Published : 11 Oct 2010, 08:44 PM

ঢাকায় আবারো ট্রেন-বাস সংঘর্র্ষ ! সায়েদাবাদ রেলক্রসিংয়ে নারায়নগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী একটি ট্রেন দুটি যাত্রীবাহী বাসকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়েছে। এতে বাসযাত্রী ও পথচারী মিলিয়ে ৬ জন নিহত ও কমপক্ষে ৩৫জন আহত হয়েছে। এটি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে এরকম ঘটনা ঘটল বেশ কয়েকটি। প্রতিদিন একাধিক দুর্ঘটনার খবরের সাথে অভ্যস্ত আমাদের সাংঘর্ষিক জীবনে এসব ঘটনা স্বাভাবিক বলেই ভাবি। কিছূদিন আগেই মগবাজার রেলক্রসিংয়ে এক তরুণ দম্পতির মোটরবাইকের সাথে ট্রেনের সংঘর্ষ ঘটেছিল।
এতে নিহত হয়েছিল তিনটি প্রাণ; বাবা-মায়ের সাথে মায়ের গর্ভে থাকা অনাগত একটি শিশুকেও মানব ভুলের চরম মাশুল গুনতে হয়েছিল। তারও আগে মালিবাগ রেলক্রসিংয়ে একটি বাসকে বেশ কিছুদূর টেনে নিয়ে গিয়েছিল একটি ট্রেন। নিয়ে ফেলেছিল দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটি যানবাহনের উপর। অনেকটা কান ধরে টেনে নিয়ে সজোরে আছাড় দেবার মত। ঘটনাচক্রে সে সময়ে সেখানে টিভি ক্যামেরা নিয়ে উপস্থিত ছিলেন এটিএন বাংলার একজন টিভি রিপোর্টার। তিনি প্রথমে ভেবেছিলেন কোন সিনেমার শুটিং হচ্ছে। এসব ঘটনা অবশ্য সিনেমার চেয়েও আশ্চর্যকর। তার ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ রুদ্ধশ্বাসে দেখেছে অগুণিত টিভি দর্শক।
একটি অত্যন্ত জনবহুল শহরের মধ্য দিয়ে এঁকে-বেঁকে গেছে রেলপথ, শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে রয়েছে অসংখ্য রেলক্রসিং। সেসব রেলক্রসিং দিয়ে বানের জলের মত প্রতিমূহুর্তে পার হচ্ছে ট্যাক্সি, বাস, ট্রাক, সিএনজি, সাইকেল, ঠেলাগাড়ি, মটরবাইক, রিকশা, ভ্যানগাড়ি, মানুষ, গরু-ছাগল-মহিষ– কী নয়? ট্রেন যখন আসে তখন ইতোমধ্যে ট্রাফিকজ্যামে হাঁস-ফাঁস নগরীর যানবাহনের চালকেরা আরো দীর্ঘ জ্যামে পরে তিক্ত-বিরক্ত হয়। রেলক্রসিংগুলো ঢাকার ট্রাফিকজ্যাম কয়েকগুন বাড়িয়ে দিয়েছে- এ ব্যাপারে দ্বিমত নেই কারো। গতকালের সংবাদপত্রেই জেনেছি ফার্মগেট থেকে উত্তরার ১৬ কিলোমিটার রাস্তা যেতে সময় লাগার কথা ত্রিশ মিনিট, লাগে আড়াই থেকে তিন ঘন্টা। এর কারণ লেভেল ক্রসিংয়ের প্রতিবন্ধকতা। ঐ পথে সরাসরি বা অপ্রত্যক্ষ রেলক্রসিং আছে আটটি, প্রতিটি রেলক্রসিংয়ের কারণে গড়ে পনের মিনিট করে থামতে হলে ১২০ মিনিট বা দু'ঘন্টা কাটে কেবল ক্রসিংয়ে অপেক্ষায়। ট্রেন যখন চলে যায় তখন দ্রুত পার হবার ও আগে যাবার প্রতিযোগিতা চলে । কিছুক্ষণ পরেই হযতো চলে আসে পরবর্তী ট্রেন। এমনকি গেটম্যান যখন ফড়িঙের দীর্ঘ লেজের মত প্রতিবন্ধকটি নামাতে থাকেন, তখনো তার নিচ দিয়ে শোঁ শোঁ করে যানবাহন যেতে থাকে, মোটরসাইকেলগুলো নিয়মের বিপরীত দিক থেকে আঁকা-বাঁকা করে পার হয়, আর মানুষতো ট্রেন চলে আসার শেষমূহুর্ত পর্যন্ত পার হতে থাকে। ঝুঁকি নিয়ে এই পারাপারের কারণ একটাই – মানুষ ট্রাফিক জ্যামে শুধু বিরক্ত নয়, একেবারেই অতিষ্ঠ।
সায়েদাবাদ রেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ গেটম্যান না থাকা। দায়িত্বে অবহেলার জন্য অলিম্পিকে কোন গোল্ড মেডেল থাকলে সেটা যে আমরাই পেতাম তা নিশ্চিত। শুনলাম একজন গেটম্যান তার কাজের জন্য দৈনিক ৮০ টাকা বেতন পান অর্থাৎ মাসে সাকুল্যে ২৪০০ টাকা (এ বেতন সরকার নির্ধারিত একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের নূন্যতম মজুরির চেয়েও ৬০০ টাকা কম।) যে লোকটি প্রতিদিন আক্রার বাজারে যায়, দ্রব্যমূল্যের আগুনে প্রতিদিন যার গায়ে ফোস্কা পড়ে, তার পক্ষে ঐ অমানবিক বেতনে অনুপ্রাণিত বা দায়িত্বশীল সেবা দেয়া যে সম্ভব নয়, তা বুঝতে বড় পণ্ডিত হতে হয় না। এখন প্রশ্ন হল, যার দায়িত্ব সচেতনতা বা সতর্কতার উপর অসংখ্য মানুষের জীবন-মরণ নির্ভর করে, আমরা কী করে তাকে ঐ মানবেতর জীবনে ফেলে রাখি? জননিরাপত্তা নিয়ে যারা প্রতিদিন গলা ফাটান ও চীৎকার-চেচামেচি করেন, তাদের উচিৎ 'জননিরাপত্তা' বিষয়টি কী প্রথমত তা ভাল করে বোঝা এবং সেটা নিশ্চিত করতে যুগোপযুগি ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেয়া।
আমার বন্ধুদের আড্ডায় একজন বন্ধু একবার এই বলে আক্ষেপ করেছিল যে, সোনার বাংলাদেশের মাটির নিচে কোন সোনার খনি নেই, এমনকি তেমন কোন উল্লেখযোগ্য খনিজ সম্পদও নেই। তখন তাকে থামিয়ে দিয়ে অপর এক বন্ধু বলেছিল, 'কে বল্ল নেই, আমাদের রাস্তাগুলোই তো এক একটা সোনার খনি।' প্রতিবছরই সেগুলো খোঁড়া হয় আর সোনার মত বিলের টাকা তোলা হয়, সেসব টাকায় অনেক সোনার প্রাসাদও নির্মিত হয়েছে। দেশপ্রেমহীন রাজনীতিবিদ, দুর্নীতিগ্রস্থ আমলা, অসৎ প্রকৌশলী ও জোচ্চড় ঠিকাদার মিলে যে দুষ্টচক্র গড়ে উঠেছে তা থেকে এদেশের মানুষদের আশু মুক্তি নেই। একেকটি রাস্তা/ হাইওয়ে কতজনকে যে সোনায় মুড়ে দিয়েছে তার খবর কে রাখে? প্রতিবছরই রাস্তা ভাঙ্গবে আর প্রতিবছরই রাস্তা শুধু মেরামত নয়, নতুনভাবে নির্মাণ করা হবে- এত টাকা এই সম্পদহীন দেশটির কোথায়? এই দুষ্টচক্র থেকে আমরা কবে বেরিয়ে আসব? না কি এ হচ্ছে দলীয় ও পছন্দের লোকদের কিছু পাইয়ে দেবার এক চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত?
একবার কথা বলছিলাম সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের এ নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে। একটি টেণ্ডারের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেছিলেন সর্বনিম্ন দরপত্রদাতা যে রেট উল্লেখ করেছিল তা দিয়ে ঐ নির্মাণ কাজটি করা অসম্ভব, কেননা অধিদপ্তরের একটি হিসাব আছে ২৪ ফুট প্রশস্ত (স্ট্যাণ্ডার্ড) এক কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণের জন্য সর্বনিম্ন কত টাকা প্রয়োজন। 'তাহলে সে কী করে করবে কাজটি?' আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম। 'করবেনা' প্রকৌশলীর নির্মোহ উত্তর। অর্থাৎ কোন কাজ না করেই পুরো টাকাটা বিল করে নিয়ে যাবে ঐ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী লোকটি। শুনে আমি হতভম্ব। এও কি সম্ভব? সবই সম্ভব 'সেলুকাস কী বিচিত্র' এই দেশে। 'আমাকে ঐ বিলে সাইনও করতে হবে', তিনি ক্ষোভের সাথে বলেছিলেন। মনে পড়ে গেল বাংলাদেশের দুর্নীতির সেই প্রচলিত গল্প যা একটি সত্যি ঘটনা থেকেই উদ্ভূত। এক ঠিকাদার একই স্থানে একটি কাজের জন্য দু'বার বিল তুলে নিয়েছিল, প্রথমবার নিয়েছিল ঐ স্থানে একটি পুকুর খননের জন্য, দ্বিতীয়বার নিয়েছিল পুকুরটি ভরাট করার জন্য। আসলে সে কোন কাজই করেনি, স্থানটি অবিকৃত থেকে গিয়েছিল।
এবার ঈদের ছুটিতে আমি নেত্রকোনা জেলার প্রান্তিক উপজেলা মোহনগঞ্জে গিয়েছিলাম। এ অঞ্চল ছাড়ালেই হাওড় এলাকার শুরু। বারহাট্টা এলেই আমার মনে পড়ে এখানে কবি নির্মলেন্দু গুণের বাড়ি। বারহাট্টা থেকে অধীতপুর পর্যন্ত পাঁচ-ছয় কিলোমিটার রাস্তাটি এমনই ভেঙ্গে গেছে যে সে পথটুকুতে মনে হয় না যে বাসে চড়েছি, মনে হয় মাঝ নদীতে নৌকায় দুলছি। তখন মনে পড়ে যায়, বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ, কিছুকাল আগেও নৌকাই ছিল আমাদের প্রধান বাহন; সড়ক আর সড়কের বাস তো নদী আর নৌকার তুলনায় নবীনই। তাই আমরা নদীকে আজো ভুলতে পারিনি। সড়কে খানা-খন্দ বানিয়ে এমন করে নেই যে নদীর পূর্ণ দোলাই ঐ নিরেট পীচের ঊপর পাওয়া যায়। আমি নিশ্চিত গণচীনে ঐ ঠিকাদারকে জনস্বার্থ বিসর্জন দিয়ে দুর্নীতি করার জন্য প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝোলাত কমিউনিস্ট সরকার। বাংলাদেশে হবে এর বিপরীত – পুনর্বার কার্যাদেশ পাবে ঐ ঠিকাদারই, এবং পুনর্বার ঐ রাস্তা চাঁদের মরুভূমির মত হবে।
ঠাকুরকোনাতে একটি ব্রিজ আছে কংস নদের একটি শাখার উপর। খালের মত শীর্ণ শাখানদী, ব্রিজটিও তেমন কিছু নয়। তবে কোন বীরপুরুষও সে সেতু বাসে করে পার হ'তে চাইবেন না। ব্রিজের উপর বাস এমনভাবে দোলে যে মনে হবে রোলারকোষ্টারে চড়েছি। থীম পার্কে গিয়ে টিকেট কেটে রোলারকোষ্টারে চড়ে মানুষ, আর এ যে না চাইতেই জল। এই চলছে অনেকদিন ধরে, সেতুটির আয়ুও নাকি শেষ, তবু কারো যেন কোন উদ্বেগ নেই। সকলে বোধহয় সেই দিনটির জন্য অপেক্ষা করে আছে যেদিন ব্রিজটি সকল সংবাদপত্রে হেডলাইন হবে। পাশের যাত্রীকে জিজ্ঞেস করি, এটি কোন ঠিকাদার তৈরী করেছিলেন। তিনি যার কথা বলেন তাকে চেনে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, নিজের নামে যিনি একটি বাহিনী পর্যন্ত বানিয়েছিলেন। তখন মনে পড়ে যায় দু'বছর আগে বিরিশিরি যাওয়ার স্মৃতি। সেখানে পরপর তিনটি ব্রিজ রয়েছে যেগুলো পৃথিবীর মানচিত্রেই অনন্যসাধারণ, কেননা প্রতিটি ব্রিজেরই কোন শুরু ও শেষ নেই, রয়েছে কেবল মাঝের অংশটুকু। মনে হবে কোন শিল্পী ব্রিজগুলো এঁকে দুপাশের অংশ তুলি দিয়ে মুছে দিয়েছেন। বর্ণনায় যতই মুগ্ধকর হোক না কেন, ব্রিজগুলো ঐ অঞ্চলের মানুষের কোন উপকারে লাগে নি।
বাংলাদেশের রাস্তাগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যাবে এসব রাস্তায় দুর্ঘটনা না হওয়াই আশ্চর্য ঘটনা। মোহনগঞ্জের পথে দেখেছি, কিংবা মাদারীপুর যাবার পথে রাস্তাগুলোর প্রশস্ততা এমনই মাপে তৈরী যে দুটো বড় গাড়ী, যেমন বাস বা ট্রাক, স্বচ্ছন্দে পাশ ঘেঁষে যেতে পারবে না। হয় দুটিকেই থামতে হবে কিংবা গতি কমাতে হবে। কোন কোন ক্ষেত্রে একটি গাড়িকে সড়ক ছেড়ে পাশের মাটিতে নেমে দাঁড়াতে হবে । এখন প্রশ্ন হচ্ছে কে নীচে নেমে দাঁড়াবে? আমাদের বাস বা ট্রাকের ড্রাইভারদের আর কিছু না থাকুক, প্রচণ্ড অহং রয়েছে। ঐ অহংয়ের কারণেই তারা ঊর্ধশ্বাসে ছোটে, সকলকে ছাড়িয়ে গিয়ে হারিয়ে দিয়ে বিজয়ীর গর্বে বুক চিতিয়ে হাসে। তাহলে কি আমাদের প্রকৌশলীরা জানেননা সড়ক কতখানি চওড়া হলে বিপরীতগামী দুটি গতিশীল যান পরস্পরের কাঁধ ঘেঁষে যাবার বিপদ ও ঝুঁকি এড়িয়ে নির্বিঘ্নে যেতে পারে? না কি ইচ্ছে করেই তৈরী করে রাখা হয়েছে অমন মরণফাঁদ? আজ যে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত বা চীন থেকে প্রকৌশলীরা এসে আমাদের হাইওয়ে তৈরী করে দিচ্ছে তাতে কি তাদের শরমবোধ হয় না, নাকি হায়া জিনিষটাই তাদের নেই? অথচ জিজ্ঞেস করে দেখুন, তারা পরিকল্পনাবিদদের উপর, বাজেট ঘাটতির উপর দোষ চাপিয়ে দিবে। হাইওয়েগুলোকে চওড়া করে মাঝে ডিভাইডার দিয়ে দিলে সড়ক দুর্ঘটনা বহুলাংশে কমে আসবে এটা আমরা সবাই জানি, জানেন পরিকল্পনাবিদরা, কিন্তু তারা কিছু করেন না (ভুল বলা হল, তারা 'সড়ক দুর্ঘটনা ও এর প্রতিকার' নিয়ে সেমিনার, ওয়ার্কশপ ইত্যাদি করেন)।
বেপরোয়া গাড়ি চালনা যে কত দুর্ঘটনার জন্ম দিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। গতকালই ৫৩জন যাত্রী নিয়ে তুরাগ নদীতে বাস ডুবল কেবল চালকের প্রায়োন্মাদ হয়ে গাড়ি চালনার জন্য। যাত্রীদের অনুরোধ-অনুনয় উপেক্ষা করে সে ছুটছিল বদ্ধ উন্মাদের মত। গাড়ির চাকা ফেটে যাবার পরেও সে দ্রুতবেগে অন্য একটি বাসকে ওভারটেক করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সেতু থেকে উল্টে সোজা নদীতে গিয়ে পরে, আর অর্ধশত তাজা প্রাণের জন্য অসময়ের বিভীষিকাময় মৃত্যু ডেকে আনে। এসব ক্ষেত্রে দুর্বল আইন, জীবন-হতাশা আর অদৃষ্টে বিশ্বাস মানুষকে বেপরোয়া করে তুলছে। এদেশে জীবন প্রচুর, তাই হয়ত জীবন এত সুলভ।
পরিসংখ্যান ও বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার সবচেয়ে বেশী শিকার হয় পথচারীরা। শহরাঞ্চলে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার ৬০ ভাগই নিরীহ পথচারী। বেপরোয়া যানবাহন আর পথচারীদের অসাবধনতা অসংখ্য দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে, অকালে ঝরে পড়ছে বহু মানুষের প্রাণ। কোন কোন ক্ষেত্রে পথচারীদের আলস্য এবং বেপোরোয়া মনোভাবও কম দায়ী নয়। আমি এয়ারপোর্ট রোডের উপর দিয়ে প্রতিদিন দৌড়ে অসংখ্য মানুষকে পার হতে দেখেছি, অথচ ঐ রোডে গাড়ির গতিবেগ প্রায়শই প্রতি ঘণ্টায় ৮০-১০০ কিলোমিটার ছাড়িয়ে যায়। আমি সপ্তাহে পাঁচদিন ভোরে মহাখালীস্থ তিতুমীর কলেজের সমুখ দিয়ে আমার কর্মস্থলে যাই। অতীতে এই স্পটে কিছু কিছু দুর্ঘটনা ঘটেছে যার ফলশ্র"তিতে 'রক্তাক্ত' সব ঘটনা ঘটিয়েছে কলেজটির বীরবাহু ছাত্ররা, গাড়ি ভাঙ্গচুর, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি। তাদের দীর্ঘদিনের দাবী ছিল ঐ স্পটে একটি ফুটওভার ব্রিজ তৈরী করে দেয়া। যথারীতি একটি চমৎকার ফুটওভার ব্রিজ তৈরী করে দিয়েছে সিটি কর্পোরেশন। মজার বা হতাশার ব্যাপার হল, একটি ছাত্রকেও আমি ঐ ব্রিজ পার হয়ে যেতে দেখি না; তারা যথারীতি ঝুঁকি নিয়ে ঐ নিচের রাস্তা দিয়েই পারাপার করছে। পুরো ফুটওভার ব্রিজটি প্রকৃতঅর্থেই একটি 'শোপীসে' পরিণত হয়েছে।
সড়ক দুর্ঘটনার দুটি সূচক বা পরিমাপক Fatality rate (প্রতি দশ হাজার রেজিষ্টার্ড যানের বিপরীতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বা আহত মানুষের সংখ্যা) পৃথিবীর মাঝে অন্যতম সর্বোচ্চ। যেখানে উন্নত বিশ্বে এই হার ২ এর নিচে, বাংলাদেশে তা ১০০-র উপরে। অন্য সূচক Fatality index (যত মানুষ দুর্ঘটনায় পতিত হয় তাদের মাঝে কত শতাংশ মানুষ মারা যায় তার অনুপাত) বাংলাদেশে অত্যন্ত বেশী (৪০%); উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে তা সর্বোচ্চ। সড়ক দুর্ঘটনা শুধু যে অসংখ্য মানুষের জীবন কেড়ে নেয় তা নয় সেসব নিহত মানুষের পরিবারের জন্য তা বয়ে আনে সীমাহীন দুর্ভোগ ও বিপর্যয়। অনেকক্ষেত্রে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি দুর্ঘটনার শিকার হয়। যখন এ লাইনটি লিখছি আমার চোখ জলে ভরে আসছে. কেননা এমনি একটি দুর্ঘটনায় আমি হারিয়েছি আমার জীবনের একজন শ্রেষ্ঠ বন্ধু- সাইয়েদুল ইসলাম কাজলকে। তাকে বহনকারী রিকশাটিকে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে দুমড়েমুচড়ে দিয়েছিল এক নির্বোধ ঘাতক মিনিবাস চালক। প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনার কারণে বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ২শতাংশ পরিমান অর্থ অপচয় হয়।
সম্প্রতি গ্যাসস্টেশনে রেশনিং চলছে। বেলা তিনটে থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত গ্যাস দেয়া বন্ধ। এর ফলে নগরে ট্রাফিক জ্যাম আরো বেড়ে গেছে। প্রশ্ন হচ্ছে এতে কী আদৌ গ্যাসের ব্যবহার কমেছে? কেননা যার যতখানি গ্যাস প্রয়োজন সে ততখানি গ্যাস নিবেই। তবে হা, মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে,এখন তাকে মধ্যরাতে গ্যাস স্টেশনে গিয়ে তা নিতে হয়। ছোটবেলায় একটি গল্প পড়েছিলাম। এক মস্ত বোঝা নিয়ে এক বাবু নৌকায় উঠেছেন নদী পারাপারের জন্য। বোঝাটির জন্য ছোট নৌকাখানি অনেকখানি নিমজ্জিত। মাঝ নদীতে নৌকা ঝড়ের কবলে পড়ে গেলে মাঝি নৌকাটি ডুবে যাবার ভয়ে যখন কাতর, তখন বাবু বল্লেন, 'মাঝি, তোমার কোন চিন্তা নেই, আমি নৌকার বোঝা হালকা করে দিচ্ছি', বলে তিনি মস্ত বোঝাটি নিজের মাথায় নিয়ে নৌকার পাটাতনে দাঁড়িয়ে রইলেন। মাঝি হাঁ হয়ে বিজ্ঞ মানুষটির কাণ্ড দেখছিল্। আমাদের পরিকল্পনাবিদদের কাণ্ড-কারখানা দেখে আমার মাঝে মাঝেই ঐ গল্পটির কথা মনে পড়ে।
প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় যে হারে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে তাতে একথা নিশ্চিত করেই বলা যায় মড়ক লেগেছে সড়কে, সড়কগুলো হয়ে উঠেছে সত্যিকারের মৃত্যুফাঁদ। প্রকৃত দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর হার প্রকাশিত সংখ্যার চেয়ে অনেক অনেক বেশী, কেননা সব দুর্ঘটনা গোচরে আসে না, রিপোর্টেড হয় না। বিশেষজ্ঞরা সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ ও এ খাতে বিনিয়োগের অভাবকে দায়ী করেন। রাজধানীতে রেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা এড়াতে ও ট্রাফিক জ্যাম কমাতে কমলাপুর রেলস্টেশনকে সরাতে হবে; এর কোন বিকল্প নেই। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে হাইওয়েগুলোর পাশে কমগতির যানবাহনের জন্য যে আলাদা নিচু লেন তৈরী করতে বলা হয়েছে তা নিঃসন্দেহে অনেক দুর্ঘটনা কমবে। আর প্রয়োজন হাইওয়েতে accident prone স্পটগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোকে সংশোধন করা এবং শক্ত ডিভাইডার বসানো। আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও প্রচলিত দুর্বল আইন সংশোধন করাও প্রয়োজন। প্রয়োজন জসসচেতনতা বৃদ্ধি। আরো প্রয়োজন মালয়েশিয়ার আদলে Build-Operate-Transfer (BOT) মডেলে এ-খাতে বিপুল বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা। ট্রাফিক জ্যামে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমান শ্রমঘন্টা মানুষের ও দেশের অপচয় হচ্ছে, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত-নিহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের যে বিপুল সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যয় -তার তুলনায় এসব বিনিয়োগ নস্যি। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপেও অনেক প্রকল্প হাতে নেয়া যায়। সরকার সে দিকেই দ্রুতগতিতে এগুবেন এমন প্রত্যাশা ভ্রমণে আতঙ্কিত ও ট্রাফিক-জ্যামে অতিষ্ঠ জনগণের।