০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

অসম বয়সের সম্পর্কের টানাপোড়েন

সঙ্গীর সঙ্গে বয়সের ব্যবধান ১০ বছরের বেশি হলে নানান মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হতে পারে।

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 15 Sep 2026, 06:41 PM

Updated : 17 Sep 2026, 03:00 AM

প্রেম বা বৈবাহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দুই সঙ্গীর বয়স কাছাকাছি হওয়াটাকেই, আধুনিক সময়ে স্বাভাবিক হিসেবে দেখা হয়।

তবে এখনও সমাজে এমন অনেক সম্পর্ক বা দম্পতি চোখে পড়ে, যেখানে দুই সঙ্গীর মধ্যে বয়সের ব্যবধান ১০ বছর বা তার চেয়েও বেশি।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় এই ধরনের আত্মিক বন্ধনকে ‘এইজ-গ্যাপ রিলেশনশিপ’ বা ‘অসম বয়সের সম্পর্ক’ বলা হয়।

সাধারণ মানুষ অনেক সময় মনে করেন, ভালোবাসা থাকলে বয়সের এই বিশাল দেয়াল কোনো বড় বাধা নয় এবং শুধু আর্থিক স্বচ্ছলতা থাকলেই এই সম্পর্কগুলো সুখে টিকে থাকে।

তবে আচরণ বিজ্ঞানের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, সমবয়সী দম্পতিদের তুলনায় অসম বয়সের সঙ্গীদের প্রাত্যহিক জীবনে কিছু সুনির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক ধকল পোহাতে হয়। এই অদৃশ্য জটিলতাগুলো যদি সঠিকভাবে সামলানো না যায়, তবে সেটা মানসিক চাপ তৈরি করে সম্পর্কের সুরক্ষালয়কে গুঁড়িয়ে দিতে পারে।

‘সাইকোলজি টুডে’-তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জার্মানির এমএসএইচ মেডিকেল স্কুল অফ হামবুর্গের প্রখ্যাত মনস্তত্ত্ববিদ ও গবেষক অধ্যাপক ডা. সেবাস্টিয়ান ওকলেনবার্গ বলেন, “অসম বয়সের সম্পর্কের স্থায়িত্ব এবং এর অভ্যন্তরীণ গতিশীলতা বা ডায়নামিকসের নেপথ্য বিজ্ঞানটি জানা প্রতিটি সচেতন মানুষের জন্য অত্যন্ত জরুরি।”

বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা ও গবেষণার রূপরেখা

ডা. সেবাস্টিয়ান ওকলেনবার্গ বলেন, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে বয়সের ব্যবধান ঠিক কীভাবে প্রভাব ফেলে, তা এতদিন এক ধরনের ধোঁয়াশায় ঢাকা ছিল।”

তিনি জানান, সম্প্রতি ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ হিউম্যান রিসার্চ অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্স স্টাডিজ’ –এ পশ্চিম আফ্রিকার ঘানা নিবাসি গবেষক জে. এন. লোমোটে-এর একটি যুগান্তকারী সমীক্ষা প্রকাশিত হয়েছে।

এই গবেষণায় মিশ্র-পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রথম ধাপে ২০০ দম্পতির ওপর প্রশ্নাবলী-ভিত্তিক জরিপ চালানো হয় এবং দ্বিতীয় ধাপে ভিন্ন ভিন্ন বয়সের কাঠামোর ৩০টি দম্পতির লালা ও মনস্তাত্ত্বিক সাক্ষাৎকার নিয়ে নিবিড় পরীক্ষা চালানো হয়।

এই সমীক্ষায় পুরুষ বড় এমন সম্পর্ক এবং নারী বড় এমন সম্পর্ক— উভয়কেই সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

অসম বয়সের সম্পর্কের ৭টি মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ

তথ্য বিশ্লেষণ করে মনোবিজ্ঞানীরা ৭টি প্রধান ক্ষতিকর জটিলতা সনাক্ত করেছেন।

কমিউনিকেশন গ্যাপ বা ভাষা ব্যবহারের অমিল: দুই সঙ্গীর প্রজন্মের ব্যবধান বেশি হলে (যেমন জেন-জি প্রজন্মের সঙ্গে বুর্মারস বা আশির দশকের কারও সম্পর্ক) তাদের প্রতিদিনের শব্দচয়ন, ভাব প্রকাশের ধরন এবং যোগাযোগের মাধ্যম সম্পূর্ণ আলাদা হয়।

একজন হয়ত টেক্সট বা মেসেজে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, অন্যজন মুখোমুখি দীর্ঘ আলাপে বিশ্বাসী। এই অমিল অবচেতনে গভীর ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করে।

মানসিক পরিপক্কতার তারতম্য: বয়সে ছোট সঙ্গে, অনেক সময় বয়সে বড় সঙ্গীর পরিপক্ক আচরণ দেখে আকৃষ্ট হলেও, দিনশেষে বয়সে ছোট সঙ্গীর অনভিজ্ঞতা বা ‘ইমোশনাল ইমম্যাচিউরিটি’ বয়সে বড় সঙ্গীর জন্য মানসিক বিরক্তি ও ক্লান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা ও ইগোর লড়াই: বয়সে বড় সঙ্গী যদি কর্মক্ষেত্রে বেশি প্রতিষ্ঠিত হন এবং সম্পর্কের সিংহভাগ আর্থিক সিদ্ধান্ত একাই নেন, তবে বয়সে ছোট সঙ্গীর মনে এক ধরনের হীনম্মন্যতা তৈরি হয়।

বড় সঙ্গীর এই অবচেতন আধিপত্য বা ‘কন্ট্রোলিং’ আচরণ ছোট সঙ্গীর মস্তিস্কের লিম্বিক সিস্টেম বা আবেগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে তীব্র অসন্তোষের জন্ম দেয়।

দীর্ঘমেয়াদী জীবন ও ক্যারিয়ারের লক্ষ্যের অমিল: বয়সের বিশাল পার্থক্যের কারণে দুই সঙ্গীর জীবনের বর্তমান চাহিদা পুরোপুরি ওলটপালট থাকে।

উদাহরণ স্বরূপ, বয়সে বড় সঙ্গী হয়ত এখন চাকরি থেকে অবসর নিয়ে শান্ত জীবন কাটাতে চান, অথচ বয়সে যিনি ছোট তার রক্তে তখন নতুন ক্যারিয়ার গড়া ও বিশ্ব ভ্রমণের তীব্র রোমাঞ্চ কাজ করছে।

এই বিপরীতমুখী লক্ষ্য সম্পর্কে সংঘর্ষ তৈরি করে।

মানসিক ধকল: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বয়সি সঙ্গীর শরীরে যদি কোনও ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসাগত জটিলতা দেখা দেয়, তখন বয়সে ছোট সঙ্গীর ওপর পুরো সংসারের দায়িত্ব একাকভাবে এসে পড়ে।

সন্তান লালন-পালনের পাশাপাশি অসুস্থ সঙ্গীর সেবা করতে, বয়সে ছোট সঙ্গীর মানসিক অবসাদে ভোগার ঝুঁকি বাড়ে।

সামাজিক কুসংস্কার ও কটূক্তি: অসম বয়সের দম্পতিদের প্রায়শই বন্ধুমহল, পরিবার ও কর্মক্ষেত্রে অদৃশ্য গুঞ্জন ও সামাজিক নেতিবাচক বিচারের মুখোমুখি হতে হয়।

নিজের ভালোবাসাকে সারাক্ষণ অন্যের সামনে নির্দোষ প্রমাণ করার এই অবান্তর চেষ্টা মগজে স্ট্রেস হরমোন ‘কর্টিসল’ বাড়িয়ে দেয়।

জেন্ডার ডাবল স্ট্যান্ডার্ড বা লিঙ্গভিত্তিক দ্বিচারিতা: আমাদের সংস্কৃতিতে পুরুষের বয়স বেশি হলে সমাজ যতটা সহজে মেনে নেয়, নারীর বয়স পুরুষের চেয়ে ১০-১২ বছর বেশি হলে সমাজ তার চেয়ে বেশি কটূক্তি ছড়ায়।

ফলে যেসব সম্পর্কে নারী বয়সে বড়, তাদের স্নায়ুতন্ত্রকে মানসিক আঘাত সহ্য করতে হয়।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

ডা. সেবাস্টিয়ান ওকলেনবার্গ পরামর্শ দেন যে, “অসম বয়সের সম্পর্ক মানেই সেটি ব্যর্থ হবে এমন নয়। তবে এই সম্পর্ককে আজীবন বর্ম দিতে হলে দুইজনকেই সম্পর্কের এই চ্যালেঞ্জগুলোকে অবহেলা না করে  পরিপক্ক ও মনস্তাত্ত্বিক উপায়ে মোকাবেলা করতে হবে।”

সঙ্গীর চিন্তার ভিন্নতাকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করাই সম্পর্কের ভারসাম্য ঠিক রাখার উপায়।

আরও পড়ুন

সবসময় দোষ চাপানো সঙ্গীর সঙ্গে মোকাবিলা করবেন যেভাবে

আড্ডায় অনুপস্থিত বন্ধুকে নিয়ে কথা বলার সীমা কোথায়?

অসম বয়সের প্রেম: কেন তৈরি হয় এই আকর্ষণ?