২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩

যখন ‘আই অ্যাম সরি’ বলাটাই যথেষ্ট নয়

সম্পর্কের টানাপোড়েনে কখনও কখনও শুধু ‘সরি’ বলে পার পাওয়া যায় না।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 27 Oct 2026, 08:01 PM

Updated : 27 Oct 2026, 08:01 PM

দৈনন্দিন জীবনে প্রিয়জন বা বন্ধুদের সঙ্গে চলার পথে অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল বা আঘাত পাওয়ার ঘটনা ঘটতেই পারে।

কোনও বন্ধু হয়ত দুপুরের দাওয়াত দিয়েও শেষ মুহূর্তে তা ভুলে গেলেন বা কোনও বিশেষ প্রয়োজনে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারলেন না।

এই ধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণত অবধারিতভাবেই একটি কথা উচ্চারিত হয়, ‘তোমার কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত!’

তবে কখনও কি ভেবে দেখা হয়েছে যে, শুধুই ‘আই অ্যাম সরি’ বা ‘আমি দুঃখিত’ বলাটা আসলে সম্পর্কের ক্ষতি কতটুকু মেরামত করতে পারে?

মনস্তাত্ত্বিক-বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘সাইকোলজি টুডে’-তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে, মনোবিদরা জানিয়েছেন, ভুলের পর স্রেফ দুঃখ প্রকাশ করার চেয়েও মানুষ অন্য একটি মনস্তাত্ত্বিক উপাদান বেশি আশা করে, যা ছাড়া সম্পর্ক জোড়া লাগা অসম্ভব।

কানাডার ওন্টারিওতে অবস্থিত ‘উইলফ্রিড লরিয়ার ইউনিভার্সিটি’র মনস্তত্ত্বের অধ্যাপক এবং ক্ষমা ও সম্পর্ক-বিষয়ক গবেষক ড. জুডি ইটন বলেন, “মানুষ যখন কোনও আঘাতে বা অবহেলায় ক্ষমা চায়, তখন সে আসলে শুধুই অনুশোচনার শব্দ শুনতে চায় না; বরং সে চায় অপর পক্ষ তার অন্যায়টি স্পষ্টভাবে স্বীকার করুক এবং তার মানসিক কষ্টকে মূল্যায়ন করুক।”

মনস্তাত্ত্বিক ‘ম্যাগনিচিউড গ্যাপ’ বা ধারণার ব্যবধান

কেউ কারও মাধ্যমে অন্যায়ের শিকার হলে অবচেতনভাবেই তার মনে আঘাত লাগে। যেমন কোনও বন্ধু শেষ মুহূর্তে পরিকল্পনা বাতিল করলে ভুক্তভোগী ব্যক্তি মনে করতে পারেন যে, তার সময়ের বা বন্ধুত্বের কোনও মূল্য নেই।

এই অবস্থায় অপর পক্ষ যদি একটি হালকা ‘সরি’ বলে বিষয়টিকে এড়িয়ে যেতে চায়, তবে সমস্যা আরও জটিল হয়।

সামাজিক বিজ্ঞানী ও মার্কিন মনস্তত্ত্ববিদ রয় বাউমিস্টার, তার একটি গবেষণায় এই পরিস্থিতিকে ‘ম্যাগনিচিউড গ্যাপ’ বা ধারণার ব্যবধান হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

তার তত্ত্ব অনুযায়ী, “যেকোনো অন্যায়ের ক্ষেত্রে যিনি ভুক্তভোগী, তিনি আঘাতটিকে অনেক বেশি বড়, দীর্ঘস্থায়ী এবং প্রভাবশালী হিসেবে দেখেন। তুলনায় যিনি অপরাধটি করেছেন, তিনি বিষয়টিকে খুব সাময়িক বা ছোট করে দেখার চেষ্টা করেন।

যতক্ষণ না পর্যন্ত ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে এই মানসিক ব্যবধানটি দূর করা যাচ্ছে, ততক্ষণ সম্পর্ক জোড়া লাগে না।

গবেষণায় যা দেখা গেছে

ক্ষমা পাওয়ার ক্ষেত্রে মানসিক অনুভূতির প্রভাব জানতে ড. জুডি ইটন এবং তার সহকর্মীরা যৌথভাবে একটি বিশেষ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা পরিচালনা করেছিলেন।

বিজ্ঞানীরা একটি অনলাইন প্রতিযোগিতামূলক খেলার আয়োজন করেন, যেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু খেলোয়াড়কে অন্য প্রতিযোগীদের সঙ্গে অন্যায় সুবিধা নিয়ে হারিয়ে দেওয়া হয়। খেলা শেষে পরাজিত ও ক্ষতিগ্রস্ত খেলোয়াড়দের কাছে ৪ ধরনের বার্তা পাঠানো হয়— ১. সাধারণ দুঃখ প্রকাশ (‘আই অ্যাম সরি’), ২. কেবল সত্যের স্বীকৃতি (‘আমি তোমার সঙ্গে অন্যায় করেছি’), ৩. দুঃখ প্রকাশ ও স্বীকৃতি দুটাই এবং ৪. কোনওটিই নয়।

‘পার্সোনালিটি অ্যান্ড সোশ্যাল সাইকোলজি বুলেটিন’-এ প্রকাশিত গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, যেখানে কোনও বার্তা দেওয়া হয়নি বা শুধু একটি শুকনো ‘আই অ্যাম সরি’ বলা হয়েছিল, সেখানে ক্ষতিগ্রস্তদের মনে ক্ষমার প্রবণতা ছিল অত্যন্ত কম।

আর চমৎকার ইতিবাচক ফল পাওয়া গিয়েছিল তখনই, যখন ভুলকারী ব্যক্তি নিজের দোষটি স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছিলেন।

আশ্চর্যজনকভাবে, অপরাধের তীব্রতা স্বীকার করার পর সেখানে আলাদা করে ‘আই অ্যাম সরি’ শব্দটি বলা হল কি হল না, সেটা ক্ষমার ক্ষেত্রে কোনও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

কার্যকর ক্ষমার মূল উপাদান

যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওহিও স্টেট ইউনিভার্সিটি’র ‘ফিশার কলেজ অব বিজনেস’-এর গবেষকদের পরিচালিত এবং ‘নেগোসিয়েশন অ্যান্ড কনফ্লিক্ট ম্যানেজমেন্ট রিসার্চ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত সমীক্ষায় দেখা গেছে, একটি কার্যকর ক্ষমার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল, নিজের কাজের ‘দায়বদ্ধতা’ স্বীকার করা।

‘আমি দুঃখিত যদি তুমি কষ্ট পেয়ে থাকো’ বা ‘আমি দুঃখিত তুমি রেগে আছ বলে’— এই ধরনের অজুহাতমূলক বা শর্তযুক্ত ক্ষমা কোনও কাজ করে না। কারণ এতে অপরাধ স্বীকারের চেয়ে ভুক্তভোগীর অনুভূতিকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়।

প্রকৃত ক্ষমা তখনই সফল হয় যখন ভুক্তভোগী বুঝতে পারেন যে, অপর পক্ষ তার মানসিক যন্ত্রণার গভীরতা উপলব্ধি করতে পেরেছে।

আগামী বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশ পেতে যাওয়া ড. জুডি ইটনের লেখা ‘সে ইট লাইক ইউ মিন ইট: দ্য সায়েন্স অব অ্যাপোলজিস’ বইটিতে উল্লেখ করেছেন, ক্ষমা চাওয়া মানেই এই নয় যে অপর পক্ষের সব কথার সঙ্গে একমত হতে হবে।

তবে সম্পর্কের ফাটল জোড়া লাগাতে হলে নিজের ভুলের কারণে যে অন্য একজন মানুষ কষ্ট পেয়েছেন, সেই সত্যকে এবং তার মানসিক অনুভূতিকে সবার আগে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

পুরনো খবর:

মানসিক অত্যাচারের অপর নাম অপরাধ বোধে ভোগানো
আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করতে হয় যেভাবে
সাবলীল সম্পর্কের চাবিকাঠি
বন্ধুত্ব ভাঙার ৫টি স্পষ্ট লক্ষণ