Published : 26 Jul 2026, 11:19 PM
প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে ভারতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গড়ে ওঠা তরুণদের সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) টানা ৩৬ দিনের আন্দোলন থেমেছে দেশটির শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর।
রাজপথ কাঁপানো এ আন্দোলন শনিবার বিকালে থামে তার পদত্যাগের ঘোষণায়। তবে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, আগেও দুবার তিনি আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। সরকারের অবস্থানের কারণেই তিনি তা করেননি। গত শুক্রবার পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ না করা নিয়ে কট্টর অবস্থানে ছিল নরেন্দ্র মোদী সরকার। সেভাবে তাকে বার্তাও দেওয়া হয়।
কিন্তু ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে কীভাবে এবং কোন চাপের ফলে সরকার সিজেপির দাবি মানতে বাধ্য হল, তা নিয়ে এখন চলছে নানা বিশ্লেষণ।
রোববার ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান অন্তত দুইবার পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সরকার তাকে ঠেকিয়ে রেখেছিল। তখন তাকে শিক্ষাক্ষেত্রের পদ্ধতিগত সমস্যা ও সংস্কারের দিকে নজর দেওয়ার তাগিদ দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত শনিবার সরে দাঁড়ান তিনি। মূলত সিজিপির নতুন করে আন্দোলনের হুমকি এবং অনলাইন মাধ্যমে আন্দোলন আরো ছড়িয়ে দেওয়ার খবরের পরই সরকার ধর্মেন্দ্রর পদত্যাগ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়।
সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে এ প্রতিবেদনে বলা হয়, “জাতীয় পরীক্ষাগুলোতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সিজেপির তীব্র আন্দোলনের মধ্যে ২০ জুলাই মন্ত্রীদের এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ধর্মেন্দ্র প্রধান সর্বশেষ পদত্যাগের প্রস্তাব দেন। কিন্তু তার সেই পদত্যাগপত্র ফিরিয়ে দেওয়া হয়। বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব তাকে পদত্যাগের চিন্তা বাদ দিয়ে শিক্ষা খাতের সংস্কারে মনোযোগী হওয়ার নির্দেশ দেয়।
“কারণ বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের মত ছিল, একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ হল সবচেয়ে সহজ পথ। এটা অনেকটা দায়িত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার মত। মোদী সরকার সমস্যা থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেয়ে তা সমাধানে বিশ্বাসী।”
তবে দৃশ্যপটে বড় পরিবর্তন আসে শুক্রবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিংয়ের সঙ্গে সিজেপি প্রতিনিধিদের দ্বিতীয় দফার বৈঠকে। এতে সরকারের তরফে সিজেপি প্রতিনিধিদের বোঝানোর চেষ্টা করা হলেও, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে অনড় ছিলেন তারা। এক পর্যায়ে দুই মন্ত্রী ঘোষণা দেন, সিজেপির সব দাবি মানা হলেও শিক্ষামন্ত্রীর পদ্যোগের দাবি মানা সম্ভব না।
এর পর সিজেপিও আন্দোলন কঠোর করার দিকে পা বাড়ায়। গত ২০ জুলাইয়ের ‘চলো সংসদ’ প্রতিবাদের মত আরও একটি বড় আকারের পদযাত্রার হুমকি দেয়।
ইন্ডিয়া টুডের খবরে দাবি করা হয়, দিল্লিতে ২০ জুলাইয়ের ওই বিক্ষোভের সময় পুলিশের লাঠিপেটায় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হওয়ার পর থেকে আন্দোলন তীব্রতা পায়। এ নিয়ে সরকারের চিন্তা বাড়তে থাকে। পাশাপাশি নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনেও সতর্ক করা হয়েছিল, দেশবিরোধী শক্তিগুলো এই অসন্তোষকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।
নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যমটি বলছে, “এরইমধ্যে ডিজিটাল নজরদারিতে গোয়েন্দারা ভারতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে অনলাইনে উসকে দেওয়ায় সক্রিয় ৪০০টিরও বেশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অ্যাকাউন্ট চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে পাকিস্তান থেকে পরিচালিত প্রায় ১০০টি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট রয়েছে।
“প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চিহ্নিত অ্যাকাউন্টগুলো আগে ‘অপারেশন সিঁদুর (২০২৫ সালের ৭ মে ভারতের সেনাবাহিনীর পাকিস্তানে অভিযান) এর সময় সক্রিয় ছিল। অ্যাকাউন্টগুলো থেকে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীকে নিয়ে এবং ভারতবিরোধী মন্তব্য, ভুল তথ্য ও প্রোপাগান্ডা ছড়ান হচ্ছিল।

“এছাড়াও ২০ থেকে ২৪ জুলাইয়ের মধ্যে দিল্লি পুলিশের ডিজিটাল মুখ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা যন্তর মন্তর এলাকায় সিজেপির প্রতিবাদস্থলের চারপাশে অপরাধমূলক রেকর্ড থাকা প্রায় ৪০০ ব্যক্তিকে চিহ্নিত করেছে। চিহ্নিত এই ব্যক্তিরা ২০ জুলাই ভাঙচুরের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে সিজেপির সঙ্গে চূড়ান্ত দফার আলোচনার আগে সরকার সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, জাতীয় স্বার্থ এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।”
গত শুক্রবার কেন্দ্রীয় দুই মন্ত্রীর সঙ্গে সর্বশেষ বৈঠকে সিজেপি প্রতিনিধিরা সরকারের কাছে তিন দাবি তুলে ধরেছিল। এর মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ছাড়াও ছিল নিট পরীক্ষার (চিকিৎসাবিদ্যা ও দন্তচিকিৎসা কোর্সে ভর্তির সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা) প্রশ্নফাঁসে আত্মঘাতী শিক্ষার্থীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ না করার নিশ্চয়তা।
বৈঠকে দুই মন্ত্রী শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ছাড়া বাকি দুই দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিলেও আন্দোলনকারীরা ছিলেন অনড়।
আনন্দবাজার পত্রিকার খবরে বলা হয়, দ্বিতীয় বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর সঙ্গে কথা বলেন জেপি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিং। রুদ্ধদ্বার এ বৈঠক চলাকালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও কিছু পদক্ষেপ করে।
এক ধাক্কায় ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির (এনটিএ) ৪৭ জন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়। এনটিএর কাঠামোগত সংস্কারের জন্য নতুন কর্মকর্তা নিয়োগের প্রস্তুতি শুরু হয়।
পাশাপাশি প্রশ্নফাঁস রুখতে ‘পাবলিক এগজামিনেশনস (প্রিভেনশন অব আনফেয়ার মিন্স) অ্যামেন্ডমেন্ট বিল’ অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। এভাবে আন্দোলনকারীদের পরোক্ষ বার্তা দেওয়া হচ্ছিল। প্রধানমন্ত্রী নিজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পর পর দুটি ভিডিও বার্তা দিয়ে তরুণ প্রজন্মকে আশ্বস্ত করেন। প্রশ্নফাঁস রুখতে ফাস্ট ট্র্যাক আদালত গঠনের কথা বলেন তিনি।
শনিবার জেপি নাড্ডাদের সঙ্গে সিজেপির তৃতীয় বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের একের পর এক পদক্ষেপের মধ্যেও যে মূল দাবিতে সিজেপি অনড়, তা বোঝা যায় ওই দিন সকালে।
সংগঠনের তরফে জানিয়ে দেওয়া হয়, শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করলে তৃতীয় দফার আলোচনার কোনো অর্থ নেই। এর পরেই ধর্মেন্দ্র পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে।
ওইদিনই ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন। এর কয়েক ঘণ্টা পর কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রহ্লাদ জোশীকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেখভালের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়।