১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

মক্কা চুক্তির পর বদলে যাওয়া পশ্চিম এশিয়া এবং ইরানের কৌশলগত সংকট

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মক্কা চুক্তি পশ্চিম এশিয়ায় নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ইরান ও ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া, আঞ্চলিক সংঘাত এবং জোটের কার্যকারিতার ওপর।

মক্কা চুক্তির পর বদলে যাওয়া পশ্চিম এশিয়া এবং ইরানের কৌশলগত সংকট
৭ অগাস্ট সৌদি আরবের মক্কায় একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের পর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়িপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ২৪

লেখা: মনসুর কায়সার | অনুবাদক: রাকিবুল রাকিব

Published : 27 Aug 2026, 12:24 PM

Updated : 16 Sep 2026, 01:01 PM

গত ৭ অগাস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়। সামরিক জোট ও প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বে ভরা পশ্চিম এশিয়ায় এই চুক্তি আলাদা গুরুত্ব রাখে। কারণ, এর মধ্য দিয়ে তিনটি প্রভাবশালী মুসলিম রাষ্ট্র একটি বিষয়ে একমত হয়েছে, পশ্চিম এশিয়ায় প্রচলিত নিরাপত্তাব্যবস্থা যথেষ্ট নেই।

চুক্তির মূল কথা হলো, তিন দেশের কোনো একটির ওপর হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপরই হামলা ধরা হবে। কাঠামোগতভাবে এটি ন্যাটোর মতো জোট নয়, তবে যৌথ প্রতিরক্ষার নীতির কারণে তুরস্ক চুক্তিটিকে ন্যাটোর মূলনীতির সঙ্গে তুলনা করেছে।

দেশ তিনটি শুধু চুক্তি করেই থেমে নেই। পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও সামরিক পর্যায়ের কর্মকর্তারা নিয়মিত আলোচনা করছেন। স্থল, নৌ ও আকাশপথে যৌথ সামরিক মহড়ার পাশাপাশি চালকবিহীন সামরিক প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অস্ত্র উৎপাদন ও সামরিক প্রযুক্তি বিনিময়েও সহযোগিতা বাড়ছে। ভবিষ্যতে এসব কার্যক্রমের জন্য একটি স্থায়ী কাঠামো গড়ে তোলার প্রত্যাশা রয়েছে।

এই কারণেই মক্কা চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর তাৎপর্য শুধু সামরিক সহযোগিতায় সীমাবদ্ধ নয়; এর ঐতিহাসিক গুরুত্বও রয়েছে। পশ্চিম এশিয়া যখন যুদ্ধ ও অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক ওই সময়েই এই চুক্তি হয়েছে।

জীবন্ত যুদ্ধের ভেতর গড়ে ওঠা মক্কা চুক্তি

মক্কা চুক্তির আবির্ভাব শুধু আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে হয়নি। এর পেছনে রয়েছে একটি চলমান এবং এখনো অমীমাংসিত যুদ্ধ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও পারমাণবিক কর্মকর্তারা নিহত হন। এরপর থেকে বারবার যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়েছে। জুনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৬০ দিনের মধ্যে সংঘাত থামানোর লক্ষ্য নিয়ে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। তবে জুলাইয়ে আবারও লড়াই শুরু হয়। ইরান অনুমোদিত নৌপথ এড়িয়ে চলা বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায়। অন্যদিকে, চলতি মাস পর্যন্ত ইরানের ওপর ওয়াশিংটন কার্যত নৌ-অবরোধ বজায় রেখেছে। ফলে হরমুজ প্রণালি এখনো উত্তপ্ত ও অস্থির; একই সঙ্গে লেবানন ও গাজাতেও সংঘাত চলছে।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই সৌদি আরব মক্কা চুক্তিতে সই করেছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে সৌদি আরব নিজেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পথগুলো কীভাবে হুমকির মুখে পড়ে, সেটি তারা সরাসরি দেখেছে। ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য সবসময় ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করা যাবে, গত দেড় বছরের যুদ্ধ ওই বিশ্বাস দুর্বল করেছে। কারণ, যে যুদ্ধ ওয়াশিংটন শুরু করেছিল, সেটি শেষ করতে তারা হিমশিম খাচ্ছে।

তাই মক্কা চুক্তিকে শুধু ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক আয়োজন হিসেবে দেখা বা ‘মুসলিম ন্যাটো’ বলে সীমাবদ্ধ করা ঠিক হবে না। এটি পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদের হাতে নেওয়ার একটি চেষ্টা। চলমান যুদ্ধ ওই প্রয়োজনকে আরও তীব্র করে তুলেছে। প্রশ্নটা তাই সরল, যুক্তরাষ্ট্রই যদি পশ্চিম এশিয়া অস্থিতিশীল করে তোলে, তাহলে নিরাপত্তার জন্য এই অঞ্চলের দেশগুলো আর কার ওপর ভরসা করবে?

মক্কা চুক্তির সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যাখ্যা

মক্কা চুক্তির সবচেয়ে সহজ, কিন্তু বিপজ্জনক ব্যাখ্যা হলো, এটি সুন্নি দেশগুলোর একটি সামরিক জোট, যার লক্ষ্য শিয়া ইরানকে মোকাবিলা করা। পশ্চিম এশিয়া এরই মধ্যে এই ধরনের বিভাজনমূলক প্রতিযোগিতার বড় মূল্য দিয়েছে। তাই চুক্তিটিকে যদি সুন্নি প্রকল্প হিসেবে তুলে ধরা হয়, ইরান সহজেই এটিকে আদর্শিক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এর ফলে ইরাক, লেবাননসহ পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশজুড়ে বিভাজন আরও গভীর হতে পারে।

চুক্তির প্রতিষ্ঠাতা দেশগুলো এই ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন। তাদের বক্তব্য, এই জোট ইরানবিরোধী নয়; চুক্তির মূলনীতির সঙ্গে একমত হলে যে কোনো দেশ এতে যোগ দিতে পারবে। অর্থাৎ, মক্কা চুক্তির শক্তি কোনো স্থায়ী শত্রু তৈরি করার মধ্যে নয় বরং বিভিন্ন দেশকে নিয়ে একটি যৌথ নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার মধ্যে।

রিয়াদের পরিস্থিতি মোকাবিলার কৌশল

যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ২০৩০ রূপকল্প বাস্তবায়নে বিনিয়োগ, পর্যটন ও আন্তর্জাতিক আস্থা দরকার। কিন্তু তেলক্ষেত্র, বন্দর ও শহরগুলো যদি নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকিতে থাকে, তাহলে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন। তাই রিয়াদ ইরানের সঙ্গে চিরস্থায়ী সংঘাত চায় না, বরং এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়, যেখানে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে অতিরিক্ত ঝুঁকি না নিয়ে তেহরানের সঙ্গে সমঝোতা করা সম্ভব।

এ কারণেই সৌদি আরবের কৌশল যুদ্ধের পথে এগোনো নয়, নিজের নিরাপত্তার ভিত্তি শক্ত করা। আর এই জায়গাতেই পাকিস্তান ও তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ওয়াশিংটন যে নিরাপত্তা দিতে পারছে না, পাকিস্তান ও তুরস্ক তাদের নিজস্ব সামর্থ্য দিয়ে তা পূরণ করতে পারে। পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের সামরিক সম্পর্ক রয়েছে। দেশটির রয়েছে কৌশলগত গভীরতা ও পারমাণবিক শক্তির মর্যাদা। তুরস্ক দিতে পারে ন্যাটোর দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা, বড় সামরিক বাহিনী এবং শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্পের সুবিধা। আর সৌদি আরব দেবে অর্থ ও ভৌগোলিক সুবিধা।

অর্থ, জনবল, প্রযুক্তি ও ভূগোল—এই চারটির সমন্বয়ে সৌদি আরব এমন একটি নতুন নিরাপত্তার পথ তৈরি করছে, যা আগে তার হাতে ছিল না।

৭ অগাস্ট সৌদি আরবের মক্কায় যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের পর আলাপচারিতায় মগ্ন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়িপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ছবি: রয়টার্স

৭ অগাস্ট সৌদি আরবের মক্কায় যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের পর আলাপচারিতায় মগ্ন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়িপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ

মিশরের অন্তর্ভুক্তি ও আঞ্চলিকতা

তুরস্ক ভবিষ্যৎ সদস্য হিসেবে মিশরের কথা বলছে। অগাস্টের মাঝামাঝি মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি জানান, কায়রো গুরুত্ব দিয়ে মক্কা চুক্তিটি পর্যালোচনা করছে। তিনি এ-ও বলেন, চুক্তিতে যোগ দেওয়ার পূর্বে মিশরের সংবিধান ও আইনি বাধ্যবাধকতার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পরে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানও মিশরের যোগ দেওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেন।

মিশর যোগ দিলে চুক্তিটির ভৌগোলিক পরিধি অনেকটাই বদলে যাবে; সৌদি আরব এটিকে উপসাগরীয় অঞ্চলের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখছে, পাকিস্তান এর পরিধি দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত করছে, তুরস্ক ন্যাটো ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে যুক্ত করছে, আর মিশর যুক্ত করবে সুয়েজ খাল, উত্তর আফ্রিকা ও লোহিত সাগরের পশ্চিমাঞ্চল। ফলে আরব বিশ্বে মক্কা চুক্তির রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেড়ে যাবে।

তবে মিশরের ক্ষেত্রে কিছু দৃশ্যমান জটিলতা রয়েছে। কায়রো ১৯৭৯ সাল থেকে ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি বজায় রেখে আসছে। গাজা নিয়ে কূটনীতি এবং রাফাহ-সংক্রান্ত আলোচনাতে মিশরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যুদ্ধের কারণে এসব সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি হলেও তা ভেঙে পড়েনি। তাই মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়া মানেই মিশরকে এসব সম্পর্ক থেকে সরে আসতে হবে, এমন নয়। এমন কোনো ইঙ্গিতও নেই যে চুক্তির প্রতিষ্ঠাতা তিন দেশ মিশরের কাছে তা চাইছে।

মিশর যদি ইসরায়েল, ওয়াশিংটন ও আরব দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেই মক্কা চুক্তিতে যোগ দিতে পারে, তাহলে চুক্তিটিকে শুধু আদর্শিক জোট হিসেবে দেখা যাবে না। বরং এটি হয়ে উঠবে নিজেদের নিরাপত্তা ও কৌশল নির্ধারণে আঞ্চলিক দেশগুলোর স্বাধীনতা বাড়ানোর এক উদ্যোগ। ইরানের দৃষ্টিতে এই পার্থক্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ।

ইরানের ঠান্ডা মাথার কৌশল

ইরানের প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া এখন পর্যন্ত বেশ সংযত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, মক্কা চুক্তি ইরানকে লক্ষ্য করে করা হয়েছে, তেহরান এমন মনে করার কারণ দেখছে না। বরং আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের শক্তি ও সক্ষমতার ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে চাইছে।

পাকিস্তান ও তুরস্কও একই সুরে কথা বলেছে। তাদের বক্তব্য, চুক্তিতে কোনো নির্দিষ্ট শত্রুকে লক্ষ্য করা হয়নি। ইরানের জন্যও প্রকাশ্যে মক্কা চুক্তির বিরোধিতা করা বাস্তবসম্মত হবে না। এতে ইরানবিরোধী একটি জোট গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তাই তেহরানের জন্য ভালো পথ হলো, জোটের প্রতিটি দেশকে বোঝানো যে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের চেয়ে সহযোগিতা বেশি লাভজনক।

কারণ, তিন দেশের উদ্বেগ এক নয়। সৌদি আরবের প্রধান চিন্তা উপসাগরীয় অঞ্চলের অবকাঠামো। তুরস্কের উদ্বেগ সিরিয়া ও পূর্ব ভূমধ্যসাগর ঘিরে। পাকিস্তানের নজর দক্ষিণ এশিয়ায়, আর মিশরের বড় উদ্বেগ গাজা। এই পার্থক্যগুলো টিকিয়ে রাখাই ইরানের জন্য বেশি সুবিধাজনক। এতে জোটটির সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাতে যাওয়ার প্রয়োজন কমে যাবে।

তবে ইরানের হাতে এমন একটি শক্তি রয়েছে, যা কোনো চুক্তি দিয়ে দূর করা সম্ভব নয়—তার ভৌগোলিক অবস্থান। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। ফলে এই পথে চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে তার প্রভাব শুধু পশ্চিম এশিয়ায় নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতেই পড়বে।

মক্কা চুক্তির মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, ড্রোন ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ে সহযোগিতা বাড়ানো সম্ভব। কিন্তু ইরানকে মানচিত্র থেকে সরানো সম্ভব নয়। তাই দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়তে হলে শুধু ইরানকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে হবে না; ইরানের সঙ্গে কীভাবে সহাবস্থান করা যায়, তারও একটি কাঠামো দরকার।

শুধু সামরিক প্রতিরোধের ওপর নির্ভর করলে চলমান সংকট আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। আবার কূটনীতি ব্যর্থ হলে তেহরান তার কয়েক দশকে গড়ে তোলা অপ্রচলিত সামরিক নেটওয়ার্কের ওপর আরও বেশি নির্ভর করবে। কিন্তু সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও শক্তিশালী সামুদ্রিক নজরদারি গড়ে উঠলে ওই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা ইরানের জন্য কঠিন হয়ে উঠবে।

ইসরায়েলের ভিন্ন স্বার্থ

কারণ ভিন্ন হলেও ইসরায়েলও মক্কা চুক্তিকে ইরানের মতোই গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে। প্রধান মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে এই চুক্তি ইসরায়েলের সামনে একটি নতুন আঞ্চলিক শক্তিকেন্দ্র তৈরি করছে। এতদিন ইসরায়েল তার উন্নত প্রযুক্তি, শক্তিশালী গোয়েন্দাব্যবস্থা ও সামরিক সক্ষমতার ওপর অনেকটাই নির্ভর করেছে। মক্কা চুক্তি ওই শক্তির বিপরীতে আরেকটি আঞ্চলিক শক্তি গড়ে তুলতে পারে।

তবে শুরুতেই চুক্তিটিকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বৈরী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। উদ্যোক্তা দেশগুলো এটিকে প্রতিরক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবেই তুলে ধরছে। মিশর এতে যোগ দিলেও ইসরায়েলের সঙ্গে তার বিদ্যমান চুক্তিগুলো বহাল রেখেই যোগ দেবে।

আসল ঝুঁকি অন্য জায়গায়; ফিলিস্তিন প্রশ্নের কোনো গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সমাধান না হলে এবং গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় সংঘাত চলতে থাকলে এই প্রতিরক্ষা কাঠামোর চরিত্র বদলে যেতে পারে। ধীরে ধীরে এটি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক ভারসাম্য তৈরির জোটে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তাই মক্কা চুক্তি কোন দিকে যাবে, তা অনেকটাই ইসরায়েলের আচরণের ওপরও নির্ভর করছে। একটি টেকসই রাজনৈতিক সমাধান হলে চুক্তিটি এক পথে এগোবে; আর সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে ভিন্ন রূপ নিতে পারে।

সংকটই জোটের শক্তি পরীক্ষা করবে

মক্কা জোটের গুরুত্ব শুধু আনুষ্ঠানিকতা দিয়ে বোঝা যাবে না। বড় কোনো সংকটেই এর আসল পরীক্ষা হবে। সদস্য দেশগুলোর স্বার্থের সংঘাত দেখা দিলে বোঝা যাবে, ‘একজনের ওপর আক্রমণ মানেই সবার ওপর আক্রমণ’ নীতিটি বাস্তবে কতটা কার্যকর।

এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। সংকটের সময় সদস্য দেশগুলোর সামরিক বাহিনী কত দ্রুত যোগাযোগ করতে পারবে? তারা কি পরস্পরের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করবে? কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত কে নেবে? আবার কোনো একটি সদস্য দেশের সংঘাতে অন্যরা জড়াতে না চাইলে কী হবে?

বাস্তবে সমন্বয় করতে সক্ষম চার সদস্যের একটি জোট অনেক সময় সমন্বয়হীন দশ সদস্যের জোটের চেয়ে বেশি কার্যকর। তাই প্রথমে বর্তমান জোটকে কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলাই জরুরি। এরপর সদস্য সংখ্যা বাড়ানোই হবে বেশি যুক্তিসংগত।

মক্কা জোট কোন পথে যাবে, তা মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে। প্রথমত, মিশর এতে যোগ দেয় কি না। এতে বোঝা যাবে, জোটে থাকতে হলে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষ বেছে নেওয়ার প্রয়োজন আছে কি না। দ্বিতীয়ত, ইরানের প্রতিক্রিয়া। তেহরান কূটনীতির পথে যাবে, নাকি কঠোর অবস্থান নেবে—তার ওপর নির্ভর করবে জোটটি নমনীয় থাকবে, নাকি আরও কঠোর হয়ে উঠবে। তৃতীয়ত, গাজা ও প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি ইসরায়েলের আচরণ। এর ওপর অনেকটাই নির্ভর করবে মুসলিম দেশগুলোর যৌথ নিরাপত্তাকে ফিলিস্তিন প্রশ্ন থেকে আলাদা রাখা সম্ভব কি না।

মক্কা জোট হয়তো পশ্চিম এশিয়ায় ক্ষমতার নতুন একটি রেখা তৈরি করবে। আবার এমন এক আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থার ভিত্তিও হতে পারে, যার অভাবে পশ্চিম এশিয়া বহুদিন ধরে ভুগছে। নিজেদের রক্ষার যৌথ সক্ষমতা, স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং শুধু প্রতিপক্ষকে ঠেকিয়ে রাখার বদলে তার সঙ্গে আলোচনায় বসার আত্মবিশ্বাস—এই তিনটিই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ পর্যন্ত মক্কা চুক্তিতে কতটি দেশের স্বাক্ষর আছে, সেটিই আসল বিষয় নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই জোট কতটা কার্যকর ও স্বাধীন হয়ে উঠতে পারে। সেটিই ঠিক করবে, মক্কা চুক্তি পশ্চিম এশিয়ায় নতুন কোনো ‘শীতল যুদ্ধ’ ঠেকাতে পারবে, নাকি উল্টো নতুন সংঘাতের পথ তৈরি করবে।

লেখাটি ‘মিডল ইস্ট মনিটর’ থেকে অনূদিত; এর লেখক মনসুর কায়সার ইসলামাবাদ-ভিত্তিক একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক। তিনি পাকিস্তান ও এই অঞ্চলের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণকারী জননীতি ও সামাজিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন।

মক্কা চুক্তি নিয়ে সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলতে হবে ঢাকাকে