হ্যানসের সৌভাগ্য
পুকুরের ধারে হ্যানস সাবধানে পাথরটা রাখল। কিন্তু যেই ঝুঁকে পুকুরের পানি খেতে গেছে, পাথরটার কথা বেমালুম ভুলে গেলো।
হাঁটতে হাঁটতে তারপর হ্যানসের সঙ্গে দেখা হলো গ্রামের এক লোকের যে তার হাতে চমৎকার একটা রাজহাঁস নিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। গ্রামের লোকটা হ্যানসকে দাঁড় করিয়ে সময় জানতে চাইল।
কথায় কথায় হ্যানস তাকে নিজের সৌভাগ্যের গল্প শোনাল। তাকে বলল কী করে পরপর এতগুলো জিনিস বিনিময়ের সময়ে অদ্ভুতভাবে সে জিতেছে। গ্রামের লোকটি বলল যে সে তার রাজহাঁসকে নিয়ে চার্চে যাচ্ছে রাজহাঁসটির নাম রাখতে। ভেবে দেখ, লোকটি হাত দুলিয়ে বলল, মাত্র আট সপ্তাহেই আমার হাঁসটা কত্ত ওজনদার হয়ে গেছে! পরে একে রোস্ট করে খাওয়ার জন্য যে-ই নিয়ে যাবে, তার অনেক লাভ হবে। এত দেখেশোনে একে বড়ো করেছি, কাটলে অনেক মাংস আর প্রচুর চর্বি পাওয়া যাবে।
একদম ঠিক বলেছ, হ্যানস রাজহাঁসটিকে নিজের হাতে নিয়ে ওজন আন্দাজ করার চেষ্টা করল। তবে জানো, আমার শূকরটার ওজনও কিন্তু কম না।
শূকরটার কথা বলতে না বলতেই গ্রামের লোকটির মুখটা শুকিয়ে গেল। অবশ্য সে হ্যানসের সঙ্গে একমত হওয়ার ব্যাপারে মাথা ঝোঁকাল। তারপর চমকে উঠে বলল, সর্বনাশ! শোনো, আমার তো মনে হয় তোমার শূকরটা তোমাকে ডোবাবে। আমি কিছুক্ষণ আগে যে গ্রামটা পেরিয়ে এসেছি, সেখানে গ্রামের অবস্থাপন্ন এক লোকের একটা শূকর চুরি হওয়ার কথা শুনলাম। আমার তো মনে হয় এটাই সেই শূকরটা। তাই, যখন থেকে এটা তোমার সঙ্গে দেখছি তখন থেকেই তোমার কী পরিণতি হতে পারে ভেবে ভয় পাচ্ছি। একবার যদি তারা তোমাকে ধরে ফেলে, তবে আর কিছু করুক না-করুক, অন্তত তোমাকে ঘোড়ার পানি খাওয়ার পুকুরটার মধ্যে ছুড়ে ফেলে দেবেই দেবে।
বেচারা হ্যানস ভয়ে-আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। শোনো, ভালো মানুষ, তুমি আমাকে এই বিপদ থেকে রক্ষা কর, হ্যানস অনুনয় করে উঠল। তুমি এই অঞ্চলটা আমার চেয়ে নিশ্চয় অনেক ভালো করে চেন। তাই এই শূকরটাকে নিয়ে আমাকে তোমার হাঁসটা দিয়ে দাও না, ভাই।
আমার অবশ্য এই চমৎকার রাজহাঁসটার দাম হিসেবে অনেক ভালো কিছু পাওয়ার কথা, গ্রামের লোকটি বলল। যাই হোক, তুমি যখন এমন বিপদে পড়েছ, তোমার সঙ্গে তো আর নিষ্ঠুর হতে পারি না। লোকটি কথা শেষ করে শূকরের দড়িটা হাতে নিল আর রাস্তার ধার ঘেঁষে ধীর পায়ে চলে গেল।
হ্যানস নিশ্চিন্ত মনে রাজহাঁসটা কোলে নিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিল। যে যাই বলুক, প্রত্যেকটি বিনিময়ে আমারই সবচেয়ে বেশি লাভ হয়েছে। হ্যানস মনে মনে ভাবল। প্রথমে আমি পাব বিশাল এক রাজহাঁসের রোস্ট। তারপর এই হাঁস থেকে যে চর্বি বেরোবে সেটা আগামী ছয় মাসের জন্য আমার তেলের অভাব মেটাবে। তাছাড়া, হাঁসটার গায়ের ধবধবে সাদা পালকগুলো আমি আমার বালিশের মধ্যে পুরে দেব। কোনো নড়াচড়া ছাড়াই বালিশের উপর মাথাটা রাখতে পারলে আমি আরাম করে ঘুমাব। আর তা দেখে আমার মা কতই না খুশিই হবে!
হাঁটতে হাঁটতে হ্যানস যখন শেষ গ্রামটাতে এসে উপস্থিত হলো, দেখল এক ছুরি ধারওয়ালা তার মেশিনের চাকা ঘুরিয়ে মহাসুখে ছুরি ধার করছে আর গান গাইছে-
‘কী আনন্দে ঘুরি আমি এই বাগানে এই পাহাড়ে
হালকা কাজে মন ভরে থাকি আরামে আহা রে
সারা দুনিয়া আমার ঘর নেই কেউ পর
আমার মতো সুখী কেউ আর আছে নাকি বল?’
হ্যানস তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। শেষে বলল, তোমাকে কাজের মধ্যে এত খুশি দেখাচ্ছে, এই কাজ করে তোমার দিন নিশ্চয় ভালোই চলে।
ঠিক ধরেছ, লোকটি বলল। আমার ব্যবসাটা হলো গিয়ে সোনার খনির মতো। ভালোভাবে ছুরি-চাকুতে ধার দিতে জানলে কখনো ফাঁকা পকেট হাতড়াতে হয় না, বুঝলে? কিন্তু তুমি এত সুন্দর একটা রাজহাঁস কোথায় পেলে বলো তো?
আমি এটা কিনিনি। একটা শূকরের পরিবর্তে রাজহাঁসটা পেয়েছি।
আর সেই শূকরটা কোথায় পেয়েছিলে?
একটা গরুর বদলে।
কিন্তু গরুটাইবা পেলে কোথায়?
একটা ঘোড়ার পরিবর্তে।
আরে বাবা, ঘোড়াটা পেয়েছিলে কোথায়?
আমার মাথার সমান বড়ো একতাল রুপো ছিল, সেটা দিয়ে ঘোড়াটাকে পেয়েছিলাম।
আর সেই বিশাল রুপোটা কোত্থেকে এলো, শুনি?
সেটা? আমি যে মালিকের কাছে টানা সাত বছর খাটাখাটুনি করলাম, তার বদলে তিনি দিলেন।
দুনিয়ায় তুমি তো এ পর্যন্ত ভালোই উন্নতি করেছ দেখছি, ছুরি ধারওলা হ্যানসকে বলল, এখন শুধু যদি যখনই পকেটে হাত দাও তখনই সেখানে টাকা পাও, তাহলেই তোমার ভবিষ্যৎ এক্কেবারে ফকফকা।
খুবই সত্যি কথা। কিন্তু সেই ব্যবস্থা আমি কী করে করব?
আমার মতোই তোমার ছুরি ধার দেওয়ার কাজ শুরু করা উচিত, লোকটি বলল। তোমার লাগবে কেবল ছুরি ধার দেওয়ার পাথরটা। এটা থাকলে বাকি সবকিছু ধীরে ধীরে এমনিতেই তোমার হাতে চলে আসবে। আর ধরো, আমার কাছেই ঠিক সেরকম একটা জিনিস আছে, এই তো এখানেই। সেটার জন্য তোমার কাছে একটা রাজহাঁসের চেয়ে বেশি দাম আমি মোটেই চাইব না। তুমি কি রাজহাঁসের বদলে পাথরটা কিনবে?
এটা কোনো প্রশ্ন হলো? উত্তেজিত হ্যানস জবাব দিল। পকেটে হাত দিলেই যদি সেখানে টাকা কড়কড় করতে থাকে, তবে আমি তো পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ হয়ে যাবো! এর চেয়ে বেশি আর আমি কী চাইতে পারি? এই নাও আমার রাজহাঁসটা।
আর এই নাও ছুরি ধার দেবার পাথর, রাস্তার ধার থেকে সাধারণ খরখরে একটা পাথর উঠিয়ে হ্যানসের হাতে দিতে দিতে ছুরি ধারওলা বলল।
এটা হলো সবচেয়ে কাজের একটা পাথর। এটা দিয়েই প্রথমে শুরু কর। করতে করতে এমন অভ্যাস হয়ে যাবে যে দেখবে এটা দিয়ে তুমি চাইলে নখও কাটতে পারবে।
হ্যানস লোকটির হাত থেকে পাথরটা নিয়ে নিশ্চিন্ত মনে হাঁটা দিলো। তার চোখ-মুখ তখন আনন্দে উজ্জ্বল। খুশি খুশি গলায় সে নিজেকে বলল, আমি নিশ্চয় ভীষণ এক সৌভাগ্য নিয়ে জন্মেছিলাম। যখন যা-ই চাই না কেন, তা নিজে নিজেই আমার কাছে এসে উপস্থিত হয়। সারাদিন বিরতিহীন চলতে চলতে হ্যানস ততক্ষণে ক্লান্ত হয়ে পড়ল। খিদের জ্বালায় সে কষ্টও পাচ্ছিল, কারণ গরু পাওয়ার খুশিতে নিজের শেষ পয়সাটাও উড়িয়ে দিয়েছিল এক রেস্তোরাঁয়। তখন তার এমন অবস্থা যে সে আর এক পা-ও এগোতে পারবে না। হাতের পাথরটাই তাকে মারাত্মক ক্লান্ত করে দিচ্ছিল। আর তাই হ্যানস তখন একটা পুকুরের পাশে পাথরটা রেখে পুকুর থেকে পানি খেয়ে খানিকটা জিরিয়ে নেবে বলে ভাবল।
পুকুরের ধারে হ্যানস সাবধানে পাথরটা রাখল। কিন্তু যেই ঝুঁকে পুকুরের পানি খেতে গেছে, পাথরটার কথা বেমালুম ভুলে গেলো। আর তখন তার হাতের ধাক্কায় পাথরটা গেল পুকুরে পড়ে। পানিতে পড়া মাত্রই পাথরটা পুকুরের নিচে তলিয়ে যেতে লাগল। স্বচ্ছ পানিতে পাথরটাকে যখন টুপ করে ডুবে যেতে দেখল, হ্যানস প্রথমে বুঝল না হাসবে না কাঁদবে। খানিক পরে হাঁটু গেড়ে সেখানেই বসে পড়ল আর চোখের পানিতে ভেসে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাল তার একমাত্র সম্পদ ওই ভারি আর কুৎসিত পাথরটা কেড়ে নেবার জন্য। হাত একেবারে হালকা এখন।
বাহ্! কত্ত সুখী এখন আমি। চিৎকার করে উঠল হ্যানস। আমার মতো সৌভাগ্য ক’জনের হয়? শেষ পর্যন্ত হ্যানস উঠে দাঁড়াল। নিজেকে তখন খুব হালকা আর উৎফুল্ল লাগল তার, যেন যাবতীয় ঝামেলা থেকে মুক্ত হতে পেরেছে। তারপর মায়ের বাড়ি পৌঁছানো পর্যন্ত মহানন্দে হাঁটতে লাগল সে।
