ছোটগল্প
Published : 27 Aug 2025, 11:22 AM
হালকা হলদে মেয়ে কোকাটাইল পাখিটা খাঁচায় ঢুকতেই ছাইরঙা ছেলে কোকাটাইল পাখিটা সরে গিয়ে খাঁচার এক কোণায় চুপ করে বসে রইল। মুখ ফিরিয়ে রইল মেয়ে কোকাটাইল পাখিটা থেকে।
মেয়ে কোকাটাইল একটু অবাক হলো, কিছুটা দুঃখও পেল। সে দোকানে একটা খাঁচার ভেতর অনেক পাখির সঙ্গে গাদাগাদি করে ছিল। খাঁচার ভেতরটা বেশ গরম। কাড়াকাড়ি করে খাবার খেতে হত। গল্প বলতে যা হত তা হল ঝগড়া। এই তুমি আমাকে ধাক্কা দিলে কেন? তুমি এত বেশি খেলে কেন? এভাবে পাখনা ছড়িয়ে বসলে অন্যরা বসবে কীভাবে? এইসব কথাবার্তা।
মেয়ে কোকাটাইল পাখিটার স্বপ্ন ছিল পরিচ্ছন্ন বড় একটা খাঁচার ভেতর এক বা দুজন বন্ধুর সঙ্গে আনন্দে বাস করবে। সেখানে থাকবে পর্যাপ্ত খাবার। কোনো ঝগড়াঝাটি হবে না। পরস্পরে গল্প, গানে আনন্দে সময় কাটাবে।
তার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। পরিচ্ছন্ন বড় খাঁচা পেয়েছে। পর্যাপ্ত খাবার আছে। একটা বন্ধুও পেয়েছে। কিন্তু বন্ধুটা যেন কেমন! গল্প করা তো দূরের কথা, ফিরেও তাকায় না। দুই-তিন দিন এভাবেই কাটল। মেয়ে কোকাটাইল পাখিটার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। বলল, তোমার সমস্যা কী বলো তো?
ছেলে কোকাটাইল পাখি চমকে উঠে নিচু স্বরে বলল, কোনো সমস্যা নেই তো!
তাহলে আমার সঙ্গে কোনো কথা বলছো না কেন?
আসলে কথা বলতে সাহস পাচ্ছি না।
মানে?
মানে তুমি খুব সুন্দর। গাঁদা ফুলের মতো গায়ের রঙ। তুমি খাঁচায় আসার পর মনে হচ্ছে বসন্ত ঋতু খাঁচায় ঢুকে গেছে। আমি শুনেছি, সুন্দরী মেয়েদের অহংকার থাকে। রূপের অহংকার। সুন্দরী কোকাটাইল পাখির অহংকার থাকে কি না তা জানি না।
হিহিহি। পাখিদের মধ্যে ওসব নেই। অহংকার থাকে মানুষের মধ্যে। রূপের অহংকার। টাকার অহংকার। ক্ষমতার অহংকার। যার যেটা আছে সেটা নিয়েই অহংকার করতে চায়। তুমি আর আমি বন্ধু। একসঙ্গে খাঁচার ভেতর গল্প করে, আনন্দ করে সময় কাটাবো।
আচ্ছা, তাই হবে।
গল্পে গল্পে ছেলে কোকাটাইল পাখি বলে, আমাদের মালিক হলো এই বাসার দুই মেয়ে। ওদের নাম জুঁই আর জবা। জুঁই বড়, জবা ছোট। জুঁই পড়ে ক্লাস সেভেনে আর জবা পড়ে ক্লাস থ্রিতে।
ওদের নাম বেশ সুন্দর।
ফুলের নামে নাম। সুন্দর তো হবেই। একটা ব্যাপারে ওদের আশ্চার্য এক মিল আছে।
কী ব্যাপারে?
ওদের দুজনের জন্মদিন একটাই। মানে ওরা একই তারিখে জন্মগ্রহণ করেছে।
বাহ!
জন্মদিনের উপহার হিসেবে ওদের বাবা ওদের জন্য একই জিনিস দুইটা করে আনে। একই বইয়েরও দুইটা কপি আনে।
একই বইয়ের দুই কপি!
হু। ওরা অনেকবার বলেছে, বাবা, একই বই দুইটা আনার দরকার কী? একটাই তো আমরা অদল-বদল করে পড়তে পারি। বাবা বলেন, তা হয় না। একদিন তোমরা শ্বশুরবাড়ি যাবে। তখন তোমরা এসব বই নিয়ে যেতে পারবে। বই চির নতুন থাকে। তোমরা পড়বে। তোমাদের ছেলেমেয়ে পড়বে।
জুঁই রেগেমেগে বলে, জবা, বাবা কীসব বাজে বকছে শুনছিস? জবা চিৎকার শুরু করে, আমরা শ্বশুরবাড়ি যাব না। যাব না। যাব না।
হিহিহি। তুমি তো অনেক মজার ব্যাপার-স্যাপার প্রত্যক্ষ করো দেখছি।
কী আর বলবো! এ বাড়িতে এসে আমার জীবন সার্থক মনে হয়। তোমারও তাই মনে হবে।
মেয়ে কোকাটাইল এবার ভিন্ন প্রসঙ্গে গেল। বলল, ওরা কি তোমার কোনো নাম দিয়েছে?
ছেলে কোকাটাইল বলল, হু, আমার নাম অরেঞ্জ।
অরেঞ্জ! মানে কমলালেবু। বেশ সুন্দর নাম তো।
দেখো, দুই-এক দিনের মধ্যে ওরা তোমারও একটা সুন্দর নাম রেখে দেবে।
আমি মেয়ে। আমাকে একটা মেয়েলি নাম দিলে ভাল হয়। আবার আপেল, গুয়াভা এরকম কিছু দেবে না তো?
আরে নাহ! ওরা খুবই বুদ্ধিমতী। মেয়েলি নামই দেবে।
প্রথম পরিচয়ে গল্পটা বেশ ভালোই জমলো। ওরা পরস্পরের কাছে খুব সহজ হয়ে গেল। পরদিন সকালে জুঁই আর জবা কোকাটাইল পাখিদেরকে খাবার দিল, ভিটামিন দিল, হজমশক্তি বৃদ্ধির জন্য ওষুধ দিল। তারপর ওরা স্কুলে চলে গেল।
দুই পাখি খাবার খেল। ঠুকরে একটু করে ওষুধও খেল। তারপর এদিক-ওদিক পাখনা মেলে হালকা ব্যায়াম করল। দু’জনই শরীর-মনে বেশ চাঙ্গা। এখন একটু গল্প করা যায়। অরেঞ্জ বলল, ভেবেছিলাম নাম পেতে তোমার আরও দু’দিন সময় লাগবে। অথচ কালই পেয়ে গেলে। ওরা হয়তো স্কুলে বসে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করে নামটা ঠিক করেছে। নামটা কি তোমার পছন্দ হয়েছে?
মেয়ে পাখিটা বলল, অরেঞ্জেলা নামটা আমার খুবই পছন্দ হয়েছে। তোমার নামের সঙ্গে আশ্চর্যরকম মিল আছে।
জুঁই আর জবা খুব যুক্তিসংগতভাবে চিন্তা করতে পারে।
আচ্ছা, ওরা কি কখনও খাঁচা থেকে আমাদের বের করবে?
অবশ্যই। ছুটির দিনে ওরা যখন ঘরে পড়তে বসে তখন ওরা আমাকে ঘরে ছেড়ে দেয়। আমি টেবিলে বসে বসে ওদের পড়া দেখি। মেঝেতে হাঁটি। জানালার গ্রিলে, পাখার ওপর আবার কখনও জুঁই জবার কাঁধে, মাথার খোঁপায় বসে থাকি।
কী মজা!
আর অনেক মজা আছে।
কী রকম?
জুঁই আমাকে মাথায় নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। ওর পাশে দাঁড়ায় জবা। ওরা দু’জন বলে, পিকু পিকু পু। আমিও বলি, পিকু পিকু পু। একবার ওরা বলে। একবার আমি বলি। এভাবে চলতে থাকে। চলতে চলতে আমি হঠাৎ বলি, পিকু পিকু জুঁই বা পিকু পিকু জবা। ওরা তখন হাসিতে লুটিয়ে পড়ে।
তাহলে তো আমাকেও ওদের নাম বলতে শেখা উচিত।
অবশ্যই। আমার কাছে প্র্যাকটিস করবে।
দিনে দিনে অরেঞ্জ আর অরেঞ্জেলার বন্ধুত্ব যেমন গভীর হল। জুঁই আর জবার সঙ্গেও অরেঞ্জেলার বন্ধুত্ব গভীর হল। মাঝে মাঝে জুঁই আর জবা স্কুলে যাওয়ার সময় অরেঞ্জ আর অরেঞ্জেলাকে ঘরের ভেতর ছেড়ে রেখে যায়। ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে যায়। তাই নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হয় না।
ঘরটা বড়। ওড়াওড়ি করা যায় স্বাচ্ছন্দ্যে। জানালার গ্রিলে, সিলিং ফ্যানে, টেবিলে, চেয়ারের হাতলে, এসির ওপর, দেয়াল ঘড়িতে, ক্যালেন্ডারে বসা যায়। জুঁই-জবা ঘরের মেঝেতে কিছু খাবার আর একটা বাটিতে পানি রেখে যায়। ওড়াওড়ি করতে করতে ক্ষুধা পেলে, তৃষ্ণা পেলে ওরা ক্ষুধা-তৃষ্ণা নিবারণ করতে পারবে।
কিন্তু একদিন। পাশের বাড়ির লোভী ও দুষ্টু হুলোটা চালাকি করে আগে থেকেই চুপটি করে ঘরে ঢুকে খাটের নিচে বসে ছিল। জুঁই-জবা তা টের পায়নি। অরেঞ্জ আর অরেঞ্জেলাকে ঘরে ছেড়ে দিয়ে যেই জুঁই-জবা দরজা বন্ধ করেছে অমনি হুলো বের হয়ে আসে। তখন সে আর হুলো থাকে না। হয়ে যায় রয়েল বেঙ্গল টাইগার।
অরেঞ্জ-অরেঞ্জেলার আত্মারাম খাঁচাছাড়া। প্রথমে ওরা ভয়ে চিৎকার শুরু করে। কিন্তু পরে বুঝতে পারে, চিৎকার করে লাভ হবে না। ওদের আওয়াজ বাইরে যাবে না। বাইরে গেলেও কেউ বুঝবে না যে, ওরা বিপদে পড়েছে। মনে করবে, স্বাভাবিক ডাকাডাকি করছে। সুতরাং জীবন বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যেতে হবে।
ওরা উড়ে গিয়ে বসল সিলিংফ্যানের পাখায়। হুলো সরাসরি লাফ দিয়ে সেখানে যেতে পারবে না। হুলো প্রথমে জানালার গ্রিল বেয়ে উঠল। অরেঞ্জ আর অরেঞ্জেলা বুদ্ধি করে যে পাখাটা জানালার গ্রিল থেকে অধিক দূরে সেই পাখায় গিয়ে বসল। হুলো দিল এক লাফ। কিন্তু পাখার নাগাল পেল না। ধপাস করে মেঝেতে পড়ল। কিছুক্ষণ ঝিম ধরে বসে থাকল।
দেয়ালে যেখানে ক্যালেন্ডার টাঙানো, তার ওপর দেয়ালঘড়ি। সেদিক দিয়ে গেলে সহজে পাখাটার নাগাল পাওয়া যায়। হুলো শক্ত ক্যালেন্ডার বেয়ে উঠতে গিয়ে খামচে ক্যালেন্ডার ছিঁড়ে ফেলল। ক্যালেন্ডারের তারকাটা খুলে ক্যালেন্ডার নিচে পড়ে গেল। তারপরও হুলো আপ্রাণ চেষ্টা করে দেয়ালঘড়ির কাছে পৌঁছুল। ততক্ষণে অরেঞ্জ আর অরেঞ্জেলা গিয়ে বসেছে জানালার গ্রিলে। তবু হুলো লাফ দিল। লাফ দিয়ে দেয়াল ঘড়িটা ফেলে দিল। ঘড়িটা ভেঙে চুরমার।
হুলো এবার জানালার গ্রিলের দিকে যেতেই অরেঞ্জ আর অরেঞ্জেলা গিয়ে বসল জানালার ওপর এসিতে। গ্রিল বেয়ে ওঠার পর হুলো খুব সহজেই হাত বাড়িয়ে ওদের ধরে ফেলতে পারবে। তার আগেই ওরা উড়ে গিয়ে বসল বৈদ্যুতিক বাল্বের নিচের লোহায়। বৈদ্যুতিক বাল্বের দিকে জাম্প করার উদ্দেশ্যে হুলো গিয়ে উঠল বইয়ের আলমারির উপর। অরেঞ্জ আর অরেঞ্জেলা উড়ে গিয়ে বসল ছাদ ছোঁয়া বুকসেল্ফের উপর। ওরা এখন বুঝে ফেলেছে কখন কোথায় গেলে হুলোর নাগালের বাইরে থাকা যাবে। হুলোর দিকে ওরা তীক্ষ্ণ নজরও রাখছে। আচানক লাফ দেওয়ার সুযোগ তাকে দেওয়া যাবে না।
এরকম চলছে ঘণ্টা দেড়েক। অরেঞ্জ আর অরেঞ্জেলা যতটা না ক্লান্ত হয়েছে তার চেয়ে হুলো অনেক বেশি ক্লান্ত। ওড়ার চাইতে লাফ দেওয়া কঠিন। তাছাড়া হুলো কয়েকবার ধপাস ধপাস মেঝেতে আছাড় খেয়েছে।
হঠাৎ ঘরের দরজা খুলে গেল। ঘরে ঢুকল জুঁই আর জবা। অরেঞ্জ উড়ে গিয়ে বসল জবার মাথায়, আর অরেঞ্জেলা গিয়ে বসল জুঁইয়ের মাথায়। জবা-ই প্রথম হুলোকে দেখল। ওর পায়ের কাছে পড়েছিল ঝাড়ু। ঝাড়ু নিয়ে ছুটে গেল হুলোর দিকে। ঝাড়ুর উল্টোপিঠ দিয়ে ধুম করে একটা বাড়িও বসিয়ে দিল হুলোর পিঠে। হুলো মাথা নিচু করে তীরবেগে ওদের পায়ের ফাঁক দিয়ে বের হয়ে রান্নাঘর দিয়ে পালিয়ে গেল।
অরেঞ্জ আর অরেঞ্জেলা থরথর করে কাঁপছে। জুঁই আর জবা ওদেরকে মাথা থেকে তুলে নিয়ে বুকের কাছে আঁকড়ে ধরল। জুঁই বলল, ভয় পেয়েছিস খুব? তোরা যে চেষ্টা করে পাজি হুলোকে পরাজিত করতে পেরেছিস, এজন্য ধন্যবাদ। আর কখনোই তোদেরকে একলা ঘরে ছেড়ে যাব না।
অরেঞ্জ আর অরেঞ্জেলা ওদের দুজনের বুকের সঙ্গে লেপ্টে রইল।