‘কেঁদেছি, তারপর লিখেছি গর্ভপাতের অধিকার চেয়ে’

ওই রায় প্রত্যাখ্যান করে ভি লেখেন: “আমি লিখেছি। আমার বিবেক আমাকে সুপ্রিম কোর্টের এই ঘৃণ্য সিদ্ধান্তে সায় দিতে দেবে না।”

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 24 July 2022, 07:06 PM
Updated : 24 July 2022, 07:06 PM

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট গত জুনে গর্ভপাতের অধিকার যখন কেড়ে নিল, সেই রায় শুনে চিৎকার করে কেঁদেছিলেন ভি; কিন্তু তারপর তিনি প্রতিবাদে হলেন সোচ্চার।

গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, ”যখন ওই রায় বেরুলো, তখন আপনার কেমন লেগেছিল? যখন তারা আমাদের শরীরের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে এল? তখন কেমন লেগেছিল?”

নাট্যকার ও অধিকারকর্মী ভি আগে পরিচিত ছিলেন ইভ এনসলার নামে। নারীর বিরুদ্ধে নির্যাতন বন্ধের বৈশ্বিক আন্দোলন ভি-ডের প্রতিষ্ঠাতা তিনি।

গর্ভপাতের অধিকার কেড়ে নেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানিয়ে গার্ডিয়ানের কলামে ভি লিখেছেন, “তারা বলতে চাইছে একজন ১২ বছরের মেয়ে গর্ভকাল পুরো করবে, তারপর সেই অসহনীয় বেদনার মধ্যে দিয়ে প্রসব করবে সেই সন্তান যা ধর্ষকের ফল।”

ভির ভাষ্যে, ”তাদের ধারণা ছিল, আমরা যারা স্বাধীন সত্তার জন্য, নিজের মত করে পথ চলার জন্য এবং নিজের মত স্বপ্ন দেখার জন্য জীবন কাটিয়ে দিচ্ছি, তারা সহজে ও নিঃশব্দে ওই ফাঁদে ধরা দেব। আমরা দেখতে পাব না একটা ফাঁদ আরেকটা ফাঁদের সঙ্গে যুক্ত। আর প্রত্যেকটি ফাঁদ যেন আমাদের থেকে বাতাস শুষে নিচ্ছে, আলো কেড়ে নিচ্ছে।

“আমি শুনতে পাচ্ছিলাম, আমার ফেনায়িত প্রাচীন মুখ থেকে চিৎকার বেরিয়ে আসছে। ক্রোধে আমার সাদা চুল পুড়ে যাচ্ছিল যেন।”

গত ২৪ জুন ‘রো বনাম ওয়েড’মামলার রায় শুনে সত্যিই কেঁদে ফেলেছিলেন ভি। তার ভাষায় ওই রায় ছিল ‘ঘৃণার প্রকাশ’।

“আমি কেঁদেছি; আমার জন্য, নারীর জন্য, কৃষ্ণাঙ্গ নারীর জন্য, বাদামি ও আদিবাসী নারীর জন্য, এশীয় নারীর জন্য, যৌন নির্যাতিত কম বয়সী ভুক্তভোগীর জন্য, দরিদ্র নারীর জন্য, ট্র্যান্সজেন্ডার পুরুষের জন্য, নন-বাইনারি লিঙ্গের সন্তান প্রসবের জন্য এবং স্বাধীনচেতা সবার জন্যর তারা যে ঘৃণা পোষণ করে, সে কথা বুঝে আমি কেঁদেছি।

Also Read: যুক্তরাষ্ট্রে গর্ভপাতের অধিকার কেড়ে নিল সুপ্রিম কোর্ট

Also Read: গর্ভপাত: যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের আদেশে বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ, উদ্বেগ

তারপরই ওই রায় নিয়ে লেখার কথা ভাবেন ভি। কঠিন ভাষায় এর প্রতিবাদ করতে চান।

“আমি লিখে চললাম পাতার পর পাতা। আমি দারুণ কিছু একটা বলতে চেষ্টা করছিলাম। এমন কিছু, যা এখনও বলা হয়নি। এমন কিছু, যা উন্মোচন করে দেয় এবং পৃথিবীকে স্তব্ধ করে দেয়, অপরাধের সমাধান করে দেয়।”

ভি ওই ’দুঃস্বপ্ন’ থেকে পরিত্রাণ পেতে শব্দ খুঁজে চলেন একের পর এক।

তার প্রতিবাদের উদ্দেশ্য ছিল কম বয়সী নারী এবং যারা প্রসব না করতে চেয়ে হয়ত মারাই যাবে, তাদের সুরক্ষা দেওয়া।

ভি সেই সব নারীর কথা ভেবে বিচলিত, যারা মানসিক, আর্থিক, আত্মিকভাবে নির্যাতিত; যারা ইচ্ছের বিরুদ্ধে সন্তান নিতে বাধ্য হয়ে জীবনের স্বপ্ন আর লক্ষ্যকে হারিয়ে ফেলেছেন।

শব্দের খোঁজে ভি লিখেছেন, “শব্দ এবং কবিতা আসলে শব্দাংশ ও ছন্দের দারুণ আয়োজন। আর সত্য, ঐতিহাসিক সূত্র, উপমা সবশেষে শতাব্দী পুরনো পিতৃতান্ত্রিকতার ধাঁধার জট খুলে দেয়।

”শব্দ দুঃসাহস দেখায়, সাধারণ শব্দ, সুস্পষ্ট শব্দ যেমন- না না না না। আমরা কখনোই ফিরে যাব না। কারণ আমরা জানি, আমরা যখনই দরজা খুলতে রাজি হব, তখনই তারা আসবে আমাদের সবাইকে ও সবকিছু কেড়ে নিতে।”

ওই রায় প্রত্যাখান করে ভি লেখেন: “আমি প্রত্যাখান করেছি। আমি লিখেছি। আমার বিবেক আমাকে সুপ্রিম কোর্টের এই ঘৃণ্য সিদ্ধান্তে সায় দিতে দেবে না।”

নাম উল্লেখ না করলেও ডনাল্ড ট্রাম্পের দিকে ইঙ্গিত করে ভি বলেন, “রায়ের পেছনে যারা রয়েছেন, তাদের নিযুক্ত করেছিলেন একজন প্রেসিডেন্ট, যিনি একজন আত্মস্বীকৃত অপরাধী।

“তারা আজ বিচার করছে আমার মূল্যবান, উজ্জ্বল, উদার, যত্নশীল বোনদের শরীরে কী হচ্ছে।”

ভির উপলব্ধি, “আমি আসলে বুঝতে পারছিলাম না কীভাবে প্রত্যাখান করব আমরা। যে দেশে সবার হাতে বন্দুক থাকে, সেখানে এই প্রত্যাখান কীভাবে দেখা হবে সেটাই ভাবছিলাম।

”আমি যতটুকু বুঝতে পেরেছি, এমন রায় আমি মেনে নেব না, যা আমাকে নিজের বিরুদ্ধে, আমার শরীরের বিরুদ্ধে নিয়ে যায়। আমি জানি, অসংখ্য মানুষ আছে, যারা আমার মত করেই অনুভব করেন। আমার কাছে উত্তর নেই, কিন্তু প্রশ্ন আছে। আমি প্রশ্নে বিশ্বাসী।”

এই অধিকারকর্মীর প্রশ্ন- যুক্তরাষ্ট্রে নারীরা কি বাধ্যগত অনুসারীর মত এই ‘অন্যায্য’ রায় মেনে নেবে? তারা কি ন্যায় চাওয়ার বদলে নিয়ম রক্ষার নিয়েই মনোযোগী হবে?

যারা এই রায়ের বিরুদ্ধে বিশাল জোট গড়ে তুলেছেন, তারা কি স্বপ্ন, শক্তি, যুথবদ্ধতাকে এগিয়ে নিতে পারবেন একটি সফল আন্দোলনের পথে?

সবাই কি উপলব্ধি করতে পারবে, যে গর্ভপাতের অধিকারের আন্দোলন হচ্ছে শ্বেত রাজত্বের বিরুদ্ধে; লিঙ্গ বৈষম্য ও পিতৃতন্ত্র ঘুচিয়ে দিতে?

ভি প্রশ্ন ছুড়েছেন, “আমরা কি নিজেদের বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত হতে পারব, যা সুপ্রিম কোর্টের বিদ্বেষমূলক ও পিতৃতান্ত্রিক চর্চাকে আড়াল করে রাখছিল?

“এই প্রতিষ্ঠানগুলো কি সাদা চামড়াওয়ালাদের দ্বারাই পরিচালিত হবে, যারা সংখ্যাগুরু, দুর্বল ও নিপিড়নের বিরুদ্ধে কাজ করে চলেছে?

”আমরা কি নিজেদের শরীরকে বিশ্বাস করে এর স্বাধীনতা রক্ষায় ঘুরে দাঁড়াতে পারব চার্চ ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে?

“এই মুহূর্তের জন্যই কি তারা সবাই অপেক্ষা করছেন?

“একেই কি অভ্যুত্থান বলে?

“ভালোবাসা দিয়ে দিয়ে এমন কিছু ঘটানো সম্ভব হত?”

ভি বলেন, “আমি আমার হাত বাড়িয়ে দিলাম তোমাদের দিকে।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক