Published : 21 May 2026, 01:10 AM
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের মাধ্যমে বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসেই রাজ্যে বহুল আলোচিত নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ) কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দিয়েছে বিজেপি।
আনন্দবাজার পত্রিকা বলছে, বুধবার রাজ্যের সচিবালয় ও প্রধান প্রশাসনিক দপ্তর নবান্নতে মন্ত্রিসভার সঙ্গে বৈঠকের পর নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা দিয়েছেন, যারা সিএএ অন্তর্ভুক্ত নন, তাদের গ্রেপ্তার করে সরাসরি তুলে দেওয়া হবে সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফের হাতে।
তার দাবি, গত বছর কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে যে নির্দেশিকা পশ্চিমবঙ্গে পাঠানো হয়েছিল তা আগের রাজ্য সরকার কার্যকর করেনি। রাজ্যে প্রথমবার ক্ষমতায় এসে বিজেপি সরকার সিএএ আইন কার্যকর করল।
আনন্দবাজারের খবরে বলা হয়, শুভেন্দু বুধবার সকালে উত্তরবঙ্গে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরে নবান্নে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। বিএসএফ এর কর্মকর্তারাও তার সঙ্গে ছিলেন। এ দিন সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিতে বিএসএফের হাতে রাজ্যের ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ জমিও তুলে দিয়েছেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী। এর পরেই অনুপ্রবেশ নিয়ে মুখ খোলেন।
তিনি বলেন, ‘‘বিএসএফের সঙ্গে সুদৃঢ় বন্ধন তৈরি করে আমরা রাজ্য এবং দেশকে সুরক্ষিত করব। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ২০২৫ সালের ১৪ মে অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের সরাসরি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছিল। আগের সরকার এক দিকে শরণার্থীদের সিএএ (সুরক্ষা) দেওয়ার বিরোধিতা করেছে। অন্য দিকে, এই গুরুত্বপূর্ণ আইনকে কাজে লাগায়নি। আজ থেকে এই আইন আমরা কার্যকর করলাম।’’
কারা এই আইনের আওতায় থাকবেন? কাদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হবে? শুভেন্দুর ব্যাখ্যা, “সিএএ আইন অনুযায়ী, সাতটি সম্প্রদায়ের মানুষ নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের আওতাভুক্ত। ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত যারা এ রাজ্যে এসেছেন, তাদের পুলিশ কোনো হেনস্থা করতে পারবে না বা আটক করতে পারবে না। কিন্তু যারা সিএএর অন্তর্ভুক্ত নন, তারা সম্পূর্ণ অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। তাদের সরাসরি রাজ্য পুলিশ গ্রেপ্তার করবে এবং বিএসএফের হাতে তুলে দেবে।
“বিজিবির (বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী) সঙ্গে কথা বলে তাদের দেশ থেকে বার করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। অর্থাৎ, ডিটেক্ট, ডিলিট ও ডিপোর্ট। সীমান্ত সংলগ্ন সমস্ত থানায় দেশের স্বার্থে, রাজ্যের স্বার্থে আইন কার্যকর করলাম।’’

রাজ্য পুলিশের ডিজি এবং মুখ্যসচিবকেও এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে তথ্য দেন শুভেন্দু।
ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালে একটি গেজেট বিজ্ঞপ্তি জারি করে বলেছিল, ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে বা ধর্মীয় নিপীড়নের ভয়ে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান থেকে ভারতে পালিয়ে আসা, হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি এবং খ্রিস্টানদের শরণার্থীর মর্যাদা দেওয়া হবে।
২০২৫ সালের ৪ এপ্রিল কার্যকর হওয়া অভিবাসন এবং বিদেশি আইনের ৩৩ ধারা অনুযায়ী এই বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। দেশটির পার্লামেন্টের বাজেট অধিবেশনে এই আইন পাস হয়েছিল। প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও সংখ্যার জোরে আইন পাস করিয়ে নেয় কেন্দ্র।
আনন্দবাজারের আরেক খবরে কীভাবে ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ চিহ্নিত ও রাজ্যছাড়া করা হবে এবং ‘ডিটেনশন সেন্টার’ নিয়ে কী বলা আছে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশিকায় তা তুলে ধরা হয়।
কীভাবে ফেরত পাঠানো হবে?
‘বাংলাদেশি’ বা রোহিঙ্গাদের কেউ স্থলপথে কিংবা জলপথে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশের সময় ধরা পড়লে তৎক্ষণাৎ তাদের ফেরত পাঠিয়ে দিতে হবে। তবে তার আগে তাদের বায়োমেট্রিক তথ্য (মূলত আঙুলের ছাপ এবং মুখের ছবি) এবং জনতাত্ত্বিক (ডেমোগ্রাফিক) বিবরণ নিয়ে রাখবে কর্তৃপক্ষ।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফরেনার্স আইডেন্টিফিকেশন পোর্টালে (এফআইপি) এই সংক্রান্ত তথ্য নথিভুক্ত করে রাখতে হবে। যেখানে ইন্টারনেট যোগাযোগ ব্যবস্থা কম, সেখানে অফলাইনেই তথ্য সংগ্রহ করতে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব কেন্দ্রীয় পোর্টালে আপলোড করতে হবে।
একইভাবে বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর যাবতীয় তথ্য, হিসাব রাখবে সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী বাহিনী। বাধ্যতামূলকভাবে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এই সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রতি মাসে পাঠাতে হবে।
অনিচ্ছাকৃতভাবে কেউ সীমান্ত পেরিয়ে এলে বিএসএফ তাদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে। যদি দেখা যায়, তারা নির্দোষ, তবে বাংলাদেশ বা মায়ানমারের সীমান্তরক্ষীদের হাতে তাদের তুলে দেওয়া হবে। তবে এর আগে তাদেরও বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করা এবং কেন্দ্রের পোর্টালে আপলোড করা বাধ্যতামূলক।
যদি দেখা যায় তারা নির্দোষ নন, তাহলে সংশ্লিষ্ট রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের পুলিশের হাতে তাদের তুলে দেওয়া হবে এবং আইনের আওতায় আনা হবে।
অবৈধ বসবাসকারী ধরা পড়লে কী করতে হবে তো সম্পর্কেও কিছু নির্দেশনা তুলে ধরে আনন্দবাজার। সেগুলো হলো-
অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করে নিজের দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য প্রতি রাজ্যে জেলা ধরে ধরে পুলিশের বিশেষ টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) গঠন করবে। এর জন্য প্রত্যেক রাজ্য সরকার সমস্ত জেলায় পর্যাপ্ত সংখ্যায় ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা শরণার্থী শিবির তৈরি করবে। সেখানে অবৈধ অভিবাসী বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গাদের আটক করে রাখা যাবে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
যদি তাদের মধ্যে কেউ নিজেদের ভারতীয় নাগরিক বলে দাবি করে, তাদের সম্পর্কে তথ্য যাচাই করতে হবে ৩০ দিনের মধ্যে। উপযুক্ত প্রমাণ না মিললে তাদের দেশ থেকে বার করে দেওয়া হবে। ওই ৩০ দিন তারা ‘হোল্ডিং সেন্টার’-এ থাকবেন।
তদন্তের পর রোহিঙ্গা বা বাংলাদেশি বলে কাউকে যদি চিহ্নিত করা যায়, অবিলম্বে তাদের বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করে কেন্দ্রের পোর্টালে আপলোড করতে হবে। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে সংশ্লিষ্ট রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের পুলিশ ওই ব্যক্তিকে উপযুক্ত নিরাপত্তা দিয়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে তুলে দেবে। এজন্য পুলিশের কাছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশের কাগজ থাকতে হবে।
এরপর সীমান্তরক্ষী বাহিনী ভারত থেকে বাংলাদেশ বা মায়ানমারে ওই অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করবে। এই অনুপ্রবেশকারীদের এ দেশে ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ করে দেওয়া হবে।
জরুরি পরিস্থিতিতে তদন্ত শেষ হওয়ার পর অবৈধ অভিবাসীকে ‘হোল্ডিং সেন্টার’ থেকেই তুলে নিয়ে যেতে পারে সীমান্তরক্ষী বা উপকূলরক্ষী বাহিনী। সরাসরি তাদের দেশের সীমান্তের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া যেতে পারে।
অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে কখন কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছে কোন রাজ্যের পুলিশ, সেই তথ্য সংশ্লিষ্ট সমস্ত রাজ্যের পুলিশের কাছে থাকবে। যাতে এই কাজের সময় কোনও ভুল বোঝাবুঝি না হয়।
সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কোনো কর্মকর্তার হাতে কাকে তুলে দেওয়া হচ্ছে, সেই তথ্যও বিশদ দিতে হবে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের সরকারকে। এই সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রতি মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জমা দিতে হবে।
যাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে, তাদের নামে ভারতে যাতে কখনও কোনও পরিচয়পত্র তৈরি না করা যায়, তা নিশ্চিত করবে কেন্দ্র। প্রয়োজন অনুযায়ী ইউআইডিএআই, নির্বাচন কমিশন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এই তথ্য জানানো হবে।
এই সংক্রান্ত কাজের জন্য অনুমোদিত সীমান্তরক্ষী বাহিনী বাংলাদেশ সীমান্তের জন্য বিএসএফ এবং মায়ানমার সীমান্তের জন্য অসম রাইফেল্স।