অহেতুক খরচ না করাই বুদ্ধিমানের কাজ
এই সময়ে ‘সফট সেইভিংস’ পদ্ধতি তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় হতে দেখা যাচ্ছে।
আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে ‘সফট সেইভিংস’ শব্দটি আর শুধু একটি আর্থিক পরামর্শ নয়, এটি একটি জীবনদর্শন।
কঠোরভাবে টাকা জমিয়ে ভবিষ্যতের জন্য সবকিছু বিসর্জন দেওয়ার বদলে বর্তমান জীবনের আনন্দ, মানসিক শান্তি ও প্রয়োজনীয় খরচের সঙ্গে ভবিষ্যতের সঞ্চয়ের মধ্যে একটি সুন্দর ভারসাম্য বজায় রাখাই ‘সফট সেইভিংস’।
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের সাবেক আঞ্চলিক প্রধান ফকির আকতারুল আলম এই বিষয়ে বলেন, “সফট সেইভিংস’ পদ্ধতি বিশেষ করে জেন-জি ও মিলেনিয়ালদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, কারণ তারা দেখছেন—কঠোর সঞ্চয় করেও ভবিষ্যৎ পুরোপুরি নিশ্চিত করা যায় না, বরং বর্তমান জীবনকে উপভোগ না করলে সবকিছুই অর্থহীন হয়ে যায়।”
“মনে রাখতে হবে, জীবন শুধু ভবিষ্যতের জন্য নয়— এটি বর্তমানেরও। সঠিক ভারসাম্য রেখে চললে আজও সুন্দর, কালও নিরাপদ”- বলেন তিনি।
‘সফট সেভিংস’ বলতে যা বোঝায়
অহেতুক খরচ না করা, বরং আয়ের একটি অংশ সঞ্চয় করার পাশাপাশি বর্তমানের ছোট ছোট আনন্দগুলোকে উপভোগ করা।
যেমন- বেতনের ২০-৩০ শতাংশ সঞ্চয় করে বাকি টাকা দিয়ে ভালো খাবার খাওয়া, একটু ঘুরে আসা বা শখ পূরণ করা।
এতে ভবিষ্যতের জন্য চাপ কমে এবং বর্তমান জীবন আরও সুন্দর হয়ে ওঠে।
ফকির আকতারুল আলম বলেন, “এই ধারণা এসেছে আধুনিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা থেকে। এটা অর্থনীতির কোনো ধারা নয়। বরং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্নজন এই পদ্ধতির কথা উল্লেখ করার ফলে, পদ্ধতিটা জনপ্রিয় হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “কারণ আজকের তরুণেরা দেখছেন, তাদের আগের প্রজন্ম কঠোর পরিশ্রম করে টাকা জমিয়েও স্বপ্নের বাড়ি বা নিরাপদ ভবিষ্যত পুরোপুরি পাননি। মূল্যস্ফীতি, চাকরির অনিশ্চয়তা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে তাঁরা বুঝতে পেরেছেন— শুধু ভবিষ্যতের জন্য বর্তমানকে বিসর্জন দেওয়া ঠিক নয়।”
‘সফট সেভিংস’য়ের সুবিধা
সবচেয়ে বড় সুবিধা হল- মানসিক প্রশান্তি। কঠোর বাজেট মেনে চলার চাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
বর্তমান জীবনের মান উন্নত হয়, ছোট ছোট শখ পূরণ করা যায় এবং অহেতুক আর্থিক চাপ কমে। এতে অভিযোজনযোগ্যতা বাড়ে। আয় বাড়লে খরচ বাড়ানো যায়, আয় কমলে সঞ্চয় কমিয়ে সমন্বয় করা যায়।
এছাড়া এটি আর্থিক সচেতনতা বাড়ায়।
এতে শুধু টাকা জমানো হয় না, বরং নিজের মূল্যবোধ অনুসারে খরচ করতে শেখা যায়।
ভবিষ্যতের ভীতি কমে, কারণ আজকের আনন্দকে পুরোপুরি বিসর্জন দিতে হয় না।
‘সফট সেভিংস’য়ের পদ্ধতি
ফকির আকতারুল আলম বলেন, “প্রথমে একটি জরুরি তহবিল (ইমার্জেন্সি ফান্ড) তৈরি করুন— যা হতে পারে আয়ের অন্তত তিন থেকে ছয় মাসের খরচ সমান টাকা। তারপর কঠোর বাজেট না করে আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ (যেমন ২০-৩০ শতাংশ) সঞ্চয় করুন। বাকি টাকা দিয়ে বর্তমানের প্রয়োজন ও শখ পূরণ করুন।”
তিনি উদাহরণ দেন এভাবে- মাসের শুরুতে সঞ্চয়ের টাকা আলাদা করে রাখা যেতে পারে। তারপর বাকি টাকা দিয়ে ভালো খাবার খাওয়া, একটু ঘুরে আসা বা পরিবারের সঙ্গে বাইরে সময় কাটানো যেতে পারে।
এতে মানসিক চাপ কমবে এবং সঞ্চয়ও চলতে থাকবে।
‘সফট’ মানে লাগামহীন নয়
‘সফট সেভিংস’য়ের অর্থ অহেতুক খরচ করা নয়। এটি বুদ্ধিদীপ্ত খরচ ও সঞ্চয়ের ভারসাম্য।
যদি আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হয়ে যায়, তাহলে এটি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তাই নিয়মিত খরচের হিসাব রাখা এবং প্রয়োজনে একজন আর্থিক উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে।
আকতারুল আলমের ভাষায়, “কঠোর সঞ্চয়ের চাপে নিজেকে ক্লান্ত না করে ‘সফট সেভিংস’য়ের মাধ্যমে বর্তমানকে উপভোগ করুন। এতে মানসিক শান্তি বাড়বে, জীবনের মান উন্নত হবে এবং ভবিষ্যতের জন্যও একটা ভিত্তি তৈরি হবে।”
আরও পড়ুন
