যেসব খাবার থেকে মিলবে ম্যাগনেসিয়াম
ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি থাকলে ঘুমের ওপর বাজে প্রভাব পড়তে পারে।
ম্যাগনেসিয়াম শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় একটি খনিজ উপাদান। পেশি ও স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখা, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, হৃদ্স্পন্দন স্বাভাবিক রাখা, রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং হাড় গঠনে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
শরীরের ৩শ’টিরও বেশি এনজাইমের কার্যক্রমে ম্যাগনেসিয়াম প্রয়োজন হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথ (এনআইএইচ)-এর তথ্য অনুযায়ী, শরীরে পর্যাপ্ত ম্যাগনেসিয়াম না থাকলে শারীরবৃত্তীয় বিভিন্ন কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। তবে প্রতিদিনের খাবারে ম্যাগনেসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার রাখলে এর চাহিদা পূরণ করা সহজ হয়।
খাদ্যাভ্যাসে অতিরিক্ত পরিশোধিত খাবার, সাদা চাল ও ময়দাজাতীয় খাবারের আধিক্য এবং শাকসবজি, ডাল, বাদাম ও বীজজাতীয় খাবারের ঘাটতি থাকলে ম্যাগনেসিয়াম গ্রহণের পরিমাণ কমে যেতে পারে।
এছাড়া বয়স্ক ব্যক্তি, দীর্ঘমেয়াদি হজমের সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি, টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং দীর্ঘদিন ধরে কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ সেবনকারীদের শরীরে ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতির ঝুঁকি বেশি থাকতে পারে।
বেশিরভাগ সুস্থ মানুষের জন্য খাবার থেকেই ম্যাগনেসিয়াম গ্রহণ করা ভালো। কারণ, ম্যাগনেসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার শরীরে অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানও সরবরাহ করে।
বাদাম ও বীজজাতীয় খাবার
ম্যাগনেসিয়াম গ্রহণ বাড়াতে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বাদাম ও বীজজাতীয় খাবার রাখা যেতে পারে। কুমড়ার বীজ, তিল, কাঠবাদাম, কাজুবাদাম, সূর্যমুখীর বীজ ও তিসি বীজ ম্যাগনেসিয়ামের ভালো উৎস।
‘এনআইএইচ’-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৮ গ্রাম ভাজা কুমড়ার বীজে ১৫৬ মিলিগ্রাম ম্যাগনেসিয়াম থাকে। এছাড়া এসব খাবারে উদ্ভিজ্জ প্রোটিন, অসম্পৃক্ত চর্বি ও বিভিন্ন উপকারী উদ্ভিদজাত উপাদান রয়েছে।
যেভাবে খাওয়া উপকারী: সকাল বা বিকেলের নাস্তায় হিসেবে অল্প পরিমাণ বাদাম ও বীজ খাওয়া উপকারী। ভর্তা, সালাদ বা ঘরে তৈরি খাবারেও তিল ও কুমড়ার বীজ যোগ করা যায়।
অতিরিক্ত লবণ, চিনি বা তেলযুক্ত বাদামের পরিবর্তে সাধারণ বাদাম বেছে নিতে হবে।
প্রতিদিনের খাবারে সবুজ শাকসবজি রাখা
সবুজ শাকসবজি ম্যাগনেসিয়ামের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। পালংশাক, লালশাক, পুঁইশাক, কলমিশাক ও অন্যান্য গাঢ় সবুজ শাকে ম্যাগনেসিয়ামসহ বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ উপাদান থাকে।
উদ্ভিদের সবুজ রং তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ক্লোরোফিলের কেন্দ্রে থাকে ম্যাগনেসিয়াম। তাই সবুজ শাকসবজি এই খনিজের একটি উল্লেখযোগ্য উৎস।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন অন্তত ৪০০ গ্রাম ফল ও শাকসবজি খাওয়া উচিত।
খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত শাকসবজি রাখলে শুধু ম্যাগনেসিয়ামের পাশাপাশি আঁশ, ভিটামিন ও অন্যান্য খনিজের চাহিদা পূরণেও সহায়তা পাওয়া যায়।
যেভাবে খাওয়া উপকারী: প্রতিদিনের দুপুর ও রাতের খাবারে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি রাখা উচিত। শাক রান্নার সময় অতিরিক্ত পানি ব্যবহার না করা এবং দীর্ঘক্ষণ সেদ্ধ না করা ভালো। সেদ্ধ করার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত পানির সঙ্গে কিছু খনিজ বেরিয়ে যেতে পারে।
পরিশোধিত শস্যের পরিবর্তে গোটা শস্য
ম্যাগনেসিয়াম গ্রহণ বাড়াতে খাদ্যতালিকায় গোটা শস্যের পরিমাণ বাড়ানো প্রয়োজন। চাল ও গমের বাইরের স্তর এবং অঙ্কুরে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান থাকে।
চাল বা গম অতিরিক্ত পরিশোধন করে সাদা চাল ও ময়দা তৈরির সময় এসব অংশের অনেকটাই বাদ পড়ে যায়। ফলে গোটা শস্যের তুলনায় পরিশোধিত শস্যে ম্যাগনেসিয়াম ও আঁশের পরিমাণ কম হতে পারে।
যেভাবে খাওয়া উপকারী: প্রতিদিনের খাবারে শুধু সাদা ভাতের ওপর নির্ভর না করে মাঝেমধ্যে লাল চালের ভাত, লাল আটার রুটি, ওটস বা অন্যান্য গোটা শস্যের খাবার রাখা উপকারী। লাল চাল বা আটার রুটি খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আনতে সাহায্য করবে। তবে যেকোনো শস্যই পরিমাণমতো খেতে হবে।
গোটা শস্য ম্যাগনেসিয়ামের পাশাপাশি বি-ভিটামিন ও খাদ্যআঁশ সরবরাহ করে। খাদ্যআঁশ হজমের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে এবং রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।
নিয়মিত ডাল ও অন্যান্য ডালজাতীয় খাবার খাওয়া
মসুর ডাল, মুগ ডাল, ছোলা, মটরশুঁটি, মটর ডাল ও শিমের দানা ম্যাগনেসিয়ামের ভালো উৎস। এসব খাবারে উদ্ভিজ্জ প্রোটিন, খাদ্যআঁশ ও অন্যান্য খনিজ উপাদানও রয়েছে।
ডালজাতীয় খাবার নিয়মিত খেলে খাদ্যতালিকায় পুষ্টির বৈচিত্র্য বাড়ে। খাদ্যআঁশসমৃদ্ধ ডাল অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে এগুলো রক্তে শর্করা ও রক্তের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক হতে পারে।
যেভাবে খাওয়া উপকারী: প্রতিদিনের খাবারে ডাল রাখা উপকারী। ভাতের সঙ্গে মসুর বা মুগ ডাল, নাস্তায় সেদ্ধ ছোলা এবং তরকারিতে মটরশুঁটি বা শিমের দানা খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে। ডাল দিয়ে স্যুপ বা অন্যান্য ঘরোয়া খাবারও তৈরি করা যায়।
তবে ডাল রান্নার সময় অতিরিক্ত লবণ ও তেল ব্যবহার না করাই ভালো।
মাছ, কলা ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার
ম্যাগনেসিয়ামের চাহিদা পূরণে মাছ, কলা ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারও ভূমিকা রাখতে পারে। সামুদ্রিক মাছের পাশাপাশি দেশীয় মাছও সুষম খাদ্যতালিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মাছ থেকে প্রোটিন পাওয়া যায়; কিছু তৈলাক্ত মাছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড ও ভিটামিন ‘ডি’-ও থাকে।
কলা ম্যাগনেসিয়ামের পাশাপাশি পটাসিয়াম সরবরাহ করে। এছাড়া অন্যান্য ফল, শাকসবজি, ডাল ও গোটা শস্যের সঙ্গে কলা খেলে খাদ্যতালিকায় পুষ্টির বৈচিত্র্য বাড়ে।
যেভাবে খাওয়া উপকারী: খাদ্যতালিকায় রুই, কাতলা, ইলিশ, ছোট মাছসহ বিভিন্ন ধরনের মাছ রাখা যায়। পরিমিত পরিমাণে কলা ও মৌসুমি ফল খাওয়া উচিত। মাছ রান্নার সময় অতিরিক্ত তেল ও লবণ ব্যবহার এড়িয়ে চলতে হবে।
শরীরে ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি এড়াতে আরও যা করা যায়
কোনও একটি খাবার থেকে ম্যাগনেসিয়ামের পূর্ণ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই প্রতিদিনের খাবারে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর খাবার রাখা জরুরি। পাশাপাশি রান্নার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় খেয়ালও রাখতে হবে।
শাকসবজি অতিরিক্ত সেদ্ধ করা যাবে না: রান্নার সময় কিছু ম্যাগনেসিয়াম পানিতে মিশে যেতে পারে। তাই শাকসবজি অতিরিক্ত সেদ্ধ না করে পরিমিত পানি ব্যবহার করা উচিত। সেদ্ধ করার পর অবশিষ্ট পানি ফেলে দিলে পানিতে দ্রবীভূত কিছু পুষ্টি উপাদানও নষ্ট হতে পারে।
খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আনা: প্রতিদিন একই ধরনের খাবার না খেয়ে শাকসবজি, ডাল, বাদাম, বীজ, গোটা শস্য, মাছ ও ফল পর্যায়ক্রমে রাখতে হবে।
অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার কমান: চিপস, অতিরিক্ত লবণযুক্ত প্যাকেটজাত খাবার, মিষ্টি, চিনিযুক্ত পানীয় এবং পরিশোধিত শস্য দিয়ে তৈরি খাবার বেশি খেলে পুষ্টিকর খাবারের পরিমাণ কমে যেতে পারে।
এসব খাবারের পরিবর্তে পুষ্টিকর ও কম প্রক্রিয়াজাত খাবার বেছে নিতে হবে।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সাপ্লিমেন্ট খাওয়া যাবে না: বেশিরভাগ সুস্থ মানুষের জন্য খাবার থেকেই ম্যাগনেসিয়াম গ্রহণ করা ভালো। তবে কারও ঘাটতি থাকলে বা শারীরিক অবস্থার কারণে অতিরিক্ত ম্যাগনেসিয়ামের প্রয়োজন হলে চিকিৎসক সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের পরামর্শ দিতে পারেন।
যখন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে
শরীরে ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি হলে প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনও লক্ষণ দেখা যায় না। ঘাটতি গুরুতর হলে ক্ষুধামন্দা, বমি বমি ভাব, ক্লান্তি, পেশিতে টান, পেশির খিঁচুনি বা হাত-পায়ে ঝিনঝিন করার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
গুরুতর অবস্থায় হৃদ্স্পন্দনেও অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে। তবে এসব লক্ষণ অন্য রোগ বা পুষ্টির ঘাটতির কারণেও হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি হজমের সমস্যা, ডায়াবেটিস, কিডনির রোগ বা দীর্ঘদিন ধরে নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ সেবনের ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক পরীক্ষা করে ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি নির্ণয় করতে পারেন।
নিজে থেকে দীর্ঘদিন ম্যাগনেসিয়াম সাপ্লিমেন্ট খাওয়া নিরাপদ নয়। অতিরিক্ত সাপ্লিমেন্ট গ্রহণে ডায়রিয়া, বমি বমি ভাব ও পেটব্যথা হতে পারে। বেশি মাত্রায় গ্রহণ করলে রক্তচাপ কমে যাওয়া এবং গুরুতর জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
কিডনির কার্যকারিতা কম থাকলে অতিরিক্ত ম্যাগনেসিয়াম শরীর থেকে বের করে দেওয়ার ক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে।
সব মিলিয়ে, শরীরে ম্যাগনেসিয়ামের চাহিদা পূরণের জন্য প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, ডাল, বাদাম, বীজ, গোটা শস্য, মাছ ও ফলের সমন্বয় রাখাতে হবে।
লেখক: পুষ্টিবিদ লিনা আকতার। রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর।
