Published : 03 Jan 2026, 08:02 AM
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) একটি বিস্তৃত পরিসরের দল, যার উত্থান, বিকাশ ও জনপ্রিয়তার পেছনে জড়িত আছে জটিল সময়, বহুমাত্রিক নেতৃত্ব এবং জাতীয় সংকটের আবর্তে জন্ম নেওয়া নতুন চিন্তাধারা। এই দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেশের অস্থির সময়ের রাজনৈতিক শূন্যতা ও সমাজের নতুন আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে ডান ও বামধারার সমন্বয়ে একটি মধ্যপন্থী দলের প্রাথমিক কাঠামো গড়ে তোলেন। কিন্তু দলটিকে প্রকৃত অর্থে জনগণের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া, তাকে একটি জনপ্রিয় জনভিত্তিক ও নির্বাচনি শক্তিতে রূপান্তর করা, দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক মাঠে প্রাসঙ্গিক রাখা, এমনকি স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে সংগঠিত গণআন্দোলনের নেতৃত্বে পরিণত করা–এসব ক্ষেত্রেই বেগম খালেদা জিয়া সময়ের সঙ্গে আরও বিস্তৃত ও গভীর ভূমিকা রাখেন। অর্থাৎ, বিএনপিকে জনমানুষের দল হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বেগম খালেদা জিয়ার অবদান অধিক বিস্তৃত। এমন মূল্যায়ন শুধু আবেগ বা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নয়, চার দশকের দৃশ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ঘটনাপ্রবাহের নিরপেক্ষ পাঠ থেকেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়।
বেগম খালেদা জিয়া জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৬ সালের ১৫ অগাস্ট দিনাজপুর জেলায়। তার পিতা ইস্কান্দার মজুমদার ও মাতা তৈয়বা মজুমদার। দেশ বিভাগের পর তার বাবা ভারতের জলপাইগুড়ি থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। পারিবারিক আদি নিবাস ফেনী জেলায়। ১৯৬০ সালে তিনি তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহী–জনতার অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। পরবর্তী সময়ে, ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল তিনি শাসনব্যবস্থাকে বেসামরিক রূপ দিতে ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন এবং ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। জিয়াউর রহমান দেশের পুনর্গঠনের পাশাপাশি বাকশাল প্রতিষ্ঠার ফলে স্থগিত হওয়া বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেন। তার সময়েই রাজনৈতিক দল গঠনের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার হয় এবং এই নবউদার রাজনৈতিক পরিবেশে তিনি নতুন জাতীয়তাবাদী চেতনা নির্মাণের লক্ষ্যে বিএনপি গঠনের রূপরেখা উপস্থাপন করেন। নিঃসন্দেহে এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে কোনো দলের প্রতিষ্ঠা মানেই তার তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তা নিশ্চিত হওয়া নয়। সে সময় জনপরিসরে আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী দলের শক্তিশালী প্রভাব অব্যাহত ছিল। জিয়াউর রহমানের লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠন ও জাতীয়তাবাদকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা, কিন্তু দলকে তৃণমূলে সংগঠিত করে শক্তিশালী গণভিত্তি তৈরি ও তা গণআন্দোলনে রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়া তখনও প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়কাল ছিল সীমিত। ১৯৮১ সালের ৩০ মে এক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে তিনি শহীদ হন। রাষ্ট্রপতি, মুক্তিযোদ্ধা এবং দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাতা, সব পরিচয়ই যেন এক রাতেই নিভে যায়। পরের বছর তৎকালীন সেনাপ্রধান এরশাদের ১৯৮২ সালে নির্বাচিত সরকার উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেন, ১৯৮৩ সালে প্রধান সামরিক প্রশাসক হিসেবে শাসনভার নেন ও স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা করেন। এর ফলে সাংবিধানিক নিয়ম, গণতান্ত্রিক অধিকার, রাজনৈতিক দল ও কর্মীরা দমন-পীড়নের মুখে পড়ে। এইসব রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেই খালেদা জিয়ার স্বামীর প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি নেতৃত্ব সংকটে নিপতিত হয় এবং দলের প্রবীণ নেতারা তাকে নেতৃত্ব গ্রহণের আহ্বান জানান।
খালেদা জিয়া রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এমন সময় যখন বিএনপির জনভিত্তি ততটা দৃঢ় হয়নি এবং সামরিক শাসনের প্রভাব পুরো রাজনৈতিক পরিবেশকে ঘিরে রেখেছিল। স্বামীর আকস্মিক মৃত্যু, দলের নেতৃত্ব সংকট, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং সামরিক শাসনবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের উত্থানের সব পরিস্থিতির মধ্যে তিনি, একজন অনভিজ্ঞ নারী, ঘরোয়া জীবন ও সামরিক পরিবার থেকে বের হয়ে রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করেন।
১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে যোগ দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বের দক্ষতা প্রকাশ পেতে থাকে। কয়েক মাসের ব্যবধানে, ১৯৮৩ সালে মার্চে তিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালে অগাস্টে দলের চেয়ারপারসন হিসেবে সর্বোচ্চ নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, শক্তি এবং সক্ষমতার সঙ্গে তিনি দলের নেতৃত্বে আসেন, যা একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে এবং জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দলকে জনগণের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য ও সক্রিয় করে তোলে।
ধীরে ধীরে তিনি প্রমাণ করেন যে হারিয়ে যাওয়া সেই জাতীয় নেতৃত্বের অভাব তিনি পূরণ করতে সক্ষম। দলের নেতৃত্বের কেন্দ্রে নিজের অবস্থান পোক্ত করে তিনি বিএনপিকে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দেশের অন্যতম প্রধান গণতান্ত্রিক শক্তিতে পরিণত করেন। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে শেষ পর্যন্ত ধারাবাহিক আন্দোলন, ৮৬ সালে নির্বাচন বর্জন, অবরোধ, লংমার্চ এবং গণসমাবেশের মতো সব কার্যক্রম তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন। এই সময়ে বিএনপি আর কেবল একটি প্রশাসনিক শক্তির দল নয়; বরং একটি বৃহত্তর জনআন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে।
১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর সচিবালয়ের সামনে অবস্থান ধর্মঘটের আগে কাঁদুনে গ্যাসের শেলের শিকার হন খালেদা জিয়া
এই আন্দোলনগুলোকে শুধুমাত্র দলীয় কর্মসূচি হিসেবে দেখা উচিত নয়; এগুলো বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ১৯৮২ সালে শুরু হওয়া সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা, ছাত্র সমাজের আন্দোলন একত্র করা এবং বিভিন্ন পেশাজীবী ও শ্রমজীবী মানুষের দাবিকে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে খালেদা জিয়া রাজপথের নেতৃত্ব দৃঢ় করেন। তিনি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সাত দলীয় জোট গঠন করেন এবং এর প্রধান নেতৃত্ব প্রদান করেন। বারবার গ্রেপ্তার ও গৃহবন্দি হওয়ার পরও তিনি রাস্তায় নেমে জনতার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। এসব সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। এ ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করতে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ, যা শেষ পর্যন্ত সামরিক শাসনের পতন এবং গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করে। এ সময়ের দৃঢ় অবস্থানের কারণে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ফেরার মুহূর্ত। নির্বাচনের পূর্বে আওয়ামী লীগ জয়জয়কার করছিল। তবে দেশের ইতিহাসে অন্যতম স্বচ্ছ এই নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়া মার্জিত ও গ্রহণযোগ্য আচরণের মাধ্যমে জনগণের মন জয় করেন এবং বিএনপিকে বিজয়ী করেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী হন। এটি শুধু বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য নয়, পুরো মুসলিম বিশ্বে পাকিস্তানের বেনজীর ভুট্টোর পর দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন। তার প্রথম সরকারের সময়ে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা। সেই সময় জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা হয় এবং রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা থেকে সংসদীয় কাঠামোয় পুনঃফিরত হওয়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এই পরিবর্তন এখনও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে টিকে আছে।
সমালোচকেরা বলেন, বিএনপির জন্ম যতোটা সহজে হয়েছিল, তার জনভিত্তি গড়ে তোলা ছিল ঠিক ততটাই কঠিন। সেই কঠিন কাজটি করেন খালেদা জিয়া। তৃণমূলে সংগঠন গড়ে তোলা, নারীদের রাজনীতিতে যুক্ত করা, যুবসমাজকে দলমুখী করা এবং পেশাজীবী সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর এসব উদ্যোগ তার সময়েই শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশেষ করে তার প্রথম সরকার আমলে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা হয়। কর্মসংস্থানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়; বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে পাঁচ বছরে প্রায় ২৯ শতাংশ কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ঘটে এবং প্রায় দুই লাখ নারী এই খাতে যুক্ত হন। শিক্ষা ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা, মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা, উপবৃত্তি কর্মসূচি, শিক্ষা কার্যক্রমের বিনিময়ে খাদ্য প্রদান এবং শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি তার সরকারের উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ।
১৯৯৬ সালের নির্বাচন ও পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ও বিএনপির জনসমর্থন অপরিবর্তিত ছিল। বিএনপি পরাজিত হলেও ১১৬টি আসন পেয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিরোধী দলে পরিণত হয়। বিরোধী দলে থাকাকালীন তিনি আবারও রাজপথকে সক্রিয় করেন। গণসমাবেশ ও দেশের বিভিন্ন জায়গায় জনগণের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগের মতো সব কার্যক্রমে তিনি বিনা বিরতিতে যুক্ত থাকেন। এর ফলে দলটির জনপ্রিয়তা ও সংগঠনিক শক্তি আবারও বাড়তে থাকে। ২০০১ সালে নির্বাচন বিএনপি এক বিশাল বিজয় লাভ করে, যা খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দক্ষতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়। নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৫ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন তাকে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় ২৯তম স্থানে রাখে।
ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বেগম খালেদা জিয়া বিএনপিকে শুধু একটি দল হিসেবে গড়ে তুলেননি, বরং একটি মতাদর্শগত অবস্থানও দৃঢ় করেছেন। তিনি জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে গণমানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বাজারমুখী নীতি, গ্রামীণ উন্নয়ন ও অবকাঠামো পুনর্নির্মাণসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর বিভিন্ন সময় জোর দিয়েছেন। তার নেতৃত্বে বিএনপি একটি ডান-কেন্দ্রিক মধ্যমপন্থী জাতীয়তাবাদী দল হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিতি পায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলেন, এই অবস্থান জনগণের একটি বড় অংশের সঙ্গে একধরনের আত্মিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগ সৃষ্টি করে, ফলে বিএনপি একটি জনভিত্তিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
উল্লেখ্য যে, জিয়াউর রহমানের অবদান ছিল রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠন, রাজনৈতিক বহুত্ববাদ পুনরুদ্ধার এবং একটি সংগঠনের ভিত্তি স্থাপন। কিন্তু তিনি মাত্র কয়েক বছর সময় পান দলটিকে প্রতিষ্ঠা ও জনপ্রিয়তা নিশ্চিত করার কাজে। তার ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্বগুণ এবং প্রশাসনিক দক্ষতা জাতীয় পরিসরে প্রভাব ফেললেও বিএনপির তৃণমূল ভিত্তির সম্প্রসারণে তিনি স্বাভাবিকগত কারণে বেশি সময় দিতে পারেননি। প্রকৃতপক্ষে, দলের সংগঠনগত বিস্তার, রাজনৈতিক স্থায়িত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি নির্বাচনি জনপ্রিয়তা বজায় রাখা এই সব কার্যক্রম ১৯৯০-এর মাঝামাঝি থেকে ২০১০-এর দশক পর্যন্ত সময়জুড়ে পরিচালিত হয়, যা সম্পূর্ণভাবে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের ফল।
এ ছাড়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন নারী হিসেবে টানা চার দশকের বেশি সময় নেতৃত্ব ধরে রাখা, দুঃসময়ে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা, রাজনৈতিক নির্যাতন, মামলা, কারাবাস ও গৃহবন্দিত্বের মতো কঠিনতম চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেও দলকে টিকিয়ে রাখা এবং জনপ্রিয়তা ধরে রাখার দৃঢ়তা অন্য কোনো নেতার মধ্যে এতো ধারাবাহিকভাবে দেখা যায়নি। তার নেতৃত্বে বিএনপি শুধু ক্ষমতার রাজনীতি করেনি; বরং ক্ষমতার বাইরে থাকাকালীনও দেশের বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ থেকেছে।
২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। দেশে তখন জরুরি অবস্থা। এক বছর পর কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তখনকার পিজি হাসপাতালে যান বড় ছেলে তারেক রহমানকে দেখতে
২০০৭–২০০৮ সালের রাজনৈতিক সংকট, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জরুরি অবস্থা, মামলা এবং দীর্ঘ কারাবাসের সময়ও তিনি রাজনৈতিকভাবে পরাজিত হননি। বরং বিএনপি এবং গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলন বারবার তার চারপাশে পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সঙ্কট, ছোট ছেলের মৃত্যু, বড় ছেলের নির্বাসন একজন মা হিসেবে নিশ্চয়ই তাকে গভীর বেদনা দিয়েছে। তবু তিনি দমে যাননি। ২০২৪ সালের ফ্যাসিবাদ বিরোধী গণঅভ্যুত্থানে তিনি ছিলেন গণতন্ত্রের প্রতীকী শক্তি। ফলে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় সহজেই বোঝা যায় যে চার দশকের কঠোর রাজনৈতিক সংগ্রাম, তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক সংগঠনকে একীভূত রাখা, জনসংযোগ বজায় রাখা, দলীয় মতাদর্শকে জনপ্রিয় করা এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে খালেদা জিয়ার অবদান বিএনপির জনপ্রিয়তা ও জনভিত্তি প্রতিষ্ঠায় সর্বাধিক।
একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করা গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সেটিকে জনপ্রিয় ও টেকসই করা আরও কঠিন। জিয়াউর রহমান দল প্রতিষ্ঠিত করেন, দিকনির্দেশনা দেন, পথরেখা তৈরি করেন। কিন্তু খালেদা জিয়া সুপরিকল্পিতভাবে, সাহসিকতার সঙ্গে এবং সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মতো দৃঢ়তা নিয়ে দলটিকে জনমানুষের সঙ্গে একাত্ম করেন, গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের প্রতীক হিসেবে গড়ে তোলেন, তৃণমূল সংগঠনকে শক্তিশালী করেন, দীর্ঘ সময় ধরে জনপ্রিয়তা ধরে রাখেন এবং জাতীয় সংকট মোকাবিলায় দলকে সামনে রাখেন।
অতএব ইতিহাসের বিশ্লেষণ আমাদের এক বাস্তব সিদ্ধান্তের মুখোমুখি দাঁড় করায়। বিএনপিকে জনগণের দল হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের যে ভিত্তি স্থাপন ছিল অপরিহার্য, তার ওপর দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়া যে সংগঠন, আন্দোলন, জনপ্রিয়তা ও গণভিত্তি তৈরি করেছেন, তা অপেক্ষাকৃত বৃহত্তর, দীর্ঘস্থায়ী এবং অধিক প্রভাবশালী। তাই বলা যায়, বিএনপিকে প্রকৃত অর্থেই গণমানুষের দলে পরিণত করার কাজে তার অবদান সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বেগম খালেদা জিয়ার জীবন তাই শুধু রাজনৈতিক কাহিনি নয় বরং এক জাতির স্বপ্ন, বাধা এবং সংগ্রামের প্রতিফলন। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যখন বাংলাদেশের রাজনীতিকে বিশ্লেষণ করবে, তখন বেগম খালেদা জিয়ার নাম নিঃসন্দেহে থাকবে সেইসব নেতার তালিকায় যারা দল, গণতন্ত্র ও দেশের জন্য নিজ জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়, আবেগ এবং শক্তি উৎসর্গ করেছেন। তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন, তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ জীবন্ত অধ্যায়।