেপ্তারের পরও যে সামাজিক পরিবেশে নতুন সদস্য তৈরি হয়, তা বদলানোর দায়িত্ব কার? বিদ্যালয় ছেড়ে দেওয়া কিশোরটিকে কে ফিরিয়ে আনবে? অপরাধী দল ছাড়তে চাওয়া একজন কোথায় গিয়ে নিরাপত্তা চাইবে? এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া কিশোর গ্যাং প্রতিরোধের আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
নৃবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সমস্যাটি বুঝতে কিশোরদের দৈনন্দিন জীবন, সম্পর্ক এবং মর্যাদা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার দিকে তাকাতে হয়। একটি দল কোনো কিশোরের কাছে বন্ধুত্ব, পরিচয়, নিরাপত্তা কিংবা অন্যের কাছে গুরুত্ব পাওয়ার জায়গা হয়ে উঠতে পারে। আমরা যাকে ‘খারাপ সঙ্গ’ বলি, সেখানে সে হয়তো এমন স্বীকৃতি খুঁজে পায়, যা পরিবার, বিদ্যালয় বা পাড়ায় পাচ্ছে না। সহিংসতায় জড়ানোর ব্যাখ্যা খোঁজা অপরাধকে সমর্থন করা নয়; প্রতিরোধের পথ বুঝতে এটি প্রয়োজন।
‘বড় ভাই’ সম্বোধনটিও তাই গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। এর সঙ্গে স্নেহ, আশ্রয় ও আনুগত্যের অর্থ জড়িয়ে থাকে। এই সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি কিশোরকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসারী, মোটরসাইকেলে দলবদ্ধ চলাফেরা কিংবা এলাকায় ভয় দেখানোর ক্ষমতাও মর্যাদার চিহ্ন হয়ে উঠতে পারে। বিকল্প কর্মসূচিতে শুধু সময় কাটানোর আয়োজন থাকলে চলবে না; সেখানে কিশোরের সম্মান, অংশগ্রহণ ও নিজের সামর্থ্য দেখানোর সুযোগ থাকতে হবে।
তবে সব কিশোরের অভিজ্ঞতা এক নয়। দারিদ্র্য, নির্দিষ্ট পোশাক, চুলের ধরন কিংবা কয়েকজনের একসঙ্গে আড্ডা দেওয়া অপরাধের প্রমাণ হতে পারে না। নির্বিচারে ‘গ্যাং সদস্য’ হিসেবে চিহ্নিত করলে নিরপরাধ কিশোরের শিক্ষাজীবন ও সামাজিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। প্রতিরোধের ভিত্তি হওয়া উচিত নির্দিষ্ট সহিংস আচরণ, বিশ্বাসযোগ্য তথ্য এবং ব্যক্তির সহায়তার প্রয়োজন।
বিদেশের অভিজ্ঞতা থেকে পদ্ধতি শেখা যায়। বোস্টনের ‘অপারেশন সিজফায়ার’-এ সহিংসতায় জড়িত নির্দিষ্ট দল এবং কিশোরদের কাছে অবৈধ অস্ত্র সরবরাহকারীদের ওপর ব্যবস্থা কেন্দ্রীভূত করা হয়েছিল। বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হলো, এমন সুনির্দিষ্ট উদ্যোগের সঙ্গে শিক্ষা, সামাজিক সেবা ও নিরাপদে ফিরে আসার সহায়তা কীভাবে যুক্ত হবে। বিদেশি কর্মসূচির নাম গ্রহণ করলেই স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ও সক্ষমতার ঘাটতি মিটবে না।
প্রথমে কয়েকটি সহিংসতাপ্রবণ এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে স্থানীয় প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। নতুন কমিটি ঘোষণার আগে বিদ্যমান প্রশাসন ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ নির্দিষ্ট করা প্রয়োজন। উপজেলা পর্যায়ে নির্বাহী কর্মকর্তাকে এবং নগরে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের একজন নির্ধারিত কর্মকর্তাকে সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব বিবেচনা করা যায়। সমাজসেবা বিভাগের একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ব্যক্তিভিত্তিক সহায়তা সমন্বয় করবেন। পুলিশ দেখবে অপরাধ ও নিরাপত্তা; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেখবে শিক্ষায় থাকা ও ফিরে আসা; স্বাস্থ্যসেবা এবং স্থানীয় সংগঠন প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেবে। এই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় জনবলও বরাদ্দ করতে হবে।
সমন্বয়ের অর্থ শুধু মাসিক সভা নয়। বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতি বা সহিংসতার ঝুঁকির তথ্য পেলে কে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন, কোথায় সহায়তার জন্য পাঠাবেন এবং পরে খোঁজ নেবেন, এসব লিখিত থাকতে হবে। প্রত্যেক সহায়তাপ্রার্থী কিশোরের জন্য একজন নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী থাকা দরকার। অন্যথায় সবাই দায়িত্বশীল বলে ঘোষিত হবে, অথচ কোনো একটি শিশুর পাশে কাউকে পাওয়া যাবে না।
বাজেট ছাড়া এই ব্যবস্থা কাগজেই আটকে থাকবে। পরীক্ষামূলক এলাকার জন্য অনুমোদিত বাজেটে কাউন্সেলিং, বিদ্যালয়ে ফেরার খরচ, যাতায়াত, বয়সোপযোগী প্রশিক্ষণ এবং জরুরি সুরক্ষার পৃথক বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন। কোন প্রতিষ্ঠান কত অর্থ পেল ও কী কাজে ব্যয় করল, তার সংক্ষিপ্ত হিসাব প্রকাশ করতে হবে। কিশোরের ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রেখেই ব্যয় ও সেবার জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব।
গ্যাং ছাড়তে চাওয়া কিশোরের জন্য নিরাপদ প্রবেশপথ সবচেয়ে জরুরি। সমাজসেবা কার্যালয় বা বিশ্বস্ত স্থানীয় সংস্থায় এমন যোগাযোগব্যবস্থা থাকতে পারে, যেখানে সে নিজে, শিক্ষক কিংবা অভিভাবক সহায়তা চাইতে পারবেন। প্রথমে দেখতে হবে প্রতিশোধ, হুমকি বা পারিবারিক অনিরাপত্তার ঝুঁকি আছে কি না। প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপদ আশ্রয়, মানসিক সহায়তা, আইনি সহায়তা এবং শিক্ষায় ফেরার পরিকল্পনা করতে হবে। শুধু অঙ্গীকারনামা নিয়ে বাড়ি পাঠানোকে পুনর্বাসন বলা যাবে না।
এই সহায়তা অপরাধের দায় থেকে অব্যাহতির প্রতিশ্রুতি নয়। অভিযোগের তদন্ত ও বিচার প্রযোজ্য আইনি সুরক্ষা মেনেই চলবে। পাশাপাশি কিশোরকে অপরাধী নেটওয়ার্ক থেকে বের হওয়ার বাস্তব সুযোগ দিতে হবে। পরিবারের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন, তবে পরিবারই অনিরাপদ হলে বিকল্প সুরক্ষাও রাখতে হবে। নিয়মিত খোঁজ নেওয়া ছাড়া একবারের কাউন্সেলিং বা প্রশিক্ষণ যথেষ্ট ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
কর্মসূচি তৈরির আগে কিশোরদের কথা শোনা দরকার। মেয়েরা কোথায় অনিরাপদ বোধ করে, ছেলেদের ওপর শক্তি প্রদর্শনের কী চাপ থাকে, কোন মাঠে কার প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং স্থানীয় নেতৃত্বের ওপর কার আস্থা আছে, সাক্ষাৎকার, দলীয় আলোচনা ও পর্যবেক্ষণে এসব বোঝা সম্ভব। এখানেই নৃবৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান কাজে আসতে পারে। যাদের জন্য উদ্যোগ, তাদের অভিজ্ঞতা বাদ দিয়ে সমাধান নির্ধারণ করলে প্রয়োজনের সঙ্গে সেবার মিল নাও থাকতে পারে।
সাফল্যের হিসাবও বদলাতে হবে। কতজন গ্রেপ্তার হলো, তার পাশাপাশি দেখতে হবে সহিংসতায় আহত হওয়ার ঘটনা কমল কি না, সহায়তা পাওয়া কিশোর আবার সহিংসতায় জড়াল কি না, শিক্ষায় ফিরে টিকে থাকল কি না এবং পরিবার ও এলাকার মানুষ নিরাপদ বোধ করছেন কি না। শুরুতে পরিস্থিতির তথ্য নিয়ে ছয় মাস ও এক বছর পর পরিবর্তন পর্যালোচনা করা যেতে পারে। অভিযোগ কমে গেলেই সাফল্য দাবি করা যাবে না; মানুষ অভিযোগ করতে ভয় পাচ্ছে কি না, সেটিও বুঝতে হবে।
একই সঙ্গে অস্ত্রদাতা, মাদক ব্যবসায়ী ও প্রাপ্তবয়স্ক পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক তদন্ত প্রয়োজন। তাদের প্রভাব অক্ষুণ্ন রেখে কিশোরদের সংশোধনের দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে প্রতিরোধ দুর্বলই থাকবে। আমাদের প্রয়োজন এমন ব্যবস্থা, যেখানে সহিংসতার দায় নির্ধারিত হবে, বিপদে থাকা কিশোর সহায়তা পাবে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানকে ফলাফলের হিসাব দিতে হবে। ওই হিসাব চাওয়ার মধ্য দিয়েই সমন্বিত প্রতিরোধ বাস্তব কাজ হয়ে উঠতে পারে।
মো. মামুন-অর-রশিদ: উন্নয়ন ও শাসনব্যবস্থা বিষয়ক গবেষক। ই-মেইল: mrashid.uk2025@gmail.com
