আর বিশ্ববিদ্যালয় নয়, চাই মানের উৎকর্ষ ও দক্ষতার গুরুত্ব
নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার দৌড় নাকি অবকাঠামো ও মানসম্মত শিক্ষার সার্বিক উন্নয়ন—আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার অগ্রাধিকার কোনটি হওয়া উচিত?
কোনো দেশের উন্নয়ন শুধু মাথাপিছু আয়, অবকাঠামো, শিল্পকারখানা কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। একবিংশ শতাব্দীর জ্ঞানভিত্তিক বিশ্বে রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির সামর্থ্যের ওপর। যে দেশ নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, প্রযুক্তির নতুন প্রয়োগ এবং গবেষণার ফলকে অর্থনীতি ও সমাজের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে পারে, ভবিষ্যতের বিশ্বে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা সেই দেশেরই বেশি। ফলে উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণের প্রশ্নটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যথেষ্ট নয়; এসব প্রতিষ্ঠান কতটা জ্ঞান সৃষ্টি করছে, গবেষণায় অবদান রাখছে এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলছে, সেই প্রশ্নই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে উচ্চশিক্ষার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বিস্তৃত হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করছে। গবেষণাপত্র প্রকাশের সংখ্যাও আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের ঐতিহাসিক প্রয়োজন ছিল এবং দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বিকাশে এই সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে বর্তমান পর্যায়ে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার আগে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা, মান এবং প্রকৃত প্রয়োজন মূল্যায়ন করা জরুরি।
বাস্তবতা হলো, দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এখনও কাঙ্ক্ষিত একাডেমিক ও গবেষণাগত মানে পৌঁছাতে পারেনি। বহু প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, আধুনিক গবেষণাগার, উন্নত বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, আন্তর্জাতিক ডেটাবেসে প্রবেশাধিকার, গবেষণা সহকারী এবং পর্যাপ্ত গবেষণা অর্থায়নের ঘাটতি রয়েছে। কোথাও শিক্ষকসংখ্যা শিক্ষার্থীসংখ্যার তুলনায় অপর্যাপ্ত, কোথাও গবেষণার পরিবেশ দুর্বল, কোথাও অবকাঠামো অসম্পূর্ণ। প্রশাসনিক জটিলতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতিও শিক্ষা ও গবেষণার স্বাভাবিক অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করছে। ফলে নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আগে বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মৌলিক দুর্বলতা দূর করাই অধিক ফলপ্রসূ হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি নিজে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের নিশ্চয়তা দেয় না। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জমি, ভবন, প্রশাসনিক কাঠামো, শিক্ষক নিয়োগ, গ্রন্থাগার, গবেষণাগার, আবাসিক সুবিধা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বড় দায় যুক্ত থাকে। এসব ব্যয় বহনের পরও পর্যাপ্ত শিক্ষক, গবেষণা অবকাঠামো, একাডেমিক স্বাধীনতা, দক্ষ প্রশাসন এবং মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে সংখ্যাগত সম্প্রসারণের সুফল সীমিত থাকতে পারে। তাই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা নীতিতে এখন নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরির গতি বাড়ানোর চেয়ে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও মান উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষার গুণগত মানের সঙ্গে মানবসম্পদ তৈরির প্রশ্নও সরাসরি যুক্ত। দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক তৈরি করা সম্ভব না হলে শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত জ্ঞান, দক্ষতা ও সৃজনশীলতা অর্জনের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের যথাযথভাবে প্রস্তুত করা না গেলে বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্রের পরিবর্তে সনদ প্রদানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। এর দীর্ঘমেয়াদি ফল হতে পারে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি।
এই বাস্তবতা উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক কারিগরি শিক্ষার গুরুত্বও সামনে নিয়ে আসে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে একই ধরনের একাডেমিক শিক্ষার পথে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। দেশের শিল্প, কৃষি, নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, উৎপাদন ও সেবা খাতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রযুক্তিগত ও পেশাগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ বাড়াতে হবে। গবেষণা ও একাডেমিক শিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য শক্তিশালী বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজন, আবার কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনে আগ্রহীদের জন্য আধুনিক কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়নে দুই ধারাকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া জরুরি।
ফলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার সম্প্রসারণের পাশাপাশি দক্ষতাভিত্তিক কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়নের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি। সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিক গবেষণাগার, উন্নত বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি, গবেষণা অনুদান, আন্তর্জাতিক ডেটাবেস এবং গবেষণা সহকারীর সুযোগ দিতে হবে। যোগ্য গবেষকদের দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে কাজের পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি গবেষণার ফল শিল্প, কৃষি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, তথ্যপ্রযুক্তি ও জাতীয় অর্থনীতিতে প্রয়োগের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। গবেষণার মূল্যায়নেও পরিবর্তন প্রয়োজন। শুধু গবেষণাপত্রের সংখ্যা নয়, গবেষণার মৌলিকত্ব, আন্তর্জাতিক প্রভাব, উদ্ধৃতির মান, পেটেন্ট, প্রযুক্তি হস্তান্তর, শিল্পখাতের সঙ্গে সহযোগিতা এবং জাতীয় সমস্যার সমাধানে অবদানকে গুরুত্ব দিতে হবে।
শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতা ও মেধাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া, আধুনিক পাঠদান পদ্ধতি চালু করা, যুগোপযোগী কারিকুলাম প্রণয়ন এবং শিক্ষার্থীদের গবেষণায় সম্পৃক্ত করার সুযোগ বাড়ানো জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শক্তি ভবনের সংখ্যা নয়; শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষার্থী এবং জ্ঞান সৃষ্টির পরিবেশই তার মূল ভিত্তি।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের ক্ষেত্রে আপাতত মোরেটোরিয়াম, অর্থাৎ সাময়িক স্থগিতাদেশ বিবেচনা করা সময়োপযোগী হতে পারে। এর লক্ষ্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ সংকুচিত করা নয়; বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও সম্পদ নিশ্চিত করাই মূল উদ্দেশ্য। এই সময়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকসংখ্যা, শিক্ষার্থীসংখ্যা, গবেষণা কার্যক্রম, অবকাঠামো, আর্থিক সক্ষমতা, একাডেমিক ফলাফল এবং প্রশাসনিক দক্ষতা নিয়ে সমন্বিত মূল্যায়ন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে কারিগরি শিক্ষার অবস্থা, প্রশিক্ষণ অবকাঠামো, শিল্পখাতের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষাক্রমের সামঞ্জস্য এবং প্রশিক্ষণ শেষে কর্মসংস্থানের সুযোগও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
পরবর্তী সময়ে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন নির্ধারণে সুস্পষ্ট জাতীয় মানদণ্ড থাকা উচিত। জনসংখ্যা, শিক্ষার্থীর চাহিদা, বিদ্যমান আসনসংখ্যা, শিক্ষক ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা, আঞ্চলিক বৈষম্য, গবেষণার সম্ভাবনা এবং জাতীয় অর্থনীতির প্রয়োজন বিবেচনা করেই নতুন প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা রাজনৈতিক, স্থানীয় কিংবা প্রশাসনিক চাপের ফল না হয়ে জাতীয় শিক্ষানীতির সুপরিকল্পিত অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার জায়গা তার তরুণ জনগোষ্ঠি। তাদের জন্য শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন এমন শিক্ষা, যা জ্ঞান, সৃজনশীলতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানের সক্ষমতা বাড়ায়। একই সঙ্গে যারা দ্রুত কর্মমুখী দক্ষতা অর্জন করতে চায়, তাদের জন্য আধুনিক কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সুযোগ বিস্তৃত করা জরুরি। শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ কোন প্রতিষ্ঠানের সনদ অর্জন করেছে, তার চেয়ে বেশি নির্ভর করবে সে কী শিখেছে এবং সেই জ্ঞান ও দক্ষতা বাস্তব জীবনে কতটা প্রয়োগ করতে পারছে তার ওপর।
তাই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা নীতিতে এখন মৌলিক প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমাদের আরও বিশ্ববিদ্যালয় দরকার, নাকি বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরও শক্তিশালী করা দরকার? একই সঙ্গে ভাবতে হবে, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা কি শিক্ষার্থীদের জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতি ও কর্মবাজারের উপযোগী করে তুলছে, নাকি কেবল সনদ অর্জনের সুযোগ তৈরি করছে? বর্তমান বাস্তবতায় সংখ্যাগত সম্প্রসারণের চেয়ে গুণগত উৎকর্ষ, গবেষণা সক্ষমতা এবং কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনকে অগ্রাধিকার দেওয়াই অধিক যুক্তিসংগত।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধিকে উন্নয়নের স্বয়ংক্রিয় সূচক হিসেবে দেখার সময় শেষ হয়েছে। এখন প্রয়োজন শক্তিশালী বিশ্ববিদ্যালয়, দক্ষ শিক্ষক, স্বাধীন গবেষণা, মেধাবী শিক্ষার্থী, আধুনিক গবেষণাগার, উদ্ভাবনমুখী একাডেমিক পরিবেশ এবং কর্মদক্ষ মানবসম্পদের সমন্বয়ে কার্যকর জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা স্থায়ীভাবে বন্ধ রাখার প্রয়োজন নেই; তবে বর্তমান পর্যায়ে নতুন অনুমোদন সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা যাচাই, প্রয়োজনীয় সংস্কার, গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কারিগরি শিক্ষার পুনর্গঠন করা বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত হতে পারে। প্রয়োজনীয়তা প্রমাণিত হলে ভবিষ্যতে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা যাবে।
কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দিয়ে জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র তৈরি হয় না। বাংলাদেশের সামনে তাই এখন সংখ্যার প্রতিযোগিতা নয়, মানের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার সময়। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্বমানের করার উদ্যোগ এবং অর্থনীতির চাহিদা অনুযায়ী শক্তিশালী কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলাই হওয়া উচিত জাতীয় উচ্চশিক্ষা নীতির প্রধান অগ্রাধিকার।
খালিদুর রহমান শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক। ই-মেইল: khalid_sust@yahoo.com
