Published : 28 Jul 2025, 01:52 PM
বিশ্বসভ্যতায় ইহুদিদের অবদান কম নয়। পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র এবং কমিউনিজম—সবই কোনো না কোনোভাবে ইহুদিদের হাত ধরে এসেছে। কার্ল মার্ক্সের নাম আমরা সবাই জানি। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের তিন জন মহান বিজ্ঞানী—আলবার্ট আইনস্টাইন, নিয়েলস বোর এবং রিচার্ড ফাইনম্যান—তিন জনই ছিলেন ইহুদি।
আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান পড়তাম, আমার রুমে আলবার্ট আইনস্টাইনের একটি ছবি ঝুলানো থাকত। ফেইসবুক ও গুগল ছাড়া আজকাল আমাদের জীবন প্রায় অচল। এই দুটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে ইহুদি উদ্ভাবকদের হাত ধরে।
যে ইহুদি জাতিকে একসময় মানুষ শ্রদ্ধা করত তাদের বিজ্ঞানচর্চা ও উদ্ভাবনের জন্য, আজ তাদের অনেকেই চিহ্নিত হচ্ছেন ভূমিদস্যু ও গণহত্যাকারী হিসেবে। তারা আজ পৃথিবীর সর্বত্র নিন্দিত।
দুঃখজনকভাবে, অনেক ইহুদি, যারা কোনোভাবেই ইসরায়েলি নীতি সমর্থন করেন না এবং যারা নেতানিয়াহুর গাজা যুদ্ধের সক্রিয় বিরোধিতা করছেন—তারাও শুধুমাত্র ইহুদি পরিচয়ের জন্য অবমাননার শিকার হচ্ছেন।
এক সময় ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে মানুষ মূলত ‘জায়োনিস্ট’ ও ‘অ্যান্টি-জায়োনিস্ট’ এই দুই পরিভাষায় অবস্থান চিহ্নিত করত। জায়োনিস্টরা ছিল ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে সেখানে নিজেদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে। কিন্তু গাজা যুদ্ধের পর সেই হিসাব-নিকাশ বদলে গেছে।
ইসরায়েলে এক সময় ‘পিস নাউ’ নামে একটি প্রভাবশালী শান্তিপন্থী গ্রুপ ছিল যারা যুদ্ধের বিরোধিতা করত। গাজার ধ্বংসযজ্ঞ ও সেনা অভিযানের পর তারা যেন রাতারাতি গুম হয়ে গেছে।
অপরদিকে, অনেক জায়োনিস্ট বা তাদের উত্তরসূরিরা গাজায় চালানো হিংস্রতার তীব্র বিরোধিতা করছেন। তবু মোটা দাগে, ফিলিস্তিনিরা প্রায় সব ইহুদিকেই দোষারোপ করছেন তাদের ওপর চালানো এই অমানবিক নিপীড়নের জন্য।
গাজা যুদ্ধ ইহুদি জাতিসত্তার ইতিহাসে এক স্থায়ী কলঙ্কচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। যেমন হিটলার ইহুদি নিধনের জন্য ইতিহাসে ঘৃণিত ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন, তেমনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুও গাজায় গণহত্যা, শিশুদের অভুক্ত রেখে হত্যা, হাসপাতাল ধ্বংস ও যুদ্ধবিরোধীদের নিঃশেষ করার মতো অপরাধে ইতিহাসের পাতায় আরেক ঘৃণিত নাম হয়ে থাকবেন।
এই ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের দায় শুধুমাত্র নেতানিয়াহুর নয়—ইসরায়েলি জনগণেরও রয়েছে সমান ভূমিকা। কারণ, জনসমর্থন ও সামাজিক সহযোগিতা ছাড়া এত বড় হত্যাযজ্ঞ দীর্ঘ সময় চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো না।
এখানে আরও একবার মনে করিয়ে দিতে হয়, অনেক ইহুদি—যারা ইসরায়েলের নীতির ঘোরতর বিরোধী এবং গাজা যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করছেন—তারাও শুধুমাত্র তাদের ইহুদি পরিচয়ের কারণে আজ অবমাননার শিকার হচ্ছেন।
ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগেও ইউরোপজুড়ে ইহুদিদের নিয়ে একটি নেতিবাচক ধারণা প্রচলিত ছিল—বিশেষ করে সুদে টাকা ধার দিয়ে সাধারণ মানুষকে শোষণের অভিযোগে। হিটলার বিশ্বাস করতেন, ইহুদিরা জার্মানির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে, তাই তিনি তাদের নানা নিষ্ঠুর উপায়ে শাস্তি দিয়েছিলেন।
ইউরোপের বহু দেশে তখন রাস্তাঘাটে ইহুদিদের গালি দেওয়া, বৈষম্যের শিকার করা কিংবা জনসমক্ষে অপমান করা ছিল এক প্রকার স্বাভাবিক ঘটনা। কখনো এসব ছিল তাদের কোনো কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া, আবার অনেক সময় তারা বিনা দোষেই নিগৃহীত হতেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার পর, জাতিসংঘ একটি চার্টার প্রণয়ন করে ঘোষণা দেয়—ইহুদিদের আর কখনো কোনো জাতিগোষ্ঠীর হাতে নিগৃহীত হতে দেওয়া যাবে না। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাস এই যে, এক সময় নিগৃহীত হওয়া জাতিই আজ নিপীড়কের ভূমিকায়!
‘অ্যান্টিসেমিটিজম’ বা ‘ইহুদি-বিদ্বেষ’ নামে পশ্চিমা বিশ্বে একের পর এক নতুন আইন জারি করা হয়েছে। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইহুদি জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করা, কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় এটি সমালোচনা রোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদি প্রভাবশালী মহল এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের চারপাশে এক ধরনের ‘কাঁচের ঘর’ তৈরি করেছে—যেখানে কেউ ইহুদিদের সমালোচনা করলেই তাকে ‘অ্যান্টিসেমিটিক’ বলে দোষারোপ করা হয়।
এই একচোখা অবস্থানের অন্যতম প্রচারমাধ্যম হলো নিউ ইয়র্ক টাইমস। পত্রিকাটি ‘অ্যান্টিসেমিটিজম’ সংক্রান্ত এই কাঁচঘরের বড় সমর্থক হয়ে উঠেছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রখ্যাত কলামিস্ট ব্রেট স্টিভেন্স যেন ইসরায়েলের মুখপাত্র হয়ে উঠেছেন। প্রতি সপ্তাহেই তিনি গাজা যুদ্ধের পক্ষে লেখেন।
আমি নিজে তার কত লেখার প্রতিবাদ করে পত্রিকায় মতামত পাঠিয়েছি! এই সপ্তাহেও তিনি একটি কলামে লিখেছেন—‘না, ইসরায়েল গাজায় কোনো গণহত্যা চালাচ্ছে না।’ অথচ বাস্তবতার সঙ্গে এই বক্তব্যের বিস্তর ফারাক। তিনিই প্রথম যিনি প্রচার শুরু করেন যে, ‘গাজা যুদ্ধের সমালোচনাই হলো ইহুদি-বিদ্বেষ বা অ্যান্টিসেমিটিজম।”
তবে আজ বাস্তবতা পাল্টেছে। গাজা যুদ্ধ নিয়ে পথে-ঘাটে, ক্যাম্পাসে, সভা-সমাবেশে মানুষ সরব। তাদের কেউ কেউ সমালোচনা করছেন, কেউ আবার প্রশ্ন করছেন এই প্রপাগান্ডার দায়ভার নিয়ে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসন এই ‘ইহুদি বিদ্বেষ’ তত্ত্বকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। বিশেষ করে যারা ইসরায়েলবিরোধী বা যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিচ্ছেন, তাদের নানা রকম শাস্তির মুখে পড়তে হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে প্রতিবাদ-আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল, ট্রাম্প প্রশাসন সেগুলোকেও ‘ইহুদি বিদ্বেষী’ আখ্যা দিয়ে দমন করার চেষ্টা করেছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুদান আটকে দেওয়া হয়েছে, আবার বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা বাতিলের হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে—যদি তারা তথাকথিত ‘ইহুদি বিদ্বেষী’ কার্যক্রম বন্ধ না করে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন হয়তো অনেকটাই থেমে গেছে—এটা সত্য। কিন্তু এই প্রতিবাদ এখন শুধু ক্যাম্পাসে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা রূপ নিচ্ছে সাধারণ জনগণের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ায়, যা এখন প্রতিফলিত হচ্ছে ভোটের বাক্সে।
গত দু’মাসে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বড় শহরে মেয়র পদে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। যারা বিজয়ী হয়েছেন, তাদের আগামী নভেম্বরে মেয়র হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত—কারণ এসব শহরে ডেমোক্র্যাটিক ভোটারদের আধিপত্য বিপুল।
এই দুই শহর—নিউ ইয়র্ক ও মিনিয়াপোলিস—আমেরিকার রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি কেন্দ্র। অতীতে এসব শহরে ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান নিয়ে কোনো প্রার্থী নির্বাচনে দাঁড়ানোর কথাও ভাবতে পারতেন না। বরং যে প্রার্থীরা মেয়র হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন, তাদের ‘সম্ভাব্যতা যাচাই’ করতে হতো ইহুদি লবি দ্বারা।
এমনকি অনেককে নির্বাচনের আগে ইসরায়েল সফর করে আনুষ্ঠানিকভাবে আনুগত্য প্রকাশ করতে হতো—এই বার্তা দিতে হতো যে, ‘আমি ইসরায়েলের বন্ধু’।
কিন্তু এবার সেই চিত্র বদলেছে। প্রাইমারিতে নির্বাচিত প্রার্থীরা কেউই গাজা যুদ্ধকে সমর্থন করেননি। বরং তারা যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিয়েই জনসমর্থন পেয়েছেন। এটি একটি বড় রাজনৈতিক পালাবদলের ইঙ্গিত।
এখন সেইসব দিন পেছনে। গত জুন মাসে নিউ ইয়র্ক শহরের প্রাইমারি নির্বাচনে জয় পেয়েছেন জোহরান মামদানি—যিনি ফিলিস্তিনিদের ‘ইন্তিফাদা’কে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তার এই বিজয় ছিল ইহুদি লবির জন্য এক বড় ধাক্কা। সেই ধাক্কা সামাল দেওয়ার আগেই, গত সপ্তাহে মিনিয়াপোলিস শহরের মেয়র প্রাইমারিতে জয় পেয়েছেন আরেক মুসলিম প্রার্থী ও গাজা যুদ্ধের ঘোর বিরোধী কণ্ঠস্বর ওমর ফাতেহ।
এই দুটি বড় শহরের ভোটার রায় স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে—খোদ আমেরিকাতেই গাজা যুদ্ধবিরোধী জনমত কীভাবে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। এটি আর শুধু বামপন্থী বা মুসলিম অভিবাসীদের ক্ষোভ নয়—এটি হয়ে উঠেছে মূলধারার রাজনৈতিক বাস্তবতা।
ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে বাঁধ তৈরি করে গাজা যুদ্ধবিরোধী ‘জলপ্রবাহ’ থামানোর চেষ্টা করেছেন, কিন্তু অন্যদিকে এই জলপ্রবাহ যেন আরেকদিক দিয়ে উপচে পড়ছে, ভেঙে দিচ্ছে সেই কৃত্রিম বাঁধ।
মানুষের এই ক্ষোভ ও প্রতিবাদ এখন আর মেয়র নির্বাচনে ভোট দেওয়া, বা বক্তৃতা-বিবৃতি কিংবা লেখালেখির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইসরায়েলের গণহত্যাকে যারা সমর্থন করছে, তাদের সমালোচনা করলেই ‘অ্যান্টিসেমিটিজমের ট্যাগ মেরে বিষয়টিকে চাপা দেওয়ার যে চেষ্টাই হোক না কেন—তা এখন আর সফল হচ্ছে না।
গাজা যুদ্ধের বিরুদ্ধে আজ সারা পৃথিবীর মানুষ শুধু ক্রুদ্ধ নয়, বরং ধৈর্যহীন হয়ে উঠছে। এই ক্ষোভ কেবল রাজনীতি নয়, সভ্যতার নৈতিক ভিত্তিকেও নাড়িয়ে দিচ্ছে।
গত এক সপ্তাহে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইহুদিরা কীভাবে নাজেহাল ও বিদ্বেষের শিকার হচ্ছেন, সে চিত্র খতিয়ে দেখলে বোঝা যায়—গাজায় হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে তারা শুধু ফিলিস্তিনিদের খুন করেনি, বরং আস্তে আস্তে পৃথিবীর নানা প্রান্তেই নিজেদের বসবাস অনিরাপদ করে তুলছে। ফ্রান্স ও ব্রিটেনে রাস্তাঘাটে ইহুদিদের ওপর হামলার ঘটনা বাড়ছে।
২১ জুলাই, গ্রীসের সাইরোস দ্বীপের কাছে গাজা যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভকারীরা একটি মেরিটাইম ক্রুজ—‘মানো মেরিটাইম’-এ থাকা ১,৬০০ ইসরায়েলিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখে, যাতে তারা জাহাজ থেকে নামতে না পারে। এটি ইউরোপের ইহুদি ইতিহাসে এক তিক্ত স্মৃতির প্রতিধ্বনি তুলে আনে—যখন জাতিগত পরিচয় ও পাসপোর্টের কারণে মানুষকে হয়রানি ও শত্রুতা মোকাবেলা করতে হতো।
এই ঘটনাটি প্রমাণ করে, গাজায় চালানো সহিংসতার দায়ভার শুধু ইসরায়েলি সরকার নয়—সাধারণ ইসরায়েলিরাও এখন সেই বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হচ্ছেন।
ইসরায়েলি পর্যটকদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন শিশুসহ পরিবার নিয়ে ছুটিতে যাওয়া মানুষ, কেউ কেউ ছিলেন বয়স্ক পেনশনভোগী। তারা একপ্রকার ‘ভাসমান হোটেলে’ আটকা পড়ে থাকেন—যখন বন্দর কর্তৃপক্ষ এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় কী সিদ্ধান্ত নেবে তা নিয়ে দ্বিধায় ছিল।
জাহাজ ঘিরে তখন বিক্ষোভকারীরা ফিলিস্তিনের পতাকা উড়িয়ে ইসরায়েলবিরোধী স্লোগান দিতে থাকে।
এই ঘটনাটি দেখায়, ‘গাজা যুদ্ধ’ শুধু মধ্যপ্রাচ্য সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ইসরায়েলের রাজনৈতিক অবস্থান বিশ্বের বহু স্থানে ইহুদিদের সামাজিক অবস্থান ও নিরাপত্তাকেও প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ইসরায়েলের ইংরেজি দৈনিক ‘জেরুজালেম পোস্ট’-এ এই সপ্তাহে প্রকাশিত একটি খবরে বলা হয়েছে—স্পেনে স্প্যানিশ বিমান সংস্থা ভুয়েলিং এক ইহুদি গ্রীষ্মকালীন শিবিরের পরিচালক এবং প্রায় ৫০ জন শিশুকে জোর করে বিমান থেকে নামিয়ে দিয়েছে।
ইসরায়েলি মন্ত্রী আমিচাই চিকলির দাবি অনুযায়ী, ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সী ওই শিশুরা বিমানে হিব্রু ভাষায় গান গাইছিল। তার অভিযোগ, শুধুমাত্র হিব্রু গান গাওয়ার কারণে ক্যাম্প পরিচালককে গ্রেপ্তার করা একটি গুরুতর ইহুদি-বিরোধী ঘটনা।
আরেকটি দৃষ্টান্ত ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর ডিউলেফিটে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদিদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য যে শহরকে ‘ন্যায়পরায়ণদের শহর’ হিসেবে সম্মান জানানো হয়েছিল, সেই শহরেই এবার ট্যুর দ্য ফ্রান্স সাইকেল প্রতিযোগিতার সময় দেখা গেল ভিন্ন এক চিত্র।
যাত্রাপথের মধ্য দিয়ে যাওয়া এই শহরে শতাধিক ফিলিস্তিনিপন্থী বিক্ষোভকারী ফিলিস্তিনি পতাকা উত্তোলন করেন, ‘স্বাধীন ফিলিস্তিন’ দাবিতে নানা ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড বহন করেন। একটি বাড়ি ফিলিস্তিনি পতাকায় মোড়ানো ছিল, আর রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো ‘ফিলিস্তিনকে মুক্ত করো’—এই স্লোগানে শহরজুড়ে প্রতিবাদের প্রতিধ্বনি তোলে।
একটি ব্যানারে লেখা ছিল— আফামার সি'স্ট টুয়ার—ফরাসি ভাষায় যার অর্থ: ‘ক্ষুধার্তদের মৃত্যু’।
ইতিহাসের কী নির্মম পরিহাস! যে শহর একদিন নিপীড়নের হাত থেকে ইহুদিদের আশ্রয় দিয়েছিল, আজ সেই শহরেই ইহুদিরা ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়েছে—ইসরায়েলের আগ্রাসনের দায় নিয়ে।
এটি কেবল প্রতীকী নয়, বরং ঐতিহাসিক ন্যায়ের এক উল্টো প্রতিবিম্ব—যেখানে শিকারী একসময় শিকার ছিল।
বেলজিয়ামের কর্তৃপক্ষ গাজায় যুদ্ধাপরাধের সন্দেহে দেশটিতে অনুষ্ঠিত টুমরোল্যান্ড সঙ্গীত উৎসবে অংশ নেওয়া দুই ইসরায়েলি নাগরিককে গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। ‘হিন্দ রিজাব ফাউন্ডেশন’—একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন যা বিশ্বজুড়ে আইডিএফ সৈন্যদের বিচারের জন্য কাজ করে—তাদের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই দুজন ‘যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধী’, যারা গাজায় সংঘটিত গণহত্যায় জড়িত।
পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ইসরায়েল ও ইহুদি-বিরোধী আন্দোলন ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে, আর প্রতি সপ্তাহে এরূপ ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে। আমেরিকার নির্বাচনে ইহুদিদের প্রভাব যতটা ছিল, গাজায় সংঘটিত গণহত্যার ঘটনায় তা ধীরে ধীরে কমছে।
গাজায় শিশুদের উপোস করিয়ে চালানো শিশুনিধন কর্মসূচি ইসরায়েলি সরকার চালিয়ে যাওয়ায় বিশ্বব্যাপী ক্রোধের ঝড় তীব্রতর হচ্ছে। ফ্রান্স ইতোমধ্যে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এবং ব্রিটিশ সংসদের ২০০ জন এমপি সরকারের কাছে দাবি করেছে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, ইসরায়েল ও ইহুদি লবির দাপটের দিন ধীরে ধীরে অস্তমিত হতে শুরু করেছে।