Published : 11 Aug 2026, 03:44 PM
ঘর পরিপাটি কিন্তু হঠাৎ কোথা থেকে ভেসে আসা গন্ধে তৈরি হল অস্বস্তিকর পরিবেশ। এই দুর্গন্ধ দূর করতে ঘরের মেঝে মোছা হল, আসবাব পরিষ্কার করা হল, জানালা খোলা হল, তারপরও যাচ্ছে না গন্ধ।
এর কারণ হতে পারে ঘরের বড় কোনো জায়গা নয় বরং এমন কিছু ছোট জায়গা আছে, যেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করার কথা ভাবাই হয় না।
রান্নাঘরের আবর্জনার পাত্র, সিঙ্ক, কাপড় ধোয়ার যন্ত্র, ভেজা কাপড়ের ঝুড়ি বা জুতার তাকও হতে পারে দুর্গন্ধের উৎস।
বিশেষ করে বর্ষাকাল বা আর্দ্র আবহাওয়ায় এই সমস্যা আরও বাড়তে পারে। অতিরিক্ত আর্দ্রতা থাকলে ছত্রাক জন্মানোর সুযোগ পায়।
গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও অন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাসমিয়া জান্নাত বলেন, “ঘরের যেখানে আর্দ্রতা বেশি, সেখানে ছত্রাক জন্মাতে পারে। ছত্রাকের উপস্থিতিতে স্যাঁতসেঁতে বা বাসি ধরনের গন্ধও তৈরি হয়।”
তাই দুর্গন্ধ ঢাকার জন্য শুধু সুগন্ধি ব্যবহার না করে প্রথমে খুঁজে বের করা জরুরি গন্ধের উৎস কোথায়।
কাপড় ধোয়ার যন্ত্র পরিষ্কার
যে যন্ত্র কাপড় পরিষ্কার করে, সেটিকেও যে নিয়মিত পরিষ্কার করতে হয়। এ বিষয়ে অনেকেই ভুল করেন। বিশেষ করে যন্ত্রের দরজার রাবারের অংশে পানি, ময়লা, কাপড়ের আঁশ ও আর্দ্রতা জমে থাকতে পারে।
দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করলে সেখান থেকে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ তৈরি হতে পারে।
কাপড় ধোয়ার পর যন্ত্রের দরজা কিছু সময় খোলা রাখা যেতে পারে, যাতে ভেতরের আর্দ্রতা শুকিয়ে যায়। রাবারের ভাঁজগুলোও নিয়মিত মুছে পরিষ্কার করতে নির্দেশনা অনুসরণ জরুরি।
রান্নাঘরের সিঙ্কে জমে থাকা খাবারের টুকরা
রান্নাঘরের সিঙ্ক ঘরের দুর্গন্ধের উৎস হতে পারে। থালা-বাসন ধোয়ার সময় খাবারের ছোট ছোট অংশ পানির সঙ্গে পাইপে চলে যায়। সবটুকু বেরিয়ে না গেলে সেগুলো নলের ভেতরে জমে দুর্গন্ধ তৈরি করতে পারে।
“তাই প্রতিদিন সিঙ্ক পরিষ্কার করার সময় শুধু ওপরের অংশ ধুলেই হবে না। নলের মুখ, চারপাশ এবং যেখানে পানি জমে থাকে, সেসব জায়গাও ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে”, পরামর্শ দেন তাসমিয়া জান্নাত।
“সিঙ্ক পরিষ্কার করার পর সেটি শুকনো রাখার চেষ্টা করাও গুরুত্বপূর্ণ। ভেজা ও খাবারের অবশিষ্টাংশ থাকা জায়গা দীর্ঘদিন অপরিষ্কার থাকলে দুর্গন্ধের পাশাপাশি জীবাণু ও ছত্রাকের বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে”, মন্তব্য করেন এই অধ্যাপক।
আবর্জনার পাত্রের দুর্গন্ধ
রান্নাঘরের আবর্জনার পাত্রে খাবারের উচ্ছিষ্ট, সবজির খোসা, মাছ-মাংসের বর্জ্যসহ নানান ধরনের জিনিস জমে থাকে। এগুলো দীর্ঘ সময় পড়ে থাকলে স্বাভাবিকভাবেই দুর্গন্ধ তৈরি হয়।
এক্ষেত্রে শুধু আবর্জনার ব্যাগ বদলানো সমাধান নয়, সঙ্গে পাত্রটিও পরিষ্কার করতে হবে। কারণ ব্যাগের বাইরে লেগে থাকা তরল বা খাবারের অংশ পাত্রের তলায় ও পাশে জমে যায়।
তাই পাত্র পরিষ্কার না করলে পরেরবার নতুন ব্যাগ দিলেও সেই পুরোনো গন্ধ থেকে যায়।
তাসমিয়া জান্নাত বলেন, “আবর্জনা ফেলার পাত্র নিয়মিত সাবান ও পানি দিয়ে ধুয়ে ভালোভাবে শুকিয়ে নেওয়া উচিত। ঢাকনা থাকলে সেটিও পরিষ্কার করতে হবে। ভেজা পাত্রে নতুন ব্যাগ বসিয়ে দিলে দ্রুত দুর্গন্ধ তৈরি হতে পারে।”
ভেজা কাপড়ের ঝুড়ি
কাপড় ধোয়ার আগে যেসব ময়লা কাপড় এক জায়গায় রাখা হয়, সেই ঝুড়িও দুর্গন্ধের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে ঘামে ভেজা কাপড়, ভেজা তোয়ালে বা দীর্ঘ সময় আর্দ্র থাকা পোশাক একসঙ্গে জমে থাকলে সেখানে বাসি গন্ধ তৈরি হয়।
ভেজা কাপড় সম্ভব হলে দ্রুত শুকিয়ে নিয়ে কাপড় ধোয়ার ঝুড়িতে রাখা ভালো। ঝুড়িটিও মাঝেমধ্যে পরিষ্কার করে পুরোপুরি শুকিয়ে নিতে হবে।
কাপড়ের ঝুড়ি যদি এমন জায়গায় রাখা হয় যেখানে বাতাস চলাচল কম, তাহলে দুর্গন্ধ আরও সহজে আটকে থাকে।
জুতার তাকে নজর
দীর্ঘ সময় ব্যবহার করা জুতায় ঘাম ও আর্দ্রতা জমে থাকতে পারে। এছাড়া অনেক জোড়া জুতা একসঙ্গে বন্ধ জায়গায় রাখলে সেই গন্ধ আরও তীব্র হয়।
তাই জুতার তাকের দরজা বা জানালা সম্ভব হলে কিছু সময় খোলা রাখা ভালো। জুতা ব্যবহারের পর পুরোপুরি শুকানোর সুযোগ দিতে হবে।
তাকের ভেতরও নিয়মিত মুছে শুকিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন, এই বিশেষজ্ঞ।
আলমারি ও কাপড়ের তাক
পরিষ্কার কাপড় রাখার আলমারিতেও কখনও কখনও স্যাঁতসেঁতে গন্ধ তৈরি হয়। কারণ হতে পারে দীর্ঘদিন বাতাস চলাচল না করা। বর্ষাকালে আর্দ্রতা বেশি থাকলে এই সমস্যা আরও প্রকট হতে পারে।
আলমারির ভেতরের কাপড় মাঝে মাঝে বের করে বাতাস লাগানো যেতে পারে। তাকগুলোও খালি করে মুছে পুরোপুরি শুকিয়ে নেওয়া দরকার।
কোনো কাপড় স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেলে সেটি আলমারিতে রেখে দেওয়া ঠিক নয়।
গোসলঘরের আর্দ্র জায়গাগুলো
গোসলঘরে পানি ও আর্দ্রতা বেশি থাকায় সেখানে ছত্রাক জন্মানোর আশঙ্কাও বেশি। দেয়ালের কোণ, টাইলসের ফাঁক, পর্দা, মেঝে এবং পানি বের হয়ে যাওয়ার জায়গা নিয়মিত পরিষ্কার করা দরকার।
তাসমিয়া জান্নাত পরামর্শ দেন, “ঘরের অতিরিক্ত আর্দ্রতা কম রাখা এবং বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করলে ছত্রাকের জন্মানোর সম্ভাবনা কমে। রান্নাঘর ও বাথরুমে বাইরের দিকে বাতাস বের করে দেয়, এমন পাখা ব্যবহার করাও সহায়ক হতে পারে।”
দেয়াল বা ছাদে স্যাঁতসেঁতে দাগ
দুর্গন্ধের কারণ সব সময় আবর্জনা বা নোংরা কাপড় নাও হতে পারে। দেয়াল, ছাদ, জানালার আশপাশ কিংবা পাইপের কাছে পানি চুইয়ে পড়লে সেখানে আর্দ্রতা জমতে পারে।
আর সেই আর্দ্রতা দীর্ঘদিন থাকলে ছত্রাক জন্মানোর সুযোগ তৈরি হয়।
তাই ঘরে হঠাৎ দীর্ঘস্থায়ী স্যাঁতসেঁতে গন্ধ পাওয়া গেলে শুধু সুগন্ধি ছড়িয়ে বিষয়টি ঢেকে না রেখে- দেয়াল, ছাদ ও পানির পাইপের আশপাশ পরীক্ষা করা উচিত।
পরিষ্কার করার সময়ের একটি ভুল
ঘরের দুর্গন্ধ দূর করতে গিয়ে একসঙ্গে বিভিন্ন ধরনের পরিষ্কার করার উপাদান মেশানো বিপজ্জনক হতে পারে। বিশেষ করে ব্লিচের সঙ্গে অন্য কোনো পরিষ্কার করার উপাদান মেশানো উচিত নয়। এতে ক্ষতিকর গ্যাস তৈরি হতে পারে বলেন এই বিশেষজ্ঞ।
ছত্রাক পরিষ্কার করার প্রয়োজন হলে ঘরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে এবং পরিষ্কার করার সময় হাত, চোখ ও নাক-মুখ সুরক্ষিত রাখার বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।
আরও পড়ুন
ফ্রিজে গন্ধ হওয়ার কারণ ও প্রতিকার