বাবা দিবসের ভিন্ন আঙ্গিক

যারা বাবা হারিয়েছেন তাদের কাছে বাবা দিবসের আমেজে মিশে থাকে আক্ষেপ।

তৃপ্তি গমেজবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 18 June 2023, 09:54 AM
Updated : 18 June 2023, 09:54 AM

মা যেমন সংসার সামনে থেকে চালনা করেন, বাবা ঠিক তার পেছনে থেকেই সংসারের হাল ধরে রাখেন।

গোটা পরিবারের দেখভাল করতে দিয়ে বাবাদের অনেক ইচ্ছা অপূর্ণ থেকে যায়। সকলের চাহিদা মেটাতে গিয়ে অনেক বাবারই সখ পূরণ করা হয় না কখনও।

বাবা মানে আশ্রয়, বাবা মানে আবদার, বাবা মানে নিশ্চিত ঠাঁই। বাবার সঙ্গা একেকজনের কাছে একেক রকম ।

কোনো বাবা বন্ধুর মতো, কোনো বাবা রাশভারী, কোনো বাবা খুব বেশি শান্ত- বাবা্র আচরণ যেমনই হোক না কেনো সন্তানের প্রতি বাবার ভালোবাসা অকৃত্রিম।

গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী তৃষা এলিজার কাছে বাবা হল বন্ধু।

তিনি বলেন, “আমার বাবা আমার বন্ধু। যার কাছে মন চাইলেই ছুটে যাওয়া যায়, কথা বলা যায়, আবদার করা যায় সে আমার বাবা। আমার মন খারাপ হলে সবার আগে টের পান তিনি। কোনো অভিযোগ ছাড়াই কেবল গলার স্বর শুনেই বাবা বলে দিতে পারে আমার মন মেজাজ কেমন।”

“শুধু তাই নয়, আমি কোথায় যাই, কী করি, কাদের সাথে মিশি- এই সবই নির্দ্বিধায় বাবাকে বলতে পারি। ভুল হলে বাবা শুধরে দেয়। আমার জীবনের এমন অনেক কথাই আছে যা আমি মাকে না বলে বাবার কাছে বলেছি”, বলেন তৃষা।

বাবা আর সন্তানের সম্পর্ক হওয়া উচিত বন্ধুর মতো। এমনটাই মনে করেন জমজ কন্যার জনক তৌহিদুল ইসলাম তুহিন।

তিনি বলেন, “সন্তানদের সময় দেওয়া, তাদের কাছে যাওয়া, মনের কথা শোনা, খোলামেলা কথা বলার মাধ্যমে সন্তানের খুব কাছে যাওয়া যায়। এতে করে তাদের মনে কী চলছে তা বোঝা যায়, ভুল ত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া যায় এবং বন্ধু মতো মেশার ফলে তারা তা সাদরে গ্রহণও করে।”

“আমার মেয়েরা সারাদিন স্কুলে কী করেছে, কোনো বন্ধু কোনো শিক্ষক কী বললো তা সবই আমাকে বলে। আমিও বাসায় ফিরে আমার সারাদিন কেমন কাটলো, বিশেষ ঘটনা তাদের সাথে শেয়ার করি।” সম্পর্কে এই যোগাযোগটা খুব জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

‘সন্তান বাবাকে ভয় পাবে’- এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ভয় অবশ্যই পাবে কিন্তু সেই ভয়টা এমন না যেয়ে বাবার কাছে যাওয়া যাবে না, দেখলেই গলা শুকিয়ে আসবে। এই ভয়টা হবে এমন যে, আমি ভুল করলে বাবা কষ্ট পাবে অথবা অবাধ্য হলে বাবা রাগ করবেন। সন্তানকে আদর করে যদি ভালো মন্দ বুঝিয়ে দেওয়া যায় তাহলে অকারণ শাসন ছাড়াই সন্তানকে সঠিক পথে চালনা করা সম্ভব।”

সবার ভালোবাসার প্রকাশ এক রকম নয়। কেউ স্বভাবতই খুব শান্ত, কম কথা বলে, ভালোবাসার প্রকাশভঙ্গিও সীমিত। প্রকাশ কম বলেই যে ভালোবাসা কম এমনটা নয়। 

ধানমণ্ডির ইংরেজী মাধ্যম স্কুলের কো—অর্ডিনেটর এবং ব্যবসায়ী সাইদ আনোয়ারের মতে, “বাবা হল অদৃশ্য ছায়া। এটা চোখে দেখা না গেলেও ঠিকই প্রয়োজনে পাশে পাওয়া যায়। কোনো বিপদে সবার আগে হাত বাড়িয়ে দেন এই মানুষটাই।”

“আমার বাবার সাথে কথা কম হয় কিন্তু তিনি প্রতিদিন আমার খোঁজ খবর রাখেন। কোনো সমস্যা হলে নিশ্চয়তার আশ্বাস দেন বরাবর। এটা জীবনের অনেক বড় পাওয়া,” বলেন তিনি।

বাবা দিবস পালন করা হয় কীভাবে জানতে চাইলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তৃষা বলেন, “এই দিনে বাবাকে ইউশ করি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাবার সাথে ছবি পোস্ট করি, ছোট খাটো কোনো গিফট দেওয়ার চেষ্টা করি। সারাদিন একটা উৎসব উৎসব অনুভূতি হয়।”

এই দিনটা সবার জন্য একই রকম হয় না। যারা ইতোমধ্যে বাবাকে হারিয়েছেন তাদের কাছে বাবা দিবস আলাদা করে কিছু নয় বরং প্রতিটা দিনই বাবার শূন্যতা অনুভূত হয়। প্রতিটা দিনই বাবার স্মৃতি মনে পড়ে, প্রতিদিনই আসলে বাবা দিবস।

ইংরেজী মাধ্যম স্কুলের শিক্ষক ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, “বাবা থাকলে তাকে উইশ করা হত, কোনো পরিকল্পনা সাজানো হত। বাবা ছোট খাটো কিনিস যেমন- কলম, নোটবুক এগুলো খুব পছন্দ করতেন, সেরকমই কিছু গিফট দেওয়া হত। কিন্তু এখন বাবা নেই তাই এমন কোনো আলাদা আয়োজনও নেই। প্রতিটা দিনই বাবার কথা মনে পড়ে। আমার কাছে প্রতিটা দিনই বাবার দিন।”

“যে কোনো বিপদ আপদ, মানসিক পরিস্থিতিতে বাবার কথা খুব মনে পড়ে। মনে হত সে থাকলে আমাকে বুঝতে পারতেন, কোনো সমাধান হয়ত দিতে পারতেন আর কিছু না হলেও অন্তত মানসিক সাপোর্টটা পেতাম। কিন্তু এখন আমি একা”, বলেন তিনি। 

ইশতিয়াক আরও বলেন, “আমার বাবা অনেক বেশি সাপোর্টিভ ছিলেন, কোনো কিছু নিয়েই আমাকে কখনও মাথা ঘামাতে হয়নি। বাবা চলে যাওয়ার পরে এখন অনেক কিছু ভেবেচিন্তে পা ফেলতে হয়। মা, বোন, বউ-সহ পরিবারের সকলের দেখাশোনার দায়িত্ব আমার ওপরে। বাবা থাকলে এসব তিনিই সামলে নিতেন। আমার পেছনের সেই সাপোর্টটা এখন আর নাই।”

তৌহিদুল ইসলামের মতে, “বাবা না থাকা মানে ছাদ ছাড়া বাড়ি।”

ধানমণ্ডির ‘গ্রিন জেমস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল’য়ের প্রধান শিক্ষক অ্যানিটা মন্ডল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফর ডটকমকে জানান তার বাবার প্রতি ভালোবাসার কথা।

“দুবছর আগে বাবা আমাদের ছেড়ে চলে যান। কোভিডের সময় যাই যাই করেও বাবার কাছে যাওয়া হয়নি। একবার টিকেট কেটেও বাবার সাথে দেখা করতে যাওয়া হয়নি। তার কয়েকদিন পরে বাবা পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। আজও তার জন্য কিনে রাখা জিনিসগুলো দেখে মন ভীষণ খারাপ হয়,” আক্ষেপ করেন বলেন তিনি।

“বাবা মা দুজনকেই সন্তান ভালোভাসে। কিন্তু একজনের সাথে আন্তরিকতা বা ভাব একটু বেশি থাকে। মা অনেক আগেই মারা গিয়েছিলেন। আমার ক্ষেত্রে বাবার সাথে ভাব বেশি ছিল। খুব গল্প গুজব করতাম আমরা। বড় হওয়ার সাথে সাথে ব্যস্ততা বাড়তে থাকে। নিজের সংসার, কাজ সব মিলিয়ে ব্যস্ততা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। চাইলেও যখন তখন বাবার কাছে ছুটে যাওয়া যেত না। বাবাও বিষয়টা বুঝতেন, কিন্তু যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন তখন খুব দেখতে চাইতেন, সব ফেলে যাওয়া হয়ে উঠতো না। এখন খুব খারাপ লাগে এসব ভেবে,” বলেন অ্যানিটা মন্ডল।

বাবা দিবসে বাবা মা থাকতে তাদের সময় দেওয়া উচিত। তারা সব সময় থাকবেন না তাই। যত দিনই আছেন সময় বের করে তাদের কাছে যাওয়া, গল্প করা, সময় দেওয়া, তাদের পছন্দের কিছু উপহার দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

শুভেচ্ছা পেতে কার না ভালো লাগে? বাবাদেরও এর ব্যতিক্রম নয়। ছোট থেকে তারা সন্তানের সব আবদার পূরণ করেন, বড় হয়ে সন্তান একটি উইশ করলে বা ছোট খাটো কোনো উপহার দিলে অনেক বেশি খুশি হন বাবারা।

“শুভেচ্ছা জানালে খুশি লাগে। নিজেকে স্পেশাল মনে হয়। মেয়েরা এইদিন উপহার দেয়, ‘ভালোবাসি’ বলে শুনতে ভালো লাগে। ছোট থেকে ওদের বড় করেছি, একটা পূর্ণতা অনুভূত হয়” এমনটাই জানান, দুই কন্যার জনক মার্টিন গমেজ।

পৃথিবীর সব বাবারাই সন্তানদের ভালোবাসেন, বিপদ থেকে আগলে রাখেন। সন্তানদেরও উচিত বড় হয়ে বাবার পাশে থাকা, ভরসা দেওয়া। বাপ সন্তানের এই বন্ধন পৃথিবীর অন্য কোনো সম্পর্ক দিয়ে তুলনা করা সম্ভব নয়।

ভালো থাকুক সব বাবারা। ভালোবাসার প্রকাশ হোক প্রতিটা দিনই।