২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩

কাউ-টাউন: যে শহরের মানুষ একদিন ‘গরু’ হয়েছিল

কাউরামাপ শহরের সেই গিনেস রেকর্ড আজও অক্ষুণ্ন রয়ে গেছে।

কাউ-টাউন: যে শহরের মানুষ একদিন ‘গরু’ হয়েছিল

ছবি: এবিসি নিউজ

কিডজ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 26 Oct 2026, 01:47 AM

Updated : 26 Oct 2026, 01:47 AM

দক্ষিণ-পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার মার্গারেট রিভার অঞ্চলের শান্ত, সবুজ আর চোখজুড়ানো এক জনপদের নাম ‘কাউরামাপ’। বহিরাগত পর্যটক কিংবা দূর-দূরান্ত থেকে আসা পথচারীদের কাছে এটি কেবলই ‘কাউ-টাউন’ বা ‘গরুর শহর’। শহরের প্রধান সড়কে পা রাখলেই চোখে পড়বে দুধেল গাভীর নানা রঙের বাস্তবসম্মত মূর্তি—কেউ হয়তো ফুটপাতে ঘাস চিবাচ্ছে, কেউ দোকানের ঝুলবারান্দার নিচে দাঁড়িয়ে, আবার কোনোটি পার্কের বেঞ্চের পাশে একমনে দাঁড়িয়ে আছে।

অনেকেই মনে করেন, ২০১৪ সালে ১ হাজার ৩৫২ জন মানুষের গরুর পোশাক পরে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস ভাঙার ঘটনাটি ছিল স্রেফ একদিনের সস্তা পাবলিসিটি স্টান্ট বা প্রচারণার উপায়। কিন্তু সত্যটি আসলে এর চেয়েও গভীর, সমৃদ্ধ ও রঙিন। এই রেকর্ড গড়ার পেছনে ছিল শত বছরের পুরনো কৃষি ঐতিহ্য, নিজের শিকড়কে আঁকড়ে ধরে রাখার ব্যাকুলতা এবং গ্রামীণ এক সম্প্রদায়ের নিজস্ব আত্মপরিচয় তুলে ধরার অনন্য গল্প।

আজ যা ‘গরুর শহর’ হিসেবে পরিচিত, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তা কিন্তু এমন ছিল না। আধুনিক ইউরোপীয় বসতি গড়ে ওঠার অনেক আগে থেকেই এই উর্বর উপত্যকা ছিল অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী ‘ওয়াদান্দাই’ নোঙ্গার সম্প্রদায়ের আশ্রয়স্থল। তাদের জীবনযাত্রা ছিল এই বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল, জলবায়ু এবং প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

স্থানীয় ওয়াদান্দাই ভাষায় ‘কাউরা’ শব্দের অর্থ হলো বিশেষ এক প্রজাতির বেগুনি রঙের টিয়া পাখি, যা একসময় এই অঞ্চলের জঙ্গলে অগণিত সংখ্যায় উড়াল দিত। আর ওয়াদান্দাই ব্যাকরণে ‘আপ’ শব্দের অর্থ ‘স্থান’ বা ‘বাসস্থান’। অর্থাৎ ‘কাউরামাপ’ নামটির মূল শাব্দিক অর্থ দাঁড়ায় ‘যে স্থানে বেগুনি টিয়াদের অবাধ বাস’। প্রকৃতির এই আদিম রূপটি আজও শহরের নামের ভেতর টিকে আছে।

তবে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এই শান্ত জনপদের মানচিত্র ও জীবনধারা বদলাতে শুরু করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর, ১৯২০-এর দশকে অস্ট্রেলিয়া সরকার এবং ব্রিটিশ রাজপরিবারের যৌথ উদ্যোগে চালু হয় ‘গ্রুপ সেটেলমেন্ট স্কিম’। মূলত যুদ্ধফেরত সেনা ও অভিবাসী পরিবারগুলোকে কাজের সুযোগ দেওয়া এবং দুর্গম বনাঞ্চলকে আবাদি জমিতে রূপান্তর করাই ছিল এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।

কাউরামাপ অঞ্চলে দলে দলে পরিবার এসে বসতি স্থাপন করতে শুরু করে। বিশাল ও ঘন কারি ও জারা গাছ কেটে তৈরি করা হয় উর্বর কৃষিজমি এবং চারণভূমি। কঠিন পরিশ্রমে গড়ে ওঠে ডেইরি বা দুগ্ধ খামার। অল্প সময়ের মধ্যেই মোঘল সাম্রাজ্যের মতো সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে কাউরামাপের ডেইরি শিল্প। সকালের সোনাঝরা রোদে সবুজ ঘাসের বুকে শত শত গরুর পাল চরে বেড়ানোর দৃশ্য, ট্র্যাক্টর আর দুধের ক্যান পরিবহনের শব্দই হয়ে ওঠে শহরের দৈনন্দিন স্পন্দন। কাউরামাপ পরিণত হয় পুরো মার্গারেট রিভার অঞ্চলের প্রধান ‘ডেইরি রাজধানী’তে।

সময় যত গড়িয়েছে, বিশ্বজুড়ে কৃষিকাজের ধরন বদলেছে। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া এবং বৃহৎ ডেইরি কর্পোরেটগুলোর দাপটে ছোট ছোট পারিবারিক খামারগুলো সংকটের মুখে পড়তে শুরু করে। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে অনেক ছোট খামার বন্ধ হয়ে যায় বা ওয়াইন উৎপাদনে রূপান্তরিত হতে থাকে। মার্গারেট রিভার অঞ্চলটি দ্রুতই তার আন্তর্জাতিক মানের ওয়াইনারি এবং সার্ফিং সৈকতের জন্য নাম কুড়াতে শুরু করে।

কিন্তু কাউরামাপের মানুষ তাদের নিজস্ব শিকড় ও কৃষিজীবী পরিচয়কে কিছুতেই হারিয়ে যেতে দিতে চাননি। নিজেদের ঐতিহ্যের প্রতি এমন শ্রদ্ধা থেকেই ২০১২ সালে ‘কাউরামাপ রিটেইলার্স অ্যাসোসিয়েশন’ চমৎকার এক উদ্যোগ নেয়। শহরের প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে ৪২টি বাস্তব আকারের ফাইবারগ্লাসের গাভীর মূর্তি স্থাপন করা হয়।

এই মূর্তিগুলো কেবল পথসজ্জা ছিল না; প্রতিটি মূর্তির পেছনে ছিল কোনো না কোনো ডেইরি পরিবারের ইতিহাস ও অবদান। রাতারাতি পুরো অঞ্চলের মানুষের নজর কাড়ে শহরের এই নতুন রূপ। পথিকরা গাড়ি থামিয়ে ছবি তুলতে শুরু করেন, স্থানীয় দোকানগুলোতে বিকিকিনি বাড়ে এবং কাউরামাপ আনুষ্ঠানিকভাবে পেয়ে যায় তার ভালোবেসে দেওয়া ডাকনাম, ‘কাউ-টাউন’।

শহরের এই নতুন ব্র্যান্ডিং যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই ঘটে সেই ঐতিহাসিক মোড় পরিবর্তন। কাউরামাপেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা স্থানীয় ব্যবসায়ী জেনিন ডার্নেল সত্তরের দশক থেকেই গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের বই পড়ার অনুরাগী ছিলেন। একদিন পাতা উল্টাতে উল্টাতে তার চোখে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের ফেয়ারফ্যাক্স শহরের একটি রেকর্ড। সেখানে ফাস্টফুড চেইন ‘চিক-ফিল-এ’-এর উদ্যোগে ৪৭০ জন মানুষ গরুর পোশাক পরে জমায়েত হয়ে গিনেস বুকে নাম তুলেছিল।

খবরটি দেখেই জেনিনের মনে এক শিহরন জেগে ওঠে। তিনি এক মুহূর্ত দেরি না করে তার স্বামীকে গিয়ে বলেন, “আমাদের এই কাউ-টাউন তো আমেরিকানদের তৈরি এই রেকর্ড তুড়ি মেরেই ভেঙে দিতে পারে!”

যেমন ভাবনা, তেমন কাজ। শহরের বার্ষিক উৎসব ‘দেজা মু – অ্যান আডারলি লেজেন্ড-ডেইরি কান্ট্রি ফেয়ার’-এর মঞ্চকে বেছে নেওয়া হলো এই ইতিহাস গড়ার জন্য। স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতির মাত্র আটজন উৎসাহী সদস্যকে নিয়ে গঠিত হলো একটি মূল কমিটি। প্রত্যেকে আলাদা আলাদা দায়িত্ব ভাগ করে নিলেন। জেনিনের ওপর দায়িত্ব পড়েছিল গিনেস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রক্ষা করা এবং তাদের কঠোর আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন মেনে প্রস্তুতি নেওয়া।

গিনেস বুক কর্তৃপক্ষের শর্তগুলো কিন্তু একেবারেই হেলাফেলার ছিল না। পোশাকের প্রতিটি ডিটেইল ছিল নির্দিষ্ট: পোশাকটি অবশ্যই শরীরের মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে রাখা একটি একক ‘ওয়ানজি’ হতে হবে। পোশাকের মূল রঙ হতে হবে সাদা, যার ওপর স্পষ্ট কালো ছোপ ছোপ দাগ থাকতে হবে। মাথায় একটি হুড এবং তার সঙ্গে গরুর কান থাকা বাধ্যতামূলক। এমনকি পায়ের জুতো পর্যন্ত হতে হবে সাদা অথবা কালো রঙের।

২০১৪ সালের ১২ জুলাই। উৎসব উপলক্ষ্যে স্থানীয় খুচরা বিক্রেতা সমিতি আগেই প্রায় ৮০০টি গরুর ওয়ানজি পোশাক অনলাইনে আগাম বিক্রির জন্য রেখেছিল, যা মেলার আগের দিনই সম্পূর্ণ বিক্রি হয়ে যায়। কিন্তু আয়োজকরা কল্পনাও করতে পারেননি, মূল দিনে কী হতে চলেছে! সকাল থেকেই দক্ষিণ-পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন কোণ থেকে মানুষ আসতে শুরু করেন। কেবল স্থানীয় বাসিন্দারাই নন; পার্থ, বানবারি কিংবা দূর-দূরান্তের শহর থেকেও শত শত পরিবার এই অনন্য কাণ্ডে শামিল হতে ছুটে আসেন। শিশু থেকে বৃদ্ধ, এমনকি পোষা কুকুরগুলোকেও পশমি গরুর পোশাক পরিয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল।

মঞ্চে তখন একদিকে গামবুট ছোঁড়া প্রতিযোগিতা আর ‘কাউ প্যাট লোটো’র মতো ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ খেলা চলছে, আর অন্যদিকে নির্দিষ্ট সীমানার পেছনে সারিবদ্ধভাবে গণনা করা হচ্ছে গরুর পোশাক পরা মানুষদের। আমেরিকানদের ৪৭০ জনের পুরানো রেকর্ডকে বহু পেছনে ফেলে সেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে সংখ্যাটি গিয়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৫২ জনে! বিশাল এক ‘মানুষ-গরুর’ পাল পুরো মাঠ জুড়ে এক অবিশ্বাস্য দৃশ্যের জন্ম দিয়েছিল। ছোট এক শহরের অদম্য ইচ্ছা শক্তি এবং একতার সামনে বিশ্ব রেকর্ডটি স্রেফ উড়ে গিয়েছিল।

কাউরামাপের সেই অনন্য গিনেস রেকর্ড আজও অক্ষুণ্ন রয়ে গেছে। তবে এই রেকর্ডের আসল সার্থকতা স্রেফ একটি গিনেসের সনদপত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না। আগে যে পর্যটকরা মার্গারেট রিভার অঞ্চলে কেবল ওয়াইন টেস্ট বা সাগরে সার্ফিং করতে আসতেন, তারা এখন নিয়ম করে থামেন কাউরামাপের এই ‘কাউ-টাউনে’। রাস্তার পাশের ক্যাফে, বেকারি, হস্তশিল্পের দোকান এবং স্থানীয় ডেইরি শপগুলোতে সারা বছরই লেগে থাকে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভিড়।

সূত্র: এবিসি নিউজ