সারাদিন দাঁত-মুখ শক্ত করে রাখার কুফল
মাথাব্যথার একটা কারণ হতে পারে সারাক্ষণ অবচেতনে কাঁধ চোয়াল শক্ত করে রাখা।
কাজের টেবিলে বসে হঠাৎ খেয়াল হল, চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, কাঁধ দুটি ভীষণ টানটান এবং মনের ভেতর এক অদ্ভুত খিটখিটে মেজাজ বা অস্থিরতা কাজ করছে।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় মানসিক চাপের মুখে অবচেতনে অনবরত নিজের শরীর, পেশী ও চোয়াল শক্ত করে রাখার এই বিশেষ রক্ষণাত্মক মানসিক প্রবণতাকে বলা হয় ‘ব্রেসিং’।
সাধারণ মানুষ অনেক সময় একে হাড় বা পেশির সাধারণ ক্লান্তি মনে করে ভুল করেন। তবে সোমাটিক থেরাপিস্ট ও গবেষকদের মতে, এই ব্রেসিং আসলে কোনো সাধারণ শারীরিক সমস্যা নয়; বরং এটি হল তীব্র মানসিক চাপের কারণে মস্তিস্কের স্নায়ুতন্ত্র অনবরত ‘হাইপার-ভিজিল্যান্ট’ বা অতি-সক্রিয় ‘ফাইট-অর-ফ্লাইট মোডে’ আটকে থাকার বিপজ্জনক অবস্থা।
‘রিয়েলসিম্পল ডটকম’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে, যুক্তরাষ্ট্রের সোমাটিক নেচার থেরাপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাইকোথেরাপিস্ট কেটি অ্যাসমাস বলেন, “ক্ষতিকর ব্রেসিংয়ের এই বাজে অভ্যাস মনের শান্তি কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি শরীরে দীর্ঘমেয়াদী ক্লান্তি ও তীব্র মাথা ব্যথার সৃষ্টি করে।”
মস্তিস্কের মহাসড়কে জটিলতার যন্ত্রণা
সোমাটিক ইএমডিআর বিশেষজ্ঞ ও নিবন্ধিত মার্কিন সাইকোথেরাপিস্ট লিন জোন্স ব্যাখ্যা করেন, “মানুষের স্নায়ুতন্ত্র মূলত একটি বিশাল তথ্য মহাসড়ক বা ‘ইনফরমেশন সুপারহাইওয়ে’র মতো কাজ করে। এটি প্রতি সেকেন্ডে লক্ষ লক্ষ তথ্য প্রক্রিয়া করে শরীরকে নিরাপদ রাখার জন্য অনবরত চারপাশ নজরদারীর মধ্যে রাখে।
যখন মানুষের জীবনে অতিরিক্ত মানসিক বা শারীরিক ধকল আসে, তখন মস্তিস্কের ‘প্রসেসর’ পুরোপুরি পরিপূর্ণ হয়ে যায়।”
কুণ্ডলী পাকানো স্প্রিংয়ের ফাঁদ: মস্তিস্ক তখন জীবনের গতি ও তীব্র মানসিক চাপের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে শরীরকে সবসময় এক অদৃশ্য বিপদের আশঙ্কায় ‘যদি কিছু খারাপ ঘটে’ মেজাজে আটকে রাখে।
এটি অনেকটা কুণ্ডলী পাকানো একটি শক্ত স্প্রিংয়ের মতো শরীরকে সবসময় ‘ব্রেসিং’ বা শক্ত করে ধরে রাখে।
মস্তিস্কের নিউরন মূলত আবেগগত চাপ এবং শারীরিক আঘাতের চাপের মধ্যে কোনো পার্থক্য বোঝে না, তাই জীবনের সব ঝামেলা সে একই ঝুঁকির বাক্সে জমা করে শরীরকে অবশ করে ফেলে।
দীর্ঘমেয়াদি ব্রেসিংয়ের ৩টি প্রধান কারণ
শৈশবের দুঃখবোধ: কেটি অ্যাসমাস বলেন, “ব্রেসিংয়ের এই ক্ষতিকর অভ্যাস অধিকাংশ মানুষের জীবনে খুব অল্প বয়সে বা শৈশবে তৈরি হয়। ছোটবেলায় যেসব শিশু এমন এক অশান্ত পরিবেশে বড় হয় যেখানে তারা নিজের শারীরিক, মানসিক বা মৌখিক সীমানা রক্ষা করতে পারে না, তাদের শরীর আত্মরক্ষার জন্য এক অবচেতন কৌশল তৈরি করে নেয়।”
তিনি আরও বলেন, “তারা ভয়ে দম আটকে রাখে, পেশি শক্ত করে এবং পরিবেশের আঘাত থেকে বাঁচতে শরীরকে কুঁকড়ে ‘ব্রেস’ করে ফেলে। বড় হওয়ার পর এটিই তাদের জীবনের স্থায়ী অভ্যাসে পরিণত হয়।”
টাইমার মেথডের মাধ্যমে ব্রেসিং সনাক্তকরণ: ব্রেসিংয়ের বড় সমস্যা হল, মানুষ নিজের অজান্তেই এটি সারাদিন করতে থাকে যতক্ষণ না তীব্র মাথাব্যথা বা কাঁধের পেশি অবশ হয়ে ব্যথা শুরু হয়। এর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা হল, কাজের মাঝখানে মোবাইলে একটি নির্দিষ্ট সময়ের টাইমার বা অ্যালার্ম সেট করে রাখা।
টাইমারটি বাজার সঙ্গে সঙ্গে নিজের বসার ভঙ্গি বা ‘বডি ল্যাঙ্গুয়েজ’ খেয়াল করতে হবে। বুক ভরে শ্বাস না নিয়ে কি কেবল বুকের উপরিভাগ দিয়ে অগভীর শ্বাস নেওয়া হচ্ছে, নাকি চোয়াল কামড়ে ধরে কাজ করা হচ্ছে? এটা সনাক্ত করাই মগজকে শিথিল করার প্রাথমিক নিয়ম।
অতিরিক্ত মনোযোগ: যখন ল্যাপটপে কাজ বা কোনো নির্দিষ্ট ক্ষতিকর চিন্তায় দীর্ঘক্ষণ অতিরিক্ত চিন্তা করা বা নজর দেওয়া হলে, মস্তিস্কের ‘ফ্রন্টাল কর্টেক্স’ ধরে নেয় শরীর কোনো বড় যুদ্ধে লিপ্ত।
এই অতিরিক্ত মনোযোগ ধমনীর রক্ত সঞ্চালনকে ধীর করে চোখের দৃষ্টিকে সংকুচিত করে দেয়। ফলে মনের ভেতর তীব্র বিষণ্ণতা, দুশ্চিন্তা এবং খিটখিটে মেজাজ উপচে পড়ে।
স্নায়ুতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পন্থা
শরীর ও মস্তিস্ককে এই তীব্র টানটান অবস্থা থেকে বের করে এনে প্রশান্তি ও শিথিলতার নতুন পথ তৈরি করতে মনোবিজ্ঞানিরা ৩টি ব্যায়ামের পরামর্শ দেন।
দীর্ঘশ্বাসের সূত্র: ‘ব্রেসিং’ বা শরীর টানটান অনুভব হওয়ামাত্রই নাক দিয়ে পরপর দুটি দ্রুত ও ছোট শ্বাস নিতে হবে, এবং মুখ দিয়ে একটি দীর্ঘ ও সম্পূর্ণ বাতাস ছাড়ার দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হবে। এটি মস্তিস্কের অ্যালার্ম সিস্টেম বা অ্যামিগডালাকে নিমেষেই শান্ত করে স্নায়ুকে শিথিল করে দেয়।
পেরিফেরাল ভিশন বা দৃষ্টির পরিধি বাড়ানো: ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে ঘরের চারপাশে, জানালার বাইরে বা আকাশের দিকে তাকাতে হবে। দৃষ্টির এই উদারতা মস্তিস্ককে সংকেত পাঠায় যে, তার চারপাশে কোনো তাৎক্ষণিক বিপদ নেই, ফলে পেশি আলতো হয়ে শিথিল হয়।
জেন্টাল উইগলিং বা শরীর ঝাঁকানো: মনের ভেতর তীব্র দুশ্চিন্তা বা আতঙ্ক দানা বাঁধলে নিজের হাত, পা এবং পুরো শরীরকে কুকুরের মতো আলতো করে কিছুক্ষণ ঝাঁকাতে বা ‘উইগলিং’ করতে হবে।
এই ঝাঁকুনি পেশির ভেতর জমে থাকা অপ্রয়োজনীয় ক্ষতিকর ‘শক্তি’ প্রাকৃতিকভাবে শরীর থেকে বের করে দেয়।
আরও পড়ুন
