১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

জুলাইয়ের ভাগ-বাটোয়ারা

জুলাই-অগাস্টের রক্তঝরা দিনগুলোর পর কেটে গেল দুটি বছর। কিন্তু যে সাম্য, গণতন্ত্র আর বাকস্বাধীনতার স্বপ্নে লাখো মানুষ রাজপথে নেমেছিল—সেই ‘জুলাই’ আজ কাদের দখলে? রাজনৈতিক ভাগ-বাটোয়ারা আর ইতিহাস বিকৃতির গ্যাঁড়াকলে পিষ্ট অভ্যুত্থানের ভেতরের অপ্রিয় সত্যগুলো নগ্নভাবে উন্মোচিত হতে শুরু করেছে।

জুলাইয়ের ভাগ-বাটোয়ারা
নারায়ণগঞ্জে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের হাতাহাতি ও সংঘাত। অভ্যুত্থানের দুই বছর উদ্‌যাপনে ক্ষমতার দাপট নাকি জুলাইয়ের ‘মালিকানা’ প্রতিষ্ঠার লড়াই?

রাজু নূরুল রাজু নূরুল

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 06 Aug 2026, 01:53 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:47 PM

২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর দুই বছর কেটে গেল। কী বীভৎস একটা দিন ছিল সেদিন! ইন্টারনেট বন্ধ, চারদিকে গুলি, রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ, পুলিশ, মিলিটারি—কে কাকে হত্যা করছে কেউ জানে না। আর ছিল মানুষের উৎকণ্ঠা—এরপর কী হবে, কোন দোজখ নেমে আসবে, তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই।

এরপর দুই বছর কেটে গেল। জুলাই নিয়ে কিছু লিখতে পারি না। লিখতে বসলে সবকিছু জটিল মনে হয়।

কিন্তু অনেক মানুষ লিখছে। বলছেও। এবার ঢাকায় খুব জমকালো ‘জুলাই’ হলো। সম্ভবত কয়েক শ ইভেন্ট হয়েছে। গভীরভাবে খেয়াল করে দেখলাম, প্রায় সব ইভেন্টের আয়োজক জামায়াতে ইসলামী অথবা তাদের বিভিন্ন ছায়া সংগঠন। সরকার ও বামপন্থিদের টুকটাক ছিল বৈকি! বলার অপেক্ষা রাখে না, এসব ইভেন্টের পেছনে কোটি কোটি টাকা খরচ হয়েছে।

টাকা খরচ করার কারণ আছে। ফ্যাসিজমের যে কয়েকটা বৈশিষ্ট্য আছে, তার একটা হলো—ফ্যাসিবাদ জিইয়ে রাখার জন্য এরকম ইভেন্ট লাগে। সাড়ম্বরে সেসব ইভেন্ট উদযাপন করতে হয়। তখন বেশ কিছু দিবস-টিবসও লাগে, মানুষ কেক কাটবে, গান গাইবে। এসব আড়ম্বরের ভিড়ে পোড়া ঘরে আলু সিদ্ধ করে খাওয়া যাবে।

ঠিক এই কারণেই ইতিহাসে জুলাই অভ্যুত্থান টিকবে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ করি। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান কত তারিখে হয়েছে আপনি জানেন? ’৯০-এর অভ্যুত্থানের দিনক্ষণ মনে আছে? নেই তো? অথচ ’৬৯-এর অভ্যুত্থান আস্ত একটা দেশ পাওয়ার অভিযাত্রায় আমাদের এগিয়ে দিয়েছে; ’৯০ দিয়েছে গণতন্ত্রে ফেরার সুবাতাস। সেসব অভ্যুত্থানে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন, তারা মানচিত্র ছিনিয়ে এনে নিজেদের কাজে ফিরে গেছেন। এ কারণেই ’৬৯ ও ’৯০ ইতিহাসে টিকে গেছে।

এবারের জুলাই উদযাপন বেশ অন্যরকম হলো। গোটা চারেক ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে অস্ত্রের মহড়া হলো। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী ছাত্রদল ৩-১ গোলে এগিয়ে আছে; শুধু রংপুরে পেরে ওঠেনি। বঙ্গভবনের উদযাপনে জুলাইপন্থি ও সরকারসমর্থকদের মধ্যে জুলাইয়ের মালিকানা নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। উপস্থিত বিদেশি অতিথিদের ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে হলঘর ছাড়তে হয়েছে।

তবে সব মিলিয়ে গত বছরের চেয়ে এবার হাঁকডাক বেশি হয়েছে। গত বছর ক্ষমতায় ছিল কার্যত জামায়াতে ইসলামী। প্রায় সবকিছু তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল; ফলে খুব বেশি হাঁকডাকের দরকার হয়নি। এবার ক্ষমতায় বিএনপি, ফলে এই ভয়টা কাজ করেছে যে—বিএনপি যদি জুলাইয়ের ঘি-মাঠা পুরোটা খেয়ে ফেলে? তাই আরও জোরে হইচই করতে হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাদেক কায়েম কয়েক হাজার মিছিলকারী নিয়ে মাঠে নেমেছেন, যাদের বড় একটা অংশ ছোট ছোট শিশু; শুধু জুলাইকে বাঁচাতে। তাদের সবার হাতে আবার নীল রঙের পিভিসি পাইপ। জুলাইকে বাঁচাতে পিভিসি পাইপ কেন লাগছে কে জানে!

তবু, জুলাই কি বৃথা গেছে? নাহ্, জুলাই মানুষ চিনতে শিখিয়েছে।

যে ছেলেটা আমার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক চর্চা করেছে, যে আমার খুব কাছের বন্ধু, বছরের পর বছর এক বিছানায় ঘুমালাম, অগাস্টের ৫ তারিখের পর দেখলাম—তাদের অনেকেই ভিন্ন মানুষ। আমার মতো সংস্কৃতি চর্চা করা কারও ছায়ায় থাকলে কেউ সন্দেহ করবে না বলেই সে আমার বন্ধু ছিল এতদিন!

তখনও সে সময়কার সরকারের সমালোচনা করে লিখতাম বলে যারা খুব বাহবা দিত, প্রতিদিন যোগাযোগ করত; সেই তারাই যখন ৫ অগাস্টের পরে জামায়াত প্রভাবিত অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতার সমালোচনা শুরু করলাম, অশ্রাব্য গালাগাল করে আনফ্রেন্ড করে দিল।

তার আগে ৫ অগাস্ট বিকেলে অন্তত ২০০ মানুষ আনফ্রেন্ড করেছিল; কারণ তাদের আওয়ামী সরকারের করা অপরাধের সমালোচনা করেছি বলে; জুলাইয়ে মানুষ হত্যার বিরুদ্ধে লেখালেখি ও আন্দোলনের পক্ষে সরব থেকেছি বলে। বুঝলাম, সবাই আসলে দলের কর্মী, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলে না।

যে ইউটিউবার, সোশ্যাল মিডিয়ার যে অ্যাক্টিভিস্ট, যে সাংবাদিক ভাইয়ের লেখার গুণমুগ্ধ ভক্ত ছিলাম, যাকে জাতির বিবেক ভাবতাম—জুলাইয়ের পর দেখলাম তিনিও দলীয় দাস। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে উঠেছেন যমুনা মহলের নৃত্যশিল্পী!

প্রত্যক্ষ করলাম, একসঙ্গে থিয়েটার করা ছেলেটা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কেন ঠিক হয়নি, তা নিয়ে তুমুল হইচই করা শুরু করল। যে ছেলে আমার বাসায় বসে বঙ্গবন্ধু কেন অবশ্যই ‘জাতির পিতা’, তা নিয়ে বিএনপির সমর্থকদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গলা ফাটিয়ে তর্ক করত, শেষমেশ আমাকে গিয়ে অলমোস্ট মারামারিটা থামাতে হতো—জুলাইয়ের পর সেই ছেলে বলে কিনা ‘মুজিব একটা ফ্যাসিস্ট!’ আমি স্রেফ তব্দা খেয়ে গেলাম। আচ্ছা মানলাম মুজিব ফ্যাসিস্ট, তাই বলে তার কাছ থেকে, ওই মুখ শুনতে হবে সেটা, যে বঙ্গবন্ধু বলে মুখে ফেনা তুলেছে?

যে ছেলেটা জুলাইয়ে প্রতিদিন আমাকে কল দিত, নানা তথ্য দিত—৫ অগাস্টের পর সে কোনোদিন আমার কোনো পোস্টে একটা লাইকও দেয়নি। অপরাধ হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হওয়া অন্যায়ের সমালোচনা করেছিলাম। যুক্তি হলো এই—যে সরকার তার উদ্দেশ্য সাধন করছে, তার সমালোচনা কেন করছি। শিখলাম, এদের সবার কাছে জুলাই অন্যায়ের প্রতিবাদ ছিল না, ছিল স্রেফ ‘হাসিনা খেদাও’ আন্দোলন। কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান নয়।

অগাস্টের ৫ তারিখের পর হাজার হাজার হোয়াটসঅ্যাপ/মেসেঞ্জার অ্যাকাউন্ট ইনঅ্যাক্টিভ হয়ে গেছে। লাখ লাখ চ্যাটিং গ্রুপ এখনো টিকে থাকলেও কেউ আর ভয়ে কথা বলে না ওখানে। জুলাই শেখাল—কাউকে বিশ্বাস করতে নেই।

শেখ হাসিনার আমলে দেশে বিস্ময়কর উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু গণতন্ত্র ছিল না, নির্বাচন হয়নি, পাহাড়সম দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি হয়েছে। দেশে একটা দল ছাড়া আর কারও অস্তিত্ব ছিল না। জোরজবরদস্তি, গুমের ঘটনা ঘটছিল। মন খুলে সমালোচনা করা যেত না। শিক্ষাব্যবস্থাটা ভেঙে পড়ল। পাহাড় ইস্যু ছিল। সংখ্যালঘুরা বিপদগ্রস্ত ছিল। জুলাইয়ে ঢাকার দেয়ালে দেয়ালে ধরে ধরে প্রত্যেকটা ইস্যু নিয়ে সাম্যের বার্তা লেখা হলো। তার ওপর ১৭ বছর কেউ ক্ষমতায় থাকলে তার সমালোচনা করার জন্য ইস্যুর অভাব হয় না তো।

সেসব যখন সামনে আসল, ব্যাকগ্রাউন্ডে দেশের গান, উদ্যমী মিউজিক, দুর্দান্ত কোরিওগ্রাফি যখন ছড়িয়ে পড়ল, মানুষের রক্ত গরম হয়ে গেল। মানুষ দুটো রাজনৈতিক দলের বাইরে স্বপ্ন দেখতে লাগল। জামায়াতে ইসলামী তখনও দৃশ্যেই নেই। নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের গলায় জাতীয় সংগীত, মাথায় পতাকা, গলায় ‘সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি’, বঙ্গবন্ধুর সেই ‘দাবায়ে রাখতে পারবা না’ স্লোগান; মানুষ ভাবল—আমাদের হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা এসে গেছে। এই তো চাই! বিশ্বাস করে মানুষ মাঠে নামল। গণঅভ্যুত্থান কখনো একক দল দিয়ে হয় না; তখনই হয়, যখন সব মানুষ রাস্তায় নেমে আসে।

সরকার পতনের পর আমরা জানলাম—এই জন্মভূমি সেই জন্মভূমি না, এটি পাক সারের দিকে যাচ্ছে। জানলাম—রবীন্দ্রনাথের নাম আসলে ‘রঠা’, জুলাই অভ্যুত্থান মূলত জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের জন্য হয়েছিল। জানলাম—গোটা আন্দোলনে সাধারণ মানুষের কোনো ভূমিকাই নেই, সবই ‘গুপ্ত সালমানের’ কৃতিত্ব। তিনি এ যুগের বীরশ্রেষ্ঠ! ওটা নাকি ‘স্বাধীনতা ২.০’!

বিএনপি এখন যতই কৃতিত্ব নেওয়ার চেষ্টা করুক, জুলাইয়ে তারা সম্মুখে ছিল না। মাঠে অবশ্যই ছিল। তবে গোটা দৃশ্যপট সাজানোর কৃতিত্ব জামায়াতকে দিতে হবে, যদিও তখন তারা ছিল সবচেয়ে পেছনে। পেছন  থেকে তারা সেটি সফলভাবে করতে পেরেছে এবং এটিই রাজনীতি; কিন্তু গুপ্ত রাজনীতি। গুপ্ত রাজনীতি করে মানুষকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে মাঠে নামালে সেটাকে অভ্যুত্থান বলে না। জামায়াত এখন একটা অভ্যুত্থানের ডাক দিয়ে দেখুক তো, কতজন মানুষ রাস্তায় নামে?

মানুষ রাস্তায় নেমেছিল বেকারত্ব কমিয়ে আনার জন্য, কোটা সংস্কারের জন্য; এরপর পরিস্থিতি যখন ঘোলাটে হয়ে আসল, তখন গণতন্ত্রের জন্য, সাম্যের জন্য, নারীর অধিকারের জন্য, পাহাড়ের মানুষের সমতার জন্য, ধর্মীয় সংখ্যালঘুর অধিকারের জন্য, আরও যা যা দেয়ালে লেখা ছিল—সেসবের জন্য।

কিন্তু ৫ অগাস্টের পর এসব নিয়ে, মানুষের প্রয়োজন নিয়ে, দারিদ্র্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য নিয়ে কোথাও একটা কথা হলো না। পাহাড়িদের সমস্যা নিয়ে কোথাও একটা সেমিনার হলো না; বরং জানানো হলো একাত্তর ভুল, মুক্তিযোদ্ধারা পথভ্রষ্ট, বীরশ্রেষ্ঠদের মাথা ভাঙা হলো, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যে দড়ি পড়ল। জানলাম, ৭১ নয়; ৪৭-ই সব, শেখ মুজিব প্রতারক। আরও কত শত শত বয়ান! বুঝলাম, ভেতরে ভেতরে আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে। উগ্রবাদীদের কাছে জুলাই ছিল ধর্মীয় উগ্রতাকে হালাল করার এক প্রাণপণ যুদ্ধ; অথচ যে যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছে অসংখ্য নিরীহ, সাধারণ মানুষ—বুঝে না-বুঝে। আর যুক্ত হয়েছে লাখো প্রগতিশীল জনতা।

জুলাইয়ের পর বাকস্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার কথা ছিল। অথচ এই লেখা যখন লিখছি, তখন দিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন নিয়ে খবর প্রচার না করার জন্য সংবাদমাধ্যমকে জোরজবরদস্তি করছে সরকার। ঠিক একইভাবে তারেক রহমানের খবর প্রচার না করার জন্য মিডিয়াকে নির্দেশ দেওয়া হতো, রীতিমতন আদালতের আদেশ। সংবাদ সম্মেলনের পর সাকিব আল হাসানের মাগুরর বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে, পেট্রোল বোমা বিস্ফোরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই হলো জুলাই থেকে পাওয়া বাকস্বাধীনতা।

এসব দেখে-শুনে, গত দুই বছরে জুলাই যখন হাত থেকে ফস্কে যাচ্ছে, সাধারণ মানুষ যখন প্রতারিত হয়ে নিজেকে সরিয়ে এনেছে—তখন জুলাই নিয়ে আরও জোরে কাদের চিৎকার করার দরকার পড়ছে, সেটা আমরা জানি। কিন্তু তারা জানে না—যতবার জুলাইকে কুক্ষিগত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, জুলাই তত দূরে সরে যাচ্ছে।

করুক চিৎকার। ভাগ-বাটোয়ারা শেষ হোক।

তারপর কোনো একদিন নিলক্ষিয়া নীল আকাশের নিচে, হাজার হাজার তারা আর তার নিচে গ্রাম, গঞ্জ, হাট, জনপদ, ঊনসত্তর হাজার লোকালয়ে নূরলদীন একদিন কাল পূর্ণিমায় দেবে ডাক—

“জাগো, বাহে, কোনঠে সবায়?”

রাজু নূরুল উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ও লেখক। বর্তমানে সোমালিয়া সরকারের অর্থমন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত। যোগাযোগ: raju_norul@yahoo.com