যে কারণে একে অপরের মুখ দেখা গুরুত্বপূর্ণ
মুখোমুখি কথোপকথন কি কেবলই ভদ্রতা? মানুষের মুখ দেখার পেছনে রয়েছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও স্নায়বিক সম্পর্ক।
মানুষ যখন সামাজিক বা পেশাদারি ক্ষেত্রে একে অপরের মুখোমুখি হয়, তখন পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্পর্কের গভীরতা নির্ধারণে দৃশ্যমান মুখমণ্ডল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বর্তমান আধুনিক যুগে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক বা প্রযুক্তিগত কারণে মানুষের মুখ ঢেকে রাখার বা সরাসরি না দেখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
মনস্তত্ত্ব বিষয়ক পোর্টাল সাইকোলজি টুডে-তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মুখোমুখি যোগাযোগ বা একে অপরের মুখ দেখতে পাওয়া কেবল কোনও সামাজিক রীতি নয়; বরং এটি মানুষের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত রাখার এবং পারস্পরিক বিশ্বাস গড়ে তোলার এক অপরিহার্য মনস্তাত্ত্বিক মাধ্যম।
প্রতিবেদনে বার্সেলোনার দার্শনিক এবং মাইন্ডফুলনেস বা সচেতনতা বিশেষজ্ঞ ড. ফিন জেনিং, তার মনস্তাত্ত্বিক পর্যালোচনায় দেখিয়েছেন, মানুষের মুখ কেবল কিছু শারীরিক বৈশিষ্ট্যের সমষ্টি নয়, বরং এটি মানুষের ভেতরের আবেগকে প্রকাশ করার প্রধান মাধ্যম।
১৯৬১ সালে প্রকাশিত অস্ট্রিয়ার দার্শনিক ইমানুয়েল লেভিনাসের 'টোটালিটি অ্যান্ড ইনফিনিটি' এবং ১৯২৩ সালে প্রকাশিত ফরাসি দার্শনিক মার্টিন বুবারের 'আই অ্যান্ড দাউ' তত্ত্বের সূত্র ধরে তিনি উল্লেখ করেন, “যখন একজন মানুষ অন্য মানুষের দৃশ্যমান মুখমণ্ডল দেখে, তখন অপর ব্যক্তিটি কেবল একটি বস্তু বা ‘ক্যাটাগরি’ থাকে না, বরং সে একজন জীবন্ত মানুষ হিসেবে মনের কাছে ধরা দেয়।”
মানুষের হাসা, লজ্জিত হওয়া, বিষণ্ণ হওয়া বা চোখের ইশারা বোঝার মাধ্যমে অপর পক্ষের মানসিক অবস্থা সরাসরি অনুভব করা যায়, যা সম্পর্কের মধ্যে গভীর ‘উপস্থিতি’ ও সহমর্মিতা তৈরি করে।
স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষকদের মতে, মানুষের স্নায়ুতন্ত্র প্রতিনিয়ত অবচেতনভাবেই চারপাশের মানুষের মুখমণ্ডল থেকে সামাজিক সংকেত বা ‘সিগন্যাল’ পড়তে থাকে।
মাকিন মনোবিজ্ঞানী স্টিফেন পোর্জেস-এর ‘পলিভেগাল থিওরি’ অনুযায়ী- মানুষের মুখের অভিব্যক্তি, কণ্ঠস্বরের ওঠানামা এবং শ্রবণপ্রক্রিয়া শরীরের স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। মানুষের অবচেতন মন বা নিউরোসেপশন কোনও সচেতন চিন্তা ছাড়াই সামনের মানুষটির মুখ দেখে অনবরত বিশ্লেষণ করে— ব্যক্তিটি নিরাপদ নাকি বিপজ্জনক।
বিশেষ করে যারা অতীতে কোনও মানসিক ট্রমা বা বড় আঘাতের মধ্য দিয়ে গেছেন, অন্য মানুষের মুখের অভিব্যক্তি বুঝতে পারার ক্ষমতা তাদের মানসিক ক্ষত নিরাময়ে বা ‘ট্রমা হিলিং’য়ে সাহায্য করে।
ড. ফিন জেনিং-এর মতে, “একে অপরের মুখ দেখতে পাওয়ার মাধ্যমে যে ‘কো-রেগুলেশন’ বা পারস্পরিক স্নায়বিক নিয়ন্ত্রণ ঘটে, তা মানুষকে মানসিকভাবে নিরাপদ ও শান্ত বোধ করতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে।
