‘ডুমজবিং’: অপছন্দের চাকরিতে আটকে থাকার অদৃশ্য ফাঁদ
অপছন্দের চাকরি থেকে বাঁচতে লক্ষ্যহীনভাবে গণহারে সিভি পাঠানো বা 'ডুমজবিং' আত্মবিশ্বাস ও কর্মজীবনের ক্ষতি করে।
চাকরি ভালো লাগছে না, কর্মক্ষেত্রে প্রতিদিন বাড়ছে বিরক্তি বা বর্তমান বেতন ও কাজের পরিবেশ নিয়ে জমছে অসন্তোষ। এমন পরিস্থিতিতে নতুন চাকরির খোঁজ শুরু করাই স্বাভাবিক।
তবে সেই খোঁজ যদি প্রতিদিন অসংখ্য চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখা, যাচাই না করেই জীবনবৃত্তান্ত পাঠানো এবং উত্তর পাওয়ার আশায় অপেক্ষা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তাহলে তা উল্টো হতাশাই বাড়াতে পারে।
কারণ চাকরি বদলানোর জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেই চেষ্টা যদি কাঙ্ক্ষিত ফল না আনে, তাহলে একসময় নিজের যোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন জাগতে পারে।
কর্মজীবনের এই অভ্যাসকে বলা হচ্ছে ‘ডুমজবিং’। অর্থাৎ হতাশা ও অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পেতে কোনও বাছবিচার ছাড়াই একের পর এক চাকরির আবেদন করা।
বাইরে থেকে মনে হতে পারে, অনেক আবেদন পাঠানো মানেই চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ানো। তবে নিজের দক্ষতা, আগ্রহ ও পরিকল্পনার সঙ্গে মিল নেই— এমন পদে বারবার আবেদন করলে সময় ও শক্তি দুটোই নষ্ট হতে পারে।
বরং যে চাকরি নিজের জন্য উপযুক্ত, সেটির আবেদন ভালোভাবে তৈরি করার সুযোগ কমে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কর্মজীবন কৌশল ও কর্মী পরামর্শ প্রতিষ্ঠান ‘দ্য ট্যালেন্ট ট্রিহাউস’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী গোল্ডা ইনকুইটো রিয়েলসিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে, এই অভ্যাসকে চাকরির জন্য ব্যাপক হারে আবেদন করার হতাশাজনক চক্র হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
তার মতে, “অনেকে জীবনবৃত্তান্ত পাঠিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনও উত্তর না পেলে একসময় কোন প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেছেন, সেটিও মনে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে চেষ্টা চলতে থাকলেও অগ্রগতির অনুভূতি তৈরি হয় না।”
এই অভ্যাসে আটকে পড়ার কারণ
চাকরির জগতে প্রতিযোগিতা, সামনের দিন নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং কর্মক্ষেত্রে অসন্তোষ উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইনেট পাওয়ার এলএলসি’-এর প্রধান নির্বাহী এবং ‘ট্যাবু টপিকস’ বইয়ের লেখক নিকোল জনস্টনের মতে, “চাকরির অনিশ্চয়তা হতাশা তৈরি করতে পারে। আবার নতুন চাকরি চাইলেও থাকতে পারে পরিবর্তনের ভয়।
এছাড়া বারবার আবেদন করেও সাড়া না পেলে হয়ত কোনও চাকরির জন্যই যথেষ্ট যোগ্য নন এমন ভাবনা আসা স্বাভাবিক। এতে আত্মবিশ্বাস কমে যায় এবং সম্ভাব্য সুযোগগুলোও ছোট হয়ে আসে।”
তাই নির্বিচারে চাকরির আবেদন সময় ও শক্তি নষ্ট এবং হতাশা বাড়াতে পারে। এমন কি অন্যদের চাকরি পাওয়ার খবর শুনে নিজের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতাও তৈরি হয়। তখন চাকরি খোঁজা হয়ে ওঠে উদ্বেগের আরেকটি উৎস।
ব্যস্ত থাকলেও যে কারণে এগোনো হয় না
একটি চাকরির জন্য আবেদন করলেই যে সাক্ষাৎকারের ডাক আসবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বিশেষ করে, নিজের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিল নেই, এমন পদে আবেদন করলে নিয়োগদাতার নজরে আসার সম্ভাবনা কমতে পারে।
প্রতিবার প্রত্যাখ্যান বা উত্তর না পাওয়ার অভিজ্ঞতা জমতে থাকলে পরবর্তী আবেদনে আগ্রহ ও মনোযোগও কমে যেতে পারে।
ফলে উপযুক্ত চাকরির জন্য ভালোভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার বদলে আবেদনসংখ্যা বাড়ানোই প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।
এভাবে চলতে থাকলে কর্মজীবনে নতুন দক্ষতা শেখা, নিজের কাজের মান উন্নত করা, পদোন্নতির সুযোগ খোঁজা বা বর্তমান প্রতিষ্ঠানে বেতন বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করা হয় না।
ডুমজবিংয়ের চক্র ভাঙার উপায়
অনবরত লক্ষ্যহীন আবেদন করার অভ্যাস দূর করতে বিশেষজ্ঞরা কিছু সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিয়েছেন।
লক্ষ্য স্থির করা: এই চক্র থেকে বের হওয়ার প্রথম ধাপ হল নিজের লক্ষ্য পরিষ্কার করা। শুধু ‘বর্তমান চাকরি ছেড়ে দিতে চাই’, এটুকু জানলেই যথেষ্ট নয়। পরে চাকরিতে কী ধরনের কাজ করতে চাই, কোন দক্ষতা কাজে লাগাতে চাই, কী শিখতে চাই এবং কোন পরিবেশে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ হবে, সেগুলোও ভেবে দেখা দরকার।
এক্ষেত্রে চাকরির বিজ্ঞপ্তি খুঁজে ভালো লাগবে এমন কাজ বাছাই করা যেতে পারে এবং কোন দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে, তা বোঝা যেতে পারে। এরপর প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হয়।
অন্যদিকে জীবনবৃত্তান্তও প্রতিটি চাকরির চাহিদা অনুযায়ী সাজানো দরকার। একই জীবনবৃত্তান্ত সব প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর বদলে সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও অর্জনগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরা জরুরি।
এতে নিয়োগদাতার বুঝতে সুবিধা হবে, কেন আবেদনকারী এই পদের জন্য উপযুক্ত। তবে অভিজ্ঞতা বা যোগ্যতা সম্পর্কেও অতিরঞ্জিত তথ্য দেওয়া উচিত নয়।
আবেদনের সময় নির্দিষ্ট: চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখার জন্য সারাদিন ব্যয় না করে নির্দিষ্ট সময় ঠিক করা যেতে পারে। উদ্দেশ্যহীনভাবে সময় কাটানোর বদলে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট মনোযোগ দিয়ে কাজ করা যেতে পারে। এই সময়ে উপযুক্ত চাকরি খোঁজা, প্রয়োজনীয় দক্ষতা যাচাই করা কিংবা প্রতিষ্ঠানের কাজ সম্পর্কে জানা উচিত।
সপ্তাহে পাঁচটি পর্যন্ত উপযুক্ত চাকরিতে আবেদন করার কথা বলেছেন, বিশেষজ্ঞরা। আর প্রতিটি আবেদনের সঙ্গে জীবনবৃত্তান্ত ও আবেদনপত্র সেই পদের উপযোগী করে তৈরি করতে হবে।
পাশাপাশি পছন্দের প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে পেশাগত যোগাযোগ গড়ে তোলার চেষ্টা করা যেতে পারে।
যোগাযোগ বাড়ানো: চাকরির সুযোগ সব সময় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সামনে আসে না। পরিচিত সহকর্মী, সাবেক সহকর্মী বা একই পেশায় কাজ করা ব্যক্তিদের কাছ থেকেও নতুন সুযোগের খবর পাওয়া যেতে পারে।
তাই চাকরির প্রয়োজন দেখা দেওয়ার আগেই পেশাগত সম্পর্ক গড়ে তোলা ভালো।
পরিচিতদের কাজের খোঁজ নেওয়া, কাজের প্রশংসা করা কিংবা নিজের আগ্রহের ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা করাও সহায়ক হতে পারে।
