দেশে যে সবকিছু একপেশে এ নিয়ে তর্ক নাই। আমরা যারা দেশের বাইরে থাকি আমরা খুব ভালো জানি গণতন্ত্র কাকে বলে। 'বহুজন হিতায় চ বলে' যে কথা, তার নামই গণতন্ত্র। সমাজে তার কিছুই অবশিষ্ট আছে বলে মনে হয় না।
জুলুম আর হালুমের দেশ বাংলাদেশ। যে যখন পারে তখন জুলুম করে আর যাদের হাকডাক বেশি তারা হালুম হালুম করেই কাজ সারে। একটি বিরোধীদলের দরকার এবং তা জরুরী জানার পরও আমরা কি আসলে ঐক্যফ্রন্টকে মানতে পারছি? না পারলে কেন পারছি না তার কারণগুলোতো বলে দিতে হবে। দেশ বা রাজনীতি যেমন একক কোনও কিছুর ওপর নির্ভর করে চলতে পারেনা তেমনি খালি ফাঁকা বুলি আর বয়সী মানুষদের আচরণেও তার মুক্তি নাই।
সমাজের চিত্রটা দেখুন একবার। শান্তি আছে শান্তি আছে বলছি বটে নানা জায়গায় আসলে শান্তি নাই। মাস্টার শ্যামল কান্তি বলেছেন, সেলিম ওসমানের গায়ে দানবের শক্তি। সেটা অবশ্য তাকে দেখলেও বোঝা যায়। খাবার দাবার আর আয়েশের জীবনে বলিষ্ঠ সেলিম ওসমানের তুলনায় নিরীহ মাস্টার লিকলিকে এক ছাপোষা মানুষ। সেলিম ওসমানের চড়ে শ্রবণশক্তি লোপ পাওয়া শ্যামল কান্তি বাবুর কান থেকে রক্ত ও ঝরেছিল। তাতে কি?
বিচারকরা মনে করেন, এটাই হয়তো উচিত কাজ ছিল। বাঘের সে কাঁটা বেঁধার গল্পের মতো কাঁটা বের করার সময় যে মুন্ডু চিবিয়ে খায়নি সেটাই তো বড় পুরস্কার। সেলিম ওসমান যদি সেদিন পিটিয়ে শ্যামলকান্তিকে মেরেও ফেলতেন আমার ধারণা বেকসুর খালাস বা ঘটনা নিয়ন্ত্রণে তার সার্থকতার জন্য পুরস্কার পেতেন। বিষয় এখন এমনই।
সমাজে এত যে অনাচার অশান্তি কিংবা গণ্ডগোল এসব নিয়ে নেতাদের কোনও মাথাব্যথা আছে আদৌ? ব্যরিস্টার মইনুল হোসেনের যেসব ফোনালাপ ফাঁস হচ্ছে তার একটি বড় কৌতুকপ্রদ। যে দুজন মানুষকে তিনি ফোন করেছিলেন তাদের একজন স্বনামখ্যাত ব্যরিস্টার ড. কামাল হোসেন। ইনি বেশ ভদ্রভাবে জানিয়ে দিলেন তার দল মইনুল হোসেনের বিষয়ে মাথা ঘামাতে নারাজ। ব্যাপারটা ভাবুন।
কয়দিন আগে হাতে হাতে ধরি ধরি করে সখা-সখিরা ছবি তুললেন। আমরা দেখে আনন্দে আবেগে প্রায় কাঁদি কাঁদি। এত ঐক্য, এত ভালোবাসা, এতদিন কই আছিলো গো? এমন ভাব যখন দানা বাঁধতেও পারেনি, তখনই শুনি একজন আরেকজনকে বিপদে প্রত্যাখ্যান করছেন। ভালো মন্দ, ন্যায় অন্যায়ের- কথা পরে। আমি যদি আপনার সাথে জোট বাঁধি বা আমরা যদি মিত্র হই তাহলে আমাদের কী করা উচিত? একাত্তরে আমরা যাদের সাথে মিত্রতা করেছিলাম তারা কি দু:সময়ে আমাদের ফেলে গিয়েছিল? ভারত বা রাশিয়া? অন্যদিকে চীন-মার্কিন কি অন্যায় জানার পরও পাকিস্তানকে ত্যাগ করেছিল? এর নাম বন্ধুত্ব। সে দু:সময়ে ফেলে পাকিস্তান চলে যাওয়া ড. কামাল হোসেন আজও পলায়নপর। তিনি ঝুঁকি নিতে জানেন না, জীবনে একবারের জন্যও ঝুঁকি নেননি। সে তিনি মইনুলের জন্য ঝুঁকি নেবেন? এরপর শুনি জাফরুল্লাহ সাহেবও ড. কামাল হোসেনকে কাপুরুষ বলে গালি দিচ্ছেন।
আবার পরেরদিন মিডিয়ায় দেখি সেই কাওয়ার্ডের নেতৃত্বে জনসভায় ভাষণ দিচ্ছেন জাফরুল্লাহ সাহেব। তাহলে মানুষ কোনটা বিশ্বাস করবে? কাকে বিশ্বাস করবে? তিনি যদি ড. কামাল হোসেনকে কাওয়ার্ড মনে করেই থাকেন তাহলে সেটা স্পষ্ট করে বলেন না কেন? কেন তাকে তার সাহস ফিরিয়ে দেন না?
আর আপনি যদি কাউকে তেমনটা মনে করেই থাকেন তার নেতৃত্বে আপনি এই জাতিকে ছেড়ে দিচ্ছেন কিসের ভরসায়? তার মানে আপনারা কেউই আসলে জাতির কথা ভাবেন না। আপনাদের সমানে দুটো বিষয় কাজ করছে। নিজেদের আখের বা অবস্থান আর যেভাবে পারেন শেখ হাসিনাকে হটানো। এ কারণেই বাংলাদেশের মানুষ যদি পরিবর্তন চায়ও, তার জন্য আপনাদের সাথে যেতে রাজি নয়। বলছিলাম সমাজের কত অসঙ্গতি আর বিপদের কথা। একটা তরুণী মেয়ে সেও পুলিশের কাছে অনিরাপদ। অথচ যেকোনও সভ্য দেশে মানুষের শেষ আশ্রয় পুলিশ কিংবা নিরাপত্তা বাহিনী। সে জায়গায় মেয়েটিকে হেনস্থা করলো তারাই। এ নিয়ে আপনারা কিছু বলেন না। আপনাদের এজেন্ডায় দেশের আগামী দিন কিংবা বাচ্চাদের নতুন প্রজন্মদের নিয়ে ভাবনা নাই। খালি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলে বুড়োদের আগ্রহ থাকতে পারে। আমরা মজতে পারি। নতুন প্রজন্ম মজার সম্ভাবনা নাই জনাব।
ড. কামাল হোসেনকে আমরা অসম্মান করিনা। তিনি একজন প্রসিদ্ধ আইনজীবী। তবে ছেলেবেলা থেকে দেখছি নিজের ভালো ছাড়া আর কিছুই বোঝেননা তিনি। কোনদিন কারো জন্য কারো অধিকার বা কোন জাতিগোষ্ঠীর উপকার করতে আদালতে দাঁড়িয়েছেন এমনও শুনিনি। 'ভদ্রলোক জাতীয় একটা' ইমেজ থাকলেই কি রাজনীতিতে নিজের জায়গা করে নেওয়া সম্ভব? রাজনীতির কঠিন ময়দানে মানুষকে যে সাহস ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হয় তা যদি তার থাকতো সত্তর দশকের শেষদিকে ব্যরিস্টার আবুল হাসনাতের ধমকে দেশ ছেড়ে চলে যেতেন না। আজতো তিনি আরও বয়সী।
তিনি কী এখন আসলেই কোনও ঝুঁকি নেবেন? আরেকটা বিষয় খুব গোলমেলে। যেমন ধরুন, সিলেটের জনসভায় বলা মির্জা ফখরুলের কথাগুলো আমরা বুঝতে পারি। তিনি বিএনপির মহাসচিব। তিনি খালেদা জিয়ার মুক্তি চাইবেন এটাই স্বাভাবিক। তিনি তারেক রহমানকে গডফাদার মানবেন এটাই নিয়ম। আওয়ামী লীগও তাই করে তাদের বেলায়। কিন্তু এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে ড. কামাল হোসেন 'বঙ্গবন্ধু', 'বঙ্গবন্ধু', বলে মায়াকান্না কাঁদবেন এটা কেমন কথা? 'বঙ্গবন্ধু' কী তার মৃত্যুর বিচারে বাধা দেয়া ইনডেমিনিটি আইন পাশ করা দলের লোকদের সাথে রাজনীতি করার আদর্শ দিয়ে গেছেন? নাকি এভাবে তাকে সম্মান বা ভালোবাসা দেয়া যায়? জেনে শুনে একজন বিজ্ঞ মানুষের এহেন আচরণ আসলেই মন খারাপের। এবং তখন আমরা ধরে নেই এগুলো হয় ভাওতা, নয়তো বয়স হলে মানুষের মাথা কাজ করেনা।
কোনটা ঠিক সময় বলে দেবে। যদিও এখন আমরা এটা ধরে নিতে পারি এ অবধি সবচেয়ে বড় লুজার বা বড় লোকসানে আছেন ড. কামাল হোসেন। না, তাকে মানাচ্ছে না, তিনি সেখানে সম্মানিত না তার কথায় আসলে কোনও কাজ হবে।
তাকে যে তারা কিভাবে রেটিং করেন সেটাতো ফোনালাপেই বোঝা গেছে। তবুও তারা 'রাজনীতিতে শেষ কথা নাই' বলে বিশ্বাস করেন। আর সে বিশ্বাসের জোরে যখন যার সাথে খুশি যেতে পারেন। মানুষ এসব বুঝতে পারে বলেই সতর্ক। ড. কামাল হোসেনের উচিত ঝেড়ে কাশা। বিএনপি করাটা অপরাধ না। জিয়াউর রহমানকে নেতা মেনে নিজের যাবতীয় অর্জনকে আস্তাকুঁড়ে ফেলে দেয়াটাও খারাপ কিছু না। এমন অনেকেই করেছে এদেশে। তিনি করলেও কারো কিছু আসবে যাবেনা। এতে অন্তত: নিজে কাপুরুষ হবার হাত থেকে বাঁচতে পারবেন। তার ভূমিকা এতটাই অস্বচ্ছ আর অতীত এমনই যে, সবাই মনে করছেন অচিরেই তিনি হয় দেশ ছেড়ে চলে যাবেন। নয়তো আবার শীতনিদ্রায় গিয়ে ঐক্যফ্রন্টের বারোটা বাজাবেন। তাছাড়া পাশে বসা ধূর্ত বদরাগী হতাশ মানুষগুলোর সাথে তিনি কতদিন থাকতে পারবেন সেটাও বিবেচনার বিষয় বৈকি। সবচেয়ে বড় কথা সাহস বা হিম্মত। ভালোবাসা আর আদর্শ না থাকলে, তা যে থাকেনা তিনি খুব ভালো জানেন। একুশে অগাস্টের ঘটনার দিনের একটি ছবি সমাজ ও জাতির জন্য প্রেরণার।
এত শোকাবহ রক্তাক্ত দিনেও একদল মানুষ তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নেত্রীকে ঘিরে রেখেছিলেন। শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি দেখছেন মেয়র হানিফের মাথা থেকে শরীর থেকে রক্ত চুইয়ে পড়ে তার শাড়ি লাল করে দিচ্ছিল। তবু তিনি নেত্রীকে ছেড়ে যাননি। এমনই করেছিলেন আরো নেতারা। তারা মরে গিয়েও নেতাকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। এমন একজনও আছে আপনার আশেপাশে?
রবীন্দ্রনাথ সে কত আগে লিখে গিয়েছেন: তোমার হাতে নাই ভূবনের ভার ওরে ভীরু। আগে আপানর কাছের মানুষদের দেওয়া বদনাম 'কাওয়ার্ড', মানে কাপুরুষ বদনামটা ঘোচাতে হবে ড. কামাল হোসেন। তারপর না হয় দেশ জাতির হাল ধরবেন। সেটাই কি ভালো হবেনা আপনার জন্য?