Published : 05 Aug 2026, 06:30 PM
টোনার, এসেন্স, নিয়াসিনামাইড সেরাম, রেটিনল, ময়েশ্চারাইজার বা সানস্ক্রিন- ত্বকের সুরক্ষায় প্রতিদিন একের পর এক প্রসাধনী ব্যবহারের দীর্ঘ রুটিন অনেকের কাছেই নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
এমন ধারণাও আছে যে, যত বেশি দামি প্রসাধনী মুখে মাখা যাবে, ত্বক তত বেশি স্বাস্থ্যবান ও উজ্জ্বল হবে।
তবে চর্মরোগ বিজ্ঞানীদের মতে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত কেমিক্যাল পণ্য ব্যবহারের ফলে ত্বক নিজস্ব প্রাকৃতিক নিরাময় ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে।
এই সমস্যার সমাধানে বিশ্বজুড়ে এখন আলোচিত বিউটি ট্রেন্ড হল ‘স্কিন ফাস্টিং’ বা ত্বকের উপবাস’।
‘হেলথলাইন ডটকম’ এবং রূপচর্চা বিষয়ক অনলাইন সাময়িকী ‘বার্ডি ডটকম’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, কিছুদিন বা কয়েক সপ্তাহের জন্য সব ধরনের কৃত্রিম রূপচর্চা সামগ্রী পুরোপুরি বন্ধ রেখে ত্বককে প্রাকৃতিকভাবে শ্বাস নিতে এবং নিজে নিজেকে নিরাময় করার সুযোগ দেওয়াই এই উপবাসের প্রধান লক্ষ্য।
যে কারণে ত্বকের উপবাস জরুরি
ত্বক পরিচর্যা বিষয়ক জাপানি বিশেষজ্ঞ এবং ‘মিরাই ক্লিনিক্যাল’-এর প্রতিষ্ঠাতা কোকো হায়াশি প্রথম এই ‘স্কিন ফাস্টিং’ শব্দটির ধারনা বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে তোলেন।
তার মতে, “মানব ত্বকের উপরিভাগে ‘হাইড্রো লিপিড’ বা লিপিড স্তর নামক একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় বা ‘স্কিন ব্যারিয়ার’ থাকে। এই রক্ষাকবচের প্রধান কাজ হল, প্রাকৃতিকভাবে সেবাম (তেল) ও আর্দ্রতা তৈরি করে ত্বককে বাইরের ধুলোবালি ও ব্যাকটেরিয়া থেকে রক্ষা করা।
চিকিৎসা-বিষয়ক সাময়িকী ‘ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড এক্সপেরিমেন্টাল ডার্মাটোলজি’-তে প্রকাশিত গবেষণায় চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা দেখিয়েছেন যে, প্রতিদিন অতিরিক্ত মাত্রায় বিভিন্ন কড়া অ্যাসিড (যেমন: স্যালিসিলিক বা গ্লাইকোলিক অ্যাসিড) এবং কেমিক্যাল সেরাম মুখে মাখা হয়, তখন ত্বকের এই স্বাভাবিক সুরক্ষাবলয়টি স্থায়ীভাবে ভেঙে যায়।
নিউ ইয়র্কের মাউন্ট সিনাই হসপিটালের বোর্ড-প্রত্যয়িত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জোশুয়া জেইচনার লাইফস্টাইল মিডিয়া ‘অলিয়র’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘কন্টাক্ট ডার্মাটাইটিস’ বা কেমিক্যাল ওভারলোডের কারণে তৈরি হওয়া ত্বকের প্রদাহ বলা হয়। এর ফলে ত্বক অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়ে, চামড়া খসখসে হয়, লালচে ছোপ পড়ে এবং হঠাৎ তীব্র ব্রণ দেখা দেয়।”
‘স্কিন ফাস্টিং’ বা ত্বকের উপবাস আসলে ত্বককে কৃত্রিম উপাদানের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে, নিজের প্রাকৃতিক তেল উৎপাদন ব্যবস্থাটি পুনর্গঠন করতে সাহায্য করে।
স্কিন ফাস্টিং বা ত্বকের উপবাস করার ৪টি নিয়ম
ত্বকের কোনো ক্ষতি ছাড়া সফলভাবে এই উপবাস বা ফাস্টিং সম্পন্ন করতে বিশেষজ্ঞরা ৪টি পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
ধীরে ধীরে প্রসাধনী কমানো
নিউ ইয়র্কের চর্মরোগ-বিশেষজ্ঞ ডা. হ্যাডলি কিং, ‘হেলথলাইন ডটকম’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলেন, “হুট করে একদিনে সব পরিচর্যার পণ্য বন্ধ করে দিলে ত্বক মারাত্মক ‘ডিহাইড্রেইশন’ বা শুষ্কতার ধাক্কা খেতে পারে। এর প্রতিকারে প্রথমে আলফা ও বিটা হাইড্রোক্সি অ্যাসিড এবং রেটিনলের মতো কড়া সেরামগুলো মাখা বন্ধ করতে হবে।
প্রথম সপ্তাহে কেবল একটি মৃদু ফেইসওয়াশ এবং ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা উপকারী।”
শুধুমাত্র বিশুদ্ধ পানি ও সাধারণ যত্ন
উপবাসের প্রধান ধাপে, রাতে ঘুমানোর আগে কোনো নাইট ক্রিম বা সেরাম মাখা যাবে না। সকালে ও রাতে হালকা কুসুম গরম পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে নেওয়া ভালো।
তবে ক্যালিফোর্নিয়ার চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেলানি পাম, হেল্থলাইনের প্রতিবেদনে সতর্ক করেন যে, “বাইরে বের হওয়ার সময় ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে বাঁচতে একটি সাধারণ নন-কমেডোজেনিক সানস্ক্রিন ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক।”
চামড়া খসখসে হওয়ার প্রাথমিক ধাক্কা সামলানো
ত্বকের উপবাস শুরু করার প্রথম ৩ থেকে ৫ দিন ত্বক কিছুটা শুষ্ক, টানটান বা খসখসে মনে হতে পারে।
কানাডার ‘মিরাকল ১০ স্কিনকেয়ার’-এর প্লাস্টিক সার্জন ডা. ফ্রাঙ্ক লিস্টা ‘কানাডিয়ান হেলথ পোর্টাল’-এ ব্যাখ্যা করেন, “এতে আতঙ্কিত হয়ে কোনো ক্রিম মেখে ফেলা ভুল। এটি মূলত একটি সংকেত যে ত্বক তার নিজের তেল ও আর্দ্রতা তৈরির ক্ষমতাটি পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করছে।”
সাধারণত এক সপ্তাহ পর এই শুষ্কতা প্রাকৃতিকভাবেই কেটে যায়।
শরীরের ভেতর থেকে আর্দ্রতা নিশ্চিত করা
বাইরে থেকে সেরাম বা টোনার ব্যবহার যেহেতু বন্ধ থাকে, তাই ত্বকের ভেতরের কোষ সতেজ রাখতে এই সময়ে প্রতিদিন ন্যূনতম ৮ থেকে ১০ গ্লাস বিশুদ্ধ পানি পান করা আবশ্যক।
একই সঙ্গে খাদ্যাভ্যাসে তাজা শাকসবজি ও ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ বাদাম রাখলে ত্বক ভেতর থেকে দ্রুত ভালো হয়ে ওঠে।
যাদের জন্য স্কিন ফাস্টিং পুরোপুরি নিষিদ্ধ
মেডিকেল সুরক্ষার স্বার্থে হেল্থলাইনের প্রতিবেদনে জানানো হয়, সবার জন্য প্রসাধনী উপবাস করা উপযোগী নয়। বিশেষ করে নিচের ব্যক্তিদের এটি এড়িয়ে চলা নিরাপদ।
চর্মরোগের ইতিহাস: যাদের বর্তমানে তীব্র একজিমা, সোরিয়াসিস, রোজাসিয়া কিংবা ডার্মাটোফাইটোসিসের মতো দীর্ঘস্থায়ী চর্মরোগ রয়েছে, চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের অনুমতি ছাড়া তাদের সব ক্রিম বা মলম বন্ধ করা সম্পূর্ণ নিষেধ।
মেডিকেইটেড অ্যাকনি ট্রিটমেন্ট: গুরুতর বা সিস্টিক ব্রণের জন্য যারা চিকিৎসকের দেওয়া নির্দেশিকায় সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক বা রেটিনয়েড ক্রিম ব্যবহার করছেন, তারা হঠাৎ করে চিকিৎসা থামালে ব্রণের সংক্রমণ পুরো মুখে মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
মনে রাখতে হবে
সুস্থ ত্বক মানেই নিখুঁত বা মেইকআপ করা চকচকে মুখ নয়।
কোকো হায়াশির মতে, “স্কিন ফাস্টিং প্রমাণ করে যে রূপচর্চায় ‘লেস ইজ মোর’ অর্থাৎ যত কম উপাদান ব্যবহার করা যায়, ত্বক তত বেশি সুরক্ষিত থাকে।”
দুই থেকে তিন সপ্তাহের এই সাময়িক প্রসাধনী উপবাস শেষে যখন আবার নতুন করে রূপচর্চা শুরু করা হবে, তখন ত্বক উপাদানগুলোকে অনেক বেশি কার্যকরভাবে গ্রহণ করতে পারবে।
আরও পড়ুন
ত্বকের বয়স রুখতে নতুন ধারা ‘এক্সোজোম’ থেরাপি: কতটা কার্যকর?