২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

গুমের কালো অধ্যায় ও অন্তর্বর্তী সরকারের পরীক্ষা

গুম কেবল আইন লঙ্ঘন নয়, এটি শত শত পরিবারের জীবনে অশেষ যন্ত্রণা ও অনিশ্চয়তার ছায়া ফেলেছে।

গুমের কালো অধ্যায় ও অন্তর্বর্তী সরকারের পরীক্ষা
অদৃশ্য হয়ে যাওয়া মানুষদের নীরব চিহ্ন—মর্মন্তুদ যন্ত্রণা নিয়ে প্রতীক্ষা করে আছে তাদের পরিবার-পরিজন। ছবি: এআই

পারভেজ আলম পারভেজ আলম

Published : 29 Aug 2025, 03:45 PM

Updated : 24 Sep 2026, 01:29 AM

দীর্ঘ ১৫টি বছর ধরে গুম বা জোরপূর্বক অন্তর্ধান বাংলাদেশের ওপর এক শীতল ছায়া ফেলে রেখেছে। আইনের শাসনকে পদ্ধতিগতভাবে ভেঙে দিয়ে, শত শত পরিবারকে অকল্পনীয় যন্ত্রণা ও অনিশ্চয়তার গভীরে ঠেলে দিয়েছে এই ভয়ঙ্কর প্রথা। বিচারবহির্ভূত হত্যার পাশাপাশি গুম দীর্ঘদিন ধরেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের সবচেয়ে জঘন্য রূপ হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই অমানবিক প্রবণতা বিগত সরকারের শাসনামলে তাদের এক ধরনের পরিচয়চিহ্নে পরিণত হয়েছিল।

এখন, যখন এক ঐতিহাসিক গণআন্দোলন পুরনো সরকারকে সরিয়ে দিয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এটি কেবল একটি সুযোগ নয়; বরং একটি দায়িত্ব—অতীতের ঘৃণ্য প্রথাগুলো মোকাবিলা করা, দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। অস্বীকার ও দায় এড়ানোর সময় শেষ হয়েছে; এখনই সময় রাষ্ট্রকে তার মানবিক মর্যাদা ও সংবিধানিক ভিত্তির ওপর পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার।

আশার কথা হচ্ছে, বাংলাদেশ গত বছরের ২৯ অগাস্ট জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রোটেকশন অব অল পার্সনস ফ্রম এনফোর্সড ডিজএপিয়ারেন্স’-এ যুক্ত হয়। এই বছর এর একদিন আগে ২৮ অগাস্ট গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসাবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন করার প্রস্তাবে সায় দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে ‘গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

গুমের মতো অমানবিক কাণ্ডের ব্যাপ্তি ও গভীরতা একইসঙ্গে ভয়াবহ ও বেদনাদায়ক। ২০০৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত অন্তত ৬২৯ জন মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন বলে নথিভুক্ত আছে। এদের কেউ কেউ পরে মৃত অবস্থায় উদ্ধার হয়েছেন, কেউ কেউ মুক্তি পেয়েছেন, আবার অনেককে পরে ‘গ্রেপ্তার দেখানো’ হয়েছে—কিন্তু এখনো একটি বড় অংশ নিখোঁজই রয়ে গেছে। তাদের পরিবারগুলো বছরের পর বছর এক অসহনীয় অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে—তারা জানেন না তাদের প্রিয়জন বেঁচে আছেন না মারা গেছেন।

এসবের কোনোটি বিচ্ছিন্ন ও আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং ধারাবাহিক একটি প্যাটার্নের অংশ, যা প্রায়শই সরকারি নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতায় ঘটেছে, বিশেষত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে। গুমের ধরন প্রায় একই রকম: অধিকাংশ ভুক্তভোগী ছিলেন তরুণ, রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়—বিরোধী দলের সদস্য, ছাত্রনেতা, শ্রমিক ইউনিয়নের কর্মী, সাংবাদিক বা সামাজিক আন্দোলনকারী।

তাদেরকে সাধারণত রাত-বিরেতে বাসা থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে। প্রকাশ্য স্থান থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও নেহায়েত কম নয়। অপহরণকারীরা অনেক সময়ই সাদা রঙের কাচ-ঢাকা মাইক্রোবাসে আসত, সাধারণত সাদা পোশাকে আসত। ইউনিফর্ম পরিহিত থাকারও কিছু ঘটনা রয়েছে। খুব কম ক্ষেত্রেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখানো হয়েছে। যারা তুলে নিয়ে গিয়েছে তারা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করত না।

উদাহরণস্বরূপ, ২০১৩ সালে ছাত্রদল নেতা মাহফুজুর রহমানের কথা বলা যায়। মাহফুজ তার ছেলের জন্মদিন উপলক্ষে ফুল কিনতে শাহবাগে গিয়ে নিখোঁজ হন। পরে জানা যায়, তাকে সাধারণ পোশাকধারী কিছু ব্যক্তি ধরে নিয়ে গেছে—আজও তার কোনো খোঁজ মেলেনি। প্রতিবছর আন্তর্জাতিক গুম দিবসে তার সন্তানরা তাদের মায়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে বাবার স্মরণে দিনটি পালন করে—একটি পরিবারের ওপর রাষ্ট্রের অদৃশ্য হাতের নির্মম প্রভাবের মর্মান্তিক প্রতিচ্ছবি এটি। আবার ২০২২ সালে ঢাকার বাসা থেকে সাদা পোশাকে থাকা কতিপয় লোক মোহসিন গাজীকে তুলে নিয়ে যায়। পরিবারের সদস্যদের স্পষ্টভাবে বলা হয় যেন তারা কোনো অভিযোগ না করে। দিন দশেক পর তাকে বরিশালে র‌্যাব কর্তৃক ‘গ্রেপ্তার দেখানো’ হয়, এবং একটি সরকারি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয় যে তাকে একটি মহগনি বাগানে ‘ডাকাত সঙ্গীদের’ সঙ্গে ধরা হয়েছে—যা অধিকাংশ পর্যবেক্ষকের কাছে অবিশ্বাস্য ও হাস্যকর মনে হয়েছিল। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, কীভাবে গুমের পর রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টায় সত্যকে আড়াল করা হয়েছে এবং কীভাবে পরিবারের সদস্যদের বছরের পর বছর অপমান ও কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। এখনও পুরোনো কষ্ট বইয়ে চলেছে পরিবারগুলোর, যে কষ্ট লাঘবের দায় অন্তর্বর্তী সরকারের।

গুম বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের এক চরম উদাহরণ। সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ স্পষ্টভাবে প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা ও আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারকে নিশ্চিত করে। ৩১ অনুচ্ছেদ বলছে, “প্রত্যেক ব্যক্তি জীবনের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির ক্ষতি হইতে আইনানুগ আশ্রয় পাওয়ার অধিকারী। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলার পরিপন্থী বা সংবিধান-বিরোধী কোনো কাজ ব্যতীত অন্য কোনো কারণে কাউকে এ অধিকার হইতে বঞ্চিত করা যাইবে না।” ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী “কোনো ব্যক্তিকে আইন ব্যতীত জীবন বা ব্যক্তিস্বাধীনতা হইতে বঞ্চিত করা যাইবে না।” ৩৩ অনুচ্ছেদে বলা আছে, গ্রেপ্তার হলে ব্যক্তিকে কারণ জানাতে হবে, আইনজীবীর সাহায্য নিতে দিতে হবে এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে।

গুমের ঘটনায় এসব সাংবিধানিক নিশ্চয়তা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। আন্তর্জাতিকভাবে জীবনধারণের অধিকারকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়—যা সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ (UDHR) এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তি (ICCPR)-এও অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশ দুই দশকেরও বেশি আগে জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কনভেনশন (CAT) অনুমোদন করেছিল। তবুও গুমের ঘটনায় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন প্রায়শই যুক্ত থাকে, যা ভুক্তভোগীদের জীবনে স্থায়ী ক্ষত তৈরি করে।

বিগত সরকারের গুম অস্বীকার করার প্রবণতা শুধু ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর প্রতি অবমাননা ছিল না; বরং এটি ছিল আইনের শাসনের প্রতি এক প্রকার চূড়ান্ত অবজ্ঞা। গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছিলেন, “একটিও গুম হয়নি”। ওই সরকারের বক্তব্য ছিল এমনই বালখিল্য, যে তারা ভুক্তভোগীরা “নিজেদের ইচ্ছায় লুকিয়ে থাকে” বলে হাস্যকর বলে সরকারি ভাষ্যও দিয়েছে। এসব বক্তব্য ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং শত শত পরিবারের যন্ত্রণাকে উপহাস করার সামিল। অনেক সময় সরকার যুক্তি দিত যে যেহেতু পরবর্তীতে ভুক্তভোগীরা ‘মুক্তি পেয়েছে’ বা ‘তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে’, তাই এগুলো গুম নয়—কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী, রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রীয় সংস্থার দ্বারা কোনো ব্যক্তিকে গোপনে আটক রাখা এবং তা স্বীকার না করা বা তথ্য না দেওয়াকেই গুম হিসেবে গণ্য হয়। এভাবে স্বৈরাচারী সরকার ‘বাস্তব অভিজ্ঞতা’কে অস্বীকার করত।

এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে। জাতিসংঘের গুম সংক্রান্ত কর্মীদল (UNWGEID) যথার্থই বলেছে: “যতক্ষণ অপরাধীরা ক্ষমতায় থাকে, ততক্ষণ ভুক্তভোগীর বিচারের দাবি উপেক্ষিত হয়।”

এটি দেখায় যে সমস্যা কেবল কিছু ব্যক্তির নয়; বরং একটি বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা ও যোগসাজশের ফল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এখন দায়িত্ব—এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার মূল কারণগুলো চিহ্নিত করা ও তা দূর করা। যদিও সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এক সময় বলা হয়েছিল যে গুমে জড়িত তাদের সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, পরে আবার বলা হয় যে কেবল ‘অল্প কিছু ব্যক্তি’ ডিজিএফআই ও র‌্যাবের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় গুমের জন্য দায়ী।

কে কতটা দায়ী এই জাতীয় তর্কযুদ্ধে না গিয়ে যার দায় রয়েছে তাদের প্রত্যেককে বিচারের আওতায় আনতে হবে। প্রশ্ন তুলতে হবে ‘আয়নাঘর’ নামের গোপন আটককেন্দ্রের পরিচালনায় কারা? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের র‌্যাক ও তার কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির পরপরই গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সংখ্যা কমে যাওয়া, কিন্তু পরে আবার বেড়ে যাওয়া—এটি প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক চাপ কার্যকর হতে পারে। অথচ বিগত সরকার নিজেদের প্রকৃত সংস্কার করার বদলে ভিন দেশের সহায়তা চেয়েছিল মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জন্য—যা তাদের ভুল অগ্রাধিকারকে স্পষ্ট করে।

আইনি ও রাজনৈতিক বিষয়গুলো ছাড়াও, গুম মানুষের জীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য হারিয়ে গেলে পরিবারগুলো চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যায়। সন্তানের পড়াশোনা ব্যাহত হয়, তরুণ স্ত্রীরা জীবনযুদ্ধে একা হয়ে যায়। নিখোঁজ ব্যক্তিদের কোনো সরকারি নথি না থাকায় পরিবারগুলো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, সম্পত্তি বা সরকারি সুবিধা কিছুই পায় না। এর ফলে তাদের দারিদ্র্য আরও গভীর হয়। সবচেয়ে ভয়াবহ হলো মানসিক কষ্ট।

“তারা আমার মাথার ওপরের ছাদটা কেড়ে নিয়েছে,” গুম হয়ে যাওয়া এক ব্যক্তির স্ত্রী এভাবেই তার যন্ত্রণা ব্যক্ত করেছেন। মায়েরা অন্তত ছেলের কবর দেখতে চান, শিশুরা বারবার জিজ্ঞাসা করে—“বাবা কেন আর স্কুলে নিয়ে যায় না” বা “ঈদের পোশাক বেছে দেয় না।” এই অনিশ্চয়তা—মৃত না জীবিত—ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য একধরনের চিরস্থায়ী নির্যাতন।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এখন স্পষ্ট দায়িত্ব—প্রত্যেকটি গুমের ঘটনার পূর্ণ জবাবদিহি নিশ্চিত করা। কেবল কয়েকজনকে দায়ী করে দায়সারা ব্যবস্থা নেওয়া চলবে না। প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ, স্বাধীন তদন্ত হতে হবে; দায়িত্বে থাকা প্রত্যেক কর্মকর্তা—যত উচ্চ পর্যায়েরই হোন—তাদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। বিশেষত গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিগত দিনের কার্যাবলি ও রাজনৈতিক ব্যবহৃত হওয়ার বিষয়ে পুনর্মূল্যায়ন জরুরি। পুনর্মূল্যায়ন করা গেলেই সংস্কার করা সম্ভব।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে এখনই সাহসী ও দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে গুমের জন্য দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো যায়। তাহলেই জনগণের আস্থা ফিরে আসবে এবং গুমের মতো জঘন্য প্রথা চিরতরে বিলীন হবে। আমরা অতীতের অন্ধকারকে প্রত্যাখ্যান করব, সত্যকে সামনে আনব এবং ভুক্তভোগী পরিবারদের কণ্ঠকে শক্তিশালীভাবে তুলে ধরব। এটাই হবে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদা পুনঃস্থাপন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং প্রকৃত ন্যায় ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনার পথ। জাতি চায় তার ন্যায়বিচার ও মর্যাদা ফিরে পেতে—এটাই একমাত্র গ্রহণযোগ্য দাবি।