Published : 30 Aug 2026, 05:46 AM
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি মিত্রতা বলে কিছু নেই—কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সাম্প্রতিক চিত্র সে কথাই বলে। উত্তর আমেরিকার দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র, যাদের সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিদিন শতকোটি ডলারের পণ্য চলাচল করে, তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্কই আজ এই প্রশ্নকে সামনে এনেছে।
কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বাস্তবতা হলো তীব্র অসামঞ্জস্যপূর্ণ বাণিজ্য-নির্ভরতা। এই অসম নির্ভরতাই ওয়াশিংটনকে শুল্ক-অস্ত্র ব্যবহারের কাঠামোগত সুযোগ দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি এই ক্ষমতার হিসাবের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি—যুক্তরাষ্ট্র জানে, দীর্ঘমেয়াদি শুল্ক-লড়াইয়ে কানাডার টিকে থাকার ক্ষমতা সীমিত। তবে এই নির্ভরতা সম্পূর্ণ একতরফা নয়। কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের ৩২টি অঙ্গরাজ্যের শীর্ষ রপ্তানি বাজার; সুতরাং এই আন্তঃনির্ভরতা পারস্পরিক, যদিও তা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
২১ অগাস্ট যখন ওয়াশিংটন-অটোয়া আলোচনা ভেঙে পড়ে, তখন তা নিছক বাণিজ্যিক ব্যর্থতা ছিল না; তা ছিল ভবিষ্যৎ অনাস্থার পথরেখাও। গত দেড় সপ্তাহে কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের যে বাঁকবদল ঘটেছে, তা তারই ধারাবাহিকতা। ২২ অগাস্ট মধ্যরাত থেকে কার্যকর হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ শতাংশ শুল্ক এবং তার জবাবে কানাডার ঘোষিত ‘ডলার-ফর-ডলার’ পাল্টা শুল্ক একটি বড় প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে—অসম শক্তির দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কে নির্ভরতা কি বাধ্যবাধকতায় রূপ নেয়, নাকি নির্ভরতার ভেতরেও একটি রাষ্ট্র তার সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার ধরে রাখতে পারে? আগ্রহের বিষয় হলো, ওয়াশিংটনের চাপের কৌশল যতটা কানাডাকে নমনীয় করার কথা ছিল, বাস্তবে ততটা হয়নি; বরং তা কানাডার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্য এবং অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণের গতিকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে—শক্তির অসমতাকে পুঁজি করে দুর্বল পক্ষের কাছ থেকে অধিক ছাড় আদায়ের চেষ্টা। হান্স মর্গেন্থাউয়ের ভাষায়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অর্থনৈতিক হাতিয়ারও ক্ষমতার হাতিয়ার, আর যুক্তরাষ্ট্র তার বাজারের আকারকে ঠিক সেভাবেই ব্যবহার করতে চেয়েছে। কিন্তু কেনেথ ওয়াল্টজের কাঠামোগত বাস্তববাদের দৃষ্টিতে দেখলে বিষয়টি আরেকটু জটিল। রাষ্ট্রগুলো কেবল শক্তির সমীকরণেই আচরণ নির্ধারণ করে না, তারা টিকে থাকার এবং নিজস্ব স্বকীয়তা রক্ষার তাগিদ থেকেও চালিত হয়। কানাডার ক্ষেত্রে এই তাগিদ স্পষ্ট—অটো শিল্প, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ কিংবা ভবিষ্যতের বাণিজ্যনীতির ওপর ওয়াশিংটনের একতরফা সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া মানে কেবল অর্থনৈতিক ছাড় নয়, দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা খর্ব করা।
আলোচনার টেবিলে কোনো নেতা যা মেনে নেন, তা তার নিজ দেশের রাজনীতিতে গ্রহণযোগ্য না হলে সেই চুক্তি টেকে না। মার্ক কার্নি যখন ওয়াশিংটনের শেষ মুহূর্তের শর্তাবলি প্রত্যাখ্যান করলেন, তখন তিনি কেবল একজন আন্তর্জাতিক দরকষাকষিকারী হিসেবে নয়, বরং ১০টি প্রদেশ ও ৩টি অঞ্চলের প্রিমিয়ারদের সমর্থন নিয়ে একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জোটের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন। দুগ্ধ শিল্পের সাপ্লাই-ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা, ফরাসি ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার প্রশ্ন এবং প্রাদেশিক পর্যায়ে মার্কিন মদ্যপণ্যে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা—এই তিনটি বিষয়ে কানাডা কোনো ছাড় দিতে রাজি হয়নি, যদিও অন্য ক্ষেত্রে ছাড়ের প্রস্তাব ছিল। কানাডার এই সীমাবদ্ধতার বড় কারণ ছিল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা। মন্ত্রিসভার বৈঠক এবং তার পরপরই কনজারভেটিভ ও এনডিপি নেতাদের সমর্থন প্রমাণ করে, এই প্রত্যাখ্যান কার্নির একক সিদ্ধান্ত ছিল না; ছিল রাজনৈতিক ঐকমত্যের ফল।
কানাডার একাধিক প্রিমিয়ার, বিশেষত ওয়াব কিনিউ ও ডেভিড ইবি, প্রকাশ্যেই ট্রাম্পকে বিশ্বাসের অযোগ্য বলে আখ্যা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির নিজের মন্তব্যেও এই সংকট স্পষ্ট—তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাক্ষর যেন পেন্সিলে লেখা, যেকোনো সময় মুছে ফেলা যায়। এই মন্তব্যগুলো নিছক আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়; এগুলো একটি কৌশলগত বার্তাও যে, ভবিষ্যতে যেকোনো চুক্তিতে কানাডা নিশ্চয়তার প্রশ্নে বাড়তি সতর্ক থাকবে। কারণ পূর্বের অভিজ্ঞতা বলছে—চুক্তি হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেসব শর্ত বদলে যেতে পারে। ট্রাম্পের একাধিকবার লেক অন্টারিওর নাম বদলে ‘লেক আমেরিকা’ করার কথা বলাও এই অনাস্থাকে আরও গভীর করেছে—এটি নিছক কূটনৈতিক উসকানি নয়, সরাসরি কানাডার সার্বভৌমত্ব ও সংস্কৃতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা। এই প্রেক্ষাপটেই কার্নি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপ, এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলে বাণিজ্য সম্প্রসারণের কথা বলেছেন—যা কেবল অর্থনৈতিক কৌশল নয়, একক শক্তির ওপর নির্ভরতার বিপদ কমানোরও প্রয়াস। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতি একটি সমস্যা তৈরি করে—স্বল্পমেয়াদি চাপ প্রয়োগে সফল হলেও, দীর্ঘমেয়াদে অংশীদার হিসেবে নির্ভরযোগ্যতার অভাব ভবিষ্যতের প্রতিটি আলোচনাকেই কঠিন করে তুলবে।
তবে এই দ্বন্দ্বের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক যুক্তরাষ্ট্রের নিজের ভেতরেই। ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কানাডাকে নিয়ে ফের কড়া মন্তব্য করেছেন, দেশটি অঙ্গরাজ্য না হয়েও অঙ্গরাজ্যের সুবিধা নিতে চায় বলে অভিযোগ তুলেছেন এবং কৃষকদের ওপর কানাডার দীর্ঘদিনের শুল্কনীতির সমালোচনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার দাবি করেছেন, কানাডা একটি সুবিধাজনক প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে একটি সুযোগ হাতছাড়া করেছে। কিন্তু একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান, মেইন, ভার্জিনিয়া ও ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর-সেনেটররা দলমত-নির্বিশেষে ট্রাম্পের শুল্কের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। মার্কিন ব্যবসায়ী মহল ও ওয়াল স্ট্রিটেও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে বাড়তি খরচ ও সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায়।
রাজনৈতিক শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক দরকষাকষির সক্ষমতা নির্ধারণ করে। কানাডার ফেডারেল-প্রাদেশিক কাঠামো ঢিলেঢালা ও বিভাজিত বলে আলোচনা আছে, কিন্তু সংকটের মুহূর্তে সেই একই কাঠামো সংঘবদ্ধ কানাডায় রূপ নিয়েছে। জ্বালানি, খনিজ ও সরকারি ক্রয়নীতির ওপর প্রাদেশিক সরকারের অংশীদারত্ব থাকায় প্রিমিয়াররা কেবল প্রতীকী সমর্থক নয়, তারা এই নীতি কার্যকরের নিয়ন্ত্রকও। অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ডের বিদ্যুৎ ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব তারই প্রতিফলন।
তবে কানাডার প্রতিরোধ যতটা নীতিগত দৃঢ়তার প্রকাশ, ততটাই তার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও বিদ্যমান। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর কানাডার নির্ভরতা এখনো বিশাল। রপ্তানি বহুমুখীকরণের যত উদ্যোগই নেওয়া হোক, তা স্বল্পমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের বিকল্প হয়ে উঠতে পারবে না। কিটিম্যাটের এলএনজি রপ্তানি কিংবা এশিয়া-ইউরোপের সঙ্গে নতুন অংশীদারত্ব দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পদক্ষেপ হলেও, তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রশমনে তার সীমিত সক্ষমতা রয়েছে। ব্যাংক অব কানাডার হিসাব অনুযায়ী, মার্কিন শুল্কের কারণে ২০২৬ সালের শেষে কানাডার প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য হারে কমতে পারে; কারণ কানাডার অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর যতটা নির্ভরশীল, আমেরিকা ততটা নয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র নিরাপদ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ বাড়লেও, ট্রাম্প প্রশাসনের এযাবৎকালের প্রবণতা বলছে সমালোচনার মুখে নীতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। ফলে স্বল্পমেয়াদে উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আর সেই ক্ষতির বোঝা শেষ পর্যন্ত দুই দেশের জনগণকেই বহন করতে হবে।
হেনরি কিসিঞ্জারের অর্থনৈতিক কূটনীতির ধারণায়, বাণিজ্যযুদ্ধে প্রকৃত বিজয় নির্ধারিত হয় না কে বেশি শুল্ক বসাল তা দিয়ে, কে দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহনশীলতা বজায় রাখতে পারল তা দিয়ে। এই বিচারে কানাডার দুর্বলতা স্পষ্ট, তবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটও কম নয়। তবু এই সংকট থেকে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ছোট বা মাঝারি রাষ্ট্রের জন্য একক বৃহৎ বাজারের ওপর অতিনির্ভরতা কৌশলগত দুর্বলতা, কিন্তু বর্তমান সংকট নীতিনির্ধারণে নতুন অগ্রাধিকার দিয়েছে। অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য বাধা অপসারণ, রপ্তানি বাজার বহুমুখীকরণ এবং জ্বালানি অবকাঠামোতে বিনিয়োগ—এই তিন ক্ষেত্রে কানাডার অগ্রগতি ভবিষ্যতে তার আলোচনার অবস্থানকে শক্তিশালী করবে।
৮ সেপ্টেম্বর থেকে কানাডার পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগে এখনো কিছু সময় রয়েছে, যা নতুন আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে। আলোচনা পুনরায় শুরু হলেও তা নিশ্চয়ই আগের শর্তে হবে না। কার্নি ইতিমধ্যে কানাডার যে রাজনৈতিক সমর্থন অর্জন করেছেন—অভ্যন্তরীণ ঐক্য, আন্তর্জাতিক সহানুভূতি ও যুক্তরাষ্ট্রের নিজ রাজ্যগুলোর ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ—তা সহজে ছাড় দেওয়ার মতো নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই এখন প্রশ্ন উঠছে—স্বল্পমেয়াদি শুল্ক-বিজয়ের বিনিময়ে দীর্ঘমেয়াদি একটি নির্ভরযোগ্য মিত্র ও জ্বালানি-অংশীদার হারানোর ঝুঁকি নেওয়া যৌক্তিক কি না। এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে আগামী দিনের কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সমীকরণ।
সামনের দিনগুলোতে এই সংঘাতের গতিপথ নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর: ১. যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যয় কতটা সহনীয় থাকে, ২. কানাডার বাণিজ্য-বৈচিত্র্যকরণ কৌশল কতটা দ্রুত ফলপ্রসূ হয়, এবং ৩. উভয় পক্ষের নেতৃত্ব নতুন করে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিশ্রুতির ভিত্তি তৈরি করতে পারে কি না।
যতক্ষণ না এই তিনটি প্রশ্নের সদুত্তর মেলে, ততক্ষণ উত্তর আমেরিকার এই দীর্ঘতম অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব অনিশ্চিত রূপান্তরের মধ্য দিয়েই এগিয়ে যাবে।
ড. মঞ্জুরে খোদা লেখক-গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ই-মেইল: torikbd@gmail.com