Published : 12 Jan 2026, 03:40 AM
বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসনে ২০২৫ সাল এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের বছর। রেকর্ডসংখ্যক কর্মী বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে দেশ ছেড়েছেন এবং রেমিট্যান্সের প্রবাহ গত ২৫ বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। অর্থনৈতিকভাবে এটি বড় সাফল্য মনে হলেও, এর আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারও মানুষের কান্নার গল্প।
রাষ্ট্র এখনো প্রবাসীদের কেবল ‘রেমিট্যান্স পাঠানোর মেশিন’ বা সংখ্যা হিসেবে দেখে। দেখার এই দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হবে। যাদের ঘাম ও শ্রমে একটি বৈষম্যহীন আগামীর স্বপ্ন ডানা মেলতে পারে, তাদের জীবনকে সহজ ও নিরাপদ করার জন্য যে ধরনের বাস্তবমুখী রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ প্রয়োজন, তা নিতে হবে।
বিশ্বজুড়ে শ্রম অভিবাসন প্রক্রিয়া ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। মানবিক সংকটের সবচেয়ে করুণ দিকটি ফুটে ওঠে আমাদের নারী অভিবাসীদের অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্নে। বিগত কয়েক বছরে নারী অভিবাসনে যে নেতিবাচক ধারা আমরা দেখছি, তা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। খবরে প্রায়ই দেখা যায়, বিদেশে কর্মরত নারীরা শোভন কর্মপরিবেশের অভাব এবং গৃহকর্তার নির্যাতন-নিপীড়নে জর্জরিত হয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হন। লাশ হয়ে ফিরে আসার ঘটনাও খুব দুর্লভ নয়। শোভন কর্মপরিবেশের অভাব ও হিংসাত্মক আচরণে ঝুঁকি—এই দুটি কারণই আমাদের মা-বোনদের অভিবাসনের পথ থেকে বিরত রাখছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমাদের সমাজের রক্ষণশীল পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা, যা নারীকে ঘরের বাইরে কাজ করতে ক্রমাগত নিরুৎসাহিত করে। এই মনোভাব কতটা নারী শ্রম অভিবাসন হ্রাসে ভূমিকা রাখছে, তা নিয়ে গভীর গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
একজন নারী অগণিত বাধা অতিক্রম করে বিদেশে যাওয়ার সাহস দেখান। ওই মুহূর্তে তার সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অবশ্যই দায়িত্ব বরং আমরা এখানে একটি বিশাল শূন্যতা দেখতে পাই। নারী অংশগ্রহণ হ্রাস শুধু শ্রমবাজারের ক্ষতি নয়, সমাজে সমতা ও নাগরিক অধিকারের লক্ষ্যে আমাদের পিছিয়ে যাওয়ার স্পষ্ট সংকেত।
ব্যক্তিগত বঞ্চনার পাশাপাশি রয়েছে রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালালদের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এক নিয়মিত শোষণ ব্যবস্থা। এটি ব্যক্তিগত নয় বরং গোছানো এবং সংগঠিত। পার্শ্ববর্তী দেশগুলো (ভারত, পাকিস্তান, নেপাল) অত্যন্ত সীমিত সংখ্যক লাইসেন্সপ্রাপ্ত এজেন্সির মাধ্যমে অভিবাসন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। অথচ বাংলাদেশে এই সংখ্যা অস্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা প্রকৃতপক্ষে তদারকি করা প্রায় অসম্ভব। এর ফলে সৃষ্টি হয়েছে এক অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা এবং শ্রমিকরা হচ্ছেন সিন্ডিকেটের জিম্মি।
কুয়েতের মতো দেশে মুষ্টিমেয় কিছু এজেন্সির সংঘবদ্ধ দল সরকারি ফি-এর চেয়ে বহুগুণ বেশি অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। এটি সরাসরি শোষণ ছাড়া আর কিছু নয়। আরও লজ্জাজনক বাস্তবতা হলো, এই শোষণ চক্রে প্রায়শই প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও নীতিনির্ধারকদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আসে। এই স্বার্থের সংঘাত শিল্পটিকে আরও দুর্বল করে তোলে।
যখন আইনপ্রণেতারা নিজেরাই রিক্রুটিং ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তখন সাধারণ শ্রমিকদের পক্ষে কথা বলার কেউ থাকে না। এখন নাগরিক সমাজ থেকে দাবি উঠছে, সংসদ সদস্য থাকাকালীন কোনো ব্যক্তি বা তাঁর পরিবারের সদস্যদের রিক্রুটিং এজেন্সি লাইসেন্স না দেওয়া এবং বিদ্যমান লাইসেন্স স্থগিত করা। এই দাবি অত্যন্ত যৌক্তিক এবং এটা স্বচ্ছতার জন্য জরুরি।
রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনার সুযোগ নিয়ে অনেকে কঠোর অভিবাসন নীতির মুখে পড়ে অনিয়মিত ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নেন। তারা জানেন না কোথায় যাচ্ছে, জানেন না তাদের ভবিষ্যত। বিশ্বব্যাপী পরিস্থিতি আমাদের অভিবাসীদের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠছে। উন্নত দেশগুলো ক্রমশ তাদের অভিবাসন নীতি কঠোর করছে। বৈধ পথের অভাব এবং অনিশ্চয়তা আমাদের মানুষকে চরম বিপদের মুখে ফেলছে। ভূমধ্যসাগরের মতো মরণফাঁদে তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পা বাড়াচ্ছেন। এই দুর্ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের মূল চেতনার সরাসরি বিরোধী।
২০২৫ সালের বড় ট্র্যাজেডি হলো, রাশিয়ায় ভালো বেতন ও নাগরিকত্বের প্রলোভন দেখিয়ে সরল কর্মীদের রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। প্রতারণাপূর্বক যুদ্ধে পাঠানো জঘন্য এক মানবাধিকারের লঙ্ঘন। এটি কি আধুনিক দাসত্বের নতুন অধ্যায় নয়? রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল এই অসৎ চক্র দমন করা। তদারকির অভাবে অসংখ্য পরিবার এখন প্রিয়জনের মৃতদেহের অপেক্ষায় কাঁদছে।
এই অন্ধকারের মাঝেও কিছু আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কয়েকটি ইতিবাচক উদ্যোগ আশা জাগাচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, প্রবাসী নাগরিকদের ভোটাধিকার স্বীকৃতি। প্রথমবারের মতো প্রবাসীরা পাচ্ছেন ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে বিদেশ থেকে ভোট দেওয়ার সুযোগ। ১১ লাখের বেশি প্রবাসী ইতিমধ্যেই নিবন্ধিত হয়েছেন। এটিই প্রমাণ করে তারা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে কতটা সচেতন।
এই উদ্যোগ প্রবাসীদের শুধু রেমিট্যান্স পাঠানো হাত নয়, দেশের সক্রিয় নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ‘বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী বিধিমালা ২০২৫’, পুনরেকত্রীকরণ নীতি, জাপানের সঙ্গে বিনা খরচে দক্ষ কর্মী পাঠানোর চুক্তি এবং সৌদি আরবে ‘তাকামল’ দক্ষতা পরীক্ষা—এগুলো সবই ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এগুলো কি সত্যিই সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে, নাকি দালালদের নতুন আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে?
সরকারের প্রতিশ্রুতি তখনই প্রশ্নবিদ্ধ হয় যখন বাজেট বরাদ্দ দেখি। মুখে প্রবাসী-বন্ধুত্বের কথা বলা হলেও বাজেটে তার প্রতিফলন নেই। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ১১৪০ কোটি থেকে কমে ৮৫৫ কোটি টাকায় নেমেছে—প্রায় এক-চতুর্থাংশ কাটছাঁট। রেমিট্যান্সে ভর করে দাঁড়ানো অর্থনীতিতে প্রবাসীদের কল্যাণে এমন ক্ষুদ্র বিনিয়োগ চরম বৈষম্যের উদাহরণ, যা জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারের কাছ থেকে একদমই প্রত্যাশিত ছিল না।
যথাযথ বাজেট ছাড়া প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মান উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। বিদেশে বিপদগ্রস্ত কর্মীদের আইনি সহায়তা দেওয়াও সম্ভব হয় না। রেমিট্যান্সের উপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি অর্থনীতিতে সেই খাতের জন্য এমন ক্ষুদ্র বাজেট বরাদ্দ একটি চরম বৈষম্যের উদাহরণ। এটি রাষ্ট্রের প্রকৃত অগ্রাধিকার কোথায় তা স্পষ্ট করে দেয়। অথচ, এ খাতে জাতীয় বাজেটের অন্তত ১% বরাদ্দের দাবি দীর্ঘদিনের।
এই সব সীমাবদ্ধতা দূর করতে আমাদের প্রশাসনিক কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আনতে হবে। বর্তমান ব্যবস্থা আর যথেষ্ট নয়। অভিবাসন বিষয়ে দক্ষতা ও জ্ঞান সংরক্ষণের জন্য একটি পৃথক বিশেষায়িত ক্যাডার সার্ভিস চালু করা অত্যাবশ্যক। এতে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জীবনভর এই খাতেই কাজ করবেন, অন্য মন্ত্রণালয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না।
আমাদের মনে রাখতে হবে অভিবাসীরা শুধু আয়ের উৎস নন তারাও রক্ত-মাংসের মানুষ। আমাদের মা-বাবা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান। তাদের মানবাধিকার রক্ষা করা কোনো কল্যাণমূলক কাজ নয়, এটি রাষ্ট্রের আবশ্যক দায়িত্ব।
নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো প্রতারিত কর্মীদের ক্ষতিপূরণ আদায় এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করছে। এই প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ এবং সত্যি বলতে গেলে, রাষ্ট্রের অনেক ঘাটতি তারা আড়াল করে রাখছে। সরকারকে এই নাগরিক উদ্যোগগুলোকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে নীতিনির্ধারণের অংশীদার বানাতে হবে। একা রাষ্ট্র পারবে না, একা নাগরিক সমাজও না, অভিবাসীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে হলে এই দুই পক্ষের সমন্বয় দরকার।