Published : 31 Jul 2025, 07:08 PM
ঢাকার উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে এ পর্যন্ত ৩৪ জন মৃত্যুবরণ করেছে, যাদের বেশির ভাগই শিশু-কিশোর বয়সী শিক্ষার্থী। বহু মানুষ এখনো আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন। এই মর্মান্তিক মৃত্যু দেশের সর্বস্তরের মানুষকে বেদনায় স্তব্ধ করে দিয়েছে। তবে ঘটনা যতটা অনাকাঙ্ক্ষিত, ততটা আকস্মিক নয়। যতদূর জানা যাচ্ছে, বিমানটি ইতিপূর্বেই দুর্ঘটনাগ্রস্ত হওয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল, যদিও সংবাদমাধ্যমে দেখছি সংশ্লিষ্টরা সেটি মানতে নারাজ।
এই যুদ্ধ বিমানটি যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর না পড়ে অন্য কোথাও বিধ্বস্ত হতো, সম্ভবত তা সংবাদমাধ্যমে এতটা আলোচিত হতো না। কিন্তু জনবহুল রাজধানীর একটি শিক্ষাঙ্গনে, শিশুরা যখন চিরতরে নিথর হয়ে পড়ে, তখন প্রশ্ন জাগে—এই মৃত্যুগুলো কি শুধুই দুর্ঘটনা, নাকি অবহেলার ধারাবাহিক পরিণতি?
একটি জনবহুল নগরে বিমান দুর্ঘটনা ঘটলে তা যে কারও মাথার ওপর পড়তে পারে—এ আশঙ্কাই যুক্তিসঙ্গত। ফলে করণীয় একটাই—মাইলস্টোনের মতো বিপর্যয় যাতে আর না ঘটে, তার জন্য তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করা। প্রশ্ন হলো, সেরকম কোনো পদক্ষেপ কি আদৌ নেওয়া হচ্ছে বা ভবিষ্যতে নেওয়া হবে? খুব সম্ভবত, শোকের ঢেউ স্তিমিত হলে সবকিছু আবার আগের মতই চলবে। আর তখন অন্য কোনো মৃত্যুর মেঘ আবার আমাদের মাথার ওপর জমতে শুরু করবে।
বাংলাদেশে নানারকম দুর্যোগ প্রায় নিয়মিত ঘটনা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় এ দেশের মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই প্রশংসনীয়ভাবে দক্ষ। কিন্তু আমরা বারবার অসহায় হয়ে পড়ি মানবসৃষ্ট দুর্যোগের মুখে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট বন্যা ও উষ্ণতা, নিত্যকার সড়ক দুর্ঘটনা, গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ড বা ভবন ধস, কিংবা একটি পুরনো যুদ্ধবিমানের বিদ্যালয়ের ওপর আছড়ে পড়া—এসবই মানবসৃষ্ট দুর্যোগের নির্মম উদাহরণ।
এগুলোকে স্রেফ ‘দুর্ঘটনা’ বলে এড়িয়ে যাওয়া মানে এক গভীরতম নৈতিক ব্যর্থতা। এর পেছনে থাকে দুর্নীতিপরায়ণ, জবাবদিহিতাহীন, লোভী একটি গোষ্ঠী, যারা অদৃশ্যভাবে এসব ব্যবস্থার চালিকা শক্তি। তাদের মুখোশ উন্মোচন না করে, কার্যকর তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করে, এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা অসম্ভব।
আর এ সকল দুর্ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম—শিশুরা। তারাই সবচেয়ে বেশি বিপন্ন হয়, সবচেয়ে বেশি নিঃশেষ হয়।
এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মানবসৃষ্ট দুর্যোগ চলছে গাজায়। ‘যুদ্ধ’ বলা হলেও এটি একপাক্ষিক হত্যাযজ্ঞ—পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ, পরিকল্পিত এবং দীর্ঘকালব্যাপী গণহত্যা। ‘মিডল ইস্ট আই’–এর ২৯ জুলাইয়ের তথ্যমতে, গত বাইশ মাস ধরে অব্যাহত এই হত্যাকাণ্ডে এখন পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছে ৬০ হাজারের বেশি মানুষ। এর মধ্যে শিশু প্রায় সাড়ে ১৯ হাজার, নারী প্রায় ১০ হাজার এবং বৃদ্ধ প্রায় ৫ হাজার। অর্থাৎ, গত ৬৬০ দিন ধরে প্রতিদিন গড়ে ২৮ জনের বেশি শিশু হত্যা করা হচ্ছে—অন্যদের কথা না বললেও কেবল শিশুর সংখ্যাটাই আমাদের স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
এ পরিসংখ্যান চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, গাজায় প্রতিদিনই ঘটছে একেকটি মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি। মনে হয়, যেন প্রতিদিন গাজার বুকে জন্ম নিচ্ছে একেকটি নতুন মাইলস্টোন। অথবা উল্টোটা—গাজাই যেন প্রতিদিন এসে আমাদের হৃদয়ে ধ্বংসের কুঠারাঘাত করছে। দুই ক্ষেত্রেই রয়েছে যুদ্ধবিমান—পাইলট ও লক্ষ্যবস্তু আলাদা হলেও ধ্বংস একই, মৃত্যু একই, বেদনা একই। তবু যুদ্ধ ও তার প্রস্তুতির নামে এই সহিংসতা বৈধতা পায়, প্রাতিষ্ঠানিক সম্মতি পায়—এটাই সভ্যতার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।
গত ২৪ জুলাই থেকে বাংলাদেশে সংঘটিত কিছু সহিংস ঘটনার দৃশ্য দেখে অনেকেরই গাজার কথা মনে পড়েছে—হয়তো অবচেতনে, কিংবা এক তীব্র মর্মবেদনার অভিঘাতে। আমি গাজাকে আজ শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই দেখছি না; এটি এক রূপক হয়ে উঠেছে, যা পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে।
গাজায় যে নিরাপত্তাহীনতা, অসহায়ত্ব এবং শিশুদের লাগাতার মৃত্যু তা আজকাল পৃথিবীর নানা অংশে নানা মাত্রায় ফিরে আসছে। স্থান বা মাত্রার ভিন্নতা থাকলেও এই মৃত্যুর উৎসগুলো প্রায় অভিন্ন—দখলদারিত্ব, পুঁজিকেন্দ্রিক মুনাফার লোভ, লুণ্ঠনবৃত্তি, আধিপত্যবাদ।
গাজায় চলছে যে গণহত্যা, তা কেবল কিছু ইসরায়েলি সৈন্যের তাৎক্ষণিক উন্মাদনা নয়; বরং এটি এক বিশেষ আইডিয়োলজি—এক চিন্তা ও কাঠামোগত সহিংসতার রূপ, যার শিকড় অনেক গভীরে, যার ডালপালা ছড়িয়ে আছে গোটা বিশ্বজুড়ে। এই কাঠামোগত নির্মমতাই গাজাকে টিকিয়ে রেখেছে, এবং সেই কাঠামোই অন্য কোথাও জন্ম দিচ্ছে নতুন গাজার।
আজ যে শিশু উত্তরায় যুদ্ধবিমানের নিচে চাপা পড়ে, কাল সে-ই হয়ত অন্য প্রান্তে গাজার মতো নিষ্ঠুর বাস্তবতায় মুছে যাবে। শিশুদের এই সার্বজনীন নিরাপত্তাহীনতা এবং মৃত্যুর আতঙ্ক—এই একবিংশ শতাব্দীতে মানবতার সবচেয়ে লজ্জাজনক পরিণতি।
গাজা শুধু ফিলিস্তিনেই নেই। গাজা আছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে, ইউরোপের ইউক্রেইনে, সিরিয়ার এখানে-ওখানে, ভারত ও পাকিস্তানের কাশ্মীরে—এবং আরও অনেক জায়গায় গাজা তৈরির প্রক্রিয়া চলছেই। গাজা না থাকলে যুদ্ধবাণিজ্য চলবে কী করে? অস্ত্রব্যবসায়ী, নির্মাণ শিল্পপতি, সামরিক উপদেষ্টা—তাদের লাভের অঙ্কই বা কোথা থেকে আসবে?
আবার সরাসরি যুদ্ধের জাঁতাকলে না পড়ে হলেও বহু মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। এই পরোক্ষ মৃত্যুর পেছনেও রয়েছে সেই একই যুদ্ধনীতি—যুদ্ধবাণিজ্য, অনৈতিক মুনাফা, সীমাহীন লোভ এবং লুণ্ঠনবৃত্তি।
এই ২৭ জুলাই, কুয়াশাচ্ছন্ন উত্তাল সাগর পাড়ি দিয়ে মরক্কো থেকে স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউতায় পৌঁছেছে ৫৪ শিশু ও প্রায় ৩০ জন পূর্ণবয়স্ক মানুষ। তাদের জন্যও সমুদ্রে ছিল গাজার মতো অনিশ্চয়তা ও মৃত্যুর হাতছানি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশের কত মানুষও সমুদ্র পাড়ি দিয়ে, পাহাড়-জঙ্গল অতিক্রম করে অন্য দেশে যাচ্ছে—আশার আলো খোঁজার নামে। সেই পথে কতজন হারিয়ে যাচ্ছে, কতজন পাচারকারীদের হাতে জিম্মি হয়ে সর্বস্ব খুইয়ে ফেলছে—তার নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই। তাদের অভিজ্ঞতাও এক ধরনের গাজারই প্রতিধ্বনি—যদিও এর পেছনের জায়নবাদ শত্রু নয়, তবে তাদের লোভ, নিষ্ঠুরতা ও নৈতিক ভঙ্গুরতা কোনো অংশেই কম নয়।
গাজার সঙ্গে অন্যান্য মানবসৃষ্ট বিপর্যয় তুলনা করা নিয়ে কেউ কেউ দ্বিধায় থাকলেও রাখাইন, কাশ্মীর ও গাজার মধ্যে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক মিল স্পষ্ট ও প্রমাণিত। ভারত ও মিয়ানমার—উভয় দেশই ইসরায়েলের কাছ থেকে অস্ত্র ক্রয় করে এবং সেই অস্ত্র ব্যবহার করে নিজেদের দেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। রোহিঙ্গা, কাশ্মীরি ও গাজাবাসীর বিরুদ্ধে এই তিন রাষ্ট্রের নিপীড়ননীতির পেছনে রয়েছে একটি ভয়াবহ আন্তর্জাতিক কাঠামো, যার নেতৃত্বে আছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইসরায়েল কর্তৃক যুক্তরাষ্ট্রের মদদে ফিলিস্তিনে পরিচালিত গণহত্যা এখন যেন একটি মডেল হয়ে উঠেছে—যা অনায়াসে গ্রহণ করছে অনেক রাষ্ট্র, প্রকাশ্যেই। এই ‘গণহত্যা মডেল’ শুধু নিপীড়নের পদ্ধতি নয়, বরং মানবতাবিরোধী অপরাধের মাধ্যমে লাভবান হওয়ার নীলনকশা। ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, রাখাইন—এই তিন ভূখণ্ডের জনগণ আজ একই পরিণতির শিকার, কারণ তাদের শাসকদের মধ্যে রয়েছে আত্মার আত্মীয়তার মতো সহমর্মিতা—নিপীড়নের ক্ষেত্রে, হত্যার পদ্ধতিতে এবং আন্তর্জাতিক আইনকে এড়িয়ে যাওয়ার কৌশলে।
এইসব রাষ্ট্রীয় অপরাধ শুধু রাষ্ট্রকেই নয়, আরও গভীরতরভাবে উসকে দিচ্ছে নানা অরাষ্ট্রীয় অপরাধকে। যখন জাতিসংঘের রেজুলেশন উপেক্ষিত হয়, আইসিসির বিচারে বাধা আসে, তখন হত্যাকারীদের উৎসাহ বেড়ে যায়—তারা দেখে, এভাবে পার পাওয়া সম্ভব।
ফিলিস্তিনিদের এই দুর্দশা অবহেলা করার জন্য জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ভর্ৎসনা করে বলেছেন, এটি এক ‘নৈতিক সংকট, যা বিশ্ববিবেককে চ্যালেঞ্জ করছে।’
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের অধিকারকর্মীদের এক বৈশ্বিক সম্মেলনে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশে বলেন, “আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এমন বিরাট অংশ সহানুভূতির অভাব, সত্যের অভাব ও মানবতার অভাব দ্বারা পরিচালিত হয়ে যে পর্যায়ের উদাসীনতা ও নিষ্ক্রিয়তা দেখাচ্ছে, তা আমি ব্যাখ্যা করে বোঝাতে পারব না।”
সত্যিই তাই—গাজা আর শুধু একটি ভৌগোলিক নাম নয়, এটি আজকের বিশ্বের সবচেয়ে বড় নৈতিক সংকটের প্রতীক।
এই সহানুভূতিহীন, সত্যহীন, মানবতাহীন আন্তর্জাতিক আচরণের দায় শুধু যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল বা ইউরোপের নয়—আরব বিশ্বও এই নিষ্ঠুর নৈঃসঙ্গ্যের শরিক। এর কুফল অন্যত্রও ছড়িয়ে পড়া স্বাভাবিক। সারা বিশ্বে ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা, সহিংসতা, উগ্রতা, আধিপত্যের ইচ্ছা, শক্তি প্রদর্শন, মিথ্যাচার, দায়িত্বহীনতা, দুর্বলের উপর নির্যাতন, শক্তিমানের চাটুকারিতা, মুনাফার কাছে চরিত্র বিসর্জনÑ এসব তারই ইঙ্গিত বহন করছে। এসব ঘটনাই দেখিয়ে দিচ্ছে—আমরা এমন এক পৃথিবীতে পৌঁছে যাচ্ছি, যেখানে মনুষ্যত্ব রক্ষা হয়ে উঠেছে ব্যতিক্রম, আর নৃশংসতা হয়ে উঠেছে নিয়ম ও সাফল্যের মানদণ্ড।
তবুও, এই অন্ধকারে মাঝে মাঝে জ্বলে ওঠে কিছু আলোকবর্তিকা—যারা জীবনের বিনিময়ে আশার আলো জ্বালান। যেমন মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষিকা মাহেরিন চৌধুরী ও মাসুকা বেগম। গাজা, ইউক্রেইন, রাখাইন, কাশ্মীর কিংবা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া নৌকাগুলোর মধ্যেও ছড়িয়ে আছেন এমন বহু নাম না-জানা মানুষ, যারা বিপদের মুখেও অন্যের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তারাই হোক চিরস্মরণীয়, পৃথিবীব্যাপী তাদের মত মানুষের কাছেই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম থাকুক চিরঋণী। অস্ত্র ও যুদ্ধব্যবসা, অনৈতিক মুনাফা অর্জন এবং দখলদারিত্বের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক কাঠামো বদলানো ছাড়া অবশ্য সেই মানবিক পৃথিবী শুধুই কল্পনায় রয়ে যাবে—অদেখা, অধরা, অলীক।