Published : 12 Jul 2025, 09:35 PM
সরকার তিন বছরের জন্য বাংলাদেশে জাতিসংঘ মানবাধিকার হাই কমিশন—এইচআরসির কার্যালয় খোলার খোলার অনুমতি দিয়েছে। এতে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি যে রাতারাতি উন্নত হয়ে যাবে, এমনটা কেউ বলবেন না। তবে এটুকু বলা যায়, এক ধরনের ‘ওয়াচডগ গ্রুপ’—অর্থাৎ মানবাধিকারের ওপর নিরপেক্ষভাবে নজরদারি চালানো একটি সংস্থা—এখন দেশে উপস্থিত থাকবে, যারা আমাদের ভুলত্রুটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে পারবে।
বাংলাদেশের নিজস্ব মানবাধিকার কমিশনও আছে, যাদের নিয়োগকর্তা সরকার। অতীতে তারা মানবাধিকার নিয়ে কী ধরনের কাজ করেছেন এবং ভবিষ্যতেও যে কী করবেন—তা নিয়ে বেশি কথা না বলাই ভালো।
জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশন একটি সম্মানিত সংস্থা, যা বিশ্বের প্রতিটি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর নজর রাখে—কখনো প্রত্যক্ষভাবে, কখনো পরোক্ষভাবে। এই সংস্থা কোনো দেশকে সরাসরি মানবাধিকার বাস্তবায়নে বাধ্য করতে পারে না, কিন্তু তাদের পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সেই দেশটির ওপর নানা ধরনের চাপ প্রয়োগ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আইএমএফ সেই দেশকে আর্থিক সহায়তা বন্ধ করে দিতে পারে।
একটি আন্তর্জাতিক ফোরাম হিসেবে জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনের কার্যক্রম কোনো দেশের মানবাধিকার নীতিকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করতে পারে। এ সংস্থা সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার, বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ ও অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে বিশ্বব্যাপী
বাংলাদেশে জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয় খোলা হলে, আশা করা যায় কাউন্সিল কিছু স্বাধীন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করবে, যারা দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন। তারা সরকারের প্রভাবমুক্ত থেকে হাইকমিশনারের ‘চোখ ও কান’ হিসেবে কাজ করবেন। যেসব ক্ষেত্রে সরকারের ঘাটতি থাকবে, সেগুলো প্রতিকারের জন্য তারা সরকারকে পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানাবেন।
বিশ্বে বর্তমানে ১৬টি দেশে জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারের অফিস রয়েছে। বাংলাদেশসহ আরও ৪৩টি দেশে এমন কার্যালয় স্থাপন নিয়ে আলোচনা চলছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনের কিছু নিজস্ব নিয়মনীতি ও শর্ত থাকে—যেমন: তাদের কর্মীদের বাধাহীনভাবে দেশে প্রবেশ ও চলাফেরার সুযোগ, স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ, এবং পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এসব বিষয় নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে যেমন আলোচনা চলছে, তেমনি বাইরে কেউ কেউ এ নিয়ে আতঙ্কও ছড়াচ্ছেন।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, মানবাধিকার বাস্তবায়ন নিয়ে কমিশনের কার্যক্রমের কারণে দেশের সরকারই সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে। অথচ সরকারের বাইরের রাজনৈতিক দল এবং অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর—যাদের ওপর আমাদের দেশে প্রায়ই নিপীড়ন ও অন্যায় ঘটে—তাদের এই সংস্থার উপস্থিতিতে স্বস্তি বোধ করার কথা। কারণ, এই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সরকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষভাবে সোচ্চার হতে পারে।
কিন্তু জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের অফিস খোলার সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরপরই আমাদের দেশের কিছু প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দল এর প্রবল সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছে।
এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সংগঠনটির কেন্দ্রীয়যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগরীর সেক্রেটারি মাওলানা মামুনুল হক বলেছেন, “গত ১৬ বছরে যেসব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও খুন ঘটেছে, সেগুলোর বিচার নিশ্চিত না করে এখন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জন্য দরজা খুলে দেওয়া মানে অপরাধীদের দায়মুক্তি দেওয়া এবং জনগণের প্রতি অবিচার করা। খাল কেটে কুমির আনার অধিকার সরকারকে কেউ দেয়নি। আমরা ঢাকায় এই মানবাধিকার কার্যালয় প্রতিষ্ঠিত হতে দেব না।”
কিছুদিন আগে হেফাজতে ইসলামের আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী বলেছেন, “সম্প্রতি জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে কার্যালয় স্থাপনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে আমরা গভীর উদ্বেগ ও আশঙ্কা প্রকাশ করছি। অতীতে দেখা গেছে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা মানবাধিকারের নামে ইসলামী শরিয়াহ, পারিবারিক আইন এবং ধর্মীয় মূল্যবোধে হস্তক্ষেপের অপচেষ্টা করেছে।”
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, যার সামাজিক, পারিবারিক ও ধর্মীয় কাঠামো ইসলামী মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই দেশের সংস্কৃতি, পরিবারব্যবস্থা ও নৈতিক রীতি-নীতিকে অক্ষুণ্ণ রাখা আমাদের ধর্মীয় এবং নাগরিক দায়িত্ব।”
ধারণা করা যায়, হেফাজতে ইসলামের মূল উদ্বেগ হলো, দেশের নারীরা তাদের অধিকার নিয়ে যেভাবে সচেতন হচ্ছেন এবং অধিকার আদায়ে সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছেন, মানবাধিকার কমিশন যদি তাদের এই ধরনের দাবি ও কার্যক্রমকে সমর্থন দেয়, তাহলে তা নারীদের আরও উৎসাহিত করবে। দেশে ইতিমধ্যে নারী অধিকার সংক্রান্ত বিভিন্ন সংস্কারমূলক কমিশন হয়েছে, যাদের কার্যক্রম সম্পর্কে হেফাজতে ইসলামের সতর্ক ও সংরক্ষণশীল অবস্থানে রয়েছে।
ঢাকায় সম্প্রতি নারী মৈত্রীযাত্রাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নারীদের প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে সম্প্রতি, যেখানে আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন যে ইসলামপন্থীরা নারীদের ঘরের বাইরে কাজের সুযোগ সীমিত করার চেষ্টা করছে। এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়; অনেকদিন ধরেই তাদের বিরুদ্ধে নারীর মানবাধিকার সংক্রান্ত বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার চেষ্টা হওয়ার কথাও ওঠে।
অন্য একটি বিষয়ে শুধু হেফাজতে ইসলামের নয়, দেশে বর্তমানে সক্রিয় সব রাজনৈতিক দলেরই উদ্বেগ রয়েছে। মামুনুল হকের বক্তব্য থেকে ধারণাটা স্পষ্ট হয় যে, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে যেসব বিচার চলছে, তার মান সম্পর্কে মানবাধিকার হাইকমিশন নিশ্চয়ই কিছু কথা বলবে। কারণ, তারা চাইবে আসামিরা ন্যায়নিষ্ঠ ও সুবিচার পেতে পারেন। দেশে যেখানে প্রতিহিংসার আগুন জ্বলছে এবং কোর্টগুলোতে আসামিদের ওপর বিরোধীরা চড়াও হচ্ছে, এসব বিষয় নিয়েও জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন ভবিষ্যতে উদ্বেগ প্রকাশ করতে পারে।
সম্ভবত বিচারে কোনো পক্ষের বক্তব্য তাদের পছন্দ নয়। বিচারের গুণগতমানের চেয়ে শাস্তির গুরুত্ব বেশি মনে করছে। তাদের এই ধরনের মনে করার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে।
জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয় স্থাপন নিয়ে বিএনপি দলীয়ভাবে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি। তবে দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ব্যক্তিগতভাবে এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তার মতে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ থাকলে তা রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
তবে দলের ভেতরে সবাই একইভাবে বিষয়টি দেখেন না বলেই মনে হয়। দলগতভাবে হয়তো ঢাকায় জাতিসংঘের এই কার্যালয় স্থাপনকে খুব স্বস্তিদায়ক ভাববে না। কারণ অতীতে বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল, তাদের মানবাধিকার রেকর্ডও সমালোচনার উর্ধ্বে ছিল না। ফলে ভবিষ্যতে দলটি ক্ষমতায় এলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের বিষয়টি তাদের জন্য সুবিধাজনক হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।
এদিকে, বিএনপির নেতাকর্মীদের নিয়েও মাঝে মাঝে প্রশ্ন উঠছে। সদ্য ঘটে যাওয়া একটি ঘটনায় পুরান ঢাকায় যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কয়েকজন কর্মীর বিরুদ্ধে ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে।
বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “কোনো দুষ্কৃতকারীর অপরাধের দায় দল নেবে না।” কিন্তু বাস্তবতা হলো, অতীতে এ রকম বহু অপরাধীই দলীয় পরিচয়ে নেতৃত্বে উঠে এসেছিল।
জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনের কাজ নিয়ে যাদের মনে সন্দেহ রয়েছে, তারা চাইলে ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার নিয়ে সংস্থাটির ভূমিকা পর্যালোচনা করতে পারেন। গাজা যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েলের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণহত্যার বিষয়ে বিশ্ববাসীর বিবেক জাগ্রত করতে এই কমিশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
হাইকমিশন বেসামরিক জনগণের ওপর ইসরায়েলি হামলাগুলোকে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তারা স্পষ্ট ভাষায় বলেছে, পরিকল্পিতভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে—জাতিগত, বর্ণগত বা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে—ধ্বংস করতে চাইছে, যা আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যার সংজ্ঞার সঙ্গে মিলে যায়।
জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনের প্রতিবেদন, তথ্য ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার বিচার শুরু করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইউয়াভ গালান্তের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়।
এই সব কিছুই সম্ভব হয়েছে জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনভাবে কাজ করার ফল হিসেবে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই আশা করা যায়, বাংলাদেশে মানবাধিকার হাইকমিশনের কার্যালয় খোলা হলে সেটিও গঠনমূলক ও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে।
যারা দেশে অন্যায়ের শিকার হন—বিশেষ করে নিপীড়িত, রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা মানুষরা—তারা হয়তো এখন একটিমাত্র কণ্ঠ পাবেন, যারা তাদের পক্ষে কথা বলবে। যখন বিরোধী রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে গুম, খুন কিংবা অহেতুক জেল-জুলুমের অভিযোগ উঠবে, তখন এই হাইকমিশন সেসব ঘটনা আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরতে পারবে।
জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনের একটি স্বাধীন ও সক্রিয় উপস্থিতি ভবিষ্যতের যে কোনো সরকারকে অতিরিক্ত দমন-পীড়ন চালাতে নিরুৎসাহিত করতে পারে। এই কার্যালয় হয়তো এক ধরনের প্রতিরোধ বা প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করবে, যা রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার রোধে সহায়ক হতে পারে।