কেন দক্ষিণ ভারত উত্তরকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে

ভারতের বাকি অংশের তুলনায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সুযোগ বিবেচনায় দক্ষিণের রাজ্যগুলো যোজন যোজন দূর এগিয়ে গেছে।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 21 Sept 2022, 12:33 PM
Updated : 21 Sept 2022, 12:33 PM

স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সুযোগ বিবেচনায় ভারতের বাকি অংশকে দক্ষিণের রাজ্যগুলা ছাড়িয়ে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তে দেখা যাচ্ছে।

এর প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে, ডাটা সায়েন্টিস্ট নিলাকান্তন আরের সহযোগিতায় তা খোঁজার চেষ্টা করেছে বিবিসি।

ধরা যাক, ভারতে কোনো শিশু জন্মাল।

প্রথমত, ওই শিশুর জন্মানোর সম্ভাবনা উত্তর ভারতের তুলনায় দক্ষিণে কম, কারণ সেখানকার রাজ্যগুলোর জনসংখ্যা বৃদ্ধি হার তুলনামূলক কম।

কিন্তু তারপরও, ধরা যাক শিশুটি মেয়ে, এবং সে দক্ষিণেই জন্ম নিল। ভারতের অন্য এলাকার তুলনায় দক্ষিণে শিশুমৃত্যুর হার কম হওয়ায় ওই মেয়ের জন্মানোর এক বছরের মধ্যে মৃত্যুর সম্ভাবনা কম থাকবে।

তার টিকা পাওয়ার সম্ভাবনাও বেশি হবে এবং জন্মানোর সময় মাকে হারানোর আশঙ্কাও কম। তার শিশুদের জন্য বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রমে প্রবেশাধিকারের সুযোগ বেশি পাওয়ার কথা, শৈশবে ভালো পুষ্টিকর খাবার পাওয়ার সম্ভাবনাও বেশি।

সম্ভবত দক্ষিণের এই মেয়ে তার পঞ্চম জন্মদিনও পালন করতে পারবে, অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতাল বা চিকিৎসকের কাছে যেতে পারবে, এ কারণে ভারতের অন্য এলাকায় জন্ম নেওয়া কারো তুলনায় খানিক বেশিদিন বেঁচে থাকার সুযোগ বেশি তার।

সে স্কুলে যেতে পারবে এবং বেশিদিন পড়তে পারবে, তার কলেজে যাওয়ার সম্ভাবনাও বেশি।

অর্থনৈতিক কারণে কৃষি বা গৃহস্থালির চেয়ে তার এমন কোনো কাজে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা অধিক, যেখানে বেশি অয় থাকবে।

সম্ভাবনা বেশি, তার সন্তান সংখ্যাও কম থাকবে, যারা তার তুলনায় বেশি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ও বেশি শিক্ষা পাবে। দক্ষিণের এ মেয়ের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং নির্বাচনে ভোটার হিসেবে প্রভাব ভারতের অন্য অংশের তুলনায় বেশিই হবে।

অল্প কথায় বললে, ভারতে এখন দক্ষিণে জন্ম নেওয়া গড় শিশুরা উত্তর ভারতে জন্ম নেওয়া শিশুদের তুলনায় বেশি স্বাস্থ্যকর, সচ্ছল, নিরাপদ ও সামাজিকভাবে বেশি প্রভাবপ্রতিপত্তির জীবনযাপন করতে পারবে।

স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সুযোগের অনেক সূচকে ভারতের এই দুই অংশের ব্যবধান এখন এতই যে এর সঙ্গে কেবল ইউরোপ ও সাব-সাহারান আফ্রিকার মধ্যে সুযোগ সুবিধার তুলনার কথাই আসতে পারে।

সবসময় ব্যাপারটা এমন ছিল না।

১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা লাভের সময় দক্ষিণের ৪ রাজ্য তামিল নাড়ু, কর্ণাটক, কেরালা ও অন্ধ্রপ্রদেশ উন্নয়নের ক্ষেত্রে মাঝারি বা নিচের দিকেই ছিল। ২০১৪ সালে অন্ধ্রপ্রদেশ ভেঙে তেলেঙ্গানার জন্ম হয়।

১৯৮০-র দশক থেকে এই অঞ্চল ভারতের অন্য অংশগুলোর তুলনায় বেশি ইতিবাচক পদক্ষেপের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে, যা পরেরদিকে আরও গতি পায়।

কেন এমনটা হয়েছিল, তার স্পষ্ট উত্তর নেই। দক্ষিণের এ রাজ্যগুলোর প্রতিটিরই আলাদা আলাদা গল্প আছে, কিন্তু মোটাদাগে প্রত্যেকটি রাজ্যই উদ্ভাবনী নীতির ওপর ভর করে সফলতা লাভ করেছে।

কিছু কিছু উদ্ভাবনী নীতি কাজে দিয়েছে, কিছু ব্যর্থ হয়েছে। এই সময়ে রাজ্যগুলো গণতন্ত্রের পরীক্ষাগারের ভূমিকা পালন করেছিল বলেও অনেকে বিশ্বাস করে।

রাজ্যগুলোর অগ্রগতির ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী নীতি কেমন ভূমিকা রেখেছে, তার অন্যতম বড় উদাহরণ হল মিড ডে মিল প্রকল্প, সরকারি স্কুলে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে দুপুরে খাওয়ানো। প্রকল্পটি শুরু হয়েছিল তামিল নাড়ুতে।

১৯৮২ সালে এই প্রকল্প শুরু হওয়ার পর থেকে তামিল নাড়ুর স্কুলগুলোতে ভর্তি বাড়তে শুরু করে; আর এখন দেশের মধ্যে স্কুলে ভর্তির হার বিবেচনায় রাজ্যটি গর্ব করতে পারে।

পার্শ্ববর্তী কেরালা রাজনৈতিক চর্চা এবং বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির যোগসাজশে স্বাস্থ্য এবং শিক্ষায় অগ্রগতি করেছে বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন নোবেল পুরস্কাজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন।

দক্ষিণাঞ্চলের লোক হিসেবে যে আলাদা পরিচিতি বা উপ-জাতীয়তাবাদ এটাও তাদের অগ্রগতির অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন প্রেরণা সিংয়ের মতো অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।

অবশ্য তাদের এই বিকাশ বেশকিছু সমস্যারও জন্ম দিচ্ছে।

উত্তরের রাজ্যগুলোর তুলনায় তাদের জনসংখ্যা কম হলেও সচ্ছলতা বিবেচনায় তাদেরকে বেশি কর দিতে হচ্ছে। কিন্তু জনসংখ্যা কম হওয়ায় কেন্দ্রীয় কর তহবিল থেকে ব্যয় করার জন্য অর্থ কম পাচ্ছে তারা। বেশি দিয়ে কম পাওয়া- এটাকে শাস্তি হিসেবে দেখছে দক্ষিণের মানুষজন।

সাম্প্রতিক কর সংস্কার কার্যক্রম পরিস্থিতিকে আরও সঙ্গীন করেছে।

অতীতে, সব রাজ্যই অপ্রত্যক্ষ করের মাধ্যমে রাজস্ব সংগ্রহ করতো, যা তাদেরকে মিড ডে মিলেল মতো নিজস্ব নীতি বাস্তবায়নে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিতো। কিন্তু সমগ্র ভারতকে এক বাজারের আওতায় আনতে নতুন প্রবর্তিত গুডস অ্যান্ড সার্ভিস ট্যাক্সের (জিএসটি) কারণে তারা সেই স্বাধীনতা হারিয়েছে।

রাজ্যগুলো বলছে, তারা এখন নিজেদের আয় বাড়াতে পারছে না, উল্টো ক্রমশই কেন্দ্রের কাছ থেকে অর্থ পাওয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

তামিল নাড়ুর অর্থমন্ত্রী পি থিয়াগা সম্প্রতি বলেছেন, “কর আরোপের সব ক্ষমতা রাজ্যগুলোর কাছ থেকে নিয়ে সবকিছুকে জিএসটির ঝুড়িতে নিয়ে রাখলে রাজ্যগুলো কীভাবে তাদের রাজস্ব নীতি ঠিক করবে? এ পদ্ধতির মাধ্যমে রাজ্যগুলোকে কার্যত পৌরসভায় পরিণত করা হচ্ছে।”

এই পদক্ষেপ কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে দক্ষিণের রাজ্যগুলোর সম্পর্কে টানাপোড়েন বাড়িয়েছে। কিছু রাজ্য এ নিয়ে মামলা করার হুমকি দিলে কেন্দ্রীয় সরকার ২০২০ সালে এসে এ নিয়ে পিছু হটে এবং রাজ্যগুলোকে তাদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে সম্মত হয়।

চলতি বছর জ্বালানির দাম কমানো নিয়েও রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার মুখোমুখি অবস্থানে চলে গিয়েছিল। কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য সরকারগুলোকে নিজ নিজ রাজ্যে জ্বালানির দাম কম রাখতে বললেও বেশিরভাগ দক্ষিণের রাজ্যই উল্টোপথে হেঁটেছিল।

এখানেই শেষ নয়, ২০২৬ সালে সংসদীয় আসনের সীমা নির্ধারণ নিয়েও দক্ষিণের রাজ্যগুলোর সঙ্গে কেন্দ্রের জটিলতা মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।

সাধারণত জনসংখ্যার ওপর ভিত্তি করে এই সীমা নির্ধারিত হয়। যেহেতু জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কম, সুতরাং দক্ষিণের রাজ্যগুলোর আসনসংখ্যা এখনকার তুলনায় কমেই যেতে পারে। তাহলে রাজস্ব হারানো, নিজস্ব নীতি বাস্তবায়নে স্বাধীনতাতে ঘাটতির পাশাপাশি ভবিষ্যতে ভারতের লোকসভায় দক্ষিণের প্রভাব আরও কমতে থাকবে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক