মার্কিন আদালতের রায়ের পর বিভ্রান্তি, সঙ্কটে গর্ভবতী নারী

মিসক্যারেজ হলে, এক্টোপিক গর্ভাবস্থার বেলায় এবং গর্ভকালে অন্য যে কোনো জটিলতায় সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বাছবিচার করা হচ্ছে এখন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে চিকিৎসা সেবা দিতে অস্বীকারও করা হচ্ছে।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 29 July 2022, 07:56 PM
Updated : 29 July 2022, 07:56 PM

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট গর্ভপাতের অধিকার কেড়ে নেওয়ার পর এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন চিকিৎসক ও রোগীরা; হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসা পেতে অনেক সময় ভুগতে হচ্ছে গর্ভবতী নারীদের, আর রোগীর জীবন সঙ্কট জেনেও চিকিৎসকরা পড়ছেন দ্বিধায়।

গর্ভের শিশুর হৃদস্পন্দন শোনার পর এক গর্ভবতী নারীর চিকিৎসা করাতে ঘাবড়ে গিয়েছিলেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক; তার আশংকা ছিল, এই চিকিৎসা হয়ত গর্ভপাতে নিষেধাজ্ঞার লঙ্ঘন হয়ে যাবে।

ফলে জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণ করা ওই নারীকে ইউনিভার্সিটি অফ মিশিগান হসপিটালে জরুরি চিকিৎসা বিভাগে ভর্তি হতে হয়।

পোস্টপার্টাম বা সন্তান প্রসবের পর নারীর রক্তক্ষরণ বন্ধে যে ওষুধ দরকার হয়, তা সংগ্রহে মিসৌরির কানসান সিটির মো শহরের এক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে এখন ফার্মাসিস্টের অনুমোদন নিতে হচ্ছে। কারণ ওই একই ওষুধ গর্ভপাত করাতেও ব্যবহার করা হয়।

উইসকনসিনে এক নারীর মিসক্যারেজ হয়েছিল। জরুরি বিভাগের কর্মীরা কেউ গর্ভ থেকে মৃত ভ্রুণ বের করে আনেনি। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর তাদের ভয় ছিল, হয়ত আইনি ঝামেলায় জড়িয়ে যেতে হবে। তাতে করে ভুগতে হয়েছিল ওই নারীকে; ১০ দিনের বেশি সময় রক্তক্ষরণ হয়েছিল তার।

ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছে, মিসক্যারেজ হলে, এক্টোপিক গর্ভাবস্থার বেলায় এবং গর্ভকালে অন্য যে কোনো জটিলতায় সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বাছবিচার করা হচ্ছে এখন। সেবা দিতে দেরি করা হচ্ছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে চিকিৎসা সেবা দিতে অস্বীকারও করা হচ্ছে।

নতুন আইন যুক্তরাষ্ট্রের যেখানে যেখানে চালু হয়েছে, সেখানকার চিকিৎসকদের মতে, এতে করে ঝুঁকির মুখে পড়েছে মাতৃস্বাস্থ্য।

”মানুষ সন্তস্ত্র হয়ে পড়েছে”, বললেন ‍ওহাইওর একজন মা ও শিশু বিশেষজ্ঞ।

সুপ্রিম কোর্টের রায় কার্যকর হওয়ার পরদিন জরায়ু সংক্রমণে আন্ত্রান্ত এক নারীর গর্ভপাত করা গিয়ে আইনি পরামর্শ নিতে হয়েছিল এই চিকিৎসককে।

তিনি বলেন, “অনেক কিছুই অজানা আছে এখানে এখনও।”

ওয়াশিংটন পোস্ট বলছে, ৩০ শতাংশ গর্ভবতীর বেলাতেই মিসক্যারেজ ঘটতে পারে। এসব ক্ষেত্রে মায়ের গর্ভে ভ্রণের মৃত্যু ঘটে হঠাৎ করেই।

যেভাবে মিসক্যারেজ হওয়া রোগীর চিকিৎসা করাতে হয়, তা আসলে গর্ভপাত করানো রোগীকে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার মতই।

দেখা যায়, একই ধরনের ওষুধ প্রয়োগ করা হয়; যেমন মিফেপ্রিসটন ও মিসোপ্রোস্টোল। অস্ত্রোপচারের বেলাতেও একই কাজ করতে হয়। ডাইলেশন এবং কিউরটেজ অথবা ডিঅ্যান্ডসি; যাতে জরায়ু প্রশস্ত করে ভ্রণ বের করে নিয়ে আসা হয়।

কখনও কখনও মিসক্যারেজ হলে আলাদা চিকিৎসার দরকার হয় না; শরীর নিজেই এই ধকল থেকে সেরে উঠতে পারে। তবে অন্যসব ক্ষেত্রে চিকিৎসা না নিলে সংক্রমণ ও রক্তক্ষরণের মত নানা জটিলতা হতে পারে। তাতে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে।

হিউসটনের ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞ রাশমি কুদেসিয়া বলেন, “প্রসবের সময় আসার আগেই গর্ভপাত (মিসক্যারেজ) হয়ে যাওয়ার মত ঘটনা ঘটতেই পারে; আমাদের এ কথা উপলব্ধি করা খুব জরুরি।”

টেক্সাসে গত সেপ্টেম্বর থেকে গর্ভপাত করানো অবৈধ। সেখানে ছয় সপ্তাহের এক গর্ভবতীর ভ্রুণের হৃদস্পন্দন শনাক্ত করার পর ওষুধের প্রয়োজন হলে ফার্মাসিস্টরা প্রশ্নের মুখে ফেলেছিলেন চিকিৎসদের। ফার্মাসিস্টদের ধারণা, মিসক্যারেজের এই ওষুধ হয়ত তারা গর্ভপাতের (অ্যাবরশন) জন্য ব্যবহার করবেন।

কুদেসিয়া বলেন, “ওষুধের দোকানে দাঁড়িয়ে থাকা এখন খুব ভয়ের ব্যাপার হয়ে গেছে। সেখানে সবার সামনে বলতে হচ্ছে মিসক্যারেজ হওয়ার কথা; বলতে হচ্ছে কোনো হৃদস্পন্দন পাওয়া যাচ্ছে না।”

দক্ষিণ উইসকনসিনের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ কার্লে জিল জানালেন তার অভিজ্ঞতার কথা। মিসক্যারেজের পর সংক্রমণ হয়েছিল এমন একজন নারীর চিকিৎসা করতে হয়েছিল তাকে।

ওই নারী আগে যে হাসপাতালে গিয়েছিলেন, সেখানে তারা রীতিমত যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিয়েছিল কী চিকিৎসা দেওয়া যেতে পারে তা নিয়ে।

১৮৪৯ সালে উইসকনসিনের আইনে প্রায় সব ধরনের গর্ভপাত ছিল অপরাধ। এখন আবার সেই পরিস্থিতি ফিরে আসার উপক্রম হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ওই হাসপাতাল শেষ পর্যন্ত জানিয়ে দেয়, গর্ভ থেকে মৃত ভ্রুণ সরিয়ে নেওয়ার কাজটি তারা করতে পারবে না।

জিল বলেন, “এতে করে ওই নারীর চিকিৎসায় অনেক দেরি হয়ে যায়। আমি তাকে দেড় সপ্তাহের মত নজরে রেখেছিলাম। মিসক্যারেজের কারণে তার রক্তপাত হচ্ছিল এবং তা আরও ক্ষরণ ও সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছিল।”

পরে জিল তাকে গর্ভপাতের ওষুধ দেন, যেন ভ্রুণ বেরিয়ে আসতে পারে গর্ভ থেকে।

সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের সপ্তাহ খানেক পর আরেক চিকিৎসক যোগাযোগ করেন জিলের সঙ্গে। ওই চিকিৎসককে একজন এক্টোপিক গর্ভবতী নারীর চিকিৎসা করতে হয়েছিল।

জিল বলেন, “ওই চিকিৎসক জানতেন তাকে কী করতে হবে। কারণ সেই গর্ভবতী নারীর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। কিছু করা না গেলে তার মৃত্যু অনিবার্য ছিল।

”কিন্তু ওই চিকিৎসক বুঝে উঠতে পারছিলেন না তাকে কাগজে কী লিখতে হবে যেন তাকে অপরাধী হিসেবে জেরার মুখে পড়তে না হয়।”

কোনো কোনো আইনজীবী চিকিৎসকদের পরামর্শ দিচ্ছেন, ওই রকম পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত দুজন চিকিৎসক যেন সঙ্গে থাকে, যারা লিখিত দেবে যে রোগীর জীবন সংকটাপন্ন।

আবার কোনো কোনো আইনজীবী এ ধরনের পরামর্শকে নাচক করে দিয়ে বলছেন, এমন কোনো কিছু লিখিত নেওয়ার দরকার নেই।

জিলের পরিচিত সেই চিকিৎসক এলানা উইসট্রম অবশ্য সাবধান থাকতে জরুরি বিভাগের চিকিৎসককে দেখিয়ে নিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিলেন একজন রেডিওলজিস্ট, যিনি রোগীর আলট্রাসাউন্ড রিপোর্ট দেখেছিলেন। এসব করতে লেগেছিল এক ঘণ্টার বেশি।

লাইভ অ্যাকশন এবং লাইফনিউজ ডটকমের মত গর্ভপাতরিবোধী সংগঠনগুলো বলছে, সুপ্রিম কোর্টের ওই রায়ের পরও এক্টোপিক গর্ভাবস্থা অথবা মিসক্যারেজের চিকিৎসা দিতে চিকিৎসকদের কোনো বাধা নেই।

”এই চিকিৎসা পদ্ধতি একদমই বৈধ এবং তা গর্ভপাত বলে গণ্য হবে না। কোনো চিকিৎসকই বলতে পারবেন না যে তারা এসব জানেন না,” বললেন অলাভজনক প্রতিষ্ঠান প্রো-লাইফ অ্যাকশন লিগের নির্বাহী পরিচালক এরিক শিডলার।

দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় জুলাই মাসে এক বিশেষ অধিবেশনে আইনপ্রণেতারা গর্ভপাত আইন নিয়ে কঠোর অবস্থান নেন। তাদের মত হল, এমনকি ধর্ষণের মত ঘটনার বেলাতেও গর্ভপাত করানো যাবে না।

যদিও মায়ের জীবন রক্ষায় এবং এক্টোপিক গর্ভাবস্থা ও মিসক্যারেজে জরুরি সেবা না মেলার উদ্বেগ আমলে নিয়ে ওই রাজ্যের রিপাবলিকানরা কিছুটা ছাড় দেওয়ার কথা বলছেন।

প্রোভো শহরের বাসিন্দা ৩৫ বছর বয়সী এক নারী ও তার স্বামী ২০১৯ সালে গ্রীষ্ম থেকে সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। পরে তারা রিপ্রডাকটিভ এন্ডোক্রাইনোলজিস্টের শরণাপন্ন হন।

সেখানে সাফল্য আসে, সেই নারী গর্ভবতী হন। এ বছর ফেব্রুয়ারিতে তার ভ্রুণের বয়স ছিল চার সপ্তাহ। কিন্তু তার দুই সপ্তাহ পর অনিয়মিতভাবে রক্তপাত শুরু হয়। নয় সপ্তাহের মাথায় চিকিৎসক জানান, গর্ভে থাকা ভ্রুণের কোনো হৃদস্পন্দন পাচ্ছেন না তারা।

চিকিৎসকরা সুমওয়েকে জানিয়েছিল তার মিসক্যারেজ ঘটবে। সেইমত তিনিও সিদ্ধান্ত নেন, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ভ্রুণ অপসারণ করবেন।

কিন্তু চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করা নিয়ে শঙ্কায় ভুগছেন এই নারী। তার ধারণা, আইনি ঝামেলা এড়াতে চিকিৎসক হয়ত ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন; হয়ত গর্ভপাতের চিকিৎসা পদ্ধতি ও ওষুধ এড়িয়ে যেতে পারেন।

সুমওয়ে বলেন, “আমি সত্যিই উদ্বিগ্ন। এসব আমরা মত মানুষকে চিন্তায় ফেলে দেয়; যারা সন্তান নিতে চায়, কিন্তু একই সঙ্গে নিজে নিরাপদ ও সুরক্ষিত থাকতে চায়, চিকিৎসা পেতে চায়।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক