Published : 08 Aug 2026, 05:05 PM
জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির দিনে গত ৫ অগাস্ট দিল্লিতে ফরেইন করেসপন্ডেন্টস অব সাউথ এশিয়া আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে শেখ হাসিনা যে বক্তব্য দিয়েছেন, ভারত সেটি সমর্থন করে না বলে দাবি করেছেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল। ৭ অগাস্ট সংবাদ সম্মেলনে তিনি বললেন, একটি বেসরকারি সংগঠনের এই অনুষ্ঠান আয়োজনে ভারত সরকারের কোনো ভূমিকা ছিল না। শেখ হাসিনা প্রশ্নে ভারত এর আগেও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে, ভারত সরকারের সমর্থন ও সহযোগিতা ছাড়া কোনো সংবাদ সম্মেলন বা অনুষ্ঠানে দিল্লিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার বক্তব্য দেওয়া এমনকি ই-মেইলে কাউকে সাক্ষাৎকার দেওয়া সম্ভব কি না? তাছাড়া শেখ হাসিনা প্রশ্নে ভারত কেন এরকম একটি ‘ক্যামোফ্লাজ’ তৈরি করে রাখতে চায় এবং এ কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হচ্ছে কি না?
যদিও সংবাদ সম্মেলনে রণধীর বলেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় নানা বিষয়ে তার দেশ কাজ করছে। বিশেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্যে। কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্যের বাইরেও বৃহৎ প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের আরও যেসব অমীমাংসিত এজেন্ডা রয়েছে, সেগুলো সুরাহার পথে শেখ হাসিনার প্রশ্নটি এখন বড় অন্তরায় বলে অনেকেই মনে করেন।
বলা হয়, ভারত শেখ হাসিনাকে শুধুমাত্র একজন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই দেখে না। বরং শেখ হাসিনা তথা আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ সম্পর্কের কারণে ভারত সরকার তাকে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে বিবেচনা করে। অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকারের কাছে তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত আসামি। ফলে দুদেশের মধ্যে বন্দিবিনিময় চুক্তি থাকলেও সেই চুক্তিতে ভারত যে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে না—এটি নিশ্চিত। তার মানে শেখ হাসিনার প্রশ্নে বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক আলাপচারিতায় একটি বড় মারপ্যাঁচ হয়ে আছে, তার ব্যাপারে দুদেশের দৃষ্টিভঙ্গি। ফলে কীভাবে এই সমস্যার সমাধান হবে—সে বিষয়ে এখনই উপসংহারে পৌঁছানো কঠিন। তাছাড়া ভারত প্রশ্নে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের যে অবস্থান ছিল, বর্তমান বিএনপি সরকারও যে সেই একই অবস্থানে আছে, তা সাম্প্রতিক নানা ঘটনায় প্রতীয়মাণ হয়েছে।
তবে শেখ হাসিনা সত্যিই ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন কি না বা কোন প্রক্রিয়ায় ফিরবেন এবং তারপর কী হবে—সেই প্রশ্নের বাইরে সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলন নিয়ে আরও কয়েকটি বিষয়ে আলোকপাত করা জরুরি।
১. দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে শেখ হাসিনার ‘বিদ্বেষমূলক’ বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে প্রচার করা যাবে না—এরকম একটি নির্দেশনা আছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের। যে নির্দেশনার আলোকে বাংলাদেশের কোনো সংবাদমাধ্যমই তার বক্তব্য (বিদ্বেষমূলক না হলেও) খুব ব্যতিক্রম ছাড়া প্রচার করেনি বা এখনও করছে না। যদিও কোন বক্তব্যটি ‘বিদ্বেষমূলক’ সেটি কে ঠিক করবে বা বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের মানদণ্ড কী, সেটি স্পষ্ট নয়।
এই তর্কের ভেতরে যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে সেটি হলো, তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে আইন করে বা রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কারো বক্তব্য প্রচার ঠেকানো যায় কি না। কেননা কোটি কোটি মানুষের কাছে সেই বক্তব্য পৌঁছে যাওয়ার নানা তরিকা আছে। প্রান্তিক মানুষের হাতেও এখন স্মার্ট ফোন, যাতে ইন্টারনেট সংযুক্ত আছে। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ায় যে বক্তব্য লাইভ বা সরাসরি সম্প্রচার করা হয়, সেটি পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকেই দেখা ও শোনা সম্ভব এবং ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনার বক্তব্য এবং ওই সংবাদ সম্মেলন নিশ্চয়ই লাখ লাখ মানুষ দেখেছেন। অর্থাৎ সংবাদমাধ্যমের ওপর নির্দেশনা বা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বক্তব্য প্রচার বন্ধ করা গেলেও কার্যত কোনো মানুষেরই সেই তথ্য বা বক্তব্য না জানার কোনো কারণ নেই। বরং এই ধরনের নির্দেশনা বা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সংবাদমাধ্যমকে একধরনের চাপে ফেলা হয় এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করা হয়। কেননা যে খবরের সংবাদমূল্য আছে, সেটি প্রকাশ ও প্রচার করা সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। সুতরাং, কোনো একজন বিশেষ ব্যক্তির খবর প্রচার করা যাবে না—এর পেছনে যে যুক্তিই দেওয়া হোক না কেন, আখেরে তাতে কোনো লাভ হয় না। কারণ মানুষ বিকল্প নানা উপায়ে সেটি দেখে এবং তার মধ্য দিয়ে মানুষের কাছে সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়।
এখন যেমন দণ্ডিত আসামি বলে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে সংবাদমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে, একইভাবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও যখন লন্ডনে নির্বাসিত জীবনযাপন করছিলেন, তার বক্তব্যও একই অজুহাতে প্রকাশ ও প্রচারের বিষয়ে আওয়ামী লীগ সরকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। তার মানে রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি আচরণে কোনো পরিবর্তন হয়নি।
২. দিল্লিতে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা যা বলেছেন, সেখানে নতুন কিছু ছিল না। বরং তিনি গত দুই বছর ধরে জুলাই অভ্যুত্থান এবং বাংলাদেশের রাজনীতি ও সরকার নিয়ে যা বলতেন, এখনও সেই একই অবস্থানে রয়েছেন। জুলাই অভ্যুত্থানকে তিনি বিদেশি শক্তির ষড়যন্ত্র এবং এর পেছনে জঙ্গি গোষ্ঠীর মদদ ছিল বলে বিশ্বাস করেন। জুলাই অভ্যুত্থানের পরে ক্ষমতার পালাবদলের মধ্য দিয়ে দেশ ও দেশের মানুষের কী লাভ হয়েছে, সেটি অন্য তর্ক। কিন্তু শুধুমাত্র ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানকে ব্যাখ্যা করা হলে প্রকৃত অর্থে যে সাধারণ মানুষেরা এই আন্দোলনের রাস্তায় নেমেছিলেন, তাদের প্রতি অসম্মান করা হয়। মনে রাখতে হবে, সাধারণ মানুষের বিরাট অংশের সমর্থন ও অংশগ্রহণ ছাড়া শুধুমাত্র বিদেশি শক্তির সমর্থনে একটি পরাক্রমশালী ও কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন ঘটানো সম্ভব নয়। সবশেষ ইরান তার বড় উদাহরণ। তাছাড়া বিদেশি শক্তি বা কোনো আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর সমর্থন ও সহযোগিতা থাকলেও আওয়ামী লীগের মতো বিরাট দল এবং শেখ হাসিনার মতো একজন প্রতাপশালী শাসকের পতনের পেছনে তাদের নিজেদের দায় নেই—এটিও বলার কোনো সুযোগ নেই। বিশেষ করে লাগামহীন দুর্নীতি, অর্থপাচার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দেওয়া, যোগ্য ও মেধাবী লোকদের বাদ দিয়ে চাটুকারদের ক্ষমতায়িত করার কারণে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ যে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল, সেই সত্যটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে গত দুই বছরেও শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছ থেকে এরকম কোনো আত্মোপলব্ধি বা আত্মসমালোচনার কোনো উদাহরণ তৈরি হয়নি। দিল্লির সংবাদ সম্মেলনও তার ব্যতিক্রম ছিল না।
৩. রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে শেখ হাসিনার প্রশংসা ও সমালোচনা দুটিই আছে। কিন্তু অভ্যুত্থানে পতনের পরে পরাজিত শাসকের ভালো কাজগুলো ম্লান হয়ে যায়। যেমন শেখ হাসিনাকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হয় তার ভাষা, শব্দচয়ন এবং তার ‘আমিত্ব’ নিয়ে। সেই আমিত্ব থেকে তিনি যে এখনও বের হতে পারেননি, তা দিল্লির সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া তার বক্তব্যে স্পষ্ট।
স্মরণ করা যেতে পারে, শেখ হাসিনার আমিত্বের সমালোচনা করার কারণে ২০১৭ সালে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ে সুরেন্দ্র কুমার সিনহা শেখ হাসিনার নাম উল্লেখ না করে আমিত্বের সমালোচনা করেছিলেন। তখন সরকার তথা আওয়ামী লীগ ওই আমিত্বকে বঙ্গবন্ধুর সমালোচনা হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। যদিও রায়টি ভালো করে পড়লে বোঝা যাবে তিনি বঙ্গবন্ধুকে নয়, বরং শেখ হাসিনার আমিত্বের সমালোচনা করেছিলেন।
রায়ের একটি অংশে বিচারপতি সিনহা লিখেছেন: No nation, no country is made of or by one person. If we want to truly live up to the dream of Sonar Bangla as advocated by our father of the nation, we must keep ourselves free from this suicidal ambition and addiction of ‘I’ness. That only one person or one man did all this and etc. (কোনো জাতি বা দেশ কোনো এক ব্যক্তিকে দিয়ে গড়ে ওঠে না, কিংবা কোনো একজন দ্বারা তা গঠিতও হয় না। আমরা যদি সত্যিই জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলায় বাঁচতে চাই, তাহলে অবশ্যই আমাদেরকে আমিত্বের আসক্তি এবং এই আত্মঘাতী প্রবণতা থেকে মুক্ত হতে হবে।)
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে কোটি বাঙালির একজন হয়েছিলেন। আবার অন্য অর্থে শেখ মুজিবই হয়েছিলেন ৭ কোটি বাঙালি। ১৯ মিনিটের ভাষণে তিনি ৬৯ বার আমি, আমার, আমরা ও আমাদের শব্দটি ব্যবহার করেছেন (বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ইতিহাস ও তত্ত্ব, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩৪)। সুতরাং তার সেই আমি, আমার, আমরা এবং আমাদের উচ্চারণের সঙ্গে অন্য কারো আমিত্বের তুলনা চলে না।
৪. বাংলাদেশের রাজনীতি মূলত পরিবারতান্ত্রিক—তাতে কোনো সন্দেহ নেই। পরিবারতন্ত্রের ভালো মন্দ নিয়ে অনেক আলোচনা আছে। পরিবারতন্ত্র সব সময় যে খারাপ, সেটিও বলার সুযোগ নেই। কিন্তু পরিবারতন্ত্র যখন দল ও দেশকে গ্রাস করে ফেলে; পরিবারতন্ত্রের কারণে যখন একটি বড় দল, বিশেষ করে যে দলটি দেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে, তারা যখন দল ও দেশকে ‘পরিবার লিমিটেড কোম্পানি’ হয়ে যায়—তখন সেটি রাজনীতির জন্য অকল্যাণ বয়ে আনে। দেশের জন্য তো বটেই। অভ্যুত্থানের পরে আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনা পরিবারতান্ত্রিক মানসিকতা থেকে কতটা বের হতে পেরেছেন বা আদৌ পেরেছেন কি না, দিল্লির সংবাদ সম্মেলনে সেই প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে। শুক্রবার বিবিসির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনে ভারত সাহায্য করবে, শেখ হাসিনার এমন প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সেই লক্ষ্যে দিল্লি গত দুই বছরে যে প্রস্তাবই দিয়েছে, শেখ হাসিনা তাতে রাজি হননি। ধারণা করা যায়, এই প্রস্তাবের একটি ছিল শেখ হাসিনা এবং শেখ পরিবারের বাইরের কাউকে দিয়ে আওয়ামী লীগের পুনর্গঠন। কিন্তু স্বভাবতই শেখ হাসিনা তাতে রাজি হননি।
৫. দিল্লির এই সংবাদ সম্মেলনে এবং তার আগেও একাধিকবার শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় জুলাই অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের জন্য আওয়ামী লীগের ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নে সরাসরি হ্যাঁ বা না বলেননি। তার বক্তব্য, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগের পতনের দিন থেকে ১৫ অগাস্ট পর্যন্ত দেশে আরও যেসব হত্যা ও অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের দায়মুক্তি দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। তাছাড়া জুলাই অভ্যুত্থানে অসংখ্য পুলিশকে হত্যা করা হয়েছে। এসব হত্যারও দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগ মনে করে, একটি ঘটনার দায়মুক্তি দিয়ে আরেকটি ঘটনার ন্যায়বিচার করা যায় না। সে কারণে জয়ের পাল্টা প্রশ্ন: আওয়ামী লীগের ক্ষমা চাওয়ার কী আছে? তার মানে বাংলাদেশের রাজনীতি যে প্রতিশোধের চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছিল, সেখানেই খাবি খাচ্ছে এবং এই চক্র থেকে বাংলাদেশে আদৌ বের হতে পারবে কি না বা বের হতে আরও কত বছর বা কত যুগ অপেক্ষা করতে হবে—সেটিই বড় প্রশ্ন।
আমীন আল রশীদ সাংবাদিক ও লেখক। ই-মেইল aminalrasheed@gmail.com