Published : 19 Aug 2026, 04:48 PM
‘গোলাপি এখন ট্রেনে’ চলচ্চিত্রের পর থেকেই যে এদেশে নারীর বা মেয়েদের রং বলতে শুধু ‘গোলাপি’ নির্ধারণ করা হয় তা কিন্তু নয়। অথচ যতবার নারীদের জন্য আলাদা বাস নামানো হয়েছে, ততবারই চিহ্নিত করতে ব্যবহার করা হয়েছে গোলাপি রং।
তবে শুধু দেশেই নয়, বিশ্বজুড়ে নবজাতক শিশুর আগমনের প্রাক্কালে ঘর সাজানো থেকে শুরু করে জামাকাপড় ও খেলনা কেনার সময় সমাজ অবচেতনেই একটি সুনির্দিষ্ট বিভাজন রেখা টেনে দেয়।
কন্যাসন্তান হলে তার জন্য বরাদ্দ হয়ে যায় স্নিগ্ধ ‘গোলাপি বা ‘পিংক’ রং। আর পুত্রসন্তান হলে তার সমস্ত সামগ্রী ছেয়ে যায় ‘নীল’ রংয়ে।
সাধারণ মানুষের মাঝে এই ধারণা এতটাই দৃঢ় যে, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও গোলাপি রংকে কেবলই মেয়েলি বা নারীত্বের সমার্থক মনে করা হয়।
তবে সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসের গবেষকদের মতে, প্রাকৃতিকভাবে বা জন্মগতভাবে কোনো রংয়ের সঙ্গেই লিঙ্গের কোনো সংযোগ নেই।
অবাক করা সত্য হল, আজ থেকে মাত্র এক শতাব্দী আগেও বর্তমান ধারণার একদম বিপরীত নিয়ম প্রচলিত ছিল এবং তখন গোলাপিকে মনে করা হতো ছেলেদের প্রিয় ও শক্তিশালী রং।
ইতিহাস যা বলে
উষ্ণ ও শক্তিশালী গোলাপি: লিঙ্গ-বিষয়ক গবেষক এবং ইতিহাসবিদেরা বিভিন্ন নথিপত্রে দেখিয়েছেন যে, ১৮ ও ১৯ শতকের ইউরোপে রং নিয়ে আজকের মতো কোনো বাঁধাধরা নিয়ম ছিল না। সেই আমলে গোলাপি রংকে মনে করা হত লাল রংয়ের একটি হালকা ও তরুণ সংস্করণ। যেহেতু লাল রংকে যুদ্ধ, ক্ষমতা, উদ্দীপনা ও পুরুষত্বের প্রতীক মনে করা হত, তাই ছোট ছেলেদের পোশাক হিসেবে গোলাপি রং-ই ছিল সমাজের প্রথম পছন্দ।
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের নর্থ অ্যান্ডোভার এলাকায় অবস্থিত ‘মেরিম্যাক কলেজ’-এর সমাজবিজ্ঞান ও ‘জেন্ডার স্টাডিজ’ বিভাগের গবেষকদের পাশাপাশি পোশাকের লিঙ্গভিত্তিক ইতিহাসের ওপর বড় গবেষণাটি করেছেন ‘ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড’-এর ইতিহাসবিদ ড. জো বি. পাওলেত্তি।
৩০ বছর ‘আর্কাইভাল গবেষণা’ পরিচালনা করে প্রকাশ করেন ‘পিংক অ্যান্ড ব্লু: টেলিং দ্য বয়েজ ফ্রম দ্য গার্লস ইন আমেরিকা’। এই বইয়ে তিনি, ১৮ এবং ১৯ শতকের হাজার হাজার শিশুতোষ ক্যাটালগ, পারিবারিক ছবি, ডায়েরি এবং সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন বিশ্লেষণ করে প্রমাণ দেখিয়েছেন যে, বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের আগে ‘গোলাপি মানেই মেয়ে’— এমন কোনো নিয়ম পৃথিবীতে ছিলই না।
ম্যাসাচুসেটসের মেরিম্যাক কলেজের সমাজবিজ্ঞান ও জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষকেরা শিশুদের খেলনা ও পোশাকের বাণিজ্যিক লিঙ্গকরণের ওপর বিশদ আচরণগত গবেষণা পরিচালনা করেন। তাদের এই মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক পর্যালোচনাটি ‘পিয়ার-রিভিউড জার্নাল’ ‘জেন্ডার অ্যান্ড সোসাইটি’ এবং ‘জার্নাল অফ কনজিউমার রিসার্চ’-এ প্রকাশিত হয়।
গবেষণার মূল পর্যবেক্ষণে উঠে আসে যে, কীভাবে মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেমি আইজেনহাওয়ারের হালকা গোলাপি গাউন পরার ঘটনাকে পুঁজি করে ১৯৫০-এর দশকে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো রংকে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে লিঙ্গভিত্তিক বা ‘জেন্ডার-সেগ্রেগেটেড’ করে তোলে, যেন কন্যাসন্তান ও পুত্রসন্তানের জন্য মা-বাবাকে ডুপ্লিকেট পণ্য কিনতে বাধ্য করা যায়।
স্নিগ্ধ ও শান্ত নীল: এর বিপরীতে, নীল রংকে মনে করা হত অত্যন্ত শান্ত, স্নিগ্ধ ও পবিত্র। খ্রিস্টীয় শিল্পকলায় যিশু খ্রিস্টের মাতা কুমারী মেরির পোশাকের রং হিসেবে নীলের ব্যবহার বেশি থাকায়, ছোট মেয়েদের জন্য নীল রংকে বেশি উপযোগী মনে করা হত।
আমেরিকার ব্যবসা ও বিপণন নির্দেশিকা ‘আর্নশ’স ইনফ্যান্টস ডিপার্টমেন্টাল বুলেটিন’ ১৯১৮ সালে, তাদের একটি বিশেষ নির্দেশিকায় স্পষ্ট করে লিখেছিল, “সাধারণভাবে গৃহীত নিয়ম অনুযায়ী ছেলেদের পোশাকের জন্য গোলাপি এবং মেয়েদের পোশাকের জন্য নীল রংই মানানসই।”
বিংশ শতাব্দীর বাণিজ্যিক রূপান্তর
ইতিহাসবিদদের মতে, ১৯৪০ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে যুকরাষ্ট্রের বড় বড় খাদ্য ও প্রসাধানী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এবং পোশাকের খুচরা বিক্রেতা ও হকাররা তাদের বাণিজ্যের পরিধি বাড়াতে নতুন মনস্তাত্ত্বিক কৌশল সাজায়।
দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় হিটলারের নাৎসি বাহিনী, সমকামী পুরুষ বন্দীদের চেনার জন্য পোশাকে জোর করে ‘গোলাপি ত্রিভুজ’ ব্যাজ পরাতো। যা এই রংয়ের পুরুষালী ভাবমূর্তিকে প্রথম বড় ধাক্কা দেয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, ১৯৫৩ সালে মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেমি আইজেনহাওয়ার, তার স্বামীর অভিষেক অনুষ্ঠানে একটি জমকালো হালকা গোলাপি রংয়ের গাউন পরে হাজির হন।
এই ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং সাধারণ মানুষের অবচেতনে গোলাপি রংকে একচেটিয়াভাবে ঘরোয়া নারীত্ব, সৌন্দর্য ও ফ্যাশনের সমার্থক করে তোলে।
বিপণন বা প্রসাধনীর বিশেষজ্ঞরা বুঝতে পারেন, রংকে যদি লিঙ্গভিত্তিক করে দেওয়া যায়, তবে একই পরিবারের মা-বাবা তাদের ছেলে ও মেয়ের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা রংয়ের দুটি যুগল সেট বা ডুপ্লিকেট’ সামগ্রী কিনতে বাধ্য হবেন।
এই বাণিজ্যিক ফাঁদের কারণেই রাতারাতি ‘গোলাপি মানেই মেয়ে’ আর ‘নীল মানেই ছেলে’র আধুনিক লিঙ্গভিত্তিক ধারণার জন্ম হয়।
লিঙ্গ-ভিত্তিক রং নিয়ে আধুনিক বিতর্ক ও প্রতিবাদ
শিশুদের মগজে রংয়ের মাধ্যমে লৈঙ্গিক কুসংস্কার বা গৎবাঁধা ধারণা জোরপূর্বক প্রবেশ করানোর মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক কুফল নিয়ে বিশ্বজুড়ে বড় গবেষণাটি করেছেন, যুক্তরাজ্যের মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসায়েন্টিস্ট এবং আচরণগত বিজ্ঞানী ডা. কর্ডেলিয়া ফাইন।
২০১০ সালে তার আলোচিত ও পুরস্কারপ্রাপ্ত গবেষণামূলক বই ‘পিংক ব্রেইন, ব্লু ব্রেইন: হাউ জেন্ডার স্টেরিওটাইপস আর রিটেন ইন আওয়ার মাইন্ডস’ প্রকাশিত হয়।
তিনি পর্যালোচনায় প্রমাণ দেখিয়েছেন যে, জন্মগতভাবে ছেলে বা মেয়ে শিশুদের মগজে রংয়ের প্রতি আলাদা কোনো আকর্ষণ থাকে না। তবে ২ থেকে ৩ বছর বয়স থেকে পরিবার ও সমাজ কন্যাসন্তানকে গোলাপি খেলনা বা বার্বি ডল এবং পুত্রসন্তানকে নীল রংয়ের গাড়ি বা লেগো ব্লক দেওয়ার মাধ্যমে অবচেতনে তাদের মগজে ‘লৈঙ্গিক অন্ধবিশ্বাস’ ঢুকিয়ে দেয়।
এটি পরে মেয়েদের প্রযুক্তি ও গণিত থেকে দূরে রাখতে এবং ছেলেদের আবেগ প্রকাশে বাধা দিয়ে এক ধরনের চরম সামাজিক জড়তা তৈরি করে।
সমাজতাত্ত্বিক সমীক্ষা ও প্রতিবাদের দলিল
খেলনা ও প্রসাধনী পণ্যের ওপর ‘গোলাপি কর’ বা জেন্ডার মার্কেটিংয়ের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে চলমান প্রতিবাদের ওপর ম্যাসাচুসেটসের ফ্রামিংহাম স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডা. এলিজাবেথ সুইট সমাজতাত্ত্বিক সমীক্ষা পরিচালনা করেছেন। তার গবেষণাটি পিয়ার-রিভিউড জার্নাল ‘সোসিওলজিক্যাল ইনকোয়ারি’-তে প্রকাশিত হয়।
‘বয়েজ অ্যান্ড গার্লস, ইটস ইন দ্য টয়স: দ্য জেন্ডারিং অব চিলড্রেন’স প্রডাক্টস’ নামের গবেষণায় ডা. এলিজাবেথ সুইট, ১৯ শতক থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত খেলনার ক্যাটালগগুলো নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, আজকের যুগে খেলনা বা কাপড়ের জেন্ডার বা লিঙ্গভিত্তিক বিভাজন ১৯৫০ সালের চেয়েও অনেক বেশি তীব্র ও বাণিজ্যিক।
এই প্রতিবাদের ফলেই যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে ‘লেট টয়স বি টয়স’ নামক একটি বিশ্বব্যাপী সামাজিক আন্দোলনের জন্ম হয়েছে, যারা হকার ও বিক্রেতাদের বাধ্য করছে যে, খেলনা বা প্রসধনীর ওপর থেকে ‘ছেলেদের জন্য’ বা ‘মেয়েদের জন্য’ এই লিঙ্গভিত্তিক ট্যাগ বা সাইনবোর্ড পুরোপুরি সরিয়ে ফেলতে।
ফ্যাশন দুনিয়ার ‘জেন্ডার নিউট্রাল’ বিপ্লব
পোশাক ও লাইফস্টাইলে গোলাপি রংয়ের পুরুষালী ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনা এবং জেন্ডার নিউট্রাল বা লিঙ্গহীন পোশাকের ফ্যাশন ধারা নিয়ে ‘লন্ডন কলেজ অব ফ্যাশন’-এর সমাজবিজ্ঞানী ও ফ্যাশন তাত্ত্বিক ডা. অ্যাগনেস রোকামোরা বিশ্লেষণধর্মী গবেষণা করেছেন।
তার এই কাজ ও পর্যবেক্ষণটি আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা ব্লুমসবারি থেকে প্রকাশিত ‘থিংকিং থ্রু ফ্যাশন: আ গাইড টু সোশ্যাল থিওরিস্টস’ এবং ফ্যাশন ডায়েরিতে বিস্তারিতভাবে উদ্ধৃত হয়েছে।
তিনি গবেষণায় দেখিয়েছেন, কীভাবে এই সময়েও আন্তর্জাতিক রানওয়ে এবং প্রসাধনীর বিজ্ঞাপনে পুরুষেরা সানস্ক্রিন বা ত্বকের যত্নের পাশাপাশি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ‘কস্টিউম’ বা গোলাপি ব্লেজার পরে ‘জেন্ডার স্টেরিওটাইপ’-এর দেয়াল ভেঙে ফেলছেন।
ডা. অ্যাগনেস রোকামোরা মতে, রং কেবলই আলোর একটি সাধারণ তরঙ্গ দৈর্ঘ্য, একে কোনো সামাজিক লিঙ্গের বেড়াজালে আটকে রাখা চরম মূর্খতা।
আরও পড়ুন
জামদানি শাড়ির যত্নে বাড়তি মনোযোগ