Published : 10 Sep 2025, 04:23 AM
ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু সোজাসুজি আকাশপথে গেলে মাত্র ৬৭৫ কিলোমিটার দূরে। সড়কপথেও দূরত্ব খুব বেশি নয়। বাংলাদেশ থেকে স্থলপথে নেপাল যেতে মাঝখানে ভারতের ওপর দিয়ে কিছুটা পথ যেতে হয়। তবে পথটা খুব দূরের নয়। ঢাকা থেকে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর দূরত্ব হাজারখানেক কিলোমিটারেরও কম।
দেশ দুটির দূরত্ব সম্পর্কিত এই সব তথ্য প্রায় সবারই জানা আছে। ভৌগোলিক দূরত্ব খুব বেশি না হলেও ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈসাদৃশ্য যথেষ্টই আছে। কিন্তু হঠাৎ করে সমপাতন ঘটল দুই দেশের মধ্যে। এই সমপাতনের ঘটার মাঝে এক বছর এক মাসের মতো একটা ব্যবধান রয়েছে। বাংলাদেশের এই বছরের অভিজ্ঞতা নেপালের জন্য হতে পারে সতর্কবার্তা। কেননা, এরই মধ্যে বাংলাদেশ বুঝতে শুরু করেছে, গণঅভ্যুত্থানের বিজয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করে দিতে পারে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারের দুর্বলতা, মব ভায়োলেন্সের ব্যাপক বিস্তার।
বছরখানেক আগে, ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টে বাংলাদেশে এক ব্যাপক গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দেয়। বাংলাদেশের অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে ছাত্রদের বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে। সাদামাটা দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন দমনে শেখ হাসিনার কঠোরতা এটিকে সর্বব্যাপী এক অভ্যুত্থানে রূপান্তরিত করে। আসলে ছোট্ট দাবিটি শেষপর্যন্ত সরকার উচ্ছেদের আন্দোলনে রূপ নিয়েছিল দেড় দশক ধরে সরকারের গভীর দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, নির্বাচনি ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে গণতান্ত্রিক স্থান সংকুচিত করা এবং মারাত্মক অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে। ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পদ্ধতিগতভাবে ভেঙে দিয়ে তরুণদের কাছে একনায়কের প্রতিভূতে পরিণত হয়েছিলেন। অবশেষে ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টে অন্তত হাজার খানেক মানুষ নিজেদের প্রাণের বিনিময়ে হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেন।
নেপালে অবশ্য বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম রক্তপাতের মধ্য দিয়েই সরকারের পতন ঘটেছে। তবে সেখানেও আন্দোলনের জন্ম হয়েছে সাধারণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে। একই সময়ে ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করা নিয়ে তরুণরা আন্দোলনের সূত্রপাত করে। বাংলাদেশের মতো নেপালের আন্দোলনটি মূলত ছাত্র-যুব নেতৃত্বাধীন, যা ছাত্র-জনতার আন্দোলনে রূপান্তরিত হতে বেশি সময় নেয়নি। আন্দোলন এমন ব্যাপকতা পাওয়ার কারণ কিন্তু শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করা নয়, সরকারের প্রতি জনগণের দীর্ঘদিনের অসন্তোষের প্রকাশ।

বাংলাদেশের মতো নেপালের সংবিধানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি রয়েছে। তবে সংবিধানের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাসংক্রান্ত ওই অনুচ্ছেদেই, বাংলাদেশের মতো সরকারকে সামাজিক শান্তির প্রয়োজনে মতামতের প্রকাশকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা দেওয়া আছে। সংবিধান প্রদত্ত ওই ক্ষমতাবলে সরকার গোয়েন্দা বিভাগকে টেলিফোনে আড়ি পাতার অধিকার দিয়ে একটা আইন তৈরির কাজ শুরু করেছিল সম্প্রতি। সেটা কাঠমান্ডুর মতো শহরের মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজকে অসন্তুষ্ট করে। ফলে ছাত্র-তরুণদের আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় নেয়নি।
নেপালে এই সেপ্টেম্বরের অভ্যুত্থানকে কয়েক দশকের মধ্যে দেশটির সবচেয়ে ভয়াবহ অস্থিরতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ ও এক্সসহ প্রধান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা একটি চরম ধাক্কা দিয়েছিল, কেননা, এটি করা হয়েছে এমন একটি দেশে যেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জনসংখ্যার ৪৮ শতাংশেরও বেশি মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের উপায়, বিশেষ করে প্রবাসী শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য, যাদের পাঠানো রেমিটেন্স অর্থনীতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। নেপালের অ্যাক্টিভিস্টরা তাৎক্ষণিকভাবে এই পদক্ষেপকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত এবং একটি স্বৈরাচারী মনোভাব হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
তবে, এই নিষেধাজ্ঞা বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা গভীর ক্ষোভের সলতেটিতে দিয়াশলাইয়ের জ্বলন্ত কাঠি ছুঁয়ে দেওয়ার মতো অবস্থা করেছে। এর মূলে রয়েছে দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে জনমনে জমা হওয়া তীব্র হতাশা।
‘নেপো কিডস’– ক্ষমতাশালী রাজনীতিবিদ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সন্তানরা—ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে তাদের বিলাসবহুল জীবনযাপন নির্লজ্জভাবে প্রদর্শন করলে তা প্রতিবাদের এক জোরালো কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে । ট্রেন্ডিং #NepoKids হ্যাশট্যাগটি একটি প্রতীক হয়ে ওঠে, যা এই বেপরোয়া প্রদর্শনকে সুসংগঠিত দুর্নীতির সঙ্গে স্পষ্টভাবে সংযুক্ত করে। অর্থনৈতিক সংকট, বিশেষ করে যুবকদের উচ্চ বেকারত্ব (২০২৪ সালে ১৫-২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ২০.৮ শতাংশ) ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে তোলে, যা বহু তরুণ নেপালিকে বিদেশে কাজের সুযোগ খুঁজতে বাধ্য করে । সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার বিক্ষোভে দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শক্তিশালী মিশ্রণ তরুণদের দ্বারা পরিচালিত একটি আন্দোলনকে চালিত করেছে।
সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল কঠোর দমন-পীড়ন। ৮ সেপ্টেম্বর পুলিশ গুলি চালায়, এতে অন্তত ১৯ জন নিহত এবং ১০০ জনেরও বেশি আহত হয় । পরের দিন ৯ সেপ্টেম্বর আরও দুজন মারা যায়, ফলে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২১ জন। একটি মাত্র হাসপাতালে ৯০ জন চিকিৎসাধীন ছিল । নিরাপত্তা বাহিনী টিয়ার গ্যাস, জলকামান, লাঠিচার্জ, রাবার বুলেট এবং এমনকি সরাসরি গুলিও ব্যবহার করে । অনির্দিষ্টকালের কারফিউ সত্ত্বেও, বিক্ষোভ তীব্র হয়। বিক্ষোভকারীরা সরকারি ভবন, পুলিশ স্টেশন এবং প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবা এবং পুষ্প কমল দাহালসহ বিশিষ্ট রাজনীতিবিদদের বাসভবনে হামলা চালায় ও আগুন ধরিয়ে দেয় । কাঠমান্ডুর ওপর দিয়ে ধোঁয়া উড়তে থাকে, যার ফলে ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হয়।
জনগণের তীব্র ক্ষোভের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ওলি পদত্যাগ করেন। তিনি বলেন, এটি একটি সাংবিধানিক সমাধানের পথ প্রশস্ত করার জন্য নেওয়া সিদ্ধান্ত। তার পদত্যাগের আগে অন্তত তিনজন ক্যাবিনেট মন্ত্রীও পদত্যাগ করেন এবং সরকার কর্তৃক চলমান দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে তরুণদের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিষেধাজ্ঞাও বাতিল করা হয়। তবে নেপাল এখনও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে, নতুন সরকার গঠন এবং আরও গভীর অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়, এবং জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা সংযমের আহ্বান জানায় এবং সহিংসতার তদন্তের নির্দেশ দেয়।
বাংলাদেশ ও নেপাল, এই দুই দেশের অভ্যুত্থান আমাদের শেখায়, জনগণকে উপেক্ষা করে কোনো সরকার শেষপর্যন্ত ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না। রাজনীতিকরা ভাবতে পারেন, তারা নিরাপত্তা বাহিনী, আমলাতন্ত্র ও আইনের ছত্রচ্ছায়ায় সব নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। কিন্তু জনগণের সম্মিলিত শক্তি যখন বিস্ফোরিত হয়, তখন সেই শক্তিকে দমন করে রাখা যায় না। বাংলাদেশে আমরা দেখেছি, কত দ্রুত আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে, শহর থেকে গ্রামে, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে। নেপালেও একই ঘটনা ঘটেছে—শহুরে তরুণদের শুরু করা আন্দোলনে গ্রামীণ কৃষক নিজেদের অংশীদার হিসেবে দেখেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মিল হলো আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের দিক থেকে। নেপাল সবসময় ভারত-চীন প্রতিযোগিতার মধ্যে আটকে থাকে, বিদেশি অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রভাবও সেখানে প্রবল। বাংলাদেশও নানা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপে থাকে, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের স্বার্থসংঘাতের ভেতরে ত্রিশঙ্কু অবস্থায় থাকতে হয় দেশটিকে। অভ্যুত্থানগুলো তাই শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নয়, বৈশ্বিক ভূরাজনীতির সঙ্গেও সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়। তবে জনগণের কাছে কূটনীতির কূট-কচাল গুরুত্বপূর্ণ নয়—তাদের কাছে মুখ্য হলো পেটের ভাত। পেটের ভাতে টান পড়লে সরকার বদলে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সরকার বদলের উপায় ভোটাধিকারও যখন ছিনিয়ে নেওয়া হয়, যেমন বাংলাদেশে নেওয়া হয়েছে ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনে, ২০১৮ সালের রাতের ভোটে এবং ২০২৪ সালে আমি ও ডামির লড়াইয়ে, তখন গণঅভ্যুত্থান ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।

গণঅভ্যুত্থানে উচ্ছেদ হওয়া বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির আরও একটি মিল রয়েছে। ২০২৪ সালে নেপালে চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন ওলি। বাংলাদেশের পাঁচ বারের প্রধানমন্ত্রী হাসিনাও ওই বছর টানা চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। হাসিনা এর আগে ১৯৯৬ সালে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।
ওলি প্রথম প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন ২০১৫ সালে। এরপর ২০১৮ সালে আবার প্রধানমন্ত্রী হন। ২০২১ সালে দেশটির সংসদে অস্থিরতা দেখা দিলে তখন অল্প সময়ের জন্য তাকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সত্তরোর্ধ্ব কে পি শর্মা ওলি নেপালের কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান। সর্বশেষ তার দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনিফায়েড মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট) মধ্য-বাম ঘরানার নেপালি কংগ্রেস পার্টির সঙ্গে জোট সরকার গঠন করেছিল।