চাঁদের মালিক আসলে কে?
এককথায় বললে, কেউ না। কিন্তু এর পেছনের আসল গল্পটা বড় এবং জটিল।
চাঁদের মালিক আসলে কে? এককথায় বললে, কেউ না। কিন্তু এর পেছনের আসল গল্পটা বড় এবং জটিল, যা এখন নতুন করে সামনে আসছে। বর্তমানে চাঁদে যাওয়ার নতুন নতুন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি গড়া, খনিজ সম্পদ তোলা এবং গুরুত্বপূর্ণ ল্যান্ডিং সাইটগুলোর দখল নিয়ে বিভিন্ন দেশ ও বেসরকারি কোম্পানিগুলোর মধ্যে লড়াইয়ের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এ কারণে কয়েকটি দেশের সরকার, আইনজীবী ও মহাকাশ গবেষণা সংস্থাগুলো অর্ধশতাব্দী আগের পুরোনো আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে। যখন বহু দেশ ও কোম্পানি এই নতুন দিগন্তে পা রাখছে, তখন মূল বিতর্কটি আর এই নিয়ে নয় যে মানুষ চাঁদকে ব্যবহার করবে কি না, বরং এই ব্যবহার কীভাবে পরিচালিত হবে তা নিয়েই।
মহাকাশ আইনের মূল ভিত্তি হলো ১৯৬৭ সালের ‘আউটার স্পেস ট্রিটি’ বা মহাকাশ চুক্তি। স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের উদ্যোগে হওয়া এই চুক্তিতে ১১৮টি দেশ স্বাক্ষর করেছিল। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে এই চুক্তির ধারাগুলো বেশ ‘আদর্শবাদী’। চুক্তির দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে পরিষ্কার বলা হয়েছে, “চাঁদসহ মহাকাশের অন্য কোনো জ্যোতিষ্ক সার্বভৌমত্ব দাবি করে বা অন্য কোনো উপায়ে কোনো দেশ নিজেদের অধিকারে নিতে পারবে না। অর্থাৎ, কোনো দেশই চাঁদের মালিকানা দাবি করতে পারে না।”
মহাকাশ চুক্তি অনুযায়ী এটি ‘সমস্ত মানবজাতির প্রদেশ’ হিসেবে গণ্য হওয়ার কথা। প্রায় ৬০ বছর ধরে এই নীতিই চলে আসছে। কোনো দেশই আনুষ্ঠানিকভাবে চাঁদের মালিকানা নেয়নি এবং অ্যাপোলো মহাকাশচারীদের পোঁতা পতাকাগুলোকে সবসময়ই ভৌগোলিক দখলের চেয়ে প্রতীকী হিসেবেই দেখা হয়েছে।
তবে এই চুক্তির একটি বড় ফাঁক হলো, এটি প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন বা ব্যবহার করাকে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করে না। ১৯৬৭ সালে চাঁদে খনি থেকে সম্পদ তোলা স্রেফ কল্পবিজ্ঞান ছিল, কিন্তু বর্তমান সময়ে তা আর কল্পবিজ্ঞান নয়। চুক্তি অনুযায়ী দেশগুলো চাঁদের মালিকানা নিতে না পারলেও, সেখান থেকে উত্তোলিত সম্পদের মালিক হওয়া যাবে কি না সে সম্পর্কে এটি পরিষ্কার করে কিছু বলে না।
কেউ কি চাঁদের মালিকানা না নিয়েও সেখানে খনি করতে পারবে? দক্ষিণ মেরু থেকে পানি-বরফ তুলে, তা রকেটের জ্বালানিতে রূপান্তর করে বিক্রি করতে পারবে—যতক্ষণ না পতাকা পুঁতে সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করা হয়?
১৯৭৯ সালে এই ফাঁকটি পূরণের জন্য ‘মুন অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা চন্দ্র চুক্তি আনা হয়েছিল। সেখানে চাঁদ ও এর সম্পদকে ‘মানবতার সাধারণ ঐতিহ্য’ হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং বলা হয়, “যেকোনো বাণিজ্যিক শোষণ শুরুর আগে একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে হবে।” কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া কিংবা চীন—কারও মতো বড় কোনো মহাকাশ শক্তিধর দেশই এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। অল্প কয়েকটি দেশ যুক্ত হওয়ায় এটি মূলত কার্যকারিতাহীন এক দলিলে পরিণত হয়।
এই আইনি শূন্যতার সুযোগ নিয়ে বড় দেশগুলো নিজেদের মতো করে আইন তৈরি করে নিয়েছে। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ‘কমার্শিয়াল স্পেস লঞ্চ কমপিটিটিভনেস অ্যাক্ট’ পাস করে, এটি ওই দেশের নাগরিকদের মহাকাশ থেকে সম্পদ আহরণ ও তা বিক্রির অধিকার দেয়। লুক্সেমবার্গ, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং জাপানও একই ধরনের আইন করেছে। তাদের যুক্তি হলো—চুক্তিতে ভৌগোলিক মালিকানা নিষিদ্ধ করা হলেও সম্পদ তোলার বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। অর্থাৎ, কেউ চাঁদের মালিক হতে পারবে না, কিন্তু সেখান থেকে যে মাটির নমুনা তুলে আনবে, তার মালিকানা তার হতে পারে।
এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার জন্য ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগীরা নিয়ে আসে ‘আর্টেমিস অ্যাকর্ডস’। এটি কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি নয়, বরং চাঁদ ও মঙ্গলগ্রহ অনুসন্ধানের জন্য কিছু নির্দেশিকা বা নীতিমালার সমষ্টি। বর্তমান সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মতো পুরোনো মহাকাশ শক্তি থেকে শুরু করে সেনেগালের মতো উদীয়মান দেশসহ ৬৮টি জাতি এতে স্বাক্ষর করেছে। এই নীতিমালার মাধ্যমে মহাকাশে স্বচ্ছতা, তথ্য আদান-প্রদান, জরুরি সহায়তা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এর পাশাপাশি একটি নতুন ধারণার জন্ম হয়েছে, যাকে বলা হচ্ছে ‘সেফটি জোন’ বা নিরাপত্তা অঞ্চল। এর উদ্দেশ্য হলো—কোনো দেশ বা কোম্পানি চাঁদের নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় কাজ করলে অন্য কেউ যেন সেখানে হস্তক্ষেপ করে দুর্ঘটনা বা ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি না করে। তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, এই নিরাপত্তা অঞ্চলগুলো ভবিষ্যতে পরোক্ষভাবে জমি দখলের সুযোগ করে দিতে পারে এবং কে আগে ভালো জায়গাটি দখল করবে, শুরু হতে পারে সেই প্রতিযোগিতা।
আগামী কয়েক দশকের সিদ্ধান্তগুলো ঠিক করে দেবে চাঁদ কেবল আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এক অনন্য মডেল হয়ে থাকবে, নাকি নতুন ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের আখড়ায় পরিণত হবে। তবে এটুকু নিশ্চিত যে, চাঁদের মালিকানা কার—এই প্রশ্নটি এখন আর কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়। মহাকাশ যুগের সূচনার পর এই প্রথম এটি এমন একটি বাস্তব সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার সমাধান বিভিন্ন রাষ্ট্র, কোম্পানি এবং অভিযাত্রীদের একসঙ্গে মিলে খুব দ্রুতই খুঁজে বের করতে হবে বলে মনে হচ্ছে।
সূত্র: বিবিসি স্কাই অ্যাট নাইট ম্যাগাজিন।
