Published : 10 Nov 2019, 01:14 PM
আমার বন্ধু ডা. একরাম। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে আমরা ছিলাম সহপাঠী। গণপরিষদের সদস্য রফিক ভূইয়া তার প্রয়াত পিতা। বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানের স্বাক্ষরকারীদের অন্যতম একজন গর্বিত পিতার সন্তান একরাম বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বড় হয়েছে বলে বোধহয় আমাদের মধ্যে একরাম বরাবরই ছিল রাজনৈতিকভাবে একটু পোদ্দার ধরনের। প্রায়ই ভারি ভারি সব রাজনৈতিক তত্ত্ব দিত। এরকমই একটা 'একরামনামা' হল, 'একজন রাজাকার সব সময়ই রাজাকার, কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধা পাকাপাকিভাবে মুক্তিযোদ্ধা নন'। যে একবার তার দেশের মাতৃভূমির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে পরবর্তী জীবনে শত ভালো কাজেও তার পাপ মুক্তি হবেনা। অন্য দিকে একজন মুক্তিযোদ্ধা ততদিনই পূজনীয় যত দিন তিনি তার মাটি আর মানুষের প্রতি অনুগত্য হৃদয়ে ধারণ করেন। কোন মুক্তিযোদ্ধা যদি একবার দেশমাতৃকার স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন, হাত মেলান রাজাকারের সাথে তাহলে ওই একদা পূজনীয় মুক্তিযোদ্ধা রাজাকারের চেয়েও অধম। এটিই হচ্ছে এই 'একরামনামা'টির প্রতিপাদ্য।
সম্প্রতি আমরা একজন আলোচিত মুক্তিযোদ্ধাকে হারিয়েছি। দীর্ঘদিন পৃথিবীর একটি উন্নততম দেশে অত্যন্ত ব্যয়বহুল চিকিৎসার পর অবশেষে ক্যান্সারের কাছে হার মেনেছেন এই মুক্তিযোদ্ধা। একাত্তরে তিনি বীরত্বের সাথে লড়েছিলেন। ছিলেন শহীদ রুমি-শহীদ আজাদের সাথে ঢাকা শহর দাপিয়ে বেড়ানো আর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কলিজায় কাঁপন ধরানো ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য। বাংলাদেশে স্বাধীনতায় তার অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু স্বাধীনতার পর আরো কোন কোন মুক্তিযোদ্ধার মত তারও পদস্খলন দেখেছি। বঙ্গবন্ধুর রক্তের উপর দাঁড়িয়ে যোগ দিয়েছিলেন জেনারেলের মন্ত্রী সভায়। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত আসামী আব্দুল আলিম আর শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. আলিম চৌধুরী সহ অসংখ্য বুদ্বিজীবীর ঘাতক মাওলানা মান্নানরা ছিল তার কেবিনেট কলিগ। ঢাকা শহরে জাতীয়তাবাদী শক্তিকে শক্ত খুঁটিতে দাঁড় করানোয় ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছিলেন। প্রতিদানও পেয়েছিলেন ঠিক ঠিকই। বিরোধী দল আর ভোটারবিহীন নির্বাচনে নির্বাচিত হয়েছিলেন অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সর্বশেষ মেয়র। পেয়েছিলেন পূর্ণ মন্ত্রীর পদমর্যাদা। সেনা সমর্থিত তত্ত্ববধায়ক সরকারের দুর্নীতির মামলা মাথায় নিয়ে উন্নত চিকিৎসার কথা বলে দেশ ছেড়েছিলেন। ফেরেননি আর কখনই। ফিরেছেন শেষমেশ কফিন বদ্ধ হয়ে। এসব ঘটনা সাম্প্রতিক এবং সবার জানা। যা জানা নেই, জানার চেষ্টাও দেখছি না এত দামী দেশে এতদিন ধরে এত দামী চিকিৎসা তিনি চালিয়ে গেলেন কিভাবে? সারা জীবন জেনেছি অপরাধীর মায়ের গলা নাকি বড় হয়, আর এবার দেখলাম অপরাধীর সন্তান আর সহকর্মীদের গলাও কিন্তু কম বড় হয় না।
কফিনে চড়ে দেশে ফিরলেও সন্মান তিনি পেয়েছেন যথেষ্ঠই। অনেকের বেলায় না পেলেও তার বেলায় বাঙালি পেয়েছে শহীদ মিনারে তাকে শেষবারের মত শ্রদ্ধা জানাবার সুযোগ। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুর মৃত দেহ ধোয়ানোর জন্য জুটেছিল কাপড় ধোয়ার ৫৭০ সাবান আর কাফনের জায়গায় ত্রাণের কাপড়। জাতীয় চার নেতার মৃত্যু নিশ্চিত করতে ঘাতকরা নিরাপদ জেলখানায় ফিরে এসে তাদের নিথর দেহের উপর বেয়নেট চার্জ করার সুযোগ পেয়েছিল। আর শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. আলিম চৌধুরীসহ আরো অনেক বুদ্ধিজীবীর নিথর দেহ রায়ের বাজারের ইট খোলায় পরে ছিল কমপক্ষে দুই থেকে তিনটি দিন। সে তুলনায় তিনি অনেক বেশি সৌভাগ্যবান। বিদায় বেলায় তার জুটেছে সর্বোচ্চ সম্মান, রাষ্ট্রীয় গান স্যালুট।
এই মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যু পরবর্তী ঘটনাগুলো আমি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করেছি। স্বাধীনতার সপক্ষের অনেককে দেখেছি তার মৃত্যুতে শোকাতুর হয়ে ফেইসবুকে স্ট্যটাস দিতেও। দেখেছি, মৃদু হেসেছি আর আনমনে বলেছি, 'সত্যি সেলুকাস, কি বিচিত্রই না আমরা!' যারা এখন এমন স্ট্যটাস দিচ্ছেন, কদিন আগেও ঢাকা উত্তরের মেয়র নির্বাচনের সময়ই তাদের দেখেছি এই মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে বিষোদগারে সোচ্চার হতে। এখন তারাই বেদনায় নীল। দেখি আর ভাবি এসব কী দেখছি? চারপাশে কাদের ভিড়ে বেঁচে আছি? কি জানি কোনদিন এরাই কেউ কেউ হয়তো মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান কিংবা মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল খালেদ মোশারফের ঘাতক আরেক মুক্তিযোদ্ধা মেজর জলিলের শোকেও মুহ্যমান হবেন। প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই থাকি গভীর রাতে ঘরে ফেরার পথে একটু একাকিত্বের অবসরে। উত্তর অবশ্য মেলেনি!