Published : 16 Jan 2026, 02:03 PM
বাংলাদেশের পারিবারিক আইন, সামাজিক রীতি ও রাষ্ট্রীয় নীতিকাঠামো—এই তিনটি স্তম্ভই মূলত পিতৃতান্ত্রিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বিশেষ করে মুসলিম পারিবারিক আইন ও ঔপনিবেশিক আইন মিলিয়ে যে আইনি কাঠামো তৈরি হয়েছে, সেখানে নারীর অধিকার কাগজে থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ অত্যন্ত দুর্বল অথবা বলতে গেলে নেই। নারীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বদলে জটিল আইনি প্রক্রিয়া এবং প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রে নারীকে আরও অরক্ষিত ও নির্ভরশীল করে তোলে।
সাম্প্রতিক সময়ে নারীর সুরক্ষার নামে যে আইন ও বিধান যুক্ত হয়েছে, তার কিছু কিছু নারীর জন্য অমর্যাদাকর ও প্রশ্নবিদ্ধ। ‘বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে ধর্ষণ’ সংক্রান্ত ধারা তার একটি উদাহরণ। ব্রিটিশ আইনে যে ধারা বহু আগেই বাতিল হয়েছে এবং ভারতের কলকাতায়ও যা এখন কার্যকর নেই, সেটিই বাংলাদেশে নতুন করে পৃথক করা হয়েছে। বৈষম্য রয়ে গেছে সন্তানের অভিভাবকত্ব আইনে—নারী সন্তান জন্ম দেন, লালন-পালন করেন, অথচ আইন তাকে পূর্ণ অভিভাবকত্বের স্বীকৃতি দেয় না। সম্পত্তির উত্তরাধিকার আইনেও নারীর অবস্থা নাজুক। প্রচলিত আইন অনুযায়ী কন্যাসন্তান পুত্রসন্তানের অর্ধেক সম্পত্তির অধিকারী হবেন। বাস্তবে নারীরা ওই অধিকার আদায় করতেও পারেন না। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট জমির মাত্র প্রায় ২ থেকে ৪ শতাংশ নারীর নামে নিবন্ধিত। অর্থাৎ শতকরা ৯৫ ভাগের বেশি জমির মালিকানা পুরুষের হাতে। গ্রামীণ এলাকায় এই হার আরও কম। এমনকি যেসব সম্পত্তি নারীর নামে থাকে, সেগুলোর ওপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা ব্যবহারিক নিয়ন্ত্রণ অনেক সময় নারীর হাতে থাকে না; স্বামী, ভাই বা অন্যান্য পুরুষ আত্মীয়রাই বাস্তবে তা পরিচালনা করেন। এমন বাস্তবতায় সম্পত্তিতে সমানাধিকারের প্রসঙ্গ আসলেই এক শ্রেণির ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠী ধর্মের দোহাই দিয়ে তুলকালাম বাধিয়ে দেন; যেনবা তারা প্রত্যেকে মা, বোন, স্ত্রী, কন্যার হক যথাযথভাবে পূরণ করেছেন! যার প্রতিটি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী অথচ রাষ্ট্র সকল ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারবদ্ধ।
নারী-পুরুষের সমানাধিকার বা ন্যায়বিচারের প্রশ্নে এক শ্রেণির ধর্মীয় বক্তা ও ধর্মভিত্তিক দলগুলো যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়, ধর্মের নৈতিক ও ন্যায়ভিত্তিক শিক্ষার প্রচারে কি একই রকম তৎপর তারা? গত ১১ জানুয়ারি হাইকোর্টের একটি রায় এই প্রশ্নগুলোকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী, আগের বিয়ে বহাল থাকা অবস্থায় সালিশি কাউন্সিলের লিখিত অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা যাবে না—এই বিধানটি বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে এই ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আইনজীবী ইশরাত হাসান একটি রিট দায়ের করেন। প্রাথমিক শুনানির পর ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি হাইকোর্ট রুল জারি করেছিলেন। রুলে আদালত জানতে চেয়েছিলেন, পারিবারিক জীবন রক্ষার স্বার্থে বহুবিবাহ আইনের নীতিমালা কেন করা হবে না এবং স্ত্রীদের সমঅধিকার নিশ্চিত না করে আইন অনুযায়ী বহু বিবাহের অনুমতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। ২০২৫ সালের ২০ অগাস্ট চূড়ান্ত শুনানি শেষে হাইকোর্ট ওই রুল খারিজ করে বিচারপতি ফাহমিদা কাদের এবং সৈয়দ জাহেদ মনসুরের বেঞ্চ। ফলে ১৯৬১ সালের ধারা বহাল থাকল। প্রশ্ন হলো, এই কাঠামো কি সত্যিই ইসলামের ন্যায়বিচারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
মুসলিম পারিবারিক আইন, ১৯৬১-এর ৬ ধারা: বহুবিবাহ সংক্রান্ত বিধিনিষেধ এ কী রয়েছে:
১. কোনো ব্যক্তির চলমান বিবাহ থাকাকালে, সালিশি কাউন্সিলের লিখিত অনুমতি ছাড়া নতুন বিবাহ করা যাবে না। এই অনুমতি ছাড়া অনুষ্ঠিত বিবাহ ১৯৭৪ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইনের অধীনে নিবন্ধিত হবে না।
২. অনুমতির জন্য আবেদন চেয়ারম্যানের কাছে নির্ধারিত ফিসহ করতে হবে। আবেদনে প্রস্তাবিত বিবাহের কারণ এবং বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীগণের সম্মতি উল্লেখ করতে হবে।
৩. চেয়ারম্যান আবেদনকারী ও বর্তমান স্ত্রী/স্ত্রীদের জন্য একজন করে প্রতিনিধি মনোনীত করবেন। এই প্রতিনিধিরা মিলিত হয়ে গঠিত সালিশি কাউন্সিল প্রস্তাবিত বিবাহ ‘প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সংগত’ মনে করলে শর্তসাপেক্ষে অনুমতি প্রদান করবে।
৪. কাউন্সিল তাদের সিদ্ধান্তের কারণ লিখিতভাবে নথিভুক্ত করবে। সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো পক্ষ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সহকারী জজের কাছে রিভিশনের আবেদন করতে পারবে। সহকারী জজের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে।
৫. সালিশি কাউন্সিলের অনুমতি ছাড়া বিবাহ করলে: বর্তমান স্ত্রী/স্ত্রীদের তলবি ও স্থগিত দেনমোহর সম্পূর্ণ পরিশোধ করতে হবে; না করলে তা বকেয়া ভূমি রাজস্ব হিসেবে আদায় করা হবে। অপরাধী ধরা পড়লে এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অথবা দশ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
আইনের বর্তমান কাঠামোতে সালিশি কাউন্সিল, চেয়ারম্যান ও সহকারী জজের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে ধরা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় সালিশি ব্যবস্থার পক্ষপাতদুষ্ট চরিত্র নতুন কিছু নয়। রিটকারীর দাবি ছিল, এই অনুমতি প্রক্রিয়া আদালতের তত্ত্বাবধানে আনতে হবে, যাতে নারীর প্রকৃত সুরক্ষা নিশ্চিত হয়। ওই দাবি পূরণ না হওয়ায় বহুবিবাহের অনুমতি তাদের হাতে থাকলেও স্ত্রীর অন্যান্য অধিকার আদায়ে আইনি রক্ষাকবচ দুর্বলই থেকে গেল। এখানে স্ত্রী/স্ত্রীগণের অনুমতি মুখ্য বিষয় থাকছে না, আগেও যেমন ছিল না। আদালতের তত্ত্বাবধানে অনুমতি বা দেনমোহর প্রাপ্তি নিষ্পত্তি হলে স্ত্রী/স্ত্রীগণের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভবপর ছিল।
অপরদিকে ইসলামে বহুবিবাহের অনুমতি কোনো সাধারণ বা অবাধ অধিকার হিসেবে আসেনি; এর একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট ছিল। ইসলাম আবির্ভাবের সময় আরব সমাজ ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত ও অস্থির। একের পর এক যুদ্ধে বহু পুরুষ নিহত হতেন, ফলে সমাজে বিপুলসংখ্যক বিধবা নারী ও এতিম শিশু অসহায় অবস্থায় পড়ে যেতেন। ওই বাস্তবতায় নারীদের নিরাপত্তা, সম্মানজনক জীবনযাপন ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাই ছিল বহুবিবাহের অন্যতম উদ্দেশ্য। কোরানের সুরা নিসার ৩ নম্বর আয়াতে বহুবিবাহের অনুমতি দেওয়া হলেও তার সঙ্গে কঠোর শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে—স্ত্রীদের মধ্যে পূর্ণ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। এমনকি একই সুরার ১২৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, স্ত্রীদের মধ্যে পূর্ণ ন্যায়বিচার করা মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
অর্থাৎ ইসলাম মূলত এক বিবাহকেই আদর্শ হিসেবে দেখেছে, আর বহুবিবাহকে দেখেছে ব্যতিক্রমী সামাজিক প্রয়োজনের সমাধান হিসেবে। প্রশ্ন হলো, ওই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট কি আজও বিদ্যমান? আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, সামাজিক নিরাপত্তা, নারীর শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বাস্তবতায় যুদ্ধবিধ্বস্ত সমাজের ওই পরিস্থিতি আর নেই। ফলে আজকের সমাজে বহুবিবাহ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সামাজিক দায়িত্বের চেয়ে ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও পিতৃতান্ত্রিক সুবিধার রূপ নিয়েছে। সেজন্য বলা যায়, ইসলামে বহুবিবাহের অনুমতির প্রেক্ষাপট ঐতিহাসিকভাবে যুক্তিসংগত হলেও, বর্তমান বাস্তবতায় তার প্রাসঙ্গিকতা গভীরভাবে পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।
এখানেই আসে স্ত্রীর হক প্রসঙ্গ। ইসলাম ধর্মে স্ত্রীর অধিকার কেবল নৈতিক উপদেশ নয়, বরং একটি কঠোর ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা। দেনমোহর স্ত্রীর অবিচ্ছেদ্য অধিকার—এটি কোনো উপহার বা দয়া নয়। কোরানে স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে, “তোমরা নারীদের তাদের মোহর স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রদান কর” (সুরা নিসা: ৪)। বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে দেনমোহর সম্পূর্ণভাবে পরিশোধ করা হয় না, অথবা গহনা ও পারিবারিক খরচের অজুহাতে তা উসুল দেখানো হয়। আবার স্ত্রীর নামে দেওয়া সম্পত্তি বা গহনার ওপরও তার প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ থাকে না।
এখন কথা হলো, যে ব্যক্তি প্রথম স্ত্রীর এসব অধিকার যথাযথভাবে পূরণ করেন না, তিনি কীভাবে দ্বিতীয় বিয়ের নৈতিক বা ধর্মীয় বৈধতা দাবি করতে পারেন? প্রথম স্ত্রীর সম্মতি যদি সামাজিক চাপ, মানসিক নির্যাতন বা অর্থনৈতিক নির্ভরতার ফল হয়, তবে ওই সম্মতিকে কতটা স্বাধীন ও ন্যায়সংগত বলা যায়?
সবশেষে প্রশ্ন একটাই—আমরা কি ধর্মের কেবল অনুমতির অংশটুকু নেব, নাকি তার সঙ্গে যুক্ত ন্যায়, দায়িত্ব ও জবাবদিহির অংশটুকুও সমানভাবে গ্রহণ করব? ইসলাম ধর্মে স্ত্রীর হক পূরণ করা অত্যন্ত কঠিন ও মর্যাদাসম্পন্ন দায়িত্ব। এই দায়িত্ব এড়িয়ে গিয়ে ধর্মের নাম ব্যবহার করা ইসলামের মূল শিক্ষার সঙ্গেই সাংঘর্ষিক।