Published : 10 Aug 2026, 05:25 PM
অনেকেই ভাবেন, বয়ঃসন্ধিকাল বা কৈশোর পার হয়ে গেলে ব্রণের যন্ত্রণাদায়ক অধ্যায়টি বুঝি জীবন থেকে স্থায়ীভাবে বিদায় নেয়। তবে বাস্তব পরিসংখ্যান বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা।
৩০, ৪০ কিংবা তার চেয়ে বেশি বয়সেও অনেকের মুখে, বিশেষ করে গাল ও চোয়ালের চারপাশে অনবরত লালচে, শক্ত ও ব্যথাময় ব্রণ দানা বাঁধতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘হরমোনাল অ্যাকনি’ বা ‘হরমোনজনিত ব্রণ’।
হেল্থলাইন ডটকম-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের ক্ষেত্রে এই হরমোনজনিত ব্রণের প্রকোপ বেশি দেখা যায়।
ইউনিভার্সিটি অফ অ্যালাবামা’র ‘স্কুল অফ মেডিসিন’-এর করা ২০০৮ সালের গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সি প্রায় ৫০ শতাংশ নারী এবং ৪০ থেকে ৪৯ বছর বয়সি প্রায় ২৫ শতাংশ নারী দীর্ঘমেয়াদী ব্রণের সমস্যায় ভোগেন।
হরমোনজনিত ব্রণ হওয়ার কারণ
মার্কিন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ এবং ‘স্কিনটেলিজেন্ট’ বইয়ের লেখক ডা. নাতালিয়া স্পিয়ারিংস ব্যাখ্যা করেন, “মানুষের মাথার ত্বক ও মুখের সেবাম বা তেলের গ্রন্থিগুলো যখন ‘অ্যান্ড্রোজেন’ নামক এক ধরনের হরমোনের প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়ে ওঠে, তখনই হরমোনাল অ্যাকনি বা ব্রণ দেখা দেয়।”
এই অ্যান্ড্রোজেন হরমোনটি, তেল গ্রন্থিগুলোকে আকারে বড় করে এবং অতিরিক্ত পরিমাণে চর্বি বা সেবাম ক্ষরণ বাড়ায়, যা লোমকূপ বন্ধ করে দেয়।
নারীদের ক্ষেত্রে মাসিকের পূর্ববর্তী সময়, গর্ভাবস্থা এবং মেনোপজ বা স্থায়ীভাবে পিরিয়ড বন্ধ হওয়ার দিনগুলোতে হরমোনের তীব্র ওঠানামার কারণে এই ব্রণের সমস্যা দেখা দেয়।
এছাড়া অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা স্ট্রেস, অনিদ্রা, ভুল ডায়েট বা খাদ্যাভ্যাস এবং প্রসাধনীর অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার এই ব্রণকে আরও বেশি গুরুতর করে তোলে।
হরমোনজনিত ব্রণ দূর করার নিয়ম
প্রাপ্তবয়স্কদের এই ব্রণ নিয়ন্ত্রণে ডা. নাতালিয়া ৪টি নিয়ম অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন।
ত্বক পরিচর্যার রুটিন কমানো
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সারদের দেখে অনেকেই ৭ থেকে ১০টি পণ্য বা সেরাম দিয়ে জটিল ত্বক পরিচর্যার রুটিন তৈরি করেন।
ডা. নাতালিয়া সতর্ক করে বলেন, “অতিরিক্ত প্রসাধনীর ব্যবহার ত্বককে গুরুতরভাবে খসখসে ও উত্তেজিত করে তোলে, যা ব্রণের বংশবৃদ্ধি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।"
হরমোনাল ব্রণের সময় পার্লার ফেইশল পুরোপুরি বর্জন করা উচিত। এর পরিবর্তে রুটিনকে একদম সাধারণ বা ন্যূনতম ৩টি উপাদানে নামিয়ে আনা উপকারী— একটি মৃদু ক্লিনজার, সাধারণ হালকা ময়েশ্চারাইজার এবং ভালো সানস্ক্রিন।
একবারে কেবল একটি পণ্য ব্যবহার
দোকানে একই সঙ্গে স্যালিসিলিক অ্যাসিড, বেনজাইল পারক্সাইড ও অ্যাজেলেইক অ্যাসিডের মতো অনেক উপাদান কিনতে পাওয়া যায়। তবে একসঙ্গে অনেকগুলো ‘অ্যাক্টিভ’ উপাদান মুখে মাখা ভুল।
ডা. নাতালিয়ার মতে, “প্রথমে খুব সাধারণ এবং ত্বকের জন্য মৃদু ২ শতাংশ সমৃদ্ধ স্যালিসিলিক অ্যাসিড সম্বলিত কোনো একটি লোশন বা জেল বেছে নেওয়া নিরাপদ।
এটি একটানা কয়েক সপ্তাহ ব্যবহার করে দেখতে হবে যে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে কি না।
জীবনযাত্রায় পরিবর্তন ও কোমল পানীয় পরিহার
শুধুমাত্র বাহ্যিক ক্রিম মাখাই হরমোনাল ব্রণ সারানোর জন্য যথেষ্ট নয়, এর জন্য শরীরের ভেতর থেকে হরমোনের যত্ন নেওয়া প্রয়োজন।
তাই খাবারে অতিরিক্ত রিফাইনড সুগার বা প্রক্রিয়াজাত চিনি, জাঙ্ক ফুড এবং অ্যালকোহল পুরোপুরি বর্জন করা আবশ্যক।
মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে মেডিটেইশন বা ধ্যান করা, রাতে অন্তত ৭ ঘণ্টার গভীর ঘুম নিশ্চিত করা এবং দেহের দূষিত পদার্থ দূর করতে সারাদিনে পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি পান করা প্রয়োজন।
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ও হরমোনাল বার্থ কন্ট্রোলের ভূমিকা
যদি কোনো সাধারণ ঘরোয়া বা দোকানের উপাদানে ব্রণ ভালো না হয় এবং এটি জীবনযাত্রার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তবে দেরি না করে একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা গুরুতর ব্রণের জন্য মুখের কড়া মলম (যেমন রেটিনয়েড) বা হরমোন ব্লকার ওষুধ (যেমন স্পাইরোনোল্যাকটোন) দিয়ে থাকেন।
এছাড়া চিকিৎসকের নিরাপদ পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সমন্বিত ‘বার্থ কন্ট্রোল পিল’ বা গর্ভনিরোধক বড়ি হরমোনের ভারসাম্য ঠিক করে ব্রণ নিরাময়ে হিসেবে কাজ করতে পারে।
মানসিক আত্ম-গ্রহণযোগ্যতা
ভারতীয় বংশদ্ভূত মার্কিন বডি ইমেজ শিক্ষাবিদ ও গবেষক অনুপা রোপার, একই প্রতিবেদনে মনস্তাত্ত্বিক সত্য তুলে ধরেন।
তার মতে, “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কৃত্রিম ফিল্টার করা ও নিখুঁত সম্পাদিত ছবির দিকে তাকিয়ে নিজের সাধারণ হরমোনাল ব্রণযুক্ত ত্বক নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগা বা লজ্জাবোধ করা একদম অনুচিত।”
হরমোনজনিত ব্রণ শরীরের একটি প্রাকৃতিকভাবে ঘটে যাওয়া জৈবিক প্রতিফলন, কোনো স্থায়ী কদর্যতা নয়। তাই নিজের ত্বকের বাস্তব রূপকে মেনে নিয়ে শান্ত মনে, চিকিৎসা যত্ন নেওয়া হবে উপকারী।
আরও পড়ুন