Published : 28 Jan 2026, 11:36 PM
ডাকসু এক সদস্যের বক্তব্যের রেশ ধরে ইউরেনিয়াম নিয়ে চারদিকে বেশ শোরগোল চলছে। পেশাগত কারণে ইউরেনিয়াম নিয়ে আমার যৎসামান্য জানাশোনা আছে। ভাবলাম, আলোচনার এই ডামাডোলে নিজের সেই অভিজ্ঞতাটুকু পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যাক।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, ইউরেনিয়াম প্রকৃতিতে তুলনামূলকভাবে সুলভ একটি মৌল। পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই এর অস্তিত্ব রয়েছে। তবে সব জায়গায় এটি অর্থনৈতিকভাবে উত্তোলনযোগ্য নয়। কোথাও মজুদ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা এখনো অনাবিষ্কৃত, আবার কোথাও রাজনৈতিক, প্রযুক্তিগত কিংবা আন্তর্জাতিক চুক্তির জটিলতায় উত্তোলন কার্যত অসম্ভব।
বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপকূলীয় অঞ্চলের মাটিতে তেজস্ক্রিয় খনিজ, বিশেষ করে ইউরেনিয়াম ও থোরিয়ামের উপস্থিতির সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (২০১৬ সালে) এবং পরে কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় (২০২০), যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় একাডেমিক ও বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা সংস্থাগুলোর একটি ‘ELSEVIER’-এ প্রকাশিত হয়েছে। এই খনিজগুলো পারমাণবিক জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারযোগ্য হলেও এখনো বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য নিশ্চিত ভাণ্ডার নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সরকারি ঘোষণা নেই।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সরকার চাইলেই কেবল ইউরেনিয়াম উৎপাদন ও সরবরাহ শুরু করা যায় না। এর সঙ্গে জড়িত আছে আন্তর্জাতিক চুক্তি ও কঠোর নজরদারি, বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা সংক্ষেপে এনপিটি (NPT: Nuclear Non-Proliferation Treaty)। সঙ্গে তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ে ঘাটাঘাটির বিশেষ নিয়মাবলি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা, এগুলো সময় সাপেক্ষ ব্যাপারও বটে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশে একটি ইউরেনিয়াম খনি পরিকল্পনা থেকে উৎপাদনে যেতে প্রায় এক দশক সময় লেগে যায় সকল চুক্তিপত্র শেষ করে খনি নির্মাণ কাজ শেষ করে আকরিক উৎপাদন করতে।
এবার বিশ্বের দিকে নজর দিই। এখন পর্যন্ত সমস্ত পৃথিবীতে আবিষ্কৃত ইউরেনিয়াম খনি থেকে অর্থনৈতিকভাবে উত্তোলনযোগ্য ইউরেনিয়ামের পরিমাণ প্রায় ৬০ লাখ মেট্রিক টন, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মজুদ আছে অস্ট্রেলিয়ায় (১৭ লাখ মেট্রিক টন, যা বৈশ্বিক মোট মজুদের প্রায় ২৮ শতাংশ)। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মজুদ আছে কাজাখস্তানে (প্রায় সাড়ে আট লাখ টন, যা বৈশ্বিক মোট মজুদের প্রায় ১৩ শতাংশ), কানাডায় মজুদ আছে প্রায় ছয় লাখ টন, যা বৈশ্বিক মোট মজুদের প্রায় ১০ শতাংশ) এবং রাশিয়া ও নামিবিয়ায় আছে পাঁচ লাখ টন করে, যা মোট মজুদের প্রায় ৮ শতাংশ করে)।
তবে ইউরেনিয়াম উত্তোলনের দিক থেকে কাজাখস্তান সবার শীর্ষে। UxC forecast 2024 production অনুসারে ২০২৪ সালে উৎপাদিত বৈশ্বিক ইউরেনিয়ামের পরিমাণ ১৫২ মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ৭০ হাজার মেট্রিক টন), যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি উত্তোলিত হয়েছে কাজাখস্তানে, মোট উৎপাদনের প্রায় ৩৮ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে আছে কানাডা, যা মোট উত্তোলনের প্রায় ২৪ শতাংশ। অন্যান্য দেশের মধ্যে নামিবিয়ায় ১৪ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়ায় ৯ শতাংশ, উজবেকিস্তান ৭ শতাংশ, রাশিয়া, চায়না, আমেরিকা এবং বিশ্বের অন্য দেশগুলো মিলে বাকি ৮ শতাংশ ইউরেনিয়াম উত্তোলন করেছে। বর্তমানে কাজাখস্তান, কানাডা, নামিবিয়া ও অস্ট্রেলিয়া মিলে বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ ইউরেনিয়াম উৎপন্ন করছে।
তবে মজার বিষয় হচ্ছে এই উৎপাদনকারী অনেক দেশই পারমাণবিক পন্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহার করে না। আমেরিকা, ফ্রান্স ও চায়না সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহারকারী দেশ। সমগ্র বিশ্বে এখন পর্যন্ত ৪৪০ টি পারমাণবিক চুল্লি চালু আছে, যার অধিকাংশই আমেরিকা (৯৩ টি), ফ্রান্স (৫৬ টি), চায়না (৫৮ টি) ও রাশিয়ার (৩৬ টি) দখলে। এছাড়া আমাদের প্রতিবেশী ভারতে ২৪ টি ও দক্ষিণ কোরিয়ায় ২৬ টি পারমাণবিক চুল্লি আছে। তাছাড়া বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ৬৬ টি পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণাধীন।
আমেরিকার নিজেদের কার্বনমুক্ত জ্বালানি উৎপাদনের প্রায় ৪৭ শতাংশ আসে পারমাণবিক বিদ্যুৎ থেকে যা বিশ্বের প্রায় ২৪ শতাংশ। ফ্রান্সের নিজেদের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশই আসে তাদের ৫৬টি পারমাণবিক চুল্লি থেকে। আর চায়না যে হারে পারমাণবিক চুল্লি বানাচ্ছে, তাতে তারা ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহারকারী হিসেবে আবির্ভূত হবে। তাদের ৩০টি পারমাণবিক চুল্লি বর্তমানে নির্মাণাধীন। প্রসঙ্গত, ভারতে সাতটি চুল্লি এবং বাংলাদেশের রূপপুরে দুটি পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণধীন রয়েছে।
এবার আসুন মুল কথায় আসি। পারমাণবিক বিদ্যুৎ অতি উচ্চমাত্রার জ্বালানি এবং প্রায় সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব হওয়ায় এই প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন খুব চাহিদাসম্পন্ন। প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামে দুটি প্রধান আইসোটোপ থাকে—ইউরেনিয়াম-২৩৫ এবং ইউরেনিয়াম-২৩৮। এর মধ্যে ইউরেনিয়াম-২৩৫ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বেশি কার্যকর। এক ইঞ্চি টুকরো পরিমাণ ইউরেনিয়াম-২৩৫ যে পরিমাণ শক্তি দেয় তা প্রায় ৪৫০ লিটার জ্বালানি তেল অথবা ১৭০০০ ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাসের সমান।
কিন্তু কিভাবে আমরা ইউরেনিয়াম থেকে জ্বালানি পাই?
ইউরেনিয়াম আকরিকে প্রায় শূন্য দশমিক সাত শতাংশ ইউরেনিয়াম-২৩৫ আইসোটোপ থাকে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কমপক্ষে ৩ থেকে ৫ শতাংশ পরিমাণ ইউরেনিয়াম-২৩৫ আইসোটোপ দরকার হয়, যা পারমাণবিক চুল্লিতে ফুয়েল রড হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে অধিকাংশ উন্নত পারমাণবিক চুল্লিতে জ্বালানি হিসেবে প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম-২৩৫ ব্যবহৃত হয়। এখন আমরা যে পারমাণবিক বোমার কথা বলি, সেটা বানাতে গেলে আমাদেরকে কমপক্ষে ৯০ শতাংশ ইউরেনিয়াম-২৩৫ আইসোটোপ সমৃদ্ধ করতে হবে। আর এই প্রক্রিয়াটি অনেক জটিল ও ব্যয়সাপেক্ষ। সঙ্গে আছে আন্তর্জাতিক আণবিক সংস্থার কড়া নজরদারি। তাই আসুন ওদিকে যাওয়ার আগে ইউরেনিয়ামের শান্তিপূর্ণ ব্যবহার বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে মনোনিবেশ করি।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত জ্বালানির যাত্রা শুরু হয় মাটির গভীরে লুকিয়ে থাকা ইউরেনিয়াম আকরিক থেকে। এই যাত্রাটি মূলত চারটি ধাপে সম্পন্ন হয়—আকরিক উত্তোলনের পর রূপান্তর, সমৃদ্ধ ও পুনর্ব্যবহারযোগ্যকরণে।
প্রথম ধাপ: আকরিক উত্তোলন (Mining)
আগেই বলেছি কাজাখস্তান, কানাডা, নামিবিয়া এবং অস্ট্রেলিয়া মিলে বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ ইউরেনিয়াম উৎপন্ন করে। এই ধাপে ওই অঞ্চলে অবস্থিত খনি থেকে ইউরেনিয়াম আকরিক উত্তোলন করা হয়। খনন প্রক্রিয়া হতে পারে খোলা খনি (Open-pit), ভূগর্ভস্থ খনি (Underground) অথবা রাসায়নিক দ্রবণের মাধ্যমে মাটির ভেতর থেকে ইউরেনিয়াম সংগ্রহ (In-situ leaching)। উত্তোলিত আকরিক সাধারণত সরাসরি ব্যবহারযোগ্য নয়, কারণ এতে ইউরেনিয়ামের পরিমাণ খুবই কম থাকে। তাই খনি থেকে আনা আকরিকগুলো ভেঙে গুঁড়ো করা হয় এবং রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইউরেনিয়াম আলাদা করে ‘ইয়েলো কেক’ নামের একটি ঘনীভূত পাউডারে রূপান্তর করা হয়। এটি পরবর্তী ধাপের জন্য কাঁচামাল হিসেবে সাধারণত পাঠানো হয় পশ্চিমা বিশ্বের মাত্র তিনটি দেশের তিনটি মাত্র স্থানে, ফ্রান্স (Orano), কানাডা (Cameco) ও আমেরিকায় (ConverDyn)। এই তিনটি দেশ ছাড়া অফিসিয়ালি রাশিয়া ও চায়নার যোগ্যতা আছে রূপান্তরকরণের, তবে তার তথ্য জনসাধারণের নাগালের বাইরে। আনঅফিসিয়ালি হয়তো ইরান, উত্তর কোরিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশে থাকতে পারে। তবে যেহেতু অধিকাংশ সাপ্লাইচেইন নিয়ন্ত্রণ করে পশ্চিমা বিশ্ব, তাই অধিকাংশ আকরিক রূপান্তরকরণের জন্য ওই তিনটি দেশে যায়।
দ্বিতীয় ধাপ: রূপান্তরকরণ (Conversion)
মাইনিং কোম্পানির তৈরি ইয়েলো কেককে সরাসরি চুল্লিতে ব্যবহার করা যায় না। তাই এটিকে বিশেষ কারখানায় নিয়ে গিয়ে রাসায়নিকভাবে রূপান্তর করা হয়। এই ধাপে ইউরেনিয়ামকে গ্যাসীয় যৌগে পরিণত করা হয়, সাধারণত ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লোরাইড (UF₆) নামে পরিচিত একটি গ্যাসে। এই গ্যাসীয় রূপটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পরবর্তী ধাপে সমৃদ্ধকরণ বা আইসোটোপ আলাদা করার কাজ এই অবস্থাতেই সহজে করা যায় সেন্ট্রিফিউজ পদ্ধতিতে।
তৃতীয় ধাপ: সমৃদ্ধকরণ (Enrichment)
পরবর্তী ধাপে এই রূপান্তরিত ইউরেনিয়াম নেওয়া হয় সমৃদ্ধকরণের জন্য। পশ্চিমা বলয়ে থাকা মাত্র দুটি কোম্পানির (Urenco and Orano) ইউরোপ ও আমেরিকায় অবস্থিত চারটি মাত্র স্থানে এই সমৃদ্ধকরণ করা হয়, তবে প্রয়োজনের তুলনায় কম।
রাশিয়া বিশ্বের ৪৭ শতাংশ সমৃদ্ধকরণ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে, যা তারা পরে আমেরিকার কাছে বিক্রি করে। এখানে মজার বিষয় হচ্ছে, যতই ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন থাকুক না কেন, কোন এক অদ্ভুত কারণে এই এনরিচ (সমৃদ্ধকৃত) ইউরেনিয়াম ও মহাকাশ বিষয়ে রাশিয়া ও আমেরিকা, এই দেশ দুটি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে! এই দুটি বিষয় নিয়ে দেশ দুটি মাঝেমধ্যে হালকা স্বরে হুমকি-ধমকি দেয় বটে, তবে তা ক্ষণিকের জন্য। কারণ, তেলের চাহিদা মধ্যপ্রাচ্য ও ভেনিজুয়েলা পূরণ করলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৯৩ টি পারমাণবিক চুল্লি চালাতে রাশিয়ার সমৃদ্ধকৃত ইউরেনিয়াম তাদের লাগবেই।
যা হোক, এই ধাপে বিশেষ সেন্ট্রিফিউজ প্রযুক্তির ব্যবহার করে ইউরেনিয়াম-২৩৫-এর পরিমাণ বাড়ানো হয়। এর ফলে জ্বালানির শক্তি উৎপাদনের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। সমৃদ্ধকরণের পর ইউরেনিয়ামকে আবার কঠিন আকারে এনে ছোট ছোট পেলেট (pellet) তৈরি করা হয়। এই পেলেটগুলো ধাতব নলের ভেতরে ভরে ‘ফুয়েল রড’ বানানো হয়, যা পারমাণবিক চুল্লিতে স্থাপন করা হয়।
চতুর্থ ধাপ: পুনর্ব্যবহারযোগ্য করা (Recycling)
চুল্লিতে ব্যবহারের পর জ্বালানি একসময় তার কার্যক্ষমতা হারায়, কিন্তু এতে এখনও কিছু মূল্যবান উপাদান রয়ে যায়। এই ব্যবহৃত জ্বালানিকে বিশেষভাবে প্রক্রিয়াজাত করে অবশিষ্ট ইউরেনিয়াম ও অন্যান্য উপাদান আলাদা করা হয়। এগুলো আবার নতুন জ্বালানি তৈরিতে ব্যবহার করা যায়। এই ধাপটি পরিবেশগত ঝুঁকি কমাতে এবং সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই পারমাণবিক প্রক্রিয়ায় তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের পরিমাণ খুব কম, মাত্র কয়েক গ্রাম থেকে কয়েক কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে।
ওপরে বর্ণিত চারটি ধাপের সমন্বিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই একটি সাধারণ আকরিক থেকে শুরু করে শক্তিশালী পারমাণবিক জ্বালানিতে রূপান্তর ঘটে, যা শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয় কলকারখানা এবং মানুষের ঘরে আলো জ্বালাতে।
এখম আসুন নিউট্রন ভাঙা-গড়ার খেলায় উন্মত্ত পারমাণবিক বোমার জগতে। আগেই উল্লেখ করেছি, এটম বোমা বানাতে কমপক্ষে ৯০ শতাংশ হারে ইউরেনিয়াম-২৩৫ সমৃদ্ধ করতে হবে, যা প্রকৃতিতে প্রাপ্ত ইউরনিয়াম আকরিকের মাত্র শূন্য দশমিক সাত শতাংশ (প্রতি ১৫০ টি ইউরেনিয়াম-২৩৮ মধ্যে একটা ইউরেনিয়াম-২৩৫)। আর একটা বোমা বানাতে লাগে কমপক্ষে ৫৬ কেজি ইউরেনিয়াম-২৩৫। এটাই পারমাণবিক বোমা তৈরির ক্রিটিক্যাল সাইজ বলে গণ্য করা হয়। তবে জাপানের হিরোশিমায় যে ‘লিটল বয়’ নামক পারমাণবিক বোমাটি ফেলা হয়েছিল, তাতে ৬৪ কিলোগ্রাম ইউরেনিয়াম-২৩৫ আইসোটোপ ছিল। তাহলে আমরা যদি অংক কষি, তাহলে দেখতে পাব একটা বোমা বানাতে আমাদের প্রায় ৮ টন বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম লাগবে, যাতে ইউরেনিয়ামের দুটি আইসোটোপই আছে (U235 and U238)।
এ তো গেল বিশুদ্ধ ইউরেনিয়ামের হিসেব। এখন আকরিক থেকে এই পরিমাণ বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম পেতে আমাদের আরও একটি অংক কষতে হবে। আমরা যদি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইউরেনিয়াম খনি, অস্ট্রেলিয়ার অলিম্পিক ড্যামের কথা বিবেচনা করি, সেখানকার আকরিকে শূন্য দশমিক শূন্য চার শতাংশ (0.04%) ইউরেনিয়াম আছে। অর্থাৎ, প্রতি টন আকরিকে মাত্র ৪০০ গ্রাম ইউরেনিয়াম পাওয়া যায়। তাহলে ৮ টন ইউরেনিয়াম পেতে আমাদের লাগবে ২০ হাজার টন আকরিক লাগবে। প্রাচুর্যের কথা বিবেচনা করলে যা অনেক বেশি, আর সময়ের বিচারে যা অলিম্পিক ড্যামের দুই বছরেরর প্রোডাকশনের সমান।
প্রিয় পাঠক, এতক্ষণ তো আমিই দুটি অংক কষে ফেললাম। এবার শেষ অংকটি আপনারা একটু কষ্ট করে কষে নেন। ওপরে যে বিশ হাজার টন ইউরেনিয়াম আকরিকের হিসেব দিলাম, সেই আকরিক কিন্তু কয়লার মত টনে বিক্রি হয় না, এটা বিক্রি হয় পাউন্ডে (১ পাউন্ড = ৪৫৩.৬ গ্রাম)। যদি এক পাউন্ড ইউরেনিয়াম আকরিকের দাম ৭০ ইউএস ডলার হয়, তাহলে বিশ হাজার টন ইউরেনিয়ামের দাম কত হবে?
এই কাঁচামালের খরচটা নেহাতই আইসবার্গের দৃশ্যমান একটা চূড়ামাত্র, যার নিচে আছে ওপরে বর্ণিত চারটি ধাপের প্রথম তিনটি, সঙ্গে অত্যন্ত জটিল প্রযুক্তি, সময়, আন্তর্জাতিক চুক্তি, কূটনীতি ও আণবিক সংস্থার কঠোর নজরদারির বিশাল এক বাধা, যা বিশ্বের গুটিকতক ক্ষমতাধর নির্ধারক ও বিজ্ঞানীর স্পর্শ ছাড়া এখনও কল্পনা করা যায় না।
সব মিলিয়ে ইউরেনিয়াম বালখিল্য বক্তৃতার বিষয় নয়, এটি ভূতত্ত্ব, অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কঠোর বৈজ্ঞানিক নিয়ন্ত্রণে আবদ্ধ অত্যন্ত জটিল বাস্তবতা। একে যেমন আবেগ দিয়ে তুচ্ছ করা যায় না, তেমনি না বুঝে ভয় দেখানোর হাতিয়ারও বানানো যায় না। প্রযুক্তিগত বিষয়ে জনপরিসরে কথা বলার ক্ষেত্রে তাই দায়িত্বশীলতা জরুরি। কারণ, ভুল তথ্য যেমন জনমতকে বিভ্রান্ত করে, তেমনি রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে। দেশপ্রেম তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা জ্ঞান, পরিমিতি ও বাস্তববোধের সঙ্গে পথ চলে; নচেৎ অতিরিক্ত আবেগ অজান্তেই জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।